| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

রামদুলাল সরকার : জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ছিলেন আধুনিক চাঁদসদাগর

Reporter
পেজ ফোর, বিশেষ প্রতিনিধি / ৭২৩ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৮ জুন, ২০২২

কলকাতা ছিল আধুনিক ভারতবর্ষে ভাবজগতের পথ-প্রদর্শক। কলকাতার পথ ধরে ভারতবর্ষে বিস্তার লাভ করেছিল নবজাগরণের বার্তা। কলকাতার সে স্বর্ণযুগ আজ প্রায় অতীত। সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলিতে বাঙালি জাতিকে যাঁরা তাঁদের বহুমুখী কর্মকাণ্ডের দ্বারা সম্মানের উচ্চশিখরে উন্নীত করতে সমর্থ হয়েছিলেন, তাঁদির স্মৃতি বহন করে আজও দাঁড়িয়ে আছে মহানগরী কলকাতার পথ-প্রান্তর। আমরা তা অতিক্রম করে যাই, ঠিকানা হিসেবে উল্লেখ করি। অথচ ওই নামগুলির আড়ালে যে সব ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল উপস্থিতি তাঁদেরকে আমরা প্রায় সবাই ভুলে গেছি কালচক্রের আবর্তনে। এমন একজন ছিলেন রামদুলাল সরকার। তাঁর স্মরণে ইংরেজ আমলেই কলকাতার আদিপর্বে উত্তর কলকাতার একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছিল রামদুলাল সরকার স্ট্রিট। উত্তর কলকাতার বিধান সরণি ধরে শ্যামবাজারের দিকে বাঁদিকের ফুটপাতে ঠিক হেদুয়ার কোণে উল্টোদিকের গির্জার পাশ দিয়ে শুরু হয়ে রাস্তাটি গিয়ে পড়েছে সেন্ট্রাল অ্যাভিন্যুতে।

রামদুলাল সরকারের কর্মময় জীবন ছিল বিচিত্র রূপকথার মতো অথচ তা ঐতিহাসিক সত্য। সর্বোপরি তা ছিল বাঙালির সমুদ্রপতে আন্তজার্তিক বাণিজ্য অংশগ্রহণের ইতিহাসে এক নবজাগরণ। তাই তাঁর প্রতিভার আলোচনা করতে গিয়ে প্রাক-কথন হিসেবে সামান্য ইতিহাসের পর্যালোচনা প্রাসঙ্গিক।

রামদুলাল সরকার

সুপ্রাচীনকাল থেকেই ভারতভূমি জল ও স্থলপথে বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এ সম্পর্কের যোগসূত্র রচনা করেছিল বণিকের বাণইঝ” ও সম্রাটের সাম্রাজ্য বিস্তারের বাসনা। ব্যবসায়-বাণিজ্যে, সম্পর্ক রচনার ক্ষেত্রে ভারতীয় বণিকরা সমুদ্রপথেরও ব্যবহার করেছেন। এ কারণে সেই ঐতিহাসিক অতীতে ভারতবর্ষের উপকৃলবর্তী অঞ্চলের কোনও কোনও স্থানে নৌ-নির্মাণশিল্প গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীর শেষার্ধে আগত এক গ্রিক নাবিকের রচনা থেকে এই প্রসঙ্গে বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। পরবর্তীকালে প্লিনীও ভারতীয় সওদাগরদের সমুদ্রপথে বাণিজ্য বিস্তারের প্রসঙ্গ চর্চা করেছেন বিশদভাবে। তারও পূর্বের ইতিহাস — মহামতি অশোক বুদ্ধের বাণী প্রচারের জন্য জলপথে পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকা তথা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপে দূত পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে ওই একই কাজে সিংহল দ্বীপে পাঠিয়েছিলেন।

সেই সুবাদে বাঙালি নাবিকও একদা সমুদ্রপথে দূর-দুরান্তে যাতায়াতের জন্য খ্যাত ছিলেন। বিশ্ববাণিজ্যের এ ধারায় প্রাচীন বাঙলা প্রভূত আর্থিক সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এ কারণে পোতনির্মাণে শিল্পেরও একটা বিশেষ স্থান ছিল প্রাচীন বঙ্গভূমিতে।

ওই সময়ের বাঙলার বণিক ও নাবিকদের সমুদ্রপথে দূরপ্রাচ্যের দেশগুলিতে যাতায়াতের জন্য প্রধানত দুটি বন্দরের গুরুত্ব ছিল সর্বাধিক। ছিল তাম্রলিপ্ত ও গঙ্গাবন্দর। তাম্রলিপ্ত ছিল বিত্তশালী বণিকদের কেন্দ্র। তাঁরা লঙ্কা, সুবর্ণদ্বীপ ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমৃদ্ধ বাণিজ্যে লিপ্ত ছিলেন। ফা-হিয়েন তাঁর বিবরণীতে সিংহলের সঙ্গে তাম্রলিপ্তর বাণিজ্যপথের কথা উল্লেখ করেছেন। পেরিপ্লাস ও টলেমির লেখাতেও এসব সমুদ্রপথ এবং বাণিজ্য সম্পর্কের কথা উল্লেখ রয়েছে। জাতকের গল্পে তাম্রলিপ্ত হতে সিংহল ও সুবর্ণদ্বীপ যাত্রার প্রসঙ্গ এসেছে বারে বারে। টলেমি আরও একটি সমুদ্রপথের সন্ধান দিয়ে বলেছেন, তাম্রলিপ্ত হতে যাত্রা শুরু করে বাণিজ্য জাহাজগুলি সোজা গঞ্জামের নিকটবর্তী পলৌরা বন্দর হয়ে কোণাকুণি বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে তা পৌঁছত মালয়, যবদ্বীপ, সুমাত্রা প্রভৃতি দ্বীপ-উপদ্বীপে।

পরবর্তীকালে আরব বণিকরা অষ্টম শতকে সমুদ্রে একচ্ছত্র আধিপত্য স্থান করলেও তারও পরে পোর্তুগীজ নাবিক, বণিক ও বোম্বেটেদের অত্যাচারে ভারতীয় নৌ-বাণিজ্যের গতি সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত হয়। বাণিজ্যবৃত্তিতে সুদূরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে বাঙালি বণিক ও নাবিক একদিন সপ্তডিঙ্গা মধুকর সাজিয়ে সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন, কালের গতিতে তাঁদের সেই উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে গেল। বাঙালি বণিকদের বহিবাণিজ্যের গতি ব্যাহত হলো।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কলকাতায় বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের মধ্য দিয়ে কিছু সংখ্যক বাঙালির মনে আন্তজার্তিক ব্যবসার ভাবনা আবার উঁকি দিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে ভারতীয়দের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের লেনদেনের ব্যাপারে কিছু সংখ্যক বাঙালি ইংরেজদের দোভাষী ও বেনিয়ান হিসেবে নিযুক্ত হলেন। সামান্য ইংরেজি জ্ঞান সম্বল করে ও কাজে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এমন অনেক বাঙালি সেই সময়ের কলকাতার সমাজে ধনী ও মানী ব্যক্তি হতে পেরেছিলেন।

