‘নীলের ঘরে দিয়ে বাতি/ জল খাও গো পুত্রবতী।’ ছোটবেলায় মা ঠাকুমাদের মুখে শোনা যেত এই ছড়া নীলষষ্ঠীর দিন। গ্রীষ্মের তীব্র খরতাপে নির্জলা উপবাস রেখে চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন সন্তানের মঙ্গল কামনা করে বাঙালি মায়েরা প্রতিবছর নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন। নীল ষষ্ঠী বাংলার একটি লৌকিক উৎসব, যেখানে মা ষষ্ঠী (যিনি নীলচণ্ডী বা নীলাবতী রূপে শিবের স্ত্রী) এবং মহাদেবকে ‘নীল’ বা ‘নীলকণ্ঠ’ রূপে পূজা করা হয় সন্তানের আয়ু বৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য,অকাল মৃত্যু বা বিপদ থেকে রক্ষা এবং সন্তান দুধে-ভাতে থাকার প্রার্থনা নিয়ে।
চৈত্র মাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো চৈত্র সংক্রান্তি। এটি বাংলা বছরের শেষ দিন, যা চড়ক পূজা, শিবের গাজন, নীল উৎসব এবং বিভিন্ন লোকজ মেলা ও উৎসবের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। এই সময়ে গম্ভীরা নাচ, পুরানো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণের আমেজই মূল আকর্ষণ।
চৈত্র মাসের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো গাজন সন্ন্যাসীদের মেলা– গাঁয়ে-গঞ্জে,কালীঘাটে এবং তারকেশ্বরে। শিবগাজনে হরকালি বা সূর্য পৃথিবীর বিয়ে যাই হোক না কেন, নীলষষ্ঠীর দিন হুগলি জেলার তারকেশ্বরে বাবা তারকনাথের সঙ্গে পার্বতীর বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এই দিন সন্ধ্যাবেলায় নন্দীভৃঙ্গি সেজে ভক্তরা শোভাযাত্রা সহ মূল মন্দিরে আসে, রাতভোর বিবাহের অনুষ্ঠান চলে।
একইসঙ্গে রয়েছে নীল ষষ্ঠীর ব্রত পালন। বিশেষ কোন প্রার্থনা নিয়ে গাজন সন্ন্যাসী ব্রত পালন করলে তা পূরণ হয়ে থাকে। এছাড়া স্বামী সন্তান এবং সংসার জীবনের সার্বিক সুখ স্বাচ্ছন্দ মাঙ্গলিক কল্যাণকল্পে বাংলার অধিকাংশ ঘরে পালিত হয় নীলষষ্ঠী ব্রত। এই ব্রত পালনের কিছু কথা ও কাহিনী বলি।
পুরাণ অনুসারে দক্ষ রাজকন্যা সতীর দেহত্যাগের কাহিনী সকলেরই জানা। সতীর দেহত্যাগে শিব যখন শোকাহত, রাজা নীলধ্বজের ভরা বাগানের একটি বেলগাছে একসময় এক রূপসী মেয়ের রূপে আবির্ভূত হন সতী।রাজা নীলধ্বজ সেই মেয়েটিকে গ্রহণ করেন কন্যা রূপে। সযত্নে বড় করে তোলেন ধীরে ধীরে। রাজকন্যার নাম দিবেন নীলাবতী। যথাসময়ে রাজা কন্যার বিবাহ দিলেন শিবের সঙ্গে। শিবের সঙ্গে নীলাবতীর এই বিবাহ পরিচিত হয় নীলষষ্ঠী নামে। এটাই পরম্পরাগত লোকশ্রুতি।মহাদেব নিজে নীলকণ্ঠ, আর তাঁর সঙ্গে এদিন নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতীর বিবাহ হয়েছিল বলেই এই দিনটি নীলষষ্ঠী নামে পরিচিত। এই পুজোকে নীল পুজো বলা হয়।
নীলষষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি লোককথা। এক দেশে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী বাস করতেন। এঁরা নানা ব্রত পালন করতেন কিন্তু তাঁদের সন্তান বেশিদিন বাঁচতো না। একদিন কাশীর গঙ্গার ঘাটে এই দুজনকে দুঃখ করতে দেখে এক বৃদ্ধা এসে তাঁদের দুঃখের কারণ জানতে চান। সবকিছু জেনে ঐ বৃদ্ধা নীল ষষ্ঠী পালনের উপদেশ দেন। তিনি বলেন,সমস্ত চৈত্র মাস সন্ন্যাস পালন করে শিব পুজো করে সংক্রান্তির আগের দিন উপবাসের পর সন্ধে নাগাদ নীলাবতীর পুজো শেষে নীলকণ্ঠ শিবের ঘরে বাতি জ্বেলে, মা ষষ্ঠীকে প্রণাম করে জল খেতে।একথা বলেই তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। আসলে ঐ বৃদ্ধা ছিলেন মা ষষ্ঠী।
বৃদ্ধার উপদেশের পর ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী চৈত্র মাসে নিষ্ঠাভরে নীল ষষ্ঠী ব্রত পালন করেন। এই ব্রতের প্রভাবে মা ষষ্ঠী প্রসন্ন হন এবং তাঁদের ঘরে দীর্ঘজীবী ও সুস্থ সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
প্রধানত চৈত্র মাসের সংক্রান্তির আগের দিন নীলপুজো নীলষষ্ঠী ব্রত পালন করা হয় বাংলার অধিকাংশ ঘরে। এই ব্রত মহিলাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যেসব মহিলাদের সন্তান আছে তারা অন্যান্য ষষ্ঠী পূজার মতই নীলষষ্ঠীতে নিষ্ঠার সঙ্গে উপবাস করে শিবের পূজা দেন। তবে নীল তথা শিবের মূর্তি কিন্তু তৈরি হয় নিমকাঠ কিংবা বেলকাঠ দিয়ে। লাল কাপড়ের মুড়ে সেই নির্মমূর্তি বা নীলকাঠ বাড়িতে বাড়িতে ঘোরার রীতি প্রচলিত আছে আজও পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের অনেক গ্রামে। এই নীলপুজো উপলক্ষে বিশেষ গানেরও প্রচলন আছে। সেই গানকে বলা হয় অষ্টক গান।
চৈত্র সংক্রান্তির পরের দিন পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষের শুরু।
সংসার জীবনে প্রতিটা মানুষই কমবেশি পারিবারিক ও কোন না কোন মানসিক অশান্তি ভোগ করে। গৃহীরা প্রতিমাসে নানা দেবদেবীর উপাসনা ও ব্রত পালন করে থাকেন। পরোক্ষভাবে দেখা যায় তাতে কোন কল্যাণকর ফল হচ্ছে বা কোনও ফল লাভ হচ্ছে না। তার পিছনে অজস্র কারণ আছে। কথায় বলে, ‘কথায় কথা বাড়ে , ভোজনে বারে পেট’ — বলা যেতে পারে নিয়ম নীতি পালন ও কাজ করা সকলের কর্তব্য তাহলে পারিবারিক ও মানসিক শান্তি আসবে এবং দেবদেবীর উপাসনা ও নানা ব্রত ফল লাভ নিশ্চিত হবে। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায়, প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে মিথ্যা কথা এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান যাই হোক না কেন তারা সত্যে প্রতিষ্ঠিত আর সত্য প্রতিষ্ঠিত থাকে বাক্যে।মূলত, সংসারের কল্যাণ এবং সন্তানদের অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যেই নীল ষষ্ঠীর এই লোকায়ত ব্রত পালন করা হয় ।
নীলষষ্ঠী যোগ — ২০২৬ সালে নীল ষষ্ঠী পালন করা হবে আগামী ১৩ এপ্রিল অর্থাৎ ২৯ চৈত্র। অমৃতযোগ- সকাল ৭টা ৩ মিনিট মধ্যে, পুনরায় ১০টা ২২ মিনিট গতে ১২টা ৫২ মিনিটের মধ্যে। সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিট গতে ৮টা ৫৬ মিনিটের মধ্যে। পুনরায় ১১টা ১৪ মিনিট গতে ২টো ১৮ মিনিটের মধ্যে।
মাহেন্দ্রযোগ — দুপুর ৩টে ২২ মিনিট গতে বিকেল ৫টা ২ মিনিটের মধ্যে।
নীলষষ্ঠী ব্রত সাধারণত সারাদিন নিরম্বু উপবাস (জল বা খাবার ছাড়া) পালন করে সন্ধ্যায় শিবের মাথায় জল ঢেলে বাতি দিয়ে উপোস ভাঙা হয়।শিবের মাথায় বেলপাতা, ফুল এবং একটি ফল দিতে হয়। এরপর সন্তানের নামে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে হয় মঙ্গল কামনার্থে।
সন্ধ্যার সময় বাড়ির সদর দরজায় বা শিব মন্দিরে ‘নীলের বাতি’ (প্রদীপ) জ্বালানো অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়।
গঙ্গামাটি বা শুদ্ধ মাটি, বেল পাতা, গঙ্গা জল, দুধ, দই, ঘি, মধু, কলা,ঋতুভিত্তিক ফল, বেল, বেলের কাঁটা ও মহাদেবের পছন্দের কোনও ফুল। নীল ষষ্ঠীর দিন ব্রত ভঙ্গ করলেও এই দিন আমিষ খাবার খাওয়া যায় না। ফল, সাবু অর্থাৎ ময়দার তৈরি খাবার খেতে হয় এই দিন। যদি সম্ভব হয় সন্ধক লবণ দিয়ে তৈরি খাবার খেতে পারেন আপনি।
এই দিনে শিবের মাথায় ছেঁড়া বা পোকা খাওয়া বেলপাতা দেবেন না, এবং কোনো কিছু কাটবেন না। রাগ বা ক্রোধ প্রকাশ করবেন না, মনের শান্তভাব বজায় রাখুন। এছাড়া, পুজোয় কেতকী বা কদম ফুল ব্যবহার করবেন না এবং উপবাসকালে অন্ন গ্রহণ না করাই শ্রেয়।
চৈত্র মাসের শেষ কয়েকদিন শিবের গাজন বা শিবের উৎসব চলে। নীল ষষ্ঠী হলো গাজনের একটি বিশেষ অংশ, যেখানে শিব ও নীলাবতীর বিবাহ উৎসবের প্রতীকী রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়।মূলতঃ মায়েরা তাঁদের সন্তানদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনায় এই দিন নিরম্বু উপবাস করে শিবের আরাধনা করেন। তবে মনে রাখবেন,মনে ভক্তি বা আন্তরিক ভালোবাসা ছাড়া কোনো ব্রত বা পূজা সম্পূর্ণরূপে সফল হয় না। শাস্ত্রানুসারে, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়েও ভগবানের প্রতি হৃদয়ের শুদ্ধ ভক্তি ও প্রেম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভক্তি হলো আধ্যাত্মিক পথের চাবিকাঠি, যা ছাড়া জ্ঞান বা কর্মের পূর্ণতা অর্জন করা কঠিন।তাই, যেকোনো ব্রত পালনের সময় মনের ভক্তি ও শুদ্ধতা বজায় রাখলে তবেই তা ফলপ্রসূ হয়।।
“ॐ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।
নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।।”
সুন্দর প্রকাশ।