বাংলায় রামনবমীর ছুটি নতুন নয়। ১৭৮৭ সালের (১১৯৪ বঙ্গাব্দ) ইংরেজ দস্তাবেজ থেকে দেখা যাচ্ছে, ইংরেজ প্রশাসনে রাজকর্মচারিদের রামনবমীতে ১ দিন ছুটি থাকত বাংলায়। দুর্গাপূজায় ৫ দিন, হোলিতে ৫ দিন আর জন্মাষ্টমীতে ২ দিন ছুটি থাকত।
ইংরেজরা বঙ্গে রামভক্তি নিয়ে সজাগ ছিল। সজাগ ছিল অন্যান্য ইউরোপীয় জাতির লোকও।
বিখ্যাত ফ্লেমিশ চিত্রকর Frans Balthazar Solvyns তাঁর কলকাতাবাসের সময় যেসব ছবি এঁকেছিলেন সেগুলি ১৭৯৬ থেকে ১৭৯৯ এর মধ্যে কলকাতাতেই ছাপা হয়েছিল ব্রিটিশ অর্থসাহায্যে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছবি হল Ramayin Gayin। ছবিটিতে স্পষ্টতই বোঝা যায় এক সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে রামায়ণের কথকতা বা রামযাত্রার আসর বসেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনছে আপামর জনগণ।
বাংলায় ব্যক্তিনামে রাম থাবা গেড়েছেন বহুদিন আগে। বাঙালি দার্শনিক, স্রষ্টা, লেখক, কবি, চিত্রকরদের মধ্যে রামনামের ছড়াছড়ি। রামনিধি গুপ্ত, রামমোহন রায়, রামপ্রসাদ সেন, রামকিঙ্কর বেইজ, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, রামলোচন ঘোষ, রামরাম বসু, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য থেকে হালের রামকুমার মুখোপাধ্যায়, অনেকের নামই রামযুক্ত।
প্রত্নতত্ত্ববিদ ইন্দ্রজিৎ চৌধুরী তাঁর এক প্রবন্ধে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন, এ বঙ্গে কয়েক শতাব্দী ধরে রামের কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়নি। তাই রামসংস্কৃতি বহিরাগত বলে কেউ কেউ ভেবেছেন।
কিন্তু তাঁরা এর কারণটা তলিয়ে দেখেননি কখনও। বস্তুত বিষয়টি জড়িয়ে আছে বঙ্গে শ্রীচৈতন্য দেবের আবির্ভাবের সঙ্গে।
বঙ্গে রামভক্তি বনাম কৃষ্ণভক্তি
মুরারি গুপ্ত ছিলেন শ্রীরামচন্দ্রের পরম ভক্ত। শ্রীচৈতন্যদেব একবার তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, “মুরারি, কলিযুগে কৃষ্ণভক্তিই শ্রেষ্ঠ, তুমি রামভক্তি ছেড়ে কৃষ্ণের উপাসনা করো।” গভীর দোটানায় পড়ে মুরারি সারারাত কান্নাকাটি করলেন। তিনি মহাপ্রভুর আদেশ অমান্য করতে পারছিলেন না, আবার নিজের প্রাণপ্রিয় ইষ্টদেব রামচন্দ্রকেও ত্যাগ করতে পারছিলেন না। পরদিন তিনি মহাপ্রভুর পায়ে পড়ে কেঁদে বললেন, “প্রভু, আপনার আদেশ আমি পালন করতে পারছি না, তার চেয়ে বরং আপনি আমাকে মৃত্যু দিন।” মুরারির এই একনিষ্ঠ ভক্তি দেখে মহাপ্রভু খুশি হয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এবং স্বীকার করেন যে মুরারিই হলেন ত্রেতাযুগের হনুমানের অবতার।

শ্রীবাস ঠাকুরের গৃহে চৈতন্যদেব যখন চতুর্ভুজ মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তখন তাঁর অন্ধভক্ত মুরারি গুপ্ত গরুড় রূপ ধারণ করেন এবং শ্রীচৈতন্য তাঁর পিঠে আসন গ্রহণ করেন।
দার্শনিক বিমলকৃষ্ণ মতিলালের নির্বাচনে দশজন সর্বকালের সেরা বাঙালির মধ্যে এক নম্বরে আছেন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। তিনি শুধু ভক্তিতেই সেরা ছিলেন না, রাজনীতির মারপ্যাঁচেও তিনি ছিলেন সেরা। মুরারি গুপ্তকে গ্যাস খাইয়ে তিনি শুধু নিজের বশেই নিয়ে এলেন না, বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের উপর বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করলেন বঙ্গে।
শ্রীচৈতন্যের গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রভাবে বঙ্গে রাধাকৃষ্ণের পূজার যেমন বাড়বাড়ন্ত দেখা গেল, শ্রীকৃষ্ণের মন্দির গজিয়ে উঠতে শুরু করল বাংলা ও উড়িষ্যার কোণায় কোণায়, রাম ক্রমশ নিষ্প্রভ হয়ে পড়তে লাগলেন। নতুন রামমন্দির নির্মাণ বন্ধ হয়ে গেল, পুরনো রামমন্দিরগুলো অনেক জায়গায় বিষ্ণুমন্দির বা রাধাকৃষ্ণ মন্দিরে রূপান্তরিত হল।
বাংলায় রামায়ত বৈষ্ণববাদ গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদের সাথে মিশে যায় এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদই প্রাধান্য লাভ করে। প্রকৃতপ্রস্তাবে, শ্রীচৈতন্যের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে রামের চেয়ে কৃষ্ণ প্রাধান্য পান এবং সীতানাথের চেয়ে গোপাল বেশি পছন্দের হয়ে ওঠেন, কিন্তু সেই অর্থে সীতানাথ কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যাননি। পশ্চিমবঙ্গে রাম কীভাবে আজও একটি জীবন্ত ঐতিহ্য, তা বুঝতে পূর্ব বর্ধমানের গোহোগ্রাম গ্রামে ঘুরে আসতে হবে।সেখানে রাম নবমীর দিনে গোটা গ্রাম আবিরের (গুলালের) রঙে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। এই গ্রামে ভট্টাচার্য পরিবার বাস করেন, তাঁরা দিব্য রাম-সেবক এবং তাঁদের কাছে অষ্টধাতুতে খোদাই করা সীতার মূর্তিসহ রামের একটি সুন্দর কালো পাথরের মূর্তি রয়েছে। আজও দিনে তিনবার রাম ও সীতার পূজা করা হয় এবং রাম নবমীর সময় একটি বড় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ১০৮ কলসি জল দিয়ে স্নান করানোর পর রাম ও সীতার পূজা করা হয়। সন্ধ্যায় দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন পুরো গ্রাম আবির বা গুলাল নিয়ে খেলা করে।
ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসের শিশু রামের মূর্তি বা রামলল্লার সঙ্গে গভীর প্রেমের বন্ধন ছিল। রামলল্লা ছিলেন উত্তর ভারতের জটাধারী নামক এক রামৈত বা রামায়ত সাধুর ইষ্ট দেবতা। জটাধারী দক্ষিণেশ্বরে এসে গঙ্গার তীরে কিছুকাল অবস্থান করেছিলেন। সেখানে থাকাকালীন ঠাকুর রাম সাধনায় মগ্ন ছিলেন। তিনি রামলল্লাকে এক জীবসত্তা হিসেবে দেখতে শুরু করলেন। রামলল্লা ঠাকুরের সঙ্গে গঙ্গায় স্নান করতে যেতেন, কিন্তু জল গুলিয়ে ময়লা করতেন এবং স্নানের সময় শেষ হয়ে গেলেও জল ছেড়ে উঠতে চাইতেন না। রামকৃষ্ণকে তাঁকে জল থেকে তোলার জন্য বারবার বকাঝকা করতে হতো। একবার রামলল্লার খিদে পেলে, ঠাকুর তাঁর কাছে থাকা কিছু চিঁড়ে তাঁকে খেতে দিলেন। সেই চিঁড়ে কয়েকটি তুষ ছিল এবং রামলল্লার মুখের ভিতর ছড়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে ঠাকুর কাঁদতে কাঁদতে বললেন – “মা কৌশল্যা তোমাকে সেরা মাখন আর ক্ষীর খাইয়েছিলেন, আর আমি তোমাকে এই কাঁচা ভাত খেতে দিলাম। আমি কী হতভাগা!” যখন জটাধারীর চলে যাওয়ার দিন এল, রামলল্লা স্বপ্নে তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে তাঁকে ঠাকুরের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে বললেন। জটাধারী রামলল্লাকে রামকৃষ্ণের স্নেহময় তত্ত্বাবধানে রেখে গেলেন। তিনি দক্ষিণেশ্বরের গর্ভগৃহে ছিলেন, যতদিন না মন্দিরে এক চুরির সময় অন্যান্য মূল্যবান জিনিসের সাথে তাঁকেও চুরি করে নিয়ে যায় তস্কররা। সম্ভবত, ভক্তদের গভীর ভালোবাসার অভাবে, রামলল্লা চিরকালের জন্য নিজেকে অদৃশ্য করে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এরকমটাই ধারণা আছে ভক্ত মহলে।
রামভক্ত মুরারি গুপ্তকে কব্জা করে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বঙ্গে রামের চেয়ে কৃষ্ণকে প্রাসঙ্গিক করে তোলেন। তবে রামনামের চোরাস্রোত রয়েই গেল। রাম কোনওদিনই এ বঙ্গে অপূজিত ছিলেন না।