২০০-র কাছাকাছি অ-সার প্রাণের উপর দিয়ে বয়ে চলেছে সার-এর গণতন্ত্র বাঁচানোর, নাগরিকত্ব প্রদানের “মৃদু-মন্দ মলয় বাতাস”। ১০/১১ কোটি বাঙালির মধ্যে ২০০টি প্রাণ তেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই কারো কোন দায় নেওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। সত্যিই তো এখনো অনেক কাজ বাকি। অনেককে জেলে পাঠাতে হবে, অনেককে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশ থেকে বার করে দিতে হবে, কালীঘাটে গিয়ে আক্রমণ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এসবের জন্য ধাপে ধাপে কাজও এগোচ্ছে — রাজ্যপাল বদল, লক্ষ লক্ষ কেন্দ্রীয় বাহিনী নিয়ে আসা, রাজ্য সরকারের একেবারে উচ্চতম স্তর থেকে মাঝারি স্তর অব্দি আধিকারিকদের বদলি করে দেওয়া… স-ব চলছে। তবে হ্যাঁ একটা কথা মনে রাখা দরকার। আর সেটা হচ্ছে — আমরা আছি “ডিজিটাল ইন্ডিয়া”-তে। তাই বিচার বিশ্লেষণ সব হবে নানান ধরনের বিচিত্র সব সফটওয়্যারের মাধ্যমে, এ. আই. এর সাহায্যে। আর তারপর? তারপর কেবলই আপলোড, ডাউনলোড ও প্রিন্ট আউট।
প্রিন্ট আউট পেয়ে দেখলেন আপনার নাম নেই। কেন নেই? নেই এই কারণে যে আপনার নামটা নামই নয়। “অনাথ নাথ নাথ” তিন তিনবার “নাথ”। এটা কি নাম নাকি “নাথ” এর মালগাড়ি? আপনারও নাম নেই? কি নাম? ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ।এটা আবার কী? “ঠাকুর” পদবী, “দাস” পদবী, আর শেষে “বন্দোপাধ্যায়” সেটাও তো পদবী —পরপর কতগুলি পদবী বসিয়ে গেলেই কি আর নাম হয় বাঙালি? চালাকি ক’রোনা একদম চুপ করে হাতে চিরকুট নিয়ে রোদের মধ্যে বসে থাকো। কি বললে —বয়স বেশি, সন্তান সম্ভবা, অসুস্থ? তার আমরা কী করতে পারি ভাইটি? আমাদের দায়িত্ব তো আর তোমাদের বয়স কমানো নয়, আমাদের কাজ গণতন্ত্র বাঁচানো, সঠিক ও নির্ভুল নাগরিকত্ব দিয়ে ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। এবং তার জন্য যা যা করার দরকার এই যেমন ধমকানো, চমকানো, একটা সার্বিক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা — সবসময়ই এমন একটা ভাব যেন কী হয়! কী হয়! মনে হয়, মানসিক চাপ ক্রমশ বেড়ে চলে আর প্রতিবাদ করার সাহস যেন এক্কেবারে গলে জল হয়ে বেরিয়ে যায়।
তোমরা বলছো হাজার হাজার জীবিত মানুষকে মৃত বলে প্রিন্ট আউট বেরিয়ে গিয়েছে। তাদের দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে সবাইকে দেখাচ্ছো,চীফ ইলেকশন কমিশনারকে দেখাচ্ছো,এমনকি সুপ্রিম কোর্টেও চলে গিয়েছো। বলছো তারা সব মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে,তাদের পরিবার, বন্ধু বান্ধব সবাই ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।এবার এমন যদি হয় এই ভুলগুলো ঠিক হলো না মানে ওরা মৃতই থেকে গেল আর ভোটের পরে পরেই সরকারি, বেসরকারি, ব্যাংক, বীমা এক কথায় সর্বক্ষেত্রেই ভোটার কার্ড যুক্ত করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়, তাহলে এই জীবিত-মৃত ব্যক্তিরা তো কোনো কিছুই করতে পারবেন না — ভূত তো আর নাগরিক হতে পারে না। ফলে কোনোরকম নাগরিক সুযোগ-সুবিধা, অধিকার এই ভূতদের কাছে থাকতে পারে না। আবার অন্যদিকে এই ভূতেদের তো আর ঘাড় ধাক্কা দিয়ে দেশের বাইরে ও পাঠানো যাবে না! আবার এই মৃতদের পরিবারবর্গ কি সেই ব্যক্তির মৃত্যুকালীন সুযোগ সুবিধা পাবেন? তাদের ডেথ সার্টিফিকেট এ কোন্ তারিখ লেখা থাকবে? মৃত্যুর কারণ হিসেবে কি ‘হার্ট অ্যাটাকের’ মত ‘সার অ্যাটাক’লেখা থাকবে? সেই ডেথ সার্টিফিকেট কি ওই ব্যক্তির কর্মস্থল বা বীমা কোম্পানিগুলো মান্যতা দেবে? বাড়ির কেউ কি কম্পেন্সেটারি গ্রাউন্ডে চাকরি পাবে? — এইরকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে পরিবারের সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে পরেছে। ওদিকে আবার সামাজিক চাপও ক্রমশ বাড়ছে ।এই জীবিত-মৃত ব্যক্তিরা যদি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বা না হারিয়ে অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয় বা তাদের উপর ঘটে যাওয়া এই অমানবিক এবং ভূতুড়ে ব্যাপারে ক্ষিপ্ত হয়ে ভয়ংকর একটা কিছু ঘটিয়ে ফেলে তাহলে কোন্ আইনের সাহায্যে তাদের ধরা হবে বা বিচার হবে? তাহলে কি এবার দেশে ভূতেদের জন্য আইন আসতে চলেছে?
তবে যা আসে তা আসুক — সেটা তো সময়ই বলবে। এখনতো চারিদিকে কেবলই “মলয় বাতাস”-ই বইছে। বাংলার মানুষের ভোটাধিকার চলে যাচ্ছে, নাগরিকত্ব চলে যাচ্ছে বলে তাদের পাশে সত্যি সত্যি কটা রাজনৈতিক দল দাঁড়িয়েছে বলো? বেশির ভাগই তো ওই বহুরূপীর মত — শ্রাবণ মাসে শিব সেজে রাস্তায় বেরোয়, তো আশ্বিন মাসে মা দুর্গা সেজে বেরোয়। লোকজন দেখে, বাচ্চারা আনন্দ পায়। আমরাও পাই। এগুলো কি জানো? এগুলো সব ‘সিজিনাল ইভেন্ট’। এই যেমন এখন পৃথিবীতে যুদ্ধ চলছে। অতএব কলকাতার রাস্তায় মিছিল বেরিয়ে পড়লো। মানুষ দেখলো। অথবা আমাদের বিরুদ্ধে মিছিল হলো। লোকজন দেখলো। আমরাও দেখলাম — ওরা বাঘ সাজলো, হালুম হুলুম করল। তারপর মেকআপ তুলে বিভিন্ন চ্যানেলে, ঘাড়ে
পাউডার দিয়ে, গরম গরম কথা বলল। এটাই ওদের কাজ — ওরা করছেও। আর আমরা আমাদের কাজ করছি। আমরা এই সবে সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বার করেছি। তাতে কিছু নাম আছে তবে লক্ষ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে।তাতে কি? যাদের নাম বাদ গিয়েছে তারা আগের মতই একটু মানসিক চাপ নিয়ে ট্রাইব্যুনালে ছোটাছুটি করবে আবার তালিকা বেরোবে — আবারও আপলোড, ডাউনলোড ও প্রিন্ট আউট। এইভাবে পরপর সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বেরোতে থাকবে — নাম বাদ যেতে থাকবে — ট্রাইবুনালে মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকবে — আর এই ভাবেই একটি সুস্থ সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ ভোট হয়ে যাবে। সব থেকে বড় কথা ভারতের বৃহত্তম “জুমলা” পার্টি তো এক্কেবারে ‘ছিটকিনি দে’-র মত মুখে ছিটকিনি দিয়ে রেখেছে — কথাটি হবে না! তাই আমাদের ভয়ের কিচ্ছুটি নেই ভাইটি।
কোন্ কথাটি হবে না? ওই যারা বহুরূপী নয়,যারা প্রতিনিয়ত মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াই করছে, ধর্না দিচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছে, যাদের নাম প্রিন্ট আউটে থাকছে না অথবা মৃত বলে দেখানো হয়েছে তাদের আইনি সহায়তা দেবার কথা বলছে — তাদের কথা হবে না। তাদের কথা হলেই বাঙালির কথা হয়ে যাবে, বাংলার কথা হয়ে যাবে। এতে যদি বাঙালিরা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ ছেড়ে বেরিয়ে আসে, জোট বাঁধে, প্রতিবাদ করে? তাহলে?
তাহলে কী হবে?