শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:০৬
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

নৈঃশব্দের প্রণেতা যোগেশ মাইম : রিঙ্কি সামন্ত

রিঙ্কি সামন্ত / ৬৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫

বিনা বাক্য ব্যায়ে অসংখ্য কথা বলে যে অভিনয় সত্ত্বা তা হল ‘মূকাভিনয়’ বা ‘মাইম’। আমরা বাঙালিরা মূকাভিনয়কে চিনি যাঁর হাত ধরে তিনি হলেন যোগেশ দত্ত। বিগত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ভারতে মূকাভিনয়ে অগ্রণী ভূমিকা তিনি পালন করেছেন। মূলত তাঁরই উদ্যোগে ভারতে মাইম একটি কলা হিসাবে এবং পরবর্তীতে ভারতীয় রীতির কলা হিসাবে বিদেশে প্রচারিত হয়। মূকাভিনয়ের দুনিয়ার তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তী। আজকের লেখায় ফিরে দেখার চেষ্টা করব ঘটনাবহুল তাঁরই জীবনের ফিরে আসা দিনগুলোকে।

বাংলাদেশের ফরিদপুরের হাটশিরুআইল গ্রামে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি নদী — আড়িয়ালখান। এক মুসলমান ফকিরের নামেই নদীর নাম। পিতামাতার এক কন্যা ও পাঁচ পুত্রের সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। শিয়ালদার বৈঠকখানা বাজারে পুরোনো আসবাবপত্রের একটি দোকান ছিল তার বাবার। জন্মের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। পরে এক জেঠিমা কলকাতায় চিঠি লিখে খবর দেন। ছ-মাস বয়সে প্রথম তার বাবা তাকে দেখেন।

বাংলাদেশে তখন স্বদেশী আন্দোলন চলছে। গ্রামের স্কুলে পড়ার সময় ব্রতচারীর গান গাওয়া হতো — আয় কচুরি নাশি/ রাক্ষসীদের বাংলাদেশে/ দিচ্ছে গলার ফাঁসি…ইত্যাদি।

গ্রামের পুকুরে একদিন কচুরিপানা তুলতে গিয়ে একটা রিভলবার পাওয়া গেল। গ্রামের বড়রা তখনই সেটাকে লুকিয়ে ফেললেও সেটি ছোট যোগেশের চোখ এড়িয়ে যায়নি। কিছুদিন পরে গ্রামে এক ভদ্রলোক এসে রিভলবারের খোঁজ নিলেন। সকলেই ব্যাপারটা কেমন যেন এড়িয়ে চলল। কিন্তু ছোট যোগেশ সত্যি না বলে থাকতে পারলো না। ভদ্রলোক খুব খুশি হয়ে যোগেশকে আদর করলেন ও সামনের দোকানে গিয়ে মিষ্টি খাওয়ালেন।

উনি তো মিষ্টি খাইয়ে চলেগেলেন আর তারপরে পাড়ার দাদারা মিলে যোগেশকে পুকুরে চুবালো আর বলল, ‘বল আর কাউকে বলবি না, কোনদিন এই কথা জিজ্ঞেস করলেও বলবি না, বল’। ‘বলবো না’ বলা সত্ত্বেও সেদিন যোগেশকে দাদারা পুকুরে চুবিয়ে চুবিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিল আর কোনদিন যেন না বলে।

সেদিন থেকে যোগেশ উপলব্ধি করেছিলেন সত্যি কথা বলার খুব বিপদ। আর সেই থেকেই তিনি খুব বেশি আর সত্যি কথা বলতেন না।

এরপর দেশ স্বাধীন হলো। সবাই যেখানে খুব আনন্দ করে স্বাধীনতা উৎসব পালন করছে, সেখানে নিজের দেশের ভিটে মাটি ছেড়ে পরিবারকে চলে আসতে হল কলকাতায়। এ এক স্বাধীনতার অকরুণ পরিহাসের কথা। ছোটবেলা খুব একটা সুখের ছিল না যোগেশের। তিনি ছোটবেলাতেই দেখেছিলেন মন্বন্তর, স্বদেশি আন্দোলন, দেশভাগের করুণ ইতিহাস। এমনকি কলকাতায় আসার পর খুব ছোট বয়সেই বাবা-মা দুজনকেই হারান যোগেশ।

ছোটবেলায় যোগেশের পড়াশোনায় একদম মনোযোগ ছিল না। মামার বাড়ির প্রাচুর্য, প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও মামার বাড়ির কড়া শাসন আদব-কায়দা তিনি মানতে পারতেন না। বাড়ি থাকে তাই একদিন পালিয়ে গেলেন। ট্রেনের টিকিট না থাকায় রামপুরহাট স্টেশনে চেকার নামিয়ে দিল। অবশেষে ‘আমার বাবা-মাকে পূর্ব পাকিস্তানে কেটে ফেলেছে, আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই’…. এই মিথ্যে বলে যোগেশ কাজ পেলো গুলটনের চায়ের দোকানে।

এরপর কোর্টের ধারে দত্তবাবুর হোটেলে। এই হোটেলের মালপত্র আনতে যেতে হতো এক মুদিখানা দোকানে।

ওই দোকানে কাছ থেকে শিখলেন কোন তেলে কি ভেজাল দেয়, কিভাবে ওজন মারতে হয়।

বিচিত্র বৃত্তি ও পেশার জন্য নানান জায়গায় ঘুরলেন। এর মধ্যেই ফরাক্কায় তার পরিচয় হয় অধ্যাপক জে.এল. ব্যানার্জির সঙ্গে। তিনি পরামর্শ দেন কাজের মধ্যে কিছু পড়াশোনা করতে। অবশেষে মেজদাদা সুরেশ দত্ত কলকাতায় মামার বাড়িতে এনে হিন্দু হাইস্কুলে যোগেশকে ভর্তি করান। এখানেই পাড়ার ‘মনিমেলা’র আসরে নানারকম ব্যঙ্গ কৌতুক করতেন।

এরপর মামার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পাল্লা বাঁধার কাজ, মোটর মেকানিকের কাজ, টেলারিং… নানা জায়গায় কাজ শুরু করলেন। কিন্তু কোন কাজেই তার মন বসলো না। যোগেশ তার মেজদার সঙ্গে রাসবিহারী মোড়ের কাছে ৪ নম্বর জনক রোডে একটা ঘর ভাড়া করে থাকতে শুরু করলেন। অভাবের সংসারে ছিল একটা ইকমিক কুকার, একটা বালতি, দুটো কলাই করা থালা আর একটা মাদুর। এখানে এসে তিনি কমিক করা শুরু করলেন।

বাড়ির কাছেই ছিল একটা লেক। লেকের ধারে দুটো কামান আছে, সেখানে গিয়ে তিনি রোজ বসতেন। কামানের ওপর বসে জোড়ায় জোড়ায় প্রেমিক প্রেমিকাকে তিনি দেখতেন। এদের না শোনা কথা, একটা সময় তাঁর মনে ধরল। হঠাৎই মনে হলো যদি কথা না বলে শুধু অঙ্গভঙ্গি করে নির্বাক কৌতুক করা যায়, তবে কেমন হয়!

তখন সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ের উলটো দিকে নাচ গানের একটি স্কুল ছিল — সুরবাণী। সেখানে গিয়ে একদিন কেয়া চ্যাটার্জিকে বললেন, ‘কেয়াদি, তোর ড্রেসিং টেবিলটা একটু ব্যবহার করতে দিবি?’ সেই ড্রেসিং টেবিলের সামনে কয়েক দিন অবিরাম মহড়া দেওয়ার পর, একদিন কেয়াদিকে বললেন, ‘এটা নির্বাক কৌতুক। দ্যাখ, একটা মেয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে কী করে।’ অজান্তেই তাঁর মধ্যে জন্ম নেয় নির্বাককৌতুক — মূকাভিনয় বা মাইম।

সেই সময় ভি. বালসারা এসেছেন বম্বে থেকে। বুকে হারমোনিয়াম (পিয়ানো অ্যাকোর্ডিয়ান) নিয়ে প্রোগ্রাম জমিয়ে দিচ্ছেন। যোগেশ তাঁকে গিয়ে বললেন, ‘আমার সঙ্গে একটু বাজিয়ে দেবেন?’

উনি বললেন, হাঁ বেটা, জরুর। বাজালেন : ইয়াদ কিয়া দিলনে কাঁহা হো তুম।

যোগেশ দত্ত একটি চাইনিজ পাঞ্জাবি ও পাজামা পরে একটা চেয়ারে বসে দেখালেন মেয়েদের সাজগোজ। দর্শক তা সাদরে গ্রহণ করলো এবং পারিশ্রমিক ২৫ টাকাও পেলেন। সেই থেকেই শুরু হল যোগেশের ‘নির্বাক কৌতুক’-এর যাত্রা। পরে ভি. বালসারা তাঁর সংগঠন ‘সাজ অউর আওয়াজ’-এ যোগেশকে যোগ দিতে বললেন। সেই গ্রুপে তিনি মূকাভিনয় ও কমিক করতেন।