নবাব আলিবর্দীর শাসনকাল। বর্গির অত্যাচারে ভাগীরথীর উভয় কূলের জনজীবন বিপর্যস্ত। ধন-প্রাণ রক্ষার জন্য গ্রামের মানুষ শহর কলকাতায় পালিয়ে বাঁচতে সচেষ্ট। এমন পরিস্থিতিতে ১৭৫২ সালে দমদমের নিকটবর্তী রেকজানি গ্রামের পাঠশালার দরিদ্র শিক্ষক বলরাম দে তাঁর, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে রাত্রিতে গ্রামত্যাগ করলেন কলকাতার উদ্দেশ্য। কিন্তু অন্ধকারে পথভ্রষ্ট হলেন। ওই সময় স্ত্রীর প্রসব-বেদনা উপস্থিত হলে এক মাঠের ধারে ঝোপের মধ্যে রামদুলালের জন্ম হয়। নিকটবর্তী গ্রামে বলরাম তাঁর স্ত্রী ও নবজাতক সন্তান-সহ এক চাষীর কুটিরে আশ্রয় নেন। এখানেই পাঁচ বছর বয়সে রামদুলাল পিতৃহীন হন। তার মাত্র দু-মাস পরে মা-ও মারা যান। এ অবস্থায় অনুজ ভাই ও ভগ্নী সহ রামদুলাল কলকাতার সিমুলিয়ায় মাতামহ ও মাতামহীর নিকট আশ্রয় পেল। তার মাতামহ ছিলেন ভিক্ষাজীবী। ওই সময় দরিদ্র ব্রাহ্মণ বা কায়স্থের পক্ষে ভিক্ষাবৃত্তি দ্বারা সংসার প্রতিপালন কোনও ঘৃণার কারণ ছিল না সমাজে। মাতামহী ও পাড়ার গৃহস্থদের বাড়ি ধান ভেনে ও চিড়া কুটে সংসার নির্বাহে সাহায্য করতেন। ঘটনাচক্রে গঙ্গার ঘাটে কলকাতার অন্যতম ধনী মদনমোহন দত্তের স্ত্রীর সঙ্গে রামদুলালের মাতামহীর পরিচয় ঘটে। সেই সূত্রে ওই ধনী দত্ত পরিবারে রাঁধুনির কাজে তাঁর নিযুক্তি। এভাবেই বালক রামদুলালের দত্ত পরিবারে (হাটখোলা দত্ত বাড়ি) আশ্রয়লাভ। মদনমোহন দত্ত তাঁর পরিবারের সন্তানদের সঙ্গে রামদুলালের বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। রামদুলাল একনিষ্ঠতা ও অধ্যবসায়ের বলে বাংলা ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করে ইংরেজি ভাষাতেও সামান্য জ্ঞান অর্জন করলেন। ষোল বছর বয়সে মদনমোহন দত্ত রামদুলালকে তাঁর নিজস্ব আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় ১৭৬৮ সালে পাঁচটাকা মাসিক মাইনেতে বিল সরকারের কাজে নিয়োগ করলেন। পরে দশটাকা মাস মাইনেতে রামদুলালকে শিপ সরকারের পদে নিয়োগ করা হলো।

ওই সময় ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে টুলো অ্যান্ড কোং-তে কিছু পণ্য নিলামে বিক্রি হবে বলে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। মদনমোহন দত্ত রামদুলালকে চৌদ্দ হাজার টাকা সঙ্গে দিয়ে ওই পণ্য নিলামে কেনার টাকা সঙ্গে দিয়ে ওই পণ্য নিলামে কেনার জন্য পাঠালেন। ওখানে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় রামদুলাল আর নিলামের ডাকে অংশগ্রহণ করতে পারলেন না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই গঙ্গার মোহনায় ডুবে যাওয়া পণ্যবোঝাই একটি বিদেশি জাহাজ নিলামে উঠল। বিদেশি জাহাজে আনা নানা পণ্যসামগ্রী নির্ণয়ে রামদুলালের অসামান্য দক্ষতা ছিল। তিনি ওই জাহাজ নিলামে চৌদ্দ হাজার টাকায় কিনে নিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ইংরেজ বণিক ওখানে উপস্থিত হয়ে লাভের লোভ দেখিয়ে ওই জাহাজ তাঁকে বিক্রি করে দিতে বললে রামদুলাল প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। নেটিভের এমন স্পর্ধায় ইংরেজ বণিক তাঁর প্রতি কটু বাক্য প্রয়োগ করে ভীতি প্রদর্শন করলেও কোনও ফল হলো না। পরে নরম সুরে তা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিলে ১ লক্ষ ১৪ হাজার টাকায় রথা করে রামদুলাল ইংরেজ বণিককে ওই জাহাজ বিক্রি করে দিলেন। ফিরে গিয়ে রামদুলাল মণিব মদনমোহন দত্তর হাতে ১ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা তুলে দিয়ে সবিস্তারে কাহিনিটি বর্ণনা করলেন। তিনি আরও বললেন, ওই টাকায় তাঁর অধিকার নেই, কারণ মনিবের পুঁজি দিয়ে তিনি নিলাম ডেকেছিলেন। রামদুলালের সততা ও নীতিবোধে বিস্মিত হয়ে মদনমোহন দত্ত ওই অর্থের এক লক্ষ টাকা রামদুলালকে ফেরত দিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করতে উপদেশ দিলেন। আশ্রয় ও অন্নদাতা মদনমোহন দত্তের আশীর্বাদ পাথেয় করে রামদুলাল ১৭৭৫ সালে স্বাধীনভাবে ব্যবসা শুরু করলেন।

১৭৭৬ সালে আমেরিকা একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা করল ও জর্জ ওয়াসিংটনের নেতৃত্বে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চলল দীর্ঘকাল। ১৭৮১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সেনাপতি কর্নওয়ালিশ সম্মিলিত মার্কিন সৈন্যবাহীনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন। ১৭৮৩ সালে ব্রিটিশ সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিলেন। জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে সদ্য স্বাধীন মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্র এবার বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে বিশ্ববাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে দেশের সার্বিক উন্নতিসাধনের সুযোগ পেল। জলপথে এশিয়ার বাণিজ্য বিপণিতে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে এলো। উপনিবেশ হারালেও ইংরেজের বিদ্বেষভাব ছিলল প্রকট। ইংরেজ বণিকরা আমেরিকার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নানাভাবে প্রতিহত করতে সচেষ্ট হলো। এরপর ১৭৮৭ সালে মার্কিন পণ্যে বোঝাই স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রথম বাণিজ্যতরী কলকাতার বন্দরে এসে ভিড়ল। কলকাতার ইংরেজ বণিকরা বা এজেন্সি হাউসগুলি মার্কিন পণ্যের বেচা-কেনা নিয়ে কোনও আগ্রহ প্রকাশ করল না। পরোক্ষভাবে ইংরেজ চাইছিল ভারত-মার্কিন বাণিজ্য যাতে সম্প্রসারিত না হয়। কলকাতায় সুপ্রতিষ্ঠিত স্বাধীনচেতা রামদুলাল সেদিন ক্ষমতাবান ইংরেজ শক্তির বিরাগভাজন হওয়ার ভয়কে উপেক্ষা করে মার্কিন বণিকদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন। তিনি উদ্যোগী হয়ে নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং নিজ কর্মচারী ও দালালদের মারফত মার্কিন পণ্য উপযুক্ত মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করলেন। অধিকাংশ বিভিন্ন বাজার থেকে লাভজনক দামে নানা ভারতীয় পণ্য মার্কিন বণিকদেরজন্য সংগ্রহ করে দিলেন। এ কাজে তিনি প্রয়োজনীয় ঋণ দিয়েও মার্কিন বণিকদের সাহায্য করলেন। স্বদেশে ফিরে গিয়ে সেসব ভারতীয় পণ্য বিক্রি করে তাঁরা প্রভূত লাভবান হলেন।

রামদুলাল সরকার স্ট্রীট (হেঁদুয়ার দিক)

রামদুলালের সততা, বাণিজ্যিক দূরদর্শিতা ও হৃদয়বেত্তায় মার্কিন বণিকসমাজ মুগ্ধ হলেন। ফলে মার্কিনমূলুক থেকে তাঁরা সরাসরি পণ্যবোঝাই জাহাজ সম্পূর্ণরূপে তাঁর উপর আস্থা রেখে কলকাতার বাজারে বিক্রির জন্য পাঠাতে শুরু করলেন। এমনি ধারায় প্রশন্ত মহাসাগর ও অ্যাটলান্টিক মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত রামদুলাল সরকারেকে কেন্দ্র করে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের একটা পাকা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

জলপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রামদুলাল সরকার আলোচ্যকালে ছিলেন আধুনিক চাঁদসদাগর। তাঁর নিজের চারখানা জাহাজ কলকাতা বন্দর থেকে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, চিন, মাল্টা, মরিশাস, যবদ্বীপ, উত্তমাশা অন্তরীপ ও ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে নিয়মিত যাতায়াত করত। রামদুলাল নিজে সাঁইত্রিশটি মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় এজেন্ট ছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বণিকসমাজ রামদুলালের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা পোষণ করতেন। তার নিদর্শনস্বরূপ তাঁরা একখানি বাণিজ্যতরীর নাম রেখেছিলেন ‘রামদুলাল’। তা ছাড়াও সালেম, বোস্টন, নিউ ইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া ও মার্বল হেডের ৩৫ জন মার্কিন বণিক স্বেচ্ছায় অর্থদান করে ওই সময়ের বিখ্যাত শিল্পী গিলবার্ট স্টুয়ার্টকে দিয়ে জর্জ ওয়াশিংটনের একখানা পূর্ণাবয়ব তৈলচিত্র অঙ্কন করিয়ে তা রামদুলালকে উপহারস্বরূপ পাঠান। জর্জ ওয়াশিংটন তখনও বেঁচে। তাঁর মৃত্যুর এক বছর পরে ওই তৈলচিত্রখানি ১৮০১ সালে এক মার্কিন জাহাজে কলকাতায় এসে পৌঁছয়। জীবদ্দশায় রামদুলাল এই অমূল্য উপহারটি পরম সমাদরে রক্ষা করে রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরেও বংশধররা তা সসম্মানে দির্ঘদিন রক্ষা করেগেছেন। পরে নানা হাত বদলের পর মার্বল হেড নিবাসী এরিক কুভার্স তৈলচিত্রখানি গোপন পথে কিনে স্বদেশে পাচার করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতবর্ষের মৈত্রীর স্মারক এই অমূল্য শিল্পনিদর্শনটি আজও স্বদেশে এরিক কুডার্সের সংগ্রহশালায় রাখা আছে।

বণিক সম্প্রদায় দেশে দেশে সবসময় সভ্যতা ও সংস্কৃতির দেওয়া-নেওয়ার অগ্রদূত হিসাবে কাজ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতায় যে নবজাগরণের সূত্রপাত হয়েছিল, তার প্রারম্ভিক পর্বে ভারত মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্ক এক বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ওই সময়ের এক মার্কিন বাণিজ্য জাহাজে টমাস পেইনের ‘এজ ওফ রেশন’ এর এক হাজার খণ্ড ওই দেশ থেকে কলকাতার বন্দরে এসে পৌঁছেছিল। বইখানির নির্ধারিত মূল্য ছিল এক টাকা। কলকাতায় বইটির জন্য যুবকদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। এক টাকার বই পাঁচগুন মূল্য দিয়ে তারা কিনে পড়ল সুদূর আমেরিকায় বসে লেখা বিশ্ববিপ্লবী টম পেইনের বুদ্ধি ও যুক্তির ঐন্দ্রজালিক ব্যাখ্যা।

রামদুলাল সরকার স্ট্রিট (সেন্ট্রাল এ্যাভিনিউয়ের দিক)

কলকাতা বন্দর থেকে মার্কিন বণিকরা নানা পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে আমাদের নানা প্রাচীন সংস্কৃতি গ্রন্থও নিয়ে গেছেন স্বদেশে। এসব গ্রন্থের কিছু গিয়ে পৌঁছেছিল ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথম মার্কিন সংস্কৃতবিদ পণ্ডিত এডওয়ার্ড এলব্রিজ স্যালসবেরি। পরবর্তীকালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতচর্চা ও গবেষণার একটি কেন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন। তারও পরে এই আমেরিকাতেই ভারতাত্মা বিবেকানন্দ সর্বপ্রথম পাশ্চত্যকে শুনিয়েছিলেন বিশ্বের প্রাচীনতম সংস্কৃতি ও সভ্যতার মর্মবাণী।

রামদুলালের কর্মযজ্ঞের বিস্তার ছিল সমাজের নানা শুভ কর্মক্ষেত্রে। ওই সময়ের আরও অনেকের মধ্যই অবশ্য তা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অন্য মহাজনরা আবার পাশাপাশি ইংরেজ তোষণ করেছেন, বিলাস ব্যাসনে অবসর বিনোদন করেছেন, মদমাংসে মাত্রাধিক রুচি দেখিয়ে ধন গরিমা সহ পুরোপুরি সাহেব হওয়ার গর্ব প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অনেকে আবার বিবেকবোধ জলাঞ্জলি দিয়ে অন্যায় পথে অর্থও রোজগার করেছেন। মধ্যস্বত্বলোভী কর্নওয়ালিশ বালাই-এর শিকার হয়ে অনেক আবার গণ্যমান্য কত খেতাব পেয়েছেন। ভারত সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের দলিল-দস্তাবেজ ঘেঁটে ড. সুকুমার সেন ওই সময়ের কলকাতায় নিজেও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের যে তালিকা প্রস্তুত করেছেন তাতে রামদুলাল সম্বন্ধে তিই বলেছেন — “ইনি বোধ হয় কলকাতার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী। বাণিজ্য সূত্রেই তিনি সম্পত্তি লাভ করেন। ইনি বহুদিন ফেয়ারলি কোম্পানির দেওয়ান ছিলেন এবং আমেরিকায় ব্যবসায়ীদের সহিত কারবার ছিল।” কলকাতার সর্বশ্রেষ্ঠ ধনী, কিন্তু ধনের গরিমায় তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন না। তাই অন্ধভাবে পাশ্চাত্যের ভোগসর্বস্ব জীবনধারার শিকার হননি। অথচ পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার পীঠস্থান হিন্দু কলেজের স্থাপন পর্বে অগ্রণী হয়ে তিনি দান করেছিলেন তিরিশ হাজার টাকা। তিনি অবশ্যই শিমুলিয়ায় নির্মাণ করিয়েছিলেন প্রাসাদোপম অট্টালিকা কিন্তু চলা-ফেরায় ছিলেন খাঁটি সহজ সরল বাঙালি ভদ্রজন। পরশ্রমজীবী জমিদার হওয়ার মোহ কখনও তাঁর হৃদয়ে স্থান পায়নি। কারণ, এ প্রথা পরগাছার সৃষ্টি করেছিল আর তার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়েছিল প্রজাপীড়ন ও শোষণ। ওই সময়ে আচরিত ইংরেজ তোষণ বা উচ্চপদে আসীন আমলাতন্ত্রের একান্ত বিশ্বস্ত ভৃত্যরূপে নিজেকে প্রমাণ করে কখনও রাজকীয় সম্মানশিখরে উত্তরণের মানসিকতায় ভোগেননি। ওই সময়ের প্রিন্স বা রাজার সঙ্গেও তাঁর কোনও সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে মনে হয় না। দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি ছিলেন নাম বা প্রভূত্বের মোহমুক্ত। অথচ আপন ব্যক্তিত্বে মানুষের ধর্মে অবিচল থেকে ব্যক্তিগত জীবনে ও বৃহত্তর সমাজের সম্পর্কে এমন কোনও শুভকর্ম নেই, যাতে তিনি অংশগ্রহণ করেননি।

ইউরোপীয় পূনর্জাগরণের একটা অবলম্বন ছিল সমুদ্রযাত্রার রোমাঞ্চ, যার ফলশ্রুতিতে আবিষ্কৃত হয়েছিল নতুন নতুন জলপথে অজানা দেশ। ইয়োরোপ ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল বাণিজ্য সম্পত্তিতে। আর আমাদের নবজাগরণের বৈশিষ্ট্য ছিল কলকাতার মুষ্টিমেয় শিক্ষিত জনের মধ্যে ভাববিপ্লবে। কিন্তু সদ্যস্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন পর্বে রামদুলাল সরকার পালন করেছিলেন ব্যবসা-বাণিজ্যে বাঙালির বৈষয়িক ভাবনায় নবজীবন দানের এক গুরুদায়িত্ব। তিনি মারা যান ১৮২৫ সালের ৯ এপ্রিল। পথের ধূলায় জন্ম এই দরিদ্র সন্তান আপন অধ্যাবসায়, সততা, ধর্মবোধ ও মানুষের ধর্মে অবিচল থেকে কালে বাঙালির ব্যবসার জগতে যে বিরাট মহীরূহে পরিণত হয়েছিলেন, তার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বিরল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev