| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অমর মিত্রের উপন্যাসবিশ্ব লিখছেন ড. দিলদার কিব্রিয়া

Reporter
ড. দিলদার কিব্রিয়া / ২০৬২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

অমর মিত্র বিশ শতকের সত্তর দশক পরবর্তী সময়ের এক শক্তিশালী কথাকার।  বাংলা উপন্যাসের শক্তিশালী লেখক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে অন্তরঙ্গ ও বিস্তৃত আলোচনা করে, তাঁর সাহিত্য সম্পর্কে পাঠকের আগ্রহ সৃষ্টি করা কিংবা যথার্থ মূল্যায়নের এ যাবৎ কোনো চেষ্টাই হয়নি। ফলে সমালোচনা সাহিত্যে তিনি অনেকটাই অনালোচিত। অমর মিত্রের বাস্তবতাবোধ, মানবতাবোধ, কঠোর জীবনসংগ্রাম ও বিচিত্র দুঃখের অভিজ্ঞতা এবং রচনাবৈশিষ্ট্য আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। যদিও তাঁর জীবনপঞ্জি, সমগ্র রচনা এবং অন্যান্য তথ্যপঞ্জি সংগ্রহ করা, সর্বোপরি একজন কথাকারকে সম্যকভাবে জানা এবং তাঁকে উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন বিষয়, তথাপি নানান বাধা, সমস্যা ও দুষ্প্রাপ্যতা সত্ত্বেও ‘অমর মিত্রের উপন্যাসবিশ্ব’-কেই আমার গবেষণার বিষয়বস্তু রূপে নির্বাচন করি। বর্তমান গবেষণা অভিসন্দর্ভে অমর মিত্রের প্রধান উপন্যাসগুলির আলোচনা করে মূল্যায়নের চেষ্টা করেছি।

অমর মিত্র একজন প্রতিভাধর শিল্পী। যিনি এখনও লিখে চলেছেন, তাঁর সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলার সময় আসেনি। আমাদের বিশ্লেষণে আমরা মোটামুটিভাবে ঔপন্যাসিক অমর মিত্রের সাহিত্যের মৌলিক প্রবণতাগুলি চিহ্নিত করতে চেষ্টা করেছি। এই লেখক বিনোদনমুখ্য উপন্যাসের পথে হাঁটেন নি। তিনি প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রামের এক দরদী রূপকার, বাস্তব ও পরাবাস্তবের উত্তর-ঔপনিবেশিক গ্রন্থনায় তাঁর সাহিত্য এক অপরূপ মায়া ছড়িয়ে দেয়। এই মায়া বিপজ্জনক। ভাষারচিত মায়ার আঁচল সরিয়ে জীবনের পাঠ নিতে হয়। আমাদের চেনার পরিসরটিকে তিনি প্রসারিত করেছেন তাঁর জীবনঅভিজ্ঞতার বয়ানে। এই বাংলার এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে যে মানুষের যাপনচিত্র, তাঁদের তিনি উদ্ভাসিত করেছেন তাঁর লিখন-পৃথিবীর সীমানায়। বর্তমান অভিসন্দর্ভ অমর মিত্রের আখ্যানবিশ্ব থেকে জীবনের তাৎপর্য বোঝে ওঠারই দুর্বল একটি প্রয়াস মাত্র।

বিশ শতকের ন’য়ের দশক থেকে আজকের এই একবিংশ শতকের দুই দশক পর্যন্ত ঔপন্যাসিক হিসেবে অমর মিত্রের যে প্রশ্নাতীত শৈল্পিক সিদ্ধি, তা কিন্তু একদিনে অর্জিত হয়নি। এর জন্য লেখককে প্রচুর বাস্তব ভূমি ও ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার প্রান্তর পেরোতে হয়েছে। লেখক নিজেও জানিয়েছেন,

‘আমি আমার যাপিত জীবনের বাস্তবতা নিয়ে বাঁচি। আমি যখন লিখতে বসি সেই বাস্তবতা থেকে যাত্রা করি অন্য কোনো বাস্তবতার সন্ধানে। এই সন্ধানটিই মুল সূত্র। অনেকক্ষেত্রে, বিশেষত গল্পরচনার ক্ষেত্রে, অনেক সময় আমাকে যাত্রা করতে হয় প্রায় শূন্য থেকে। সেখান থেকে পৌঁছতে চাইতে হয় এমন কোনো জায়গায়, যা ছিল আমার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা। এই অচেনা সত্যটি খুঁজে বের করাই কি লেখকের কাজ? অচেনা বাস্তবতা? আসলে সেই সত্য খুব কাছেরই সত্য, কিন্তু তাকে চেনা সম্ভব হয় না বলেই সব গল্প, গল্প হয়ে ওঠে না, সব সত্য, সত্য হয়ে ওঠে না। আমার খুঁজে পাওয়া সত্যের ভিতরে দূর ভারতবর্ষের কোনো এক গ্রাম্যবধূ তাঁর জীবনের সত্য খুঁজে পেয়ে যাবেন মনে মনে।’

এই হল লেখকের জীবনদৃষ্টি আর সাহিত্যের সত্য সম্পর্কে তাঁর ধারণা। এই সত্যতে পৌঁছতে হলে লেখককে যে বাস্তবতা নির্মাণ করতে হয়, যে বাস্তবতাকে খুঁজে বের করতে হয় তার সঙ্গে ঘটমান পৃথিবীর বাস্তবতা আপাততভাবে আলাদা মনে হয় না। অনেক সময় লেখক নিজ কল্পনায় সেই বাস্তবতাকে তৈরি করে নেন, যার সঙ্গে তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা, যাপিত জীবনের সত্যের কিছু মিল থাকে। মিল তো থাকবেই, যাপিত জীবনের সত্য-বাস্তবতাকে সূত্র করেই তো তাঁর লিখনের আরম্ভ।

বিচিত্র বিষয় নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন অমর মিত্র। গত চল্লিশ বছরে গ্রাম ও শহরের রূপান্তর, জীবন অভিমুখের পরিবর্তন, বিপন্ন সময় ও অসহায় মানুষ, প্রকৃতির নানা রূপ তাঁর উপন্যাসে প্রতিভাত। বিষয়-বৈচিত্র্যে তিনি অনন্য। কখনো দু-হাজার বছর আগের উজ্জয়িনী নগর হয়ে উঠে তাঁর উপন্যাসের বিষয়। কখনো ভূমিকম্প-পীড়িত মহারাষ্ট্রের লাতুর কিল্লারি উঠে আসে তার ভাঙা হাড়গোড় রক্তমাংস নিয়ে। কখনো বা রাজপুত্র গৌতমের অশ্ব তার প্রভুর অপেক্ষায় থেকে থেকে সময় পার করে এসে পড়ে সমকালীন ভারতবর্ষে, বা একখানি গৃহ নির্মাণই হয়ে ওঠে ভারত নির্মাণ। ব্যাবিলন- বাগদাদ- কলকাতা শহর ঢুকে পড়ে কারবালা প্রান্তরের অন্ধকারে। নিয়ত বৈচিত্র্যময় ও জীবনসন্ধানী লেখকের কলমে সমগ্র ভারত ধরা পড়ে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শনের মতো করে। ‘ধনপতির চর’ সেই ভারতবর্ষেরই আরেক রূপ। প্রাচীন ও নবীন পৃথিবী এখানে এসে মিলেছে যেভাবে নদী এসে মেশে সাগরে।

উন্নয়নের নামে প্রকৃতি-ধ্বংসের প্রবল সমালোচনা রয়েছে অমর মিত্রের একাধিক উপন্যাসে। ‘হাঁস পাহাড়ি’ উপন্যাসে এই প্রতিবাদ তীব্র; পাহাড় যেমন জঙ্গলশূন্য হয়ে যাচ্ছে, তেমনি অরণ্যের সন্তানেরা উৎখাত হচ্ছে স্বভূমি থেকে। বিবেকবান লেখক দেখাচ্ছেন এই পরিপ্রেক্ষায় মাফিয়া প্রশাসনের আঁতাত, উৎখাতের জন্য হন্তারক আধিপত্যবাদ কীভাবে পুঁজি করে আদিবাসী সমাজের অন্ধবিশ্বাসকে। দেশকালের চাপে নাগরিক মধ্যবিত্তের পরিসরে স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের আখ্যান রয়েছে ‘নিস্তব্ধ নগর’ উপন্যাসে। নির্মাণ ও ধ্বংস নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিসরে কীভাবে হাত ধরাধরি করে চলে, সেই অন্তর্বাস্তবের উন্মোচন করেন কথাকার।

সত্তরের দশক আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল সব দিক থেকে। এই জীবন-সমালোচনা আরো সক্রিয় হয়েছে আটের দশকে। বর্তমান এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নিমায়ক রাষ্ট্রটির বিশ্বজোড়া অকারণ খবরদারি ও বিশ্ব-আধিপত্যবাদের হৃদয়হীন রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রবল সমালোচনা প্রত্যক্ষগম্য স্পষ্টতায় উচ্চারিত হয়েছে অমর মিত্রের একাধিক উপন্যাসে। নয়া-উপনিবেশবাদীপর্বে প্রযুক্তি-নির্ভর ধনতন্ত্র প্রান্তিক মানুষের জীবনে এনেছে বিপন্নতা, মধ্যবিত্ত মননেও চলছে অবসাদের এক দীর্ঘ পর্ব। অমর মিত্রের কলম যেন জাগ্রত বিবেক, বিশ্বায়নের এই পর্বে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত ছুঁয়ে সমকালীন ভারতবর্ষের দিনযাত্রারই কথাকার তিনি।

পৃথিবীজোড়া ইকোলজিক্যাল ব্যালান্স নষ্ট করার কারণ আমরাই। আবার দূষিত পরিবেশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিশুদ্ধতার সাধনাও তো আমাদেরই। অমর মিত্রের উপন্যাসও যেন তার সকল সামর্থ্য ও অপারগতার মধ্যেও এই কথাটি ধরিয়ে দিতে চায় যে, জীবনের সুর ও সঙ্গতি সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়েছে আমাদেরই অস্তিত্বের অর্থ ঘুলিয়ে যাবার ফলে। আবার এই উপন্যাসগুলি সঙ্গে সঙ্গে আর একটি কথাও বলেছে–নতুন মানে খুঁজে নিতে সেই মানুষই তার চরম ও পরম আত্মনিবেদনের প্রস্তুতি নিতে পারে।

‘অশ্বচরিত’ প্রকৃতপ্রস্তাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে, হিংসার বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, বিশ্বব্যাপী সমরায়নের বিরুদ্ধে এক চরম প্রতিবাদী উপন্যাস। বিশ্বজুড়ে যাবতীয় সাঁজোয়া-প্রস্তুতি; বিশেষত ভারবর্ষের মতো অনুন্নত দেশে, যেখানে এখনও ষাট শতাংশ জনসাধারণ নিরক্ষর, সেখানে পারমাণবিক বোমা নিয়ে পরীক্ষা-বিলাস এবং শক্তির অন্তঃসারশূন্য আস্ফালনের বিরুদ্ধে অমর শিল্পিতভাবে সরব তাঁর এই উপন্যাসে।

লেখক অনায়াসে বাস্তব ও কল্পনাকে মেলান, তথ্য ও ইন্দ্রজালকে এক চালচিত্রের বুনোটে সাজান। তাঁর ভাষায় একই সঙ্গে বাঁশিওয়ালার টান, জাদুকরের ধাঁধা, ঐতিহাসিকের স্থিতি ও কাহিনিকারের মায়া। মানুষের বহু হাজার বছরের তৃষ্ণার কাহিনি লেখার জন্য ভাষার এই বহুবর্ণ রাম ধনুর প্রয়োজন ছিল।

২০০৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরষ্কার পাওয়া উপন্যাস ‘ধ্রুবপুত্র’। এই উপন্যাস মেঘনির্ভর, জনশ্রুতি, লোককথা আর কিংবদন্তির আশ্রয়ে এবং ধ্রুবপুত্রের দ্বি-স্তরিক উপস্থিতির রূপকে ভারতের আবহমান কালের সমাজগাথা। সমগ্র ভারতবর্ষকে তিনি এই উপন্যাসের মাধ্যমে চিনতে চেষ্টা করেছেন। যে ভারতবর্ষ মেঘে মেঘে জুড়ে গেছে।

প্রেমিক পুরুষ যখন আষাঢ় শ্রাবণে ঘর ছেড়ে দূর দেশে থেকে যেতে বাধ্য হয়, তখন তার জীবনের বিরহের চেয়ে বড় সত্য আর কী আছে? তখন তার ভিনদেশে জীবিকার জন্য থাকতে বাধ্য হওয়া তো নির্বাসন, নিজগৃহে অলকাপুরী থেকে নির্বাসন। আমরা পড়তে পড়তে টের পাই মেঘদূত কাব্যে লোকজীবনের যে ছায়া আছে, লোকজীবনের যে সত্য আছে তা-ই ওই কাব্যকে এত কয়েকশো বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে। এই নির্বাসন নিরন্তর ঘটে যায়। এই নির্বাসনে আখ্যান ভারতবর্ষের গ্রামীণ কৃষিজীবী মানুষের কাছে পরম সত্য। ঠিক তেমনি ধ্রুবপুত্রের দ্বি-স্তরিক নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনে যে মেঘবর্ষণ তা উজ্জয়িনীর কৃষিজীবি মানুষের কাছে পরম সত্য।

লেখকের একটি অত্যাশ্চর্য উপন্যাস ‘ধনপতির চর’। ম্যাজিক রিয়্যালিজমের মোড়কে তৈরি অমর মিত্রের এই ‘ধনপতির চর’-এর সর্দার নিজেকে পাঁচশো বছরের পুরনো হার্মাদ পেদরুর বংশধর বলে মনে করে। আপন মনে অজস্র গল্পকথার সৃষ্টি বুনে চলে। নিত্য-নতুন বৃত্তান্ত নিয়ে হাজির হয় চরের জেলে-জেলেনির সম্মুখে। চরের ইতিহাসকে, সৃষ্টিকে জীবন্ত করে তোলে। বিগত পাঁচশো বছরের হারিয়ে যাওয়া বৃত্তান্তকে নতুন ভাবে রঙিন করে। চরের সাধারণ নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের সহজ সরল নর-নারীর মনে সর্দার সাধারণতীত হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে রহস্যময়।

ধনপতির চরের অন্যপিঠে চলে আধিপত্য কায়েমের ষড়যন্ত্র। ছ’মাসের পৃথিবীতে চলে সাম্রাজ্য বিস্তারের টানাপোড়ন। রাষ্ট্রিক শাসন ব্যবস্থায় মুনাফার জেরে শিকার হয় সাধারণ মানুষ। সুলভ বাজার কবজা হতে চলেছে কর্পোরেট বাণিজ্যে। ফলত তেড়ে আসছে বিশ্বায়ন। অনুন্নত ক্ষেত্রগুলোকে টারগেট করে নির্মিত হচ্ছে নয়া উপনিবেশিক শাসন। ধনপতির চর একটি নির্মল জলে ঘেরা ভূ-খণ্ড। যেটি শহরের অমানবিক শোষণ থেকে ছ’লিগ দূরে স্থবির। দূষণহীন সজীব ডাঙা। যেখানে জেলে জেলেনিরা মনের আনন্দে ধনপতি সর্দারের নির্দেশনায় যাপন করে। কিন্তু জলময় ভূ-খণ্ডকে গিলে খেতে চায় কিছু স্বার্থান্বেষী লোভাতুর দালাল। বাতাসি-যমুনা–সাবিত্রী এই তিন নারীসহ চরের অন্যান্য নারীদেরকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বিকিকিনির ষড়যন্ত্র।

লেখকের ‘নিস্তব্ধ নগর’ উপন্যাসে আমরা নাগরিক মধ্যবিত্তের বাস্তব চিত্র খুঁজে পেয়েছি।  এক দম্পতি সুজয় ও কাবেরী তাদের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল কলকাতার মতো মহানগরে। কিন্তু চলার পথে তাদের বার বার ছন্দ পতন হয়। সুজয় তার নির্মাণ কার্যে বার বার ব্যর্থ হতো, সফলতার শিখরে সে পৌঁছতে পারেনি। কাবেরী চায় অনাথ বিশ্বাস বাইলেন, ঘন শ্যাম রোডের বাসাবাড়ি থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসা যায়। কীভাবে মধ্যবিত্ত পরিসরের প্রাচীর ডিঙানো যায়। কাবেরীর স্বপ্ন ছিল নিজস্ব একটি ফ্ল্যাটবাড়ির। যেখানে সে নিজের মতো করে সমগ্র পরিবারটিকে সাজাতে পারে। বড় শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনের চরম উৎকণ্ঠা ও ব্যর্থতার গ্লানিকে কয়েকটি পরিবারচিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন রিয়ালিস্ট লেখক। লক্ষ করবার মতো, নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিসরের আখ্যানগুলিতে কাম-প্রেমের চর্বিতচর্বণ প্রধান আধেয় হয়ে আসেনি।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দ্বারা ভূমিজ মানুষ, মনুষ্যেতর প্রাণী ও প্রকৃতির উচ্ছেদের কথা অমর মিত্র দরদভরে লিখেছেন। ‘কৃষ্ণগহ্বর’-এ হুগলী জেলার গঙ্গা নদীর তীরবর্তী কাঁঠালবেড়ে গ্রামে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠাতার নাম করে এক দল স্বার্থান্বেষী নরপিশাচের দল কৃষকদের স্বর্বস্ব হরণ করে। স্বাভাবিক ফসলের মূল্য থেকে বঞ্চিত হয় বর্গাচাষি ও ভাগচাষিরা। শত শত বাস্তুভিটে কোম্পানির কৃষ্ণ গহ্বরের অতলে হারিয়ে গেছে। মানুষ ও মনুষ্যেতর প্রাণী তারা তাদের বেদনার আর্জি জানিয়েছে এক লোকদেবতার কাছে। ‘হাঁসপাহাড়ি’-তে অসৎ সরকারি কর্মচারী আর অসৎ রাজনৈতিক নেতার মদতপুষ্ট মাফিয়াদের মিলিত চক্রান্তে বাউরি, লোহার, বাগদি, সাঁওতাল প্রভৃতি নিম্ন সম্প্রদায়ের মানুষের উচ্ছেদ আর উৎখাত হওয়ার করুণ আখ্যান বর্ণিত হয়েছে। ‘সবুজ রঙের শহর’-এ অমর মিত্র অভিনব পদ্ধিতে গাছ ও মানুষের উচ্ছেদের কথা বলেছেন। প্রাচীন বটবৃক্ষ তাদের যন্ত্রণার কথা, তাদের উৎখাতের কথা দরদভরে উপন্যাসের মনুষ্যচরিত্র মনোময় শীলকে বলতে দেখা যায়। অমর মিত্র এই তিনে দেখিয়েছেন কীভাবে নগর উন্নয়নের নাম করে চলছে বনচ্ছেদন ও ভূমিজ মানুষদের বাস্তুভিটে হরণের পর্ব।

একজন ছিটবাসীর জীবনযাত্রা ও একজন স্বাভাবিক নাগরিকের জীবনযাত্রার মধ্যে যে বিস্তর ফারাক রয়েছে, তা এই উপন্যাস পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি। এই ছিটের মানুষগুলি এক রাষ্ট্রহীন ভূখণ্ডের বাসিন্দা। বাংলাদেশের মোট ৫১টি গ্রাম ভারতের পেটে লালিত হতো। ঠিক তেমনি ভারতের মোট ১১১টি গ্রাম বাংলাদেশের পেটে স্থবির ছিল। এই দুই দেশের ছিটের মানুষদের চলার পথ মোটেও সুখকর ছিল না। লেখক দুই দেশেই গিয়েছেন সেই সব অলীক গ্রামগুলিকে অনুভব করে দেখে নিতে এবং শেকড়ের সন্ধানে। সেই অনুভূতি আর উপলব্ধিই জন্ম দিয়েছে এই উপন্যাসের।

লেখকের ‘নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান’ ও ‘পুনরুত্থান’- এই উপন্যাসদ্বয় বিশ্লেষণে আমরা দেখতে পেয়েছি রাষ্ট্রিক ক্ষমতার পৈশাচিক প্রয়োগ বিপন্নতার নিবিড় অন্ধকারে ঠেলে দেয় সাধারণ প্রান্তিক মানুষকে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার যে কৌশলী ফর্মুলা তা অমর মিত্র এই আখ্যানদ্বয়ে তুলেধরেছেন। ‘নিরুদ্দিষ্টের উপাখ্যান’ একটি মামলার কাঠামোয় নিবদ্ধ। একজন সাধারণ শ্রমিকবর্গের মানুষকে মাঝ রাতে পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গঙ্গার খুনেঘাটে বাক্সবন্দী করে ভাসিয়ে দেয়। ক্ষমতাধারীরা পরদিন সেই শ্রমিককে নিরুদ্দিষ্ট বলে ঘোষণা করে এবং অস্বীকার করে যে তারা আদৌ কোনো ব্যাক্তিকে গ্রেপ্তার করেনি। বাদী নিরুদ্দিষ্টের পিতা ও পত্নীর সত্যাখান বিবাদী পুলিশ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেয়। ‘পুনরুত্থান’-এ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার উচ্চশিখরে থাকা নীলরক্তের ডিএসপি অনিন্দ্য তালুকদার অন্যায়ভাবে একজন প্রতিবাদীকে কনস্টেবল পল্টনকে দিয়ে খুন করে। প্রতিবাদী ভরত কুইলার অপরাধ ছিল, সে অবিনাশ ব্যানার্জীর বেআইনি কয়লা খাদানের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রসচিবকে করেছিল। সেই কয়লা খাদানে চারজন শ্রমিক চাপা পড়ে যায়, অথচ তাদের তোলার বিন্দুমাত্র চেষ্টা না করে মাটি দিয়ে খাদান ভরাট করা হয়। এই চরম অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে ভরত কুইলাকে খুন হতে হয়। আর এই খুনের দায়ভার চাপানো হয় একজন নিরীহ ওসির ওপর। অমর মিত্র স্বাধীনভাবে এই নোংরা প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার নির্লজ্জ রূপ অনাবৃত করেছেন।

অমর মিত্রের একটি অসাধারণ উপন্যাস ‘মোমেনশাহী উপাখ্যান’।  এই উপন্যাসে অমর মিত্র ইতিহাসের কিছু মৃত কাহিনি জনশ্রুতির কথা বর্তমানের আলোকে উজ্জীবিত করেছেন। এখানে আছে রাজা সোমেশ্বরী পাঠক ও গারোরাজা বৈশ্য মান্দার যুদ্ধের কথা। বর্ণিত হয়েছে রাজা জানকীনাথ ও রানি কমলাসুন্দরীর ঐতিহাসিক সায়র খননের কথা। জলহীন সায়র কীভাবে রানির আত্ম-উৎসর্গে জলপূর্ণ হয়ে ওঠল সেই বেদনার্দ্র লোকগাথা। গারো পাহাড়ের কোলে সোমেশ্বরী নদীর তীরের সুসঙ্গ দুর্গাপুর অঞ্চলে রাজা, জমিদার, ভূমধ্যকারীর বিরুদ্ধে হাজং পাহাড়িয়া জাতির হাতিখেদা বিদ্রোহ, ভূমির অন্যায্য চুক্তি টঙ্ক প্রথার বিরুদ্ধে হাজংজাতির বিদ্রোহ, করিম শহের নেতৃত্বে পাগলপন্থীর আন্দোলন ও অন্যান ঐতিহাসিক কৃষক বিদ্রোহ যেমন এর বিষয়, তেমনি অপরূপ গীতিকা-কাহিনির চরিত্রদের বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসা নিয়ে এই আখ্যান। ইতিহাস ও জনজীবন উঁকি দিয়েছে ছায়াচ্ছন্ন অতীত থেকে বর্তমানের আলোকে।

অমর মিত্র দায়বদ্ধ কথাকার। দুঃখী মানুষ, বিপন্ন মানুষ তাঁর উপন্যাসের কেন্দ্রীয় আধেয়। দেশকালের বাস্তবপটে শ্রেণিবিভাজিত সমাজকে উপস্থাপন করেন লেখক, অন্তেবাসী মানুষের যন্ত্রণাকে অনাবৃত করেন। আধুনিকতা ও উন্নয়নের যত আয়োজন সবই তো প্রান্তিক মানুষকে বিপন্ন করে। বিপন্ন হচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশও। আর, অমর মিত্র এও দেখান যে, আধিপত্যবাদী কেন্দ্রীয় শক্তির চাপে পরিধি যখন বিপন্ন হয়, তখন বিপন্নদের মধ্যে বিপন্নতর হয় নারী। যুদ্ধ, অন্ধ জাতীয়তাবাদ, খরা, বন্যা –- এসবই মানুষের বিপন্নতার কারণ, আর এসব বিপন্নতার পেছনে ক্রিয়াশীল রয়েছে আধিপত্যবাদের হন্তারক ভূমিকা। অমর মিত্র কোথাও বক্তৃতাধর্মী নন, সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদীদের মতো ইচ্ছাপূরণের নির্মিতিতেও তিনি অনাগ্রহী। কিন্তু তা বলে অমর তাঁর পক্ষপাত গোপন করেন না। তিনি সাম্প্রদায়িকতা, যুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদের ভূমিক্ষুধার বিপক্ষে, তিনি ‘other’ বা অপর, অর্থাৎ অন্তেবাসীদের পক্ষে। তাঁর প্রায় সকল রচনায় প্রান্তিকায়িত মানুষ আর অধিকতর বিপন্ন নারীদের বিপন্নতাই উঠে আসে দেশকালের প্রেক্ষাপটে। এটাই একজন বাস্তববাদী লেখকের অভিজ্ঞান।

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উপন্যাসের বাস্তবতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘বাস্তবতা’ হচ্ছে ‘গড়পড়তা পরিবেশে প্রতিনিধিত্বিমূলক চরিত্রের বিশ্বস্ত উপস্থানপন।’ এই কাজটিই করেন অমর মিত্র। পরিবেশের বাইরে চরিত্রকে নিয়ে গিয়ে প্রেম-যৌনতার বিনোদন নির্মাণ করেন না তিনি।

পরিবেশকে তিনি সমকাল ছাপিয়ে ধূসর অতীতের বৃহৎ পট পর্যন্ত বিস্তৃত করে দেন। ইতিহাস আর বর্তমানের মধ্যে সংলাপ গড়ে তোলা অমর মিত্রের প্রিয় প্রকরণ। এই সংলাপ একই সঙ্গে মিথ-কিংবদন্তির পরিবেশের সঙ্গে বর্তমানের, বাস্তবের সঙ্গে পরাবাস্তবের। সব মিলিয়ে যাদুবাস্তবতার এক নিজস্ব ধরন নির্মাণ করেন এই কথাকার। দেখা বাস্তবকে প্রকল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া— এই লেখাটি সচেতনভাবেই লেখক গড়ে তুলেন বর্তমানের বাস্তবকে তীক্ষ্ণতর ও উজ্জ্বলতর করে তোলবার প্রয়োজনেই। এক্ষেত্রে তাঁর সাফল্যও প্রশ্নাতীত।

অমর মিত্রের বিপুল সৃজনবিশ্বের একটি দুর্বল অধ্যয়নপ্রয়াস এই সন্দর্ভে নিবেদিত হল। এ তো সূচনামাত্র, তাই সীমাবদ্ধতাও প্রচুর। কথাকারের উপন্যাসবিশ্বে ডুব দেবেন মেধাবী পাঠক, বিশ্লেষক। এই অধ্যয়নের সীমাবদ্ধতাকে চিহ্নিত করে, আরো উন্নত পাঠপ্রস্তুত করবেন ভাবী পাঠক-গবেষক। এই প্রত্যাশা লিপিবদ্ধ করেই আপাতত পূর্ণচ্ছেদ টানলাম আমরা।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev