চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের কামদা একাদশী (সংস্কৃত: कामदा एकादशी) পাপমোচন, আত্মশুদ্ধি এবং ভক্তের সমস্ত মনের ইচ্ছা (কামনা) পূরণের লক্ষ্যে পালন করা হয়। সংস্কৃতে ‘কাম’ শব্দের অর্থ ইচ্ছা বা বাসনা এবং ‘দা’ শব্দের অর্থ যিনি প্রদান করেন। তাই কামদা একাদশী হলো সেই ব্রত যা পালন করলে ভক্তের ন্যায়সঙ্গত মনোকামনা পূর্ণ হয়।এটি হিন্দু নববর্ষের পর প্রথম একাদশী। বিশ্বাস করা হয়, এই ব্রত পালনে পিশাচত্ব বা রাক্ষসযোনির মতো ঘোর পাপ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায় এবং ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় জীবন থেকে নেতিবাচক কর্মফল দূর হয়।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই দিনে উপবাস পালন বহু বছর ধরে তপস্যার সমান ফল দেয়।তাই এই একাদশীকে ‘ফলদা একাদশী’ও বলা হয় ।
বরাহপুরাণে এই একাদশী ব্রতের মাহাত্ম্য বর্ণিত রয়েছে। যুধিষ্ঠিরের প্রশ্নের উত্তরে শ্রীগদাধর বললেন, চৈত্র মাসে শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম শ্রীকামাদা। নরপতি দিলীপের এক প্রশ্ন অনুসারে মহর্ষি বশিষ্ঠদেব বলেছিলেন, এই একাদশীর পুত্রদানকারী এবং সর্বপাপনাশী।
একদা স্বর্ণ ও রৌপ্য দিয়ে সজ্জিত অত্যন্ত সমৃদ্ধ শহর “ভোগীপুর রত্নপুরা” শহরে বাস করতেন এক যুবক গন্ধর্ব দম্পতি ললিত এবং তার স্ত্রী ললিতা। তারা একে অপরের প্রতি গভীর প্রেমাসক্ত ছিলেন।কেউ কারো ক্ষণিক বিচ্যুতিও সহ্য করতে পারতেন না। সেই রাজ্যের রাজা ছিলেন পুণ্ডরিক। ললিত ছিলেন তাঁর দরবারের একজন খ্যাতিমান গায়ক এবং ললিতা সেই রাজদরবারের একজন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী।
একদিন রাজা পুন্ডরিকের সভায় যখন ললিত সুমধুর কন্ঠে গান গাইছিলেন, তখন তার মনোযোগ দরবারে অনুপস্থিত তার স্ত্রীর প্রতি চলে যায়। ফলস্বরূপ, তিনি তার সঙ্গীতের স্বর-লয়-তাল-মানের বিপর্যয় ঘটান। সেই সভায় কর্কটক নামে এক নাগ ছিলো। সে ললিতের রহস্যের কথা জানত। তাই সে ললিতের মনোভাব বুঝতে পারে। সুযোগ পেয়ে সে রাজার কাছে অভিযোগ করলেন। বললেন, রাজসভায় ললিত তার প্রভু রাজার চেয়ে তার স্ত্রীকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
রাগান্বিত হয়ে রাজা পুণ্ডরীক ললিতকে একজন নরখাদক রাক্ষস হওয়ার অভিশাপ দিলেন। রাজার অভিশাপে ললিত এক ভয়ঙ্কর রাক্ষসে পরিণত হলো। তার হাত দশ যোজন বিস্তৃত হলো, মুখ পর্বতের গুহাতুল্য হলো, চোখ দুটি প্রজ্বলিত আগুনের মতো, ঊর্ধ্বে আট যোজন বিস্তৃত প্রকান্ড এক শরীর সে লাভ করলো। স্বামীর এরকম ভয়ঙ্কর রাক্ষস শরীর দেখে ললিতা মহা দুঃখে কাতর হয়ে শাপমোচনের জন্য চিন্তিত হল।
এদিকে স্বেচ্ছাচারী রাক্ষসে পরিণত হয়ে ললিত দুর্গম বনে ভ্রমণ করতে লাগল। ললিত নির্দয়ভাবে মানুষ ভক্ষণ করত। এই পাপের ফলে তার মনে বিন্দুমাত্র শান্তি ছিল না। ললিতা কিন্তু তার স্বামী সঙ্গ ত্যাগ করল না। পতির সেই দুরবস্থা দেখে ব্যথিত চিত্তে রোদন করতে করতে ললিতা একদিন বিন্ধ্যপর্বতে উপস্থিত হল।
দৈবযোগে ললিতা সেখানে শৃঙ্গি মুনির আশ্রম দেখতে পান। অতঃপর মুনিবরের দর্শনও পান। তার চরণে প্রণাম করে ললিতা সেখানে দাঁড়িয়ে রইল। মুনিবর জিজ্ঞাসা করলেন — হে সুন্দরী! তুমি কে, কার কন্যা, কি কারণেই বা এই গভীর বনে এসেছ? তা সত্য করে বল।
তদুত্তরে ললিতা বলল- হে প্রভু! আমি বীরধন্যা গন্ধর্বের কন্যা। আমার নাম ললিতা। আমার পতির পিশাচত্ব দূর হয় এমন কোন উপায় জানবার জন্য এখানে এসেছি। তখন ঋষি বললেন — চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের কামদা একাদশী সমাগত। এই ব্রত যথাবিধি পালন করে রাত্রি জাগরণ করে পরদিন পারণ করবার পর সেই ব্রতের ফল স্বামীকে দান করো। তাতেই তোমার স্বামী শাপমুক্ত হবে।
মুনির এমন বাক্যে আশ্বস্ত ললিতা ভক্তিভরে কামদা ব্রত করে স্বামীকে তাঁর পুণ্য দান করার ফলে, ললিত রাক্ষসরূপ ত্যাগ করে দিব্যরূপ ধারণ করল এবং পুনরায় সুখের জীবন লাভ করল। অতঃপর তাদের একটি স্বর্গীয় উড়ন্ত রথে করে স্বর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। এই কাহিনী প্রমাণ করে, সর্ব পাপনাশকারি কামদা ব্রত পালনকারীর সকল মনোরথ পূর্ণ হয়। এই ব্রত পাঠ বা শ্রবণে বাজপেয়ী যজ্ঞের ফল লাভ হয়।
অন্য আরেকটি পৌরাণিক গ্রন্থে কামদা একাদশীর কাহিনীকে ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং দৈব কৃপার কাহিনী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
একদা এক ভক্ত গভীর দুঃখ ও অপূর্ণ বাসনায় ভুগছিলেন। যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তিনি ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হন এবং তিনি তাঁকে পূর্ণ বিশ্বাস ও হৃদয়ের পবিত্রতার সাথে কামদা একাদশী ব্রত পালনের পরামর্শ দেন।
ভক্তটি একাদশীর দিনে সারারাত উপবাস এবং ভগবান বিষ্ণুর নাম জপ করেন। পরদিন সকালের মধ্যেই তাঁর দুঃখ দূর হয়ে যায় এবং তাঁর প্রকৃত ইচ্ছাগুলো শান্তি ও স্বচ্ছতার সাথে পূর্ণ হয়।
এই কাহিনীটি প্রতীকীভাবে বোঝায় যে, কামদা একাদশীতে যখন হৃদয় আন্তরিকভাবে ঈশ্বরের কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন ভক্তির শক্তি প্রকৃত ইচ্ছা পূরণ এবং দুঃখ দূর করতে পারে।
কামদা একাদশীর সকালে স্নান করার পর ভক্ত উপবাস করেন। প্রায়ই কাছাকাছি মন্দিরে কৃষ্ণের রূপে বিষ্ণুকে পূজা দেওয়া হয়।এই ব্রত থেকে অর্জিত পুণ্য সবচেয়ে জঘন্য পাপ শুদ্ধ করে এবং ভক্ত বা তার পরিবারের সদস্যদের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেয় বলে বিশ্বাস করা হয়।
কামদা একাদশী ‘কান্তা একাদশী নামেও পরিচিত। এই বছর একাদশী তিথি দুই দিন ধরে পড়ায় কামদা একাদশীর তারিখ নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক কামদা একাদশীর সঠিক তারিখ, শুভ সময়, উপবাস ভঙ্গের সময়।
২০২৬ সালের চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের কামদা একাদশী ব্রত ২৯শে মার্চ, রবিবার (১৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) পালিত হবে। একাদশী তিথি ২৮শে মার্চ সকাল ৮টা ৪৫মিনিটে শুরু হয়ে ২৯শে মার্চ সকাল ৭টা ৪৬মিনিটে শেষ হবে। ৩০শে মার্চ সকাল ৬টা বেজে ১৩ মিনিট থেকে ৭টা বেজে ০৯ মিনিটের মধ্যে কামদা একাদশীর উপবাস ভঙ্গ হবে।
কামদা একাদশী ব্রত পালনে ভক্তরা চৈত্র শুক্লপক্ষের একাদশী তিথিতে সূর্যোদয়ের আগে স্নান সেরে, উপবাস করে ভগবান বিষ্ণুর পূজা করেন। এদিন সম্পূর্ণ নিরম্বু (জলবিহীন) বা ফলমূল ও জল গ্রহণ করে, পেঁয়াজ-রসুন-শস্য বর্জন করে, বিষ্ণু নাম জপ ও ব্রতকথা শ্রবণ করে দিনটি অতিবাহিত করেন এবং পরদিন (দ্বাদশী) নির্দিষ্ট সময়ে পারণ (ব্রত ভঙ্গ) করেন
বিস্তারিত পালনের নিয়ম :
দশমীর (আগের দিন) রাতে আমিষ ও শস্য জাতীয় খাবার বর্জন করে সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করতে হয়।
একাদশীর দিন ভোরে উঠে স্নান করে পবিত্র হতে হয়।
সংকল্প : মনে মনে বা পুরোহিতের দ্বারা ব্রত পালনের প্রতিজ্ঞা (সংকল্প) করতে হয়। এরপর তুলসী পাতা, ফুল ও ধূপ নিবেদন করে ভগবান বিষ্ণুর বা কৃষ্ণের ষোড়শোপচারে পূজা করতে হয়।
ব্রতকথা ও জপ : কামদা একাদশীর মাহাত্ম্য বা ব্রতকথা পাঠ/শ্রবণ এবং “ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়” জপ করা।
খাদ্য : নিরঞ্জলা (জল ছাড়া) উপবাস সেরা, তবে শারীরিক ক্ষমতা অনুযায়ী ফল-মূল বা জল গ্রহণ করা যায়, কিন্তু কোনো শস্য জাতীয় খাবার (ধান, গম, ডাল) খাওয়া যাবে না। পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস সম্পূর্ণ বর্জনীয় ।
দ্বাদশী (পরের দিন) : নির্দিষ্ট সময়ে বা সূর্যোদয়ের পর ‘পারণ’ বা উপবাস ভঙ্গ করতে হয়, সাধারণত তুলসী পাতা গ্রহণ করে এটি করা হয় ।
দান : এদিনে সামর্থ্য অনুযায়ী অভাবী মানুষদের অন্ন বা অন্য কিছু দান করা অত্যন্ত পুণ্যময়।
হিন্দুধর্মে কামদা একাদশীর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। প্রতিমাসের কৃষ্ণপক্ষ ও শুক্লপক্ষে একটি করে একাদশী থাকে এবং প্রতিটি একাদশীর নিজস্ব তাৎপর্য ও ফল রয়েছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই দিনে যথাযথ আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভগবান বিষ্ণুর পুজো এবং উপবাস পালন করলে জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং ধন, সমৃদ্ধি ও সুখ লাভ হয়।