Logo
এই মুহূর্তে ::
বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বিদ্যাসাগর — একটি কল্পিত সাক্ষাৎকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ খোলা খামের পরে খোলা চিঠি : দিলীপ মজুমদার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ ও তিনি — ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-৮৬) : প্রলয় চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘মেরিলিন মনরোর চশমা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস খোলাখাম : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জামা, জামি, জামাইষষ্ঠী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় পলিসি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন আবশ্যক : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পলাশীর যুদ্ধ ও একটি সিদ্ধান্ত (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৪৪৯ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কোথাও হারিয়ে যাব বললেই যেমন হারিয়ে যাওয়া যায় না, ঠিক তেমনি কিছু পাব বললেই সেটা পাওয়াও যায় না। এখন এই পেতে চাওয়া আর হারিয়ে যাওয়ার মাঝখানেও কিছু একটা ম্যাজিক থাকে। ওই ম্যাজিক লন্ঠনটা আমরা খুঁজে ফিরি বারবার। আর এই সারাজীবন কিছু পেতে চেয়ে যখন মানুষ জীবনে দিশাহীন এক অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিপাকে হাবুডুবু খায়, হয়ত বা জীবনের শেষ দেখতে চায়, সেই মুহূর্তেই মৃত্যু তাকে হয়ত ফিরতে বলে। ডুবতে ডুবতে সামনে একটা ম্যাজিক লন্ঠন আচমকা হালকা থেকে স্পষ্ট, অতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনির্দিষ্ট এক হারিয়ে যাওয়া থেকে সে তখন ওই আলোর রেখার পথে সাঁতরানো শুরু করে। হয়ত এই সাঁতরানো তার আকাঙ্ক্ষায় পৌঁছে দেবে না। হয়ত সে মাঝসমুদ্রে আবার হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ওই ম্যাজিক লন্ঠন তাকে টানবে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এবার গন্তব্যে পৌঁছেও সে ঠিক ঠিকানায় ফিরল কিনা, সে যা পেতে চেয়েছিল পেল কি না, ঠিকানায় পৌঁছেও কেউ দরজা খুলে দাঁড়াল কি না — সে প্রশ্ন অবান্তর। আসল জিনিসটি এখানে ওই ম্যাজিক লন্ঠন — যা একজনকে অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার হাত থেকে আলোর দিশা দেখিয়ে জীবনে ফিরিয়ে আনছে।

ফাঁকা রাস্তায় ছুটে চলেছে অটো। মসৃণ ঝকঝকে রাস্তায় কোথাও কোথাও একটু আধটু ভাঙা। তা সে সামান্যই। অন্তত আমরা যে পথে রোজ জীবনকে একটু একটু করে ক্ষইয়ে ফেলছি সেই পথের থেকে অনেকটাই উত্তম। হু হু করে বাতাস বইছে কানের পাশ দিয়ে। এখানে অটোতে তিনজনের বেশি আরোহী তোলা নিয়ম বহির্ভূত। সামনের সিটে ড্রাইভার ছাড়া আর কেউ বসার অধিকারী নয়। আবার আমরা তো অটোর সামনে ড্রাইভার ছাড়া আরও তিনজনকে দেখতে অভ্যস্ত। পোড়া চোখে ড্রাইভার ছাড়া সামনের সিটে আর কাউকে না দেখে কেমন ফাঁকা ফাঁকা অনুভব হচ্ছে। পুরো দস্তুর জানুয়ারি মাস। কলকাতা শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। কিন্তু এখানে এই কানের পাশে হু হু হাওয়া ছাড়া আর কোনো শীতের উপকরণ নেই। আর গাড়ির গতির জন্য যে বাতাস বয় তাকে জব্দ করতে একটা ওড়না কানে পেঁচিয়ে নিলেই লাইফ জিঙ্গালালা।

অ্যাবার্ডিন মার্কেটে শপিং করে ফেরার পথে অটোওয়ালার সঙ্গে পরিচয় হবেই। সুতরাং ফাঁকা রাস্তায় আলাপ শুরু। “কতদিন এসেছেন? কিরকম চলছে সংসার? ইত্যাদি।” সে রইলে অবশ্যই রাস্তার দিকে চেয়ে, কারণ সে অটোটি চালাচ্ছে। আমাদের তিনটি প্রাণের ভার তারই উপর আপাততঃ। কিন্তু রবি ঠাকুরের হঠাৎ দেখার মত সে দু-একটি কথায় জবাব দিলে না। বেশ লম্বা চওড়া উত্তরই সে দিলে। আন্দামানের পোর্ট ব্লেয়ারের অটো চালক। দেখে প্রথমে সাউথ ইন্ডিয়ান মনে হলেও সে বাঙালি। পরে আটদিন আন্দামানের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় বুঝলাম এখানে বাঙালির সংখ্যা সবথেকে বেশি। সে মাঝি মাল্লা হোক বা অটো চালক বা সমুদ্রের ধারে বালির উপরে ছোট খড়ের ঘরে সাজানো পসরা নিয়ে বসে থাকা দোকানিই হোক। তারা অনেকেই বাঙালি। সুতরাং এক বাঙালি আর এক বাঙালি পেলে অন্তর উজাড় করে দেবে এইটিই সিদ্ধমত। দীর্ঘ কথোপকথনে এইটুকু পেলাম যে তার জীবনের প্রথমটা বনগাঁতে কাটালেও এখন সে এই দ্বীপরাষ্ট্রে একটা ম্যাজিক লন্ঠনের দেখা পেয়ে গেছে। সেই ম্যাজিকে সে ভাল আছে। আন্দামানে চুরি নেই, ছিনতাই নেই, নেই নিয়ম ভাঙা, অথচ সব গড়গড়িয়ে নাকি চলছে। অটো চালিয়ে তার রোজগারও খুব ভালো। গোটা পথ জুড়ে আমাকে আর প্রশ্ন করতে হয় নি। সে আপনিই নিজের হৃদয়ের কপাট খুলে আমাদের সেখানে পথের সময়টুকু বসিয়ে রেখেছিল।

পরদিন ফেরি পেরিয়ে একটি জিপে করে এসে যখন নর্থ বে আইল্যান্ডে নামলাম তখন সকাল একটু এগিয়েছে। ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকলে একটা শিরশিরে ভাব। কিন্তু রোদে গেলেই গা পুড়িয়ে দিচ্ছে এই জানুয়ারিতেও। চড়াই ভেঙে হাঁটতে লাগলাম নর্থ পয়েন্ট লাইটহাউসের দিকে। এখানেও চারদিকে বাঙালির দোকান। তাদের কেউ নতুন এসেছে আবার কেউ বা দাদুর আমল থেকে এখানকার অধিবাসী। কারোর বাড়ি বনগাঁ, কারও কাকদ্বীপ আবার কারোর অধুনা বাংলাদেশ। তবে যে সময় তাদের পূর্বপুরুষ এই দ্বীপরাষ্ট্রে ভাগ্যের ফেরে পা রেখেছিলেন তখন ছিল অবিভক্ত বাংলা। সারাজীবন ধরে নিজেরও একটা ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজ অন্তহীন। একটা দরজার খোঁজ, যেখানে কেউ দাঁড়িয়ে থাকবে শুধু আমারই জন্য।

জিপ থেকে নামার পরে পাহাড়ি পথ ধরে ঘন অরণ্যের মধ্যে দিয়ে সুন্দর বাঁধানো পথ। হালকা চড়াই ভেঙে হাঁটতে অসম্ভব ভালো লাগে। যাচ্ছি এই প্রথম একটি সজীব লাইট হাউসে উঠব বলে। এর আগে বারবার ছুটে গেছি ম্যাজিকের আশায়। কিন্তু সব স্থানে গিয়ে নিরাশ হতে হয়েছে। কেউ আমার জন্য দরজায় অপেক্ষা করে নেই। হয়ত কোনো একদিন সে ছিল, কিন্তু তখন আমি ছিলাম না। বেশির ভাগ সাগরের তীরে যে ম্যাজিকের খোঁজে গেছি, দেখা গেছে তার দোর গেছে ভেঙে, ঘোরানো সিঁড়ি গেছে তেবড়ে, ভিতরে কোনো আলোর দিশা আর নেই, নিকষ অন্ধকার। দু একটা চামচিকে কি বাদুড় আমার মত অকিঞ্চিতের উৎপাতে বিরক্ত হয়ে কিচকিচ শব্দে কানের পাশ দিয়ে উড়ে গেছে। আমারও জাদুর ছোঁয়া পাওয়া হয় নি।

নর্থ পয়েন্ট লাইটহাউসের ভূমি বা বেস সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৭ মিটার উঁচুতে। লাইটহাউসে উঠতে গেলে ঘোরানো সিঁড়ি ১৫৫ আর তারপর একদম উল্লম্ব সিঁড়ি ১২টি। পুরোপুরি লোহার তৈরি। ১৯৭২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। লাইটহাউসের নিজস্ব উচ্চতা ১১৫ ফুট বা ৩৫ মিটার। লাইটহাউসের সর্বোচ্চ বিন্দু সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭২ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। রাতে এটি থেকে ১২ সেকেন্ড অন্তর অন্তর আলোর বীম ছড়িয়ে পড়ে দিকনির্ণয়ের সুবিধার্থে। গাঢ় লাল আর সাদা রঙের লাইটহাউসটা দেখে বাইরে থেকে এক রূপকথার কেশবতী রাজকন্যার দুর্গের কল্পনা মাথায় আসে। ওই যে উঁচু আকাশ ছোঁয়া ছোট্ট ঝোলা বারান্দায় সে তার মস্ত লম্বা কেশ ঝুলিয়ে দাঁড়াবে আর নীচ থেকে এক রাজপুত্তুর সেই কেশ বেয়ে উপরে তার কাছে গিয়ে পৌঁছে বলবে, “এই তো আমি শুধু তোমার জন্যই আকাশ ছুঁয়ে আসি রোজ।” কেশবতী রাজপুত্তুরের কথায় মিষ্টি করে হাসে।

লোহার দরজার সামনে টিকিট পরীক্ষক দরজায় অপেক্ষা করছিলেন। আর ছিল বেশ কটি কুকুর বাইরে আরাম করে শুয়ে। বেশ কয়েকজন সিকিউরিটি জওয়ান এবং অফিসার রয়েছেন। পাশে স্টাফ কোয়ার্টার। জলের ব্যবস্থা, ওয়াশরুম সবই সুন্দর ভাবে গোছানো। কেশবতীর দুর্গে জুতো খুলে খালি পায়ে মন্দিরে প্রবেশ করার মত ঢুকতে হল। লোহার বাড়ি, লোহার ঠান্ডা মেঝে, মসৃণ লোহার সিঁড়িতে পা রাখলাম। চওড়া ছড়িয়ে থাকা সিঁড়ি যত উপরে উঠেছে তত সরু হয়েছে। মোট সাতটি তলা ভেঙে উঠতে হবে। এক একটি তলার উচ্চতা সাধারণ বাড়ির দোতলার সমান। আজ কেশবতী রাজকন্যা উঠছে ঠান্ডা ধাতব সিঁড়ি ভেঙে। পায়ের তলায় এক আশ্চর্য পেলব শীতল স্পর্শ। প্রতিটি ধাপে সে উঠছে অজানাকে ছোঁবে ব’লে। ওইটুকুই তার চাওয়া। শেষ ধাপে উঠে যেন কেউ হাতটি বাড়িয়ে হ্যাঁচকা টানে তাকে টেনে নেয়। অনেকটা সেই ডিডিএলজে’র রাজের সিমরনকে টেনে নিয়ে এক অনন্ত পৃথিবীর সামনের দোর খুলে দেওয়ার মত।

কেউ কেউ বেশি উৎসাহে অতি তড়বড়িয়ে উঠতে গিয়ে তিনতলার গোল জায়গায় হাঁপাচ্ছেন । কেউ তাদের পাশ কাটিয়ে মুখে স্মিত হাসি নিয়ে’ স্লো বাট স্টেডি’ ভঙ্গিমায় দিব্যি উঠে যাচ্ছেন। চলতে চলতে প্রত্যেকটি মুখের দিকে তাকিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হৃদয়ের অন্তস্থলে আলোড়ন তুলছে। প্রত্যেকের এই সিঁড়ি ভাঙাতে কষ্ট তো হচ্ছে। তার উপর যত উপরে ওঠা হচ্ছে, মনে হচ্ছে যেন বাতাস বড় কম। নিঃশ্বাসের একটা ওঠানামা, একটা চাপ বোধ রয়েছে। তবু কিসