বাংলার ভোটের ময়দানে এ বার নতুন সংযোজন — ‘মুড়ি পে চর্চা’। প্রধানমন্ত্রীর ঝালমুড়ি খাওয়া নিয়ে যখন চর্চা তুঙ্গে, ঠিক তখনই পাল্টা ঝালমুড়ি খেতে ও খাওয়াতে ময়দানে নেমে পড়েছেন বিভিন্ন নেতা, টিভি চ্যানেল। অথচ সেই কবে থেকেই সুখে-দুঃখে, জলে-জঙ্গলে, বিলাসে-ব্যসনে, রোগে-আরোগ্যে, সর্বহারা থেকে বুর্জোয়া শ্রেণীর খাদ্য তালিকায় অবাধে যাতায়াত নিরহংকারী, শান্তশিষ্ট, পিত্তনাশক মুড়ির। আমজনতার খাবার এই মুড়ি।
সকালে সন্ধ্যায়, ভিড় ট্রেন-বাসে, বন্ধুদের আড্ডায়, টিভি দেখতে দেখতে অনায়াসে হালকা তেল-লঙ্কা, চানাচুর, পিয়াঁজ মিশিয়ে নিলে কেয়া বাত, কেয়া বাত! শৈশব থেকে বার্ধক্য জীবনকে অটুট বন্ধনে বেঁধে রেখেছে মুড়ি। ঘটি কিম্বা বাঙালদের পেটের যেকোনো সমস্যার অব্যর্থ সমাধান ভিজে মুড়ি কিংবা শুকনো মুড়ি।মুড়ি খেয়ে কেউ অসুস্থ হয়েছে বলে আজ অবধি আমি শুনিনি।

পেটরোগা বাঙালীর মুড়ি পেটেন্ট খাদ্য আর অহংকার করে বলেও থাকে — মুড়ির কলম্বাস নাকি তারাই। কিন্তু মুড়ির জন্ম আর্যদের সময় কালে। ধারণা করা হয়, নব্য প্রস্তর যুগের মানুষ যখন থেকে শস্যকণাকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন থেকেই মুড়ি তৈরির পদ্ধতি শুরু হয়। বৈদিক যুগে দেবতাকে অন্নরূপ অর্ঘ্য দেওয়া হতো চালভাজায়। চালভাজারই পরবর্তী সংস্করণ মুড়ি। দুধ, মুড়ি, চিঁড়ে এই সবই বোধহয় শ্রদ্ধেয় আর্যদের প্রিয় খাদ্য ছিল।
গুপ্তযুগে মুড়ি ছিলো বিশেষ জনপ্রিয় খাদ্য।মোগলরা তাদের’মোগলাই খানা’য় (কাবাব, বিরিয়ানি, কোরমা) এদেশ মাত করে দিলেও, মুড়িতে মজেছিল তাদের মন। মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের বোন গুলবদন বেগম তাঁর আত্মজীবনীমূলক দলিল ‘হুমায়ূন-নামা’-তে তৎকালীন সময়ের খাদ্যাভ্যাস, উৎসব এবং ভোজের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে মোগল হেরেমের অন্দরমহলে দেশি জলখাবার হিসেবে মুড়ি, চিঁড়ে এবং অন্যান্য স্থানীয় খাবারের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। লখনৌয়ের শাহী নবাবিয়ানাও বস মেনেছিল মুড়ির মোহে।
মুড়ি শুধুমাত্র বাঙালিদের প্রিয় খাবার নয়, এটি বিভিন্ন সংস্কৃতিতে তার স্বাদের কারণে খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে। জৈনরাও মুড়িকে আপন করে নিয়েছে।
ভারতে বসবাসকারী ইহুদি সম্প্রদায়, বিশেষ করে বেনে ইসরায়েল সম্প্রদায়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় মুড়ির প্রচলন রয়েছে। তাদের একটি বিশেষ প্রার্থনা বা ধন্যবাদ জ্ঞাপন অনুষ্ঠানে ‘মালিদা’ নামক একটি সুস্বাদু খাবার তৈরি করা হয়, যার অন্যতম প্রধান উপাদান হলো ভেজানো চিঁড়ে বা মুড়ি। এই মালিদা তৈরিতে চিঁড়ে/মুড়ির সাথে নারকেল কোরা, চিনি, এলাচ, কাজু, কাঠবাদাম ইত্যাদি ব্যবহার করা হয় এবং এটি বিয়ের অনুষ্ঠান বা ঘরে নতুন সদস্য আসলেও পরিবেশন করা হয়। বৈষ্ণো দেবী মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে মুড়ি বা খই দেওয়া হয়।
এই মুড়ি এপিড ওপিট করে তামিলে হয়েছে পোরি, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় মারমারালু বা পেলালা, মহারাষ্ট্রে কুড়মুড়া…..মুধি, মুরাই, ভাজা, হুড়ুম, ওরুম, লাইয়্যা, মুড়মুড়ে, পারমাল। তবে নাম বদলের সঙ্গে চরিত্রও বেশ কিছুটা বদলেছে মুড়ির।

মুড়ি শুধু বাংলা বা ভারতেই নয়, ইমিগ্রেশন করে আমেরিকা, ইতালি, গ্রিস এবং ইংল্যান্ডের মতো দেশেও পৌঁছে গেছে। ইংরেজরা কোন এক সময় ঠাট্টা করে মুড়িকে বলতো এয়ার ক্যাপসুল।বিদেশের মাটিতে এই জনপ্রিয় একটি খাবাটি পাফ্ড রাইস বা Crispy Rice নামে পরিচিত। ইহুদিদের আদি পুরুষরা মুড়িকে বলত পিপুজে ওরেজ।
মুড়ি একটি সহজপাচ্য এবং পুষ্টিকর খাবার, যাতে কম ক্যালোরি (১৫ গ্রামে প্রায় ৫৪ kcal), প্রচুর কার্বোহাইড্রেট, ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন B, এবং নিয়াসিন থাকে। এটি ফ্যাট-ফ্রি, ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, হজমশক্তি বাড়ায়, হার্ট ভালো রাখে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও হাড় ও দাঁত শক্ত করতে সাহায্য করে।ফাইবারে পরিপূর্ণ থাকায় কোষ্ঠকাঠিন্যর সমস্যায় ভুগলে মুড়ি খাওয়া ভাল। ভিটামিন বি সমৃদ্ধ মুড়ি ত্বকের জন্য খুবই উপকারী।
মুড়িতে বিদ্যমান ভিটামিন বি (Niacin, Thiamine, Riboflavin) মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা মেজাজ ভালো রাখা এবং মানসিক সজীবতার জন্য প্রয়োজনীয়। মুড়ি খুব সহজে হজম হয় এবং পেটের অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে।

মুড়িতে ফাইবার এবং কার্বোহাইড্রেট থাকায় এটি দ্রুত খিদে মেটায় এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, ফলে বাড়তি ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
শহরে আগেকার দিনের দাদুরা ঠাট্টা করে বলতেন, ‘বাড়ির আপদ বুড়ি আর পেটের আপদ মুড়ি।’ শুনতে মজা লাগলেও এটা সত্যি যে, নিয়মিত বা অতিরিক্ত পরিমাণে মুড়ি খেলে হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI)-এর কারণে রক্তে শর্করা বৃদ্ধি, ওজন বৃদ্ধি, এবং ইউরিক অ্যাসিড বাড়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। এছাড়া, কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সোডিয়াম বা নিম্নমানের মুড়ি কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মুড়িতে গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (GI) বেশি (প্রায় ৭০-৮০), যা ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই অতিরিক্ত মুড়ি না খাওয়াই ভালো।
যতই মুড়ির অপকারিতা থাকুক না কেন, গ্রামীণ বাংলায় মুড়ি শুধু একটি খাবার নয়, বরং এটি একটি সংস্কৃতি, একটি ঐতিহ্য। গ্রামেগঞ্জে মুড়ি কৃষিজীবীদের বড় আদরের আস্বাদন। সারাদিন মাঠে রোদে পুড়ে কাজ করার পর, দুপুরে বা বিকেলে এক আঁজলা মুড়ি, পেঁয়াজ, লঙ্কা আর সরষের তেল — এ যেন স্বর্গীয় আস্বাদন। এক অদ্ভুত মাটি ঘ্রাণ ছড়িয়ে আছে এই মুড়ির মধ্যে। গ্রামের প্রায় প্রতি বাড়িতেই সকালের জলখাবার বা বিকেলের টিফিনে মুড়ি অপরিহার্য।

মুড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে সস্তা এবং সহজলভ্য প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেটের উৎস। মাটির উনুনে বালি দিয়ে ভাজা মুড়ির যে একটা সোঁদা গন্ধ থাকে, তা শহরের প্যাকেটজাত মুড়িতে পাওয়া ভার। তাই তো, যান্ত্রিক জীবনের দাপট সত্ত্বেও গ্রামেগঞ্জে মুড়ির জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। এ নিয়ে একটা গল্প মনে পড়ে গেল।
আমার শ্বশুরবাড়ি বর্ধমানের এক গ্রামে। পাকা দেখার দিন শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছিল সকাল থেকে। আমাদের বাড়িতেও চলেছিল খাবারের নানা আয়োজন। শহুরে জলখাবার খাওয়ার পর বড় ভাসুর মাকে বললেন, ‘আমাকে একটু মুড়ি দিন দাঁতে কাটার জন্য।’ আমার মা তখন একটা ছোট বাটি করে অল্প মুড়ি দিয়েছিল খাবার জন্য। বিয়ের পর শুনেছিলাম সেটা নিয়ে নাকি খুব হাসাহাসি হয়েছিল।
কারণটা পরে বুঝেছিলাম। বিয়ের পর এসে দেখলাম সকালে ওরা ব্রেকফাস্ট করে মুড়ি দিয়ে। মুড়ি মানে একটি বড় কাঁসার থালা ভর্তি মুড়ি, তাতে জল মেখে খায়। সঙ্গে থাকে তরকারি কিংবা বেগুনী, কলাইসিদ্ধ, শশা, পিঁয়াজ কুচি আর মিষ্টি/গুড়। শহরে আমরা মুড়ি খাই সাধারণত বিকালে ঝালমুড়ি কিংবা ভেলপুরি করে। কিন্তু গ্রামের মানুষের কাছে মুড়ি হচ্ছে প্রধান খাবার বিশেষ করে বাঁকুড়া, মেদনীপুর এবং বর্ধমানে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুকনো মুড়ি আর লিকার চা, জলখাবারে মুড়ি, মাংসের ঝোল মেখে মুড়ি, তরকারি মেখে মুড়ি, দুধ মেখে মুড়ি… সারাদিন শুধু মুড়ি, মুড়ি এন্ড মুড়ি।

এত মুড়িপিরিতি বাংলাতেই সম্ভব। প্রতিবছর মাঘের কনকনে ঠান্ডায় বাঁকুড়া জেলার কেঞ্জাকুড়ায় প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো দ্বারকেশ্বর নদের চরে বসে মুড়ি মেলা।
আবাল্য মুড়িপ্রীতি ছিলো শ্রীরামকৃষ্ণেরও, কথামৃতের বিভিন্ন স্থানে এই সাধারণ খাবারের প্রতি অনুরাগের উল্লেখ পাওয়া যায়।১৮৫৫ সালে রাণী রাসমণি কর্তৃক দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার দিনে এত আয়োজন, এত দানছত্র… সেদিনও ঠাকুর বাগানে বসে মধ্যাহ্নভোজন করলেন এক পয়সার মুড়ি খেয়ে।
ঝালমুড়ি আর মুড়ির মোয়ার প্রতি অনুরাগ আমারও প্রবল। যাইহোক, মুড়ি খান ও অপরকেও খাওয়ান। এতক্ষণ ধরে মুড়ির মাহাত্ম্য বর্ণনা করে শোনালাম। চোঁয়াঢেকুর তোলা বাঙালী ইহা পড়ে যদি আরো ১০ জনকে পড়ায় তবে চোঁয়া থেকে তার অবশ্যই নিষ্কৃতি পাবেন।
জয় মুড়ির জয়।
আমি আরামবাগের। আমাদের হুগলি জেলায় মুড়ি খুব জনপ্রিয়। আমিও মুড়ি খেতে খুব পছন্দ করি। যে কোনো ধরনের কলাইসেদ্ধ, শসা, চপ, পেঁয়াজ আর শঙ্কা চাই মুড়ির সঙ্গে। আমার স্ত্রী বাঁকুড়া শহরের মেয়ে হলেও মুড়ি প্রায় খান না বললেই চলে। মেয়ে মাঝে মধ্যে।
অনেক ধন্যবাদ মতামতের জন্য।
আমি হুগলির মেয়ে। আমাদেরও নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যসঙ্গী এমনকি কোথাও বেড়াতে গেলেও অল্প হলেও সঙ্গে করে নিয়ে যাই।
মুড়ির মুড়িঘন্ট শেষমেষ জাতে উঠল রাজনীতির ময়দানে প্রবল বাঙালি বিদ্বেষী নেতাদের মুখে বাঙলার মুখরোচক টক ঝাল মিষ্টি মুড়ির প্রভাব এখন বাংলা ছাড়িয়ে সারা ভারতের প্রতি কোনে অবশ্যই দুরদর্শন তথা মোবাইলের
দৌলতে।বাংলা বাঙালির খাওয়া দাওয়া নিয়ে প্রচুর কটাক্ষ
ইদানিং বাঙালিকে কষ্ট দিচ্ছিলো।আপাতত মুড়ির মাধ্যমে
তার খানিক বিরতি বাংলা বাঙালিকে স্বস্তি দেবে।
সবাই মুড়ির ইতিহাস জানতে পারল আপনার কলমের জাদুতে।🙏 ধন্যবাদ 🙏
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই এত সুন্দর একটি মতামতের জন্য। বাঙালির তর্কের ডিএ, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, দাদা দিদি, কার্ল মার্ক্স, গ্লোবাল ওয়ার্মিং ….নিয়ে তুমুল আলোচনার সাক্ষী থাকুক মুঠোয় ভরা মুড়ি। শুধু মুড়িঘন্টতেই মুড়ির থাকা আর হলো না।
ঝালমুড়ি বোধহয় জাতে উঠল এবার। আগে কলকাতাই ছিল ঠিকানা। এবার বিদেশেও পৌঁছে গেল নাম। পর্যটকরা বাংলা এলে নিশ্চিত ঝালমুড়ির খবর নেবেন। প্রধানমন্ত্রী ঝালমুড়ি খাওয়াটা একটা ইতিহাস হয়ে থাকবে।