শুটিং সেটের একটা ভুল চড়, আর সেই ঘটনাই পাল্টে দিলো ললিতা পাওয়ারের ফিল্মি কেরিয়ার। ১৯৪২ সালে ‘জং-এ-আযাদী’ সিনেমার সেটে একটি দৃশ্যে অভিনেতা ভগবান দাদাকে ললিতা পাওয়ারকে চড় মারতে হয়েছিল।কিন্তু চড়টি এতটাই জোরে ছিল যে ললিতা পাওয়ার মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর কান দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়।এই আঘাতেই তাঁর মুখমণ্ডলের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত (Facial Paralysis) হয় এবং বাম চোখে স্থায়ী ক্ষতি বা স্কুইন্ট তৈরি হয়।
এই দুর্ঘটনার পর প্রায় তিন বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। এর ফলে তাঁর নায়িকা হিসেবে ক্যারিয়ার পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। অথচ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে একসঙ্গে ১৮টা ছবিতে কাজ করছিলেন ললিতা। একে একে সেগুলো তার হাত থেকে চলে যেতে লাগলো অন্যদের কাছে।
শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তিনি হার মানেননি। নায়িকা থেকে খলনায়িকা হিসেবে নতুনভাবে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন। পরবর্তীতে তিনি হিন্দি সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় দজ্জাল শাশুড়ি বা নেতিবাচক চরিত্রের অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। দেখে নেওয়া যাক ললিতা পাওয়ার সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য :

১৯১৬ সালের ১৮ই এপ্রিল নাসিকের ইয়েওলায় এক রক্ষণশীল পরিবারে আম্বা লক্ষ্মণ রাও সাগুন(ললিতা) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা লক্ষ্মণ রাও সাগুন ছিলেন একজন ধনী রেশম ও সুতির কাপড়ের ব্যবসায়ী। নয় বছর বয়সে ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ (১৯২৮) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি তাঁর অভিনয় জীবন শুরু করেন এবং পরবর্তীকালে নির্বাক যুগ ও চল্লিশের দশকের চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। তিনি ১৯৩২ সালে ‘কৈলাশ’ নামক একটি নির্বাক চলচ্চিত্রে সহ-প্রযোজনা ও অভিনয় করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৩৮ সালে ‘দুনিয়া কেয়া হ্যায়’ নামে আরেকটি সবাক চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন, ১৯৩৫ সালে ‘হিম্মত-এ-মর্দা’ চলচ্চিত্রে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করছেন।
কিংবদন্তি অভিনেত্রীর সাংসারিক জীবন ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক, নাটকীয় এবং বিশ্বাসঘাতকতায় ভরা। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ললিতা পাওয়ার চলচ্চিত্র প্রযোজক গণপতরাও পাওয়ারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু তাদের এই সম্পর্ক ভেঙে যায় যখন ললিতা জানতে পারেন যে, তাঁর স্বামী গণপতরাও-এর সাথে তাঁর নিজের ছোট বোনের অবৈধ সম্পর্ক চলছে। স্বামী এবং বোনের কাছ থেকেই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ললিতাকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল। পরে তিনি গণপতরাও-কে ডিভোর্স দেন।
পর্দায় কঠোর শাশুড়ি বা খলনায়িকার চরিত্রে অভিনয় করলেও, বাস্তবে ব্যক্তিগত জীবনে তিনি চরম নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিলেন।

তিন বছর ঘরে থাকার পর তখন স্টুডিওয় স্টুডিওয় ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভবঘুরের মতো কাজের জন্য। কিছু স্টেজ শো করছিলেন নাটক দলের সঙ্গে কিন্তু তাতে খুব একটা সুরাহা হচ্ছিল না। অবশেষে মরিয়া হয়ে ছুটে গেলেন শান্তারামজি কাছে। বললেন, ‘আপনি থাকতে আমাকে কি না খেয়ে মরতে হবে?’
কথাটা শুনে শান্তারামজি একটু হাসলেন। বললেন, ‘নায়িকা চরিত্রে না হোক অন্য চরিত্রে তোমাকে নিতে পারি। কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে ‘দহেজ’। নায়কের রোলে আছেন করণ দেওয়ান, ওর মায়ের চরিত্রটা তোমাকে করতে হবে।’
ললিতা বললেন, ‘কি বলছেন কি আপনি? করন আমার থেকে মাত্র এক বছরের ছোট। ওর মায়ের চরিত্র আমাকে কিভাবে মানাবে? ‘শান্তারামজি শান্ত হয়ে বললেন, চরিত্রটা খারাপ নয়, বাকিটা আমার দায়িত্ব।
মায়ের চরিত্র পছন্দ ছিল না ললিতার। সিনেমার এই মায়েরা সবাই জটিল,কুটিল এবং চূড়ান্ত নেগেটিভ। তাদের যত রাগ ছেলের বউয়ের উপর। পর্দায় তাদের উপস্থিতি যেন বউ এর ওপর নানা অত্যাচার করার জন্যই হয়। ললিতার ভাবনার সঙ্গে তখন কোথাও যেন মিল হয়েছিল অর্ধেন্দু মুস্তাফির জীবনের এক উপমার।

নীলদর্পণ নাটকের নীলকর সাহেবের ভূমিকায় গিরিশ ঘোষের অভিনয় দেখতে দেখতে খড়ম খুলে ছুঁড়ে মেরে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তখন সেই খড়ম মাথায় তুলে অর্ধেন্দু মুস্তাফি বলেছিলেন, ‘এটাই আমার অভিনয়ের সেরা পুরস্কার।’ ললিতা পাওয়ার মনে মনে ঠিক করলেন নেগেটিভ রোল করতে হলে করবেন ওই রকম মুন্সিয়ানার সঙ্গে। চরিত্র লং নয়, স্ট্রং হওয়া জরুরী।
১৯৫০ সালের রিলিজ হলে ‘দহেজ’। তারপর ‘৫১ থেকে ‘৫৭ পরপর একই রকম নেগেটিভ মায়ের, মাসির চরিত্রে একের পর এক অভিনয় করে কাঁপিয়ে দিলেন ললিতা। ‘৫২ সালে ছবি ‘দাগ’-এ বুকে পাথর চাপা দিয়ে তার থেকে বয়সে চার বছরের বড় দিলীপ কুমারের মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করলেন ললিতা। ভাগ্য ভালো থাকলে দিলীপ কুমারের নায়িকা তিনি হতে পারতেন। কিন্তু ভাগ্যের উপহাসে হলেন তার মা। নির্বাক চলচ্চিত্র থেকে টকিজ, খলনায়িকা হিসেবে উত্থান ঘটল ললিতা পাওয়ারের।
‘আরে কালমুহি’ সম্ভবত ললিতা পাওয়ারের প্রিয় সংলাপ ছিল, তিনি এমনভাবে এটি বলতেন যেন এটি তাঁরই সম্পত্তি। হিন্দি সিনেমার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শাশুড়ি হিসেবে তিনি যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, এটি তারই অন্যতম একটি কারণ।
এই মন খারাপের কঠিন সময়ে ললিতার সঙ্গে আলাপ বন্ধুত্ব ও প্রেম হল নির্মাতা রাজপ্রকাশ গুপ্তার। সেই সময়ে বোম্বের অম্বিকা স্টুডিওর চলচ্চিত্র প্রযোজক রাজপ্রকাশের ছবি একের পর এক পেয়েছিল দর্শকের আশীর্বাদ। রাজপ্রকাশ গুপ্তের সাথে দাম্পত্য জীবনে তাদের একটি ছেলে হয়, যার নাম জয় পাওয়ার। জয় পাওয়ার পরবর্তীকালে চলচ্চিত্র প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন।
নতুন সংসার, স্বামী, সম্পূর্ণ না হলেও খানিকটা ফিরে পাওয়া অভিনয় গৌরব এবং সবথেকে বড় সন্তান জয়কে পাওয়ারকে পাবার পরেও অপূর্ণতা ছিল ললিতার মনের মধ্যে। রাজপ্রকাশ ছিলেন মূলত ব্যবসাদার মানুষ। তিনি শিল্পী নন, তাই শিল্পীর মনের দুঃখ তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি। তাকে কিছু বলতে গেলেই বলতেন, ‘অভিনয় তো করছো, লোকে পছন্দ করছে, টাকা আসছে, আর কি চাই?’ তবুও আশা রেখেছিলেন ললিতা, ভাবতেন কোন না কোনদিন তার ইচ্ছে পূরণ হবেই।

একদিন সেই ইচ্ছা পূরণের ফোন বেজে উঠলো। ফোন তুলতেই হৃষিকেশ মুখার্জি বললেন, ‘তোমার সঙ্গে কথা ছিল, কাল একবার বাড়িতে আসতে পারবে?’ পরিচালক হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় তাঁর এই নেগেটিভ একপেশে চরিত্রের ভাবমূর্তি ভেঙেছিলেন। হৃষিকেশ মুখার্জীর পরিচালনায় রাজ কাপুরের বিপরীতে ‘অনারি’ (১৯৫৯) ছবিতে কঠোর কিন্তু দয়ালু মিসেস এল. ডি’সা-র ভূমিকায় উল্লেখযোগ্যভাবে অভিনয় করেন ললিতা। এই চরিত্রে তিনি তাঁর জীবনের সেরা অভিনয়টি উপহার দেন, যার জন্য তিনি ফিল্মফেয়ারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭১ সালের হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত কাল্ট ক্লাসিক ছবি ‘আনন্দ’-তে ললিতা পাওয়ার ‘মিসেস ডি’সা’ নামে হাসপাতালের এক কঠোর কিন্তু স্নেহময়ী ম্যাট্রনের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। এই ছবিতে তার অভিনয় দর্শকদের হৃদয়ে এক অভিন্ন জায়গা করে নিয়েছিল।
১৯৮৭ সালে রামানন্দ সাগরের কালজয়ী টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘রামায়ণ’-এ কৈকেয়ীর চক্রান্তকারী দাসী মন্থরার ভূমিকায় অভিনয় করেন ললিতা পাওয়ার। এই চরিত্রের জন্য ললিতা ছাড়া অন্য কারও কথা নাকি ভাবতেই পারেননি ধারাবাহিক নির্মাতারা। শোনা যায়, এই চরিত্র থেকে তিনি প্রায় ৪০ লক্ষ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন।
১৯৬১ সালে ভারত সরকার তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম মহিলা হিসেবে সম্মানিত করে। তাঁর সাত দশকব্যাপী কর্মজীবন জীবনের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। হিন্দি, মারাঠি এবং গুজরাটি চলচ্চিত্রের ৭০০ টিরও বেশি ছবিতে অভিনয় করেন।

দর্শকের এত ভালবাসা পাওয়ার পরেও অভিনেত্রীর শেষ জীবন ছিলো খুব কষ্টের ও ট্রাজিক। ১৯৯০-এর দশকে ললিতার মুখের ক্যান্সার ধরা পড়ে। তিনি চিকিৎসার জন্য পুনেতে বসবাস শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুনের আউন্ধে নিজের ফ্ল্যাটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুঃখজনকভাবে, তাঁর মৃত্যুর সময় স্বামী বা ছেলে কেউই তার কাছে ছিলনা। তাঁর বাড়ি থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় দুই দিন পর মৃত্যুর খবর জানা যায়।
১৯৬০-এর দশক এবং ৭০-এর দশকের শুরুর দিকে, ললিতা পাওয়ারের নেগেটিভিটি ক্যারেক্টার ঠিক ততটাই বক্স অফিসের হিট ফর্মুলা ছিল, যতটা হেলেনের ক্যাবারে ডান্স। বাণিজ্যিক সিনেমায় ললিতা পাওয়ার প্রায় একটি ‘আইটেম’-এর মতোই ছিলেন।
আধুনিক সিনেমার শাশুড়িরা ললিতা পাওয়ারের ধারেকাছেও নেই। আজ হিন্দি সিনেমার এই বহুমুখী প্রতিভার একশো দশতম জন্মবার্ষিকীতে আমার শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাই।
Powerfull actress
একদম
সঠিক নির্বাচন করেছেন এই প্রবাদ প্রতিম অভিনেত্রীর জীবনের সংগ্রাম কে নতুন করে জানার জন্য,,,,, অসাধারণ লাগলো👌👍🏼