এরপর আলাপ হয় এইচএমভির অরুণ বসাকের সাথে। সবেমাত্র লন্ডন থেকে তিনি এসেছিলেন। যোগেশের পারফরমেন্স দেখে ভীষণ আনন্দিত হলেন। বললেন, “এটিকে বলে ‘মিম’। এটা একটা ফ্রেন্চ শব্দ। এটার মধ্যে থাকে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর জেসচার ল্যাঙ্গুয়েজ”।

এরপর কলকাতায় নিউ এম্পায়ারে শো করতে এলেন মার্শাল মাসো। কিন্তু টিকিটের দাম এতটাই বেশি ছিল যে যোগেশ সেই প্রোগ্রামে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ তখন যোগেশের প্রোগ্রামের রেট ছিল আলুর দম আর লুচি। মার্শাল মাসোর অনুষ্ঠান দেখতে না পেয়ে খুব মন খারাপ হলো যোগেশের। তবে তার বদলে তার দেখা মিলল বালা সরস্বতী, উদয়শঙ্কর, গুরু গোপিনাথ এবং রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন নৃত্যনাট্য। এসব দেখে তিনি আরো নির্বাক কৌতুক বানালেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মনে হয়েছিল, “মার্শাল মাসো না দেখতে পাওয়া ভালোই হয়েছিল। কেননা আমি হয়তো ওর প্রভাবে পড়ে যেতাম। বরং আমি এলাম আমাদের দেশের শিল্পের কাছে।”

১৯৬১ সালে ইডেনে যুব উৎসব হচ্ছিল। মূল মঞ্চে যোগেশের একটি প্রোগ্রাম ছিল। তার আগে ছিল ভি. বালসারার প্রোগ্রাম। পাবলিক বালসারাকে কিছুতেই ছাড়বে না, তবু বালসারাকে নেমে যেতে হচ্ছে। যেই যোগেশের নাম ঘোষণা করা হলো, পাবলিক চিৎকার করে বলছে ‘চাই না, চাই না’।

যোগেশ মঞ্চে আসতেই ঢিল জুতো পড়ছে। তখন তিনি বললেন, ‘আমি দশ মিনিট সময় নেব, যদি ভালো না লাগে এই জুতো আমি আপনাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসবো।’

দর্শক একটু চুপ করলো, যোগেশ মূকাভিনয় করলেন। দর্শক চুপ। মূকাভিনয় শেষে যোগেশ অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। জ্ঞান ফিরতেই দেখলেন চারিদিকে দর্শক করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। এটি ছিল যোগেশের জীবনের পরম পাওয়া।

যেদিন সুনীল ব্যানার্জী অহীন্দ্র চৌধুরীকে বলেছিলেন, ‘ভারতবর্ষের মূকাভিনয়ের এই হবে পথিকৃৎ।’ সেদিন থেকেই যোগেশের মনে আরও জেদ চেপে গেছিল।

রোজ রাত্রে সিএলটি-র ছাদে ও রাতের অন্ধকারে প্র্যাকটিস করতে লাগলেন। একদিন রমেন ঘোষ এসে জানালেন, স্টুডেন্টস হলে আমার প্রথম শো হবে। চারিদিকে পোস্টার পড়ে গেল। সাংবাদিক বৈঠক হলো। ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “ভয় করবি না, ভালো হইবো।” যোগেশের পোশাক ছিল কালো রঙের চোস্ত ও বেনিয়ান।

মেকআপের দায়িত্ব নিল সত্যজিৎ রায়ের মেকআপ আর্টিস্ট অনন্ত দাস। মূকাভিনয় যেহেতু এক্সপ্রেশনের ব্যাপার, অনেকটা কথাকলি, ভারতনাট্যম নাচের উপর ভিত্তি করে ‘ওরিয়েন্টাল মেকআপ’ করে দিলেন। উনি ভ্রু আঁকলেন অনেকটা ঢেউয়ের মতো।অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মূকাভিনয়ের আজকের এই মেকআপ ওনারই অবদান।

মূকাভিনয় করতে গিয়ে যোগেশ বুঝেছেন অনেক জিনিস শেখার প্রয়োজন। ব্যালে শিক্ষা নিলেন বব দাসের কাছে, শরীর ঠিক রাখার জন্য ব্যয়ামাগারে গেলেন, কোরিওগ্রাফি শিখলেন তারই মেজদা সুরেশ দত্তের কাছে, নাটক শিখলেন, এমনকি সার্কাস পার্টির সঙ্গে থেকে শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠা শেখার চেষ্টা করলেন। বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিদের সান্নিধ্যে এসে বহু কিছু শেখার তার সুযোগ হয়েছিল।

পারফরমেন্সে রেখেছিলেন জীবনের বাস্তব গল্পগুলোকে। হিন্দুস্তান টাইমস তাকে ‘চকোবয়’ বলে সম্বোধন করলেন। টাইমস অফ ইন্ডিয়া ‘পোয়েট অফ সাইলেন্ট’ বলে খ্যাতি দিলেন যোগেশ দত্তকে।

 

জীবনে প্রেমও এসেছিল যোগেশের। প্রেমে হাবুডুবু খাওয়ার সময় মেয়েটিকে রবীন্দ্রভারতীতে এম.এ পড়াতে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে একদিন যোগেশের আলমারি ভেঙে সব নিয়ে তারই সেক্রেটারি কে বিয়ে করে চলে গেলেন। প্রচন্ড মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে এমনকি আত্মহত্যা করতে যান যোগেশ।

পরে বন্ধু-বান্ধবের চেষ্টায় আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন। পুনরায় কাজে মনোনিবেশ করেন। এর অনেকদিন পরে অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাগ্নির সাথে তার বিয়ে হয়।

১৯৭১ সালে তিনি মূকাভিনয়ের জন্য তৈরি করেন নিজের দল পদাবলী। তখনকার তথ্য ও সংস্কৃতি মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের সহায়তায় কালীঘাট পার্কের একটি ফাঁকা জায়গায় সেটি ১৯৭৫ সালে রূপান্তরিত হয় “যোগেশ মাইম আকাডেমি”তে। এটি সঙ্গীত নাটক অকাদেমি এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারা স্বীকৃত। ২০০৯ সালে অবসরের পর তিনি উদীয়মান শিল্পীদের প্রতিভা বিকাশে এবং কলা-কৌশলে প্রশিক্ষণ দেন। এই একাডেমি হল মাইম সিলেবাস। যোগেশ দত্ত তার শিল্পসত্তাকে নিয়ে সারা বিশ্বে ঘুরেছেন। এখানেই তার শ্রেষ্ঠত্ব।

১৯৮৩ সালে ভারতের তৎকালীন ফিল্ম ডিভিশন অব ইন্ডিয়ার উদ্যোগে নির্মিত হয় একটি তথ্যচিত্র — ‘সাইলেন্ট আর্ট অফ যোগেশ দত্ত’। এটি অনূদিত হয়েছে ১৪টি ভারতীয় ভাষায়। এছাড়াও জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সেও তার ওপর নির্মিত হয়েছে তথ্যচিত্র।

২১শে আগস্ট ২০০৯, কলকাতার রবীন্দ্রসদন প্রেক্ষাগৃহে যোগেশ তাঁর শেষ শো অতি জনপ্রিয় “চোর” উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠান শেষে তিনি বলেছিলেন-

“আমি বুড়ো হয়েছি, শারীরিক অক্ষমতা এসেছে। মূকাভিনয়ের শো’তে তৎপরতার সঙ্গে এবং মুক্তভাবে শারীরিক চলাচলের প্রয়োজন এবং এটি এখন আমার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠছে।”

পরমুহূর্তে নির্বাক কবি এতদিনের ব্যবহৃত পোশাক মঞ্চে খুলে রেখে ভেঙে পড়েন কান্নায়। বাঁধভাঙ্গা ভিড়ে পরিপূর্ণ প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের সবার চোখেও তখন জল।

তারপরেও তিনি নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন শিক্ষকতায়। বিশেষত প্রতিবন্ধী যুবক যুবতীদের বাঙময় উপস্থাপনায়। তাদের দিয়ে পরিবেশন করিয়েছেন ‘খোল দ্বার’ নামক উপস্থাপনা যা আসলে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’রই রূপান্তর।

৯১ বছর বয়সী এই মানুষটির আজও নিজের কাজ নিজে করে নেওয়ার প্রবণতা অটল। দৃষ্টি ঝাপসা হলেও স্মৃতিশক্তি প্রখর, বাড়তে দেননি শিশুসুলভ মনের বয়স। এই জীবিত কিংবদন্তী যোগেশ দত্ত’র ছত্রছায়ায় এ শহর এখনও মূকাভিনয় উদযাপন করছে ভাবলে আগামীর প্রতি আশা জাগে। বহু বছর কেটে গেছে, পারিপার্শ্বে অনেক কিছু বদলে গেছে। তবুও ওই চিরনবীন শিল্পী এখনো স্বপ্ন দেখেন মাইম করার। আশা একটাই, এই শিল্পসত্ত্বা যেন বেঁচে থাকে তরুন প্রজন্মের কাছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন