আশির দশকের মফঃস্বল। পাড়ায় বেশিরভাগ একতলা বাড়ি, হাতে গোনা কয়েকটা দোতলাবাড়ি। প্রত্যেক বাড়ির সঙ্গে তফাৎ বেশ খানিকটা। মাঝে বাগান। একটা পাড়ায় অন্তত দুতিনটে বড় খেলার মাঠ। যেখানে বিকেল হতে না হতেই শুরু হয় ফুটবলের ধুপধাপ আওয়াজ আর খানিক পরে পরেই সেই বল এসে পড়ে কারোর বাগানে বা একতলার ছাদে। আর ছাদে যদি উঠতি বয়সের কন্যার পায়চারি চলে তো সেই ছাদে বা বাগানে টিপ করে ফুটবল এসে পড়ে বেশ ঘন ঘন। বাড়ির কর্তা রেগে বল আটকে রাখলেও কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে। আবার ছেলের দল “পায়ে পড়ি কাকু, আর হবে না।” বলে বল নিয়ে যায়। মিনিট কতক পরে আবার ধুপ করে বাগানে চলে আসে বল। ওইটুকুই আনন্দ। ওইটুকুতেই হয়ত বা প্রেম।
কোনো কোনো বাড়িতে সব ঘরে ফ্যানই ছিল না। তার উপরে ছিল লোডশেডিং এর দাপট। ছিল হ্যারিকেন। আর দু একটা বিশেষ বাড়িতে ছিল অ্যান্টেনা। বেশ লাগত সেই বাড়ির ছাদগুলো। যেন কী এক গর্বে মাথায় মুকুট পরে বসে আছে। সন্ধ্যায় গা ধুয়ে মা কাকিমারা রবিবার বসতেন সিনেমা দেখতে। সাদা কালো ছোট্ট বাক্সের মত একটি টেলিভিশন। তখন ছোট করে টিভি বলার চল শুরু হয় নি। সেই টেলিভিশন আবার শাটার দেওয়া একটি জাঁদরেল বাক্সের মধ্যে থাকতেন। যখন প্রতিবেশিনীরা বেশ ঘর ভরিয়ে ফেলতেন, তখন সেই শাটার সরিয়ে টিভির নব ঘোরাতেন গরবিনী গৃহস্বামিনী। শুরু হত বাংলা ছায়াছবি। ছোটরা কেউ সেই ঘরে এন্ট্রি পেত না। এক একদিন বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ত। যেদিন ছোটদের ছবি থাকত। যেমন ‘মর্জিনা আব্দুল্লা’, ‘মেজদিদি’, ‘ইন্দ্রনাথ শ্রীকান্ত’, ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ ইত্যাদি। আমার নিজের এই মেজদিদিতে তাঁকে প্রথম দেখা টেলিভিশনের পর্দায়। মেজদিদির ভূমিকাতে তিনি ছিলেন। গুরুজনেরা বললেন ওঁর নাম ‘কানন দেবী’। ব্যস। ওইটুকুই। তবে তাঁকে একবারও মনে হয় নি যে উনি সত্যিই মেজদিদি নন। আমার কাছে তখন শরৎচন্দ্রের মেজদিদি এক রক্ত মাংসের মানবী। যাঁর পদ্মপলাশের মত দুটি টলটলে চোখ। যে চোখে একটি মা হারা ছেলের জন্য অপার স্নেহ টলমল করছে। হাপুস নয়নে কান্নাকাটি করে সিনেমা শেষ হলেও রান্নাঘরে মায়ের কাছটিতে ঘুরঘুর করা। মা মরে গেলে কেমন কষ্ট পেতে হয় সে তো ‘কেষ্টকে’ দেখে তখন মগজে ঢুকে গেছে। আর ওই কানন দেবীর মতই তখন প্রতিটি মাকে লাগত যে। ওই রকম স্নেহের ভরা টলটলে চোখ।

মেজদিদির পরে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’ ছাড়া সত্যি বলতে ওঁকে দেখা কমই হয়েছে। তবে ওই একটি ছবিতেই তিনি নিজেকে ভুলতে দেন নি। পরে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় পড়ে ওঁর সম্বন্ধে নিজের জানা বেড়েছে। ২২শে এপ্রিল ১৯১৬ সালে কানন বালার জন্ম হাওড়াতে। তাঁর বাবা ছিলেন সওদাগরী অফিসের কেরানি। তবে সত্যি এটাই যে কানন বালার পিতৃপরিচয় সঠিক ভাবে ছিল না। অর্থাৎ কানন বালার মা রতন চন্দ্র দাসের বিবাহিতা স্ত্রীর মর্যাদা কোনোদিন পান নি। তবু সংসার চলছিল। কিন্তু রতন চন্দ্র মারা গেলে দুই নাবালিকা কন্যাকে নিয়ে কম বয়সী বিধবা অথৈ জলে পড়লেন। কানন বালার মা এরপর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি রাঁধুনীর কাজ নেন। অসম্ভব দারিদ্র্যের মধ্যেই কাননের শৈশব অতিবাহিত হয়েছে। বস্তির একটা ছোট ঘরে মা ও দুই মেয়ের মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছিল। কিন্তু এই বস্তি থেকেই তিনি প্রতিভা ও পরিশ্রমের জোরে গোটা ভারতের প্রথম ‘সিনেতারকা’ হয়ে উঠেছিলেন। রূপকথার মতই সে উত্থান। প্রথাগত কোনো শিক্ষা না থাকলেও নিজেকে ঘষে মেজে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। তিনি একাধারে গায়িকা, অভিনেত্রী এবং নৃত্যশিল্পী ছিলেন। এর মধ্যে কোনো শিক্ষাকেই তিনি কম গুরুত্ব দেন নি। সেই সময় বেশির ভাগ ছায়াছবিই দ্বিভাষিক হত। কানন দেবী বহু দ্বিভাষিক ছবিতে কাজ করেছেন। মাস্টার রেখে উর্দু এবং হিন্দি ভাষা রপ্ত করেছিলেন, যাতে তাঁর উচ্চারণ সঠিক হয়। ফলে তাঁর নিখুঁত উচ্চারণ শুনে বোঝার উপায় ছিল না তিনি বাঙালি না অবাঙালি।

কানন বালার গানের গলাটিও ছিল অপূর্ব। প্লেব্যাকের সুযোগ সেই আমলে না থাকায় নিজেকে গান করতে হত। তাই গানকে তিনি কখনো অবহেলা করেন নি। নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ মল্লিক, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ রায়, আখতারি বাই, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্রের কাছে তিনি তালিম নিতেন। কানন দেবীর অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর গানও উচ্চপ্রশংসিত হত। ১৯৩৫ সালে রূপবাণী থিয়েটারে টানা দশ সপ্তাহ চলে ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’। এই প্রথম তাঁর গান গ্রামাফোন রেকর্ডে বের হয়। তিরিশের দশকে তাঁর সমস্ত দ্বিভাষিক ছবিই দর্শকনন্দিত। এর পর তিনি যোগ দেন নিউ থিয়েটার্সে। ‘বিদ্যাপতি’ ও ‘মুক্তি’ বের হওয়ার পরে কানন দেবীর খ্যাতি আরও বৃদ্ধি পায়। পঙ্কজ কুমার মল্লিক তাঁকে নিউ থিয়েটার্সের ‘প্রথম সিঙ্গিং স্টার’ আখ্যায় ভূষিত করেছিলেন। তাঁর অপরূপ রূপের এবং অসাধারণ কন্ঠের জয়গান গেয়েছিল হলিউডের বিভিন্ন পত্র পত্রিকা। চল্লিশের দশকে বোম্বাই ফিল্ম কানন দেবীকে বারবার ডেকেছে কিন্তু কানন দেবী কলকাতা ছেড়ে যাননি। বলেছিলেন, “বম্বেকেই আমার কাছে আসতে হবে।” ফলে বম্বের প্রযোজক লক্ষ্মীদাস আনন্দ নিজে এসে তাঁকে দেবকী বসুর পরিচালনায় কৃষ্ণলীলা ছবির জন্য চুক্তিবদ্ধ করেন। ওই বছরেই অশোক কুমারের বিপরীতে কানন দেবী পেয়েছিলেন এক লাখ পঁচিশ হাজার টাকা। এমনকি ওই সময়ে বম্বের বিশিষ্ট প্রযোজক চন্দুলাল শাহ তাঁকে পাঁচ লাখ টাকা মাস মাইনে দিতে চেয়েছিলেন।

মূলত দারিদ্র্যের কারণে কানন বালার অভিনয় জীবনের শুরুটা কিন্তু সোনায় মোড়া ছিল না। বরং পিতৃপরিচয়হীন এক নাবালিকাকে যতটা শোষণ করা যায় ততটাই করা হয়েছিল। তাঁকে এমন সব দৃশ্যে জোর করে অভিনয় করতে বাধ্য করা হত যেগুলো তিনি করতে চান নি। এমনকি ‘জোর বরাত’ সবাক চলচ্চিত্রে তাঁকে জোর করে চুম্বন করা হয়, যা তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেন নি। ‘বাসবদত্তা’ ছবিতেও এমন কিছু দৃশ্য তাঁর অনিচ্ছা সত্ত্বেও জোর করে করানো হয়েছিল। কারণ সেই সময় নাবালিকা মেয়েটির হয়ে বলার কেউ ছিল না। ১৯৩৭ সালে জ্যোতিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “মানময়ী গার্লস স্কুল” তাঁকে এনে দিল খ্যাতি এবং পরিচিতি। বস্তুত ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত ছিল কানন দেবীর স্বর্ণযুগ। পরবর্তী কালে তিনি ‘শ্রীমতী পিকচার্স’ গড়ে তোলেন তাঁর দ্বিতীয় স্বামী হরিদাস ভট্টাচার্যের সহায়তায়, যিনি প্রথম জীবনে নেভাল অফিসার ছিলেন এবং পরে চলচ্চিত্র পরিচালক হয়েছিলেন। যার বেশিরভাগ নির্মাণ ছিল শরৎচন্দ্রের গল্প নিয়ে। এখানে তিনি শুধু প্রযোজক ও অভিনেত্রীই ছিলেন না, কিছু ছবি পরিচালনাও করেছিলেন।
গানকে তিনি মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতি ঘরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাঁর গান শুনে খুশি হতেন। রবি বসুর লেখাতে জানা যায় যে কানন দেবীকে দেখলে যুবক এবং প্রৌঢ়দের হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত। রূপবাণী সিনেমা হলে এক যুবক নাকি উন্মাদের মতো তাঁর দিকে ছুটে গেছিল। সেই আমলে মহিলারা কানন দেবীর ফ্যাশনে শাড়ি ব্লাউজ পরা শুরু করেন। এমনকি সোনার দুলও কানন দেবীর মতো তৈরি করার চল হয়েছিল।

রাধা ফিল্মসে যোগ দিয়ে তিনি ‘শ্রী গৌরাঙ্গ’ ছবিতে বিষ্ণুপ্রিয়ার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই চরিত্রই তাঁকে বিপুল খ্যাতি এবং সিঙ্গিংস্টারের তকমা এনে দিতে সক্ষম হয়েছিল। পিতৃপরিচয়হীন এক বস্তিবাসী নাবালিকা প্রথম জীবনে নানাভাবে শোষিত হতে হতে জীবনের স্লেটে এমনভাবে নিজেকে এঁকেছিলেন যে তিনি এক রূপকথার পরী হয়ে সকলের চোখে মায়াকাজলের টান দিতে সক্ষম হয়েছেন। আবার খ্যাতির চূড়ায় থাকতে থাকতেই নায়িকার রোল হেলায় ত্যাগ করে মায়ের চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করলেন। মানুষের সেবায় নেমে এসেছিলেন মানুষের মাঝখানে। অনেক হাসপাতালে বেড করে দিয়েছেন, পাতকুয়ো করে দিয়েছেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য অনুদান দিয়েছেন। বন্যাত্রানে সবসময় এগিয়ে এসেছেন। তিনি ‘মহিলা শিল্পী মহল’ তৈরি করেছিলেন। অভিনেত্রী জীবনে বয়স হয়ে গেলে যে অর্থসংকট আসে তার মোকাবিলায় এই সংগঠন খেয়াল রাখত। এই সব কারণে তিনি হাউসফুল নাটক করেও সেই অর্থ এই সংগঠনে দান করেছেন। সেই যুগেও এক দেড় লাখ টাকা অনায়াসে দান করতেন।

অসাধারণ বাগ্মী, গায়িকা, নৃত্যশিল্পী এবং অসাধারণ অভিনেত্রী কানন দেবীর মন শরৎচন্দ্রের ‘মেজদিদির’ সঙ্গে মিলে যায় বলেই ওই চরিত্র একবার দেখলে আর ভোলা অসম্ভব। ক্যালকাটা মুভিটোন স্টুডিওর জমি তিনি কিনে দিয়েছেন অথচ স্টুডিওর নাম তাঁর নামে হয় নি। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী কানন দেবী তাঁর প্রাপ্য সম্মান অনেকক্ষেত্রেই পান নি। তবু সাফল্যের বিচারে তিনি সকলের চেয়ে এগিয়েই থাকবেন। তাঁর বহু কাজ সংরক্ষিত হয় নি। সেটা হলে তাঁর সম্পর্কে আরও জানতে পারবে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়ে। আর সেটাই হবে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তিনি কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ষাটের দশকেই তবে তিনি পুরোপুরি স্তব্ধ হন ১৯৯২ সালে। ১৯৭৬ সালে আকাশবাণী রেডিওর গায়িকা হিসেবে তাঁকে ‘গোল্ডেন ডিস্কে’ সম্মানিত করা হয়। ওই বছরেই তিনি ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কার পান। তবে কানন দেবীর মত এক বহুমুখী প্রতিভাকে কোনো পুরস্কারে আবদ্ধ রাখা যায় না।
Lekhata pore anek kichu janlam.kanan debi samparke khub besi kichu jana chilo na.khub valo lekha.