চৈত্রের শেষ। দুপুরে কাঁচা মাটির রাস্তায় একটা ধুলোর ঘূর্ণি ওঠে। ছোট ছোট ঘূর্ণি। রাস্তায় পড়ে থাকা ঝরা শুকনো পাতা ওই ঘূর্ণিপাকে পড়ে খানিক ঘুরে আবার রাস্তায় বেপথু। আমগাছগুলো আমের ভারে গরবিনী আবার ভারাক্রান্তও। দুপুরের ঘূর্ণি কখন যেন আকাশের পশ্চিম কোণে উঠে গিয়ে ম্যাজিক দেখাবার আয়োজন করতে থাকে, কেউ প্রথমে খেয়াল করে না। সে স্টেজ সাজায় নিঃশব্দে। স্টেজ সাজানো কমপ্লিট হলে আচমকা গুমগুম আওয়াজ ভেসে আসে। মানে এবার অনুষ্ঠান শুরু হবে। আগাম প্রস্তুতি নিতে বলা হয় শ্রোতা বা দর্শকদের। দর্শকেরা যে যার মতো স্থান নিয়ে নিলে পরে গোটা আকাশ ছাইতে থাকে কালো পর্দায়। তারপর আসে চৈত্র শেষের তুমুল কালবোশেখি। সমস্ত জীর্ণ পুরানো যা কিছু যেখানে আছে সবটুকু উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক নতুন রাজ্যপাট গড়তে চায় কেউ। একদম নতুন আনকোরা সোঁদা গন্ধ মাখা অন্য এক নতুনের আগমন ঘটে এই তুমুল বেসামাল ঝড়ের হাত ধরে।
বৃষ্টি হলে বাতাস বেয়ে অনেক দূরের আওয়াজ স্পষ্ট শোনা যায়। দূরে কোথাও মাইকের আওয়াজ শুনে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ে কোনো শিশু সত্তরের দশকে। ভেসে আসা গলার স্বর শিশু- কিশোর- বৃদ্ধ বাছ বিচার না করে সম্মোহিত করে শুধু কন্ঠের ম্যাজিকে। সত্তরের দশকে ভেসে আসা সেই গান হয়ত ‘আলো আর আলো দিয়ে তোমার খুশিটি নিয়ে প্রেমকে নতুন করে জানলাম/মনে হয় আজ আমি হাজার সূর্য ওঠা দেখলাম।’ ম্যাজিক কন্ঠী হাজার সূর্য ওঠা দেখলেন কি না জানা নেই তবে শ্রোতারা আর একটি নতুন সূর্য পেলেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই ম্যাজিক কন্ঠের অধিকারী আশা ভোঁসলে। এর আগে বাঙালি সন্ধ্যাকে পেয়েছে, লতাকে পেয়েছে, পেয়েছে গীতা দত্তকে এবং আরও অনেককে। তাঁরা সকলেই তাঁদের কন্ঠ দিয়ে প্রাণ মন জুড়োনো আবেশ তৈরি করেন। শ্রোতাদের সবটুকু শ্রদ্ধা আদায় করে নেন। কিন্তু এই নতুন কন্ঠ যেন শ্রদ্ধার সঙ্গে আরও কিছু আদায় করে নেয়, কি যেন বলতে চায় – যা সকলে বলতে পারে না। কি যেন বলিয়ে নিতে চায় – যা এতদিন সাহস করে কেউ বলে উঠতে পারে নি। তাই গানে গানে সুরে সুরে এক কিশোরী যখন বাড়ির উঠোনে হঠাৎ চেঁচিয়ে গেয়ে ওঠে “বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো/রাধার মতো মরতে হলে মরবোই তো/লা লা লা লা লা লারা লা লা…।” গানটা শেষ হবার সুযোগ হয়ত ঘটে না। কারণ কিশোরীর জেঠু বা কাকা, ঠাকুমা বা বাবা মাঝপথে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। বলেন, “এসব অসভ্যের মতো গান কোথা থেকে শিখলে? আর যেন কোনোদিন না শুনি। আধুনিক গাইতে হলে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান গাইবে।” কিশোরী থেমে যায় বাধ্য হয়ে। কিন্তু মন তার গেয়ে চলে ওই বাঁধ ভেঙে দেওয়ার গান “বেশ করেছি প্রেম করেছি করবোই তো।”

মহারাষ্ট্রের সাংলীতে জন্ম। পিতা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন ভ্রাম্যমাণ নাটকের দলের কর্ণধার। সেই সময়ের আর পাঁচটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সঙ্গে খুব একটা তফাৎ ছিল না মঙ্গেশকর পরিবারের। চার বোন এক ভাই আর বাবা মায়ের মধ্যে বড় হচ্ছিলেন আশা। গান বাজনা অভিনয়ের মধ্যেই সকলের বেড়ে ওঠা। কিন্তু ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের বছরে দীননাথের মৃত্যু পরিবারটিকে বেসামাল করে দিল। মাত্র চোদ্দ বছরে সংসারের হাল ধরলেন জ্যেষ্ঠা কন্যা লতা। তখন আশা মাত্র দশ। পরের বছরেই মারাঠি ছবিতে প্রথম প্লে ব্যাক ছোট্ট আশার। লতা যেমন শান্ত শিষ্ট, আশা ঠিক তেমনটি ছিলেন না। অনেক গোছানো ঘর গেরস্থালির স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলেন ষোলো বছরের সেই কিশোরী। তাই বাড়ি থেকে পালিয়ে লতাদিদির ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে ঘর বাঁধলেন আশাজি। কোন স্বপ্ন চোখে মায়াকাজল পরিয়েছিল কে জানে! কুড়ি বছরের বড় গণপতরাওয়ের মধ্যে কি এমন ছিল যে ষোলোর রাইকিশোরী সবকিছু অগ্রাহ্য করে বেরিয়ে পড়েছিলেন! আসলে মনে হয় আদ্যন্ত স্বাধীনতাপ্রিয় মানুষটি নিজস্ব একটা ঠাঁই খুঁজছিলেন, যেটা বাপের বাড়িতে তখন পাওয়ার আশা দুর্লভ ছিল।
স্বপ্ন কিন্তু অধরাই থেকে গেল আশাজির।বাপের বাড়ি এই বিবাহ মেনে নিতে পারেনি, ফলে দূরত্ব তৈরি হয়েছে স্বাভাবিক ভাবেই। আর শ্বশুর বাড়িতে ওই অল্প বয়সে মা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হেঁসেল সামলে, স্বপ্নের ঘর দুয়ার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে, জল তুলে রেখে, বাচ্চাদের খাইয়ে গান গাইতে বেরোতে হত রোজগারের জন্য। এর সঙ্গে অনুপান হিসেবে পেয়েছিলেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। স্বাধীনতাকামী একটি কিশোরী তখন পরাধীনতার শৃঙ্খলে আগাপাশতলা বন্দী। ওদিকে সদ্য স্বাধীন হওয়া ভারতবর্ষে সুরসম্রাজ্ঞীর আসনে একটু একটু করে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছেন তাঁরই দিদি লতা মঙ্গেশকর। ফলতঃ, এখানেও দিদির সঙ্গে একটা অদৃশ্য প্রতিযোগিতা প্রতিদিন পেরোতে হত মেয়েটিকে। লতার পাশে পাশেই চলেছেন গীতা দত্ত। সুতরাং পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে প্রথম সারির নায়িকার ঠোঁট থেকে আশা ছিলেন অনেক দূরে। সেই সময় ছোটদের লিপে আশাজির গান বরং জনপ্রিয় হচ্ছিল। বুট পালিশে মহম্মদ রফির সঙ্গে, জাগৃতিতে হেমন্তের সুরে গান গাইলেন আশাজি। স্বপ্ন তখনও অধরাই। তবু নিজের অন্তরে আশার আলো নিবতে দেননি সেদিন।
১৯৫৭ সালে শুরু হল ‘নয়া দৌড়’। আক্ষরিক অর্থেই আশার জীবনে নয়া দৌড় শুরু হল। ও পি নাইয়ার বেছে নিলেন আশাকে। এই প্রথম আশা ভোঁসলের কন্ঠ পেল প্রথম সারির নায়িকা বৈজয়ন্তীমালাকে। ঠিক এই সময়েই রূপালি পর্দায় একটা বেসামাল এলোমেলো ঝড় তুললেন শাম্মী কাপুর। এলোমেলো, পাগলাটে ভাবভঙ্গি নিয়ে শাম্মী যখন পর্দায় আসতেন সেই সময়ের নিয়মের আগড়ে বাঁধা যুবকের দল মনের আগল খোলার একটা স্থান পেল যেন। সিনেমাহল। যেখানে সব বন্ধনের মুক্তি ঘটে। আর এই শাম্মীর বিপরীতে যে নায়িকাই থাকুন না কেন তাঁর ঠোঁট নড়ে উঠত একমাত্র আশাজির গাওয়া গানে। কারণ সুরকার ও পি নাইয়ার। ১৯৫৮ সালে ‘হাওড়া ব্রিজ’ ছবিতে তুফান তুলতে আগমন ঘটল তরুণী হেলেনের। মধুবালার ঠোঁট আর আশাজির কন্ঠে ধ্বনিত হল ‘আইয়ে মেহেরবান’। আবার ঠিক এই সময়ে লতাজির সঙ্গে সাময়িক বিচ্ছেদ এল শচীন দেব বর্মনের। ফলে যে গানগুলো শচীন কর্তা অবশ্যম্ভাবী ভাবে লতার জন্য রেখেছিলেন সেগুলো সব দিক পাল্টে চলে এল আশার কন্ঠে। আশা বুঝলেন সময়ের কাঁটা ঘুরছে এবং ঘুরছে তাঁরই দিকে।

অত্যন্ত বুদ্ধিমতী আশা বুঝেছিলেন লতাদিদির বা গীতা দত্তের বদলী শিল্পী হলে হবে না। নিজেকে সঙ্গীত জগতে অপরিহার্য করে তুলতে গেলে তাঁকে স্টাইল পাল্টাতে হবে। সেই স্টাইল হবে তাঁর একান্ত নিজস্ব। ১৯৬০ সালে বিবাহিত জীবনের ছেদ টেনে পুত্র কন্যা সমেত ফিরে এলেন বাপের বাড়ি। কিন্তু বেশিদিনের জন্য নয়। ও পি নাইয়ার, শচীন দেব বর্মন, সুরকার রবিকে তিনি পাশে পেলেন, আর পেলেন হেলেনকে। হেলেন ততদিনে পর্দায় নিজেকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছেন। যেন একটি কালবৈশাখী ঝড়। আর হেলেনের লিপে একমাত্র আশা ছাড়া আর কাউকেই যেন মানায় না। এক ঝড় অন্য এক তুফানকে চিনে নেবে এটাই তো স্বাভাবিক। এক এক করে উঠে আসছেন আশা পারেখ, শর্মিলা ঠাকুরের মতো নতুন নায়িকারা একেবারে টাটকা বাতাসের মতো। তাঁদের সঙ্গে গলা মিলে যাচ্ছে আশাজির। তৈরি হচ্ছে নতুন কিছু। শেষে মদনমোহনজিকেও ‘ঝুমকা গিরা রে’ র জন্য ডাকতে হল আশাজিকে। যেখানে মদনমোহন ছিলেন লতা নিবেদিত প্রাণ। আসলে ধাঁচ বদলায়, ছাঁচ পাল্টে যায় এটাই যুগের নিয়ম। আর এই নিয়মকে ওলোটপালোট করে দেবার জন্য ঝড়ের প্রয়োজন পড়ে। সেই ঝড়ের নাম আশা।
রাত, নিশি, নিশা এই শব্দগুলোকে একটু অন্য রকম করে সাজালে দেখবেন শব্দটা কখন ‘আশা’ হয়ে গেছে। লতা মানে এক আদর্শ ভারতীয় নারী। যিনি সুরসম্রাজ্ঞীর আসনে এমনি এমনি অধিষ্ঠিতা নন। সমস্ত ভারতীয় গুণাবলী তাঁর যাপনের প্রতিটি পর্বে সাক্ষর রেখে গেছে বলেই তিনি ওই উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। সঙ্গে তাঁর অননুকরণীয় কন্ঠ। কেউ তাঁকে কোকিলের সঙ্গে তুলনা করেন, কেউ বা স্বয়ং দেবী সরস্বতীর সঙ্গে তাঁকে একাসনে বসান। আশাজি এসবের কোনোটাই নন। কিন্তু যখন ‘রাত আকেলি হ্যায়/বুঝ গয়ে দিয়া…’ বা ‘আজ দুজনে মন্দ হলে মন্দ কি /দেখো ময়ূরকন্ঠি রাত যে আলোয় ঝিলমিলে/আহা এমন রাতে এসো না আজ ভাব করি’ আশাজির কন্ঠ ছাড়া আর কাউকে ভাবতে পারবেন কোনো ভারতীয়? সুরকার ও পি নাইয়ার যে কারণে লতাজিকে যথেষ্ট সম্মান করলেও গান দিতেন আশাজিকেই। প্রেমকে’ আগুন’ করে তুলতে আশার কন্ঠ এক ম্যাজিকের মত কাজ করত। যে ম্যাজিক লতাদিদির কন্ঠে অনুপস্থিত। লতার সঙ্গে এইখানেই তিনি বৈপরীত্য তৈরি করলেন। তৈরি করলেন খুব সাবধানে, সময় নিয়ে, অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে। নিয়মিত পাশ্চাত্য সঙ্গীত শুনতেন এবং অভ্যাস করতেন। আর এটি আরও সহজ হল রাহুল দেব বর্মনের সঙ্গে জুটি বাঁধার পর। লতা যখন ‘বাহোঁ মে চলি আও/হামসে সনম কেয়া পর্দা’ গেয়ে ওঠেন তখনও কোথায় গিয়ে একটা নিরভিমান সমর্পণ মনে হয়। মনে হয় এই গানের ভিতে কোনো অবৈধ নির্মাণ হতেই পারে না। আর আশাজি যখন ‘দম মারো দমমমম/মিট যায় হাম’ ধরেন, তখন ‘বোলো সুবহ সাম হরে কৃষ্ণ হরে হরে রাম’ এই নামগানও অন্য এক নিষিদ্ধ জায়গায় টানতে চায়। সে টান বড় অমোঘ, ক্লান্তিহীন। কিংবা ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে যো দিলকো’ গানটির পরতে পরতে যেন একটা নরম আগুন যেন মস্তিষ্ক থেকে গোটা শরীর জুড়ে নামতে থাকে। যে কারণে রঙ্গিলায় ঊর্মিলার ঠোঁটে আশাজির গান আগুনের মতো শরীরি হয়ে ওঠে। আবার কাজলের ঠোঁটে নেশাগ্রস্ত হয়ে সেই আসমুদ্রহিমাচল কাঁপিয়ে দেওয়া গান ‘জরা সা ঝুম লু ম্যায়/ আরে নারে নারে না’ কি অনায়াসে তরুণ তরুণীদের নিজস্ব সঙ্গীত হয়ে ওঠে।

রাহুল দেব বর্মনের সাথে তাঁর সাঙ্গীতিক জুটি যেমন আকাশ ছুঁয়েছিল তেমনই গুলজার সাবে’র সঙ্গে তাঁর জুটি এনেছিল এক পরম অবগাহনের স্পর্শ। ইজাজতের সেই অমোঘ সঙ্গীত ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাশ পড়া হ্যায়’ প্রেমের এক অতল গভীরতাকে সামনে আনে। প্রথম জীবনে হেলেনের ওষ্ঠে আর খ্যাতির মধ্যগগনে রেখাজির ওষ্ঠে আশাজির গান এক নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করে, সঙ্গে গুলজার সাহেবের লেখনী। একবার উমরাও জানের সেই দৃশ্যটি কল্পনা করুন যেখানে রেখাজির কন্ঠে আশাজি গাইছেন ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায় জান লিজিয়ে..’ এক অসাধারণ ক্ষণের জন্ম দেয় যার কোনো বিকল্প নেই। রেখাজি এবং আশাজি সারাজীবন অনেক ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। অনেক প্রেম এসে লুটিয়েছে তাঁদের চরণোপান্তে। কোনও প্রেম তাঁরা অস্বীকার করে এগিয়ে গেছেন আবার কোনো প্রেম তাঁদের আঘাত করে এগিয়ে গেছে। তাই রেখাজির ঠোঁট আর আশাজির কন্ঠ মিলেমিশে এক হয়ে যায়। কোনও তফাৎ করা যায় না। দুজনেই আগুন জ্বালাতে পারেন — একজন চোখ দিয়ে, অন্যজন তাঁর কন্ঠ দিয়ে।
চৈত্রের শেষে তাই এক ঝড়ের থেমে যাওয়ার পালা। অনেক ঝড় সামলে নিয়ে আজ তিনি শান্ত। যেতে যেতে বলে গেলেন, ‘মেরা কুছ সামান তুমহারে পাশ পড়া হ্যায়’..
Asadharon lekha.mon vote gelo
অনেক ধন্যবাদ।
Khub valo laglo tomar lekhata pore , Asha ji r somporke jetai bola jai setai mone hoy onek kom , uni onar gaan er modhhe dea ei vabei amader moner moddhe theke jaben chiro kaal 🙏🙏🙏🙏
ধন্যবাদ 😊
লেখাটা পড়ে ভালো লাগলো