হাওয়ায় দুলতে থাকা আখ ক্ষেতের পাতার চামর যেন নীল আকাশের বুকে সাদা মেঘগুলোকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সূয্যি ডুবলেই রাভীগঞ্জের আখক্ষেত গোটা আকাশটাকে টেনে নেয় বুকের মাঝে। জাপটে রাখে তাকে, যাতে চাঁদ, তারার সরল আলোগুলো রাতচরা হিংস্র পশুর নাগাল না পায়। রাতের নিকষ আঁধারে দানবীয় উল্লাসে ফেরে নরপিশাচের দল। অর্ধমৃত শিকারের আর্তনাদ আখগাছের পাতাগুলোর মতোই নুয়ে পড়ে। ভোরের আলোয় তার কোনো চিহ্ন থাকে না।
রাভীগঞ্জ জুড়ে শুধুই আখের ক্ষেত। সামান্য মজুরীর বিনিময়ে কাজের আশায় দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখানে আসে মহিলা শ্রমিক। সবুজ পাতার মাঝে তাদের রঙীন পোষাকের রঙের ছটায় চোখে ঘোর লাগে ক্ষেতের ম্যানেজার শিউচরণের।
সারাদিন কাজের শেষে দিনের মজুরী বুঝে নিয়ে কামিন বস্তির দিকে পা বাড়ায় মেয়ের দল।
সূয্যি যখন হলুদ আলোর বন্যায় ভাসতে ভাসতে আঁধারের কোলে ডুব দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল ঠিক তখনই দিনের মজুরীর আশায় টেবিলের ওপর চম্পার বাড়ানো হাতটা ধরে ফেলে শিউচরণ।
ছ্যাৎলা পড়া দাঁতে খ্যাকখ্যাক্ করে হাসে। বলে, “উধার যাকে খাড়ে হো।”
শিউচরণের নির্দেশিত দিকে তাকায় চম্পা। দেখে, বাগানলাগোয়া ম্যানেজার কোঠির বারন্দায় চৌপায়ার ওপরে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসে আছে এই আখক্ষেতের মালিক লখনলাল।
চম্পা বলে, “আমার টাকা!”
— “সব কুছ্ মিল যায়েগা, থোড়া জ্যাদা ভি মিল সকতে হে” চোখ মটকে একটা অশ্লীল ভঙ্গী করে শিউচরণ।
তারপর চম্পার হাতটা হ্যাঁচকা টানে একপাশে সরিয়ে দিয়ে ধমকে ওঠে, “বোলা না, উধার যা কে খাড়ে হো”।
লখনলাল চৌপায়ায় বসে বসে মজা দেখতে থাকে। মনে মনে ভাবে, শিউচরণ বেশ কাজের লোক।
ওর বুদ্ধিতেই লখনলাল এই অঞ্চলের মেয়েদের ক্ষেতের কাজের জন্য রাখে না। প্রথম প্রথম দু-একবার রেখে নানান ঝামেলায় জড়িয়ে পড়তে হয়েছিল। মনের আশ মিটিয়ে আশনাই করতে গেলেই হুজ্জোতি বাধে। একবার তো থানা পুলিশ অবধি গড়িয়েছিল। সেই থেকে শিউচরণের মধ্যস্থতায় আড়কাঠি বিল্লার মারফৎ ক্ষেতের কাজের জন্য বাইরের রাজ্যগুলো থেকে রোজগারের আশায় দলে দলে মেয়েরা আসে।
পেটের টানে কাজে নতুন যোগ দেওয়া মেয়েকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিজের ইচ্ছেমতো করে না পেলে লখনলালের মাথায় রক্ত চড়তে থাকে।
নতুন কাজে আসা মেয়েদের অসহায়তা দেখতে ভারি মজা লাগে ওর। এইসব মেয়েদের বাগ মানিয়ে নিজের পাশবিক লালসা চরিতার্থ করে আবার নতুন নারীমাংসের খোঁজে শিউচরণকে তাড়া লাগায় লখনলাল।
চিনিকলে ছিবড়ে হওয়া আখের মতোই আখক্ষেতের কামিনের শরীর লালসার শিকার হয়ে ছিবড়ে হতে থাকে রোজ কাজ পাওয়ার আশায়।
ম্যানেজারের ধমকে চম্পা একপাশে সরে দাঁড়ায়।
শ্রমিক মেয়েদের লাইন ধীরে ধীরে ম্যানেজারের টেবিলের দিকে এগোতে থাকে।
হঠাৎই ফুলমতীর গলার আওয়াজে চম্পা চমকে ওঠে।
— “আজ মুঝে যানে দো বাবু, তবিয়ৎ খরাব হ্যায়”
ফুলমতীর হাত ধরে হাসতে থাকে শিউচরণ। বলে, “তবিয়ৎ খরাব! ঠিক হ্যায়, আজ তেরে কো ছোড় রহা হু। কাল কাম পর মত্ আনা। বিল্লা কাল তুঝে লেকর ডাগদর্ কো পাশ যায়েগা। তো পরিশানী খতম হোগা। না হোগা বাঁশ না বাঁশুরী।”
গোটা ক্ষেত জুড়ে শিউচরণের হাসি হায়নার মতো দাপিয়ে বেড়ায়।
চম্পা ভয় পায়। সবাই নিজের নিজের মজুরী বুঝে নিয়ে একে একে চলে যাচ্ছে।
চম্পা ভয়ে ভয়ে শিউচরণকে বলে, “আমার টাকাটা দিয়ে দাও বাবু। আমি ওদের সাথে চলে যাব।”
— “ম্যায় হুঁ না! তেরে কো ঘর পহুঁচানা মেরা কাম হ্যায়।” বলেই কি মনে করে টেবিল ছেড়ে উঠে আসে শিউচরণ।
চম্পার হাত ধরে টানতে টানতে ওকে কোঠীর ভেতরে নিয়ে আসে শিউচরণ। সাথে সাথেই উঠে আসে লখনলাল। বলে, “কাল ফুলমতী কে সাথ্ ইসকো ভি ডাগদর্ কো পাস ভেজ দেনা।”
শিউচরণ বাইরে এসে দরজা টেনে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেয়।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই গাড়ির শব্দে চম্পা চোখ মেলতেই সারা শরীরে অসহ্য ব্যথা অনুভব করে। পা বেয়ে শুকনো রক্তের দাগ। আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলে ও।
জ্ঞান ফেরার পর চম্পা বুঝতে পারে না যে ও কোথায় রয়েছে। শুধু তলপেটে অসহ্য যন্ত্রণা অনুভব করে। চারদিকে তাকাতেই বিল্লাকে দেখতে পায়।
জ্ঞান ফিরেছে দেখে বিল্লা এগিয়ে আসে।
বলে, “আজ থেকে তোর বিন্দাস জীবন। রোজগার করবি আর আমাদের খুশি করবি। তোর পেটের ভেতর থেকে বাচ্চা হওয়ার যন্ত্র ডাগতারবাবু ফেলে দিয়েচে।”
চম্পা আবার জ্ঞান হারায়।
এবার জ্ঞান ফেরার পর ও যেন সম্পূর্ণ অন্য মানুষ। সুস্থ হয়ে আবার ক্ষেতের কাজে ফেরে। যন্ত্রের মতো কাজ করে সারাদিন। তারপর কখনো শিউচরণ, কখনো লখনলাল, কখনো বা বিল্লার লালসা মিটিয়ে ঘরে ফেরে ও।
এই রাভীগঞ্জের আখক্ষেত আর তাকে ঘিরে কামিনবস্তির জীবন যেন পৃথিবীর মধ্যেই অন্য এক জগৎ। বাইরের কোনও খবর এখানে এসে পৌঁছায় না। এদের খবরও গঞ্জের বাইরে বেরোয় কিনা কে জানে!
তবুও বোধহয় পালাবদলের সময় আসে। একদিন ধূলো উড়িয়ে কালো কাঁচ ঢাকা বড় একটা গাড়ি এসে থামে ক্ষেতের সামনে। গাড়ি থেকে নামে কয়েকজন সুবেশা নারী। একজনের হাতে ক্যামেরা।
মাথা নীচু করে কাজ করতে থাকা মেয়ের দল মাথা তুলে দেখতে থাকে। অবাক হয়।
ছোপধরা দাঁতে কানএঁটো হাসি হেসে শিউচরণ ওদের অভ্যর্থনা জানায়।
লখনলাল কামিনদের শাসিয়ে রাখে, “অগর তুম আপনা মুহ্ খোলোগে তো মার ডালুঙ্গা।”
এমন মানুষজনের সামনে কামিনদের মুখ থেকে কথা সরে না। শুধু এটুকু বুঝতে পারে যে সামনের মাসের কোনো একটা দিন ওদের ক্ষেতের কাজ করতে হবে না। সেদিন নাকি শ্রমিক দিবস। সবাই যাতে শ্রমের মজুরী ঠিকঠাক পায় সেসব নিয়ে কথা বলতেই ওইসব দিদিরা আসবেন।
ধূলো উড়িয়ে চলে যায় গাড়ি। এতদিন ধরে গড়ে তোলা সাধের মধুসাম্রাজ্যে বাইরের লোকের অনুপ্রবেশে ক্ষিপ্ত হয় লখনলাল। সব রাগ গিয়ে পড়ে শিউচরণের ওপর।
সকাল থেকেই সূর্য চোখ রাঙাচ্ছে। সেদিন মে দিবস। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সুরক্ষার প্রতিষ্ঠার দিন। শহরের দিদিমণিরা আখক্ষেতের শ্রমিক মহিলাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে রাভীগঞ্জে এসেছেন। কামিন বস্তির সবাইকে ফুল আর মিষ্টির প্যাকেট দিয়ে সম্মান জানাচ্ছেন।
চম্পার হাতেও একজন সুন্দরী দিদিমণি ফুল আর মিষ্টির প্যাকেট তুলে দেন।
— দিদিমণিটার গা থেকে কেমন সুন্দর মিষ্টি একটা গন্ধ বেরোচ্ছে। চম্পা ভাবে, “একদিন ওর গা থেকেও…” হঠাৎই গা গুলিয়ে ওঠে ওর। ছুঁড়ে ফেলে দেয় ফুল, মিষ্টি।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিৎকার করে ওঠে ও। বলে, “শোনো দিদিমণিরা, আমরা পেটের দায়ে পেট কাটতে বাধ্য হই গো। আমাদের গা থেকে তোমাদের মতো সুন্দর গন্ধ কোনওদিন বেরোবে না। এখানে শুধু আগুন জ্বলে বুঝলে; শুধু আগুন। খিদের আগুন।”
জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে চম্পা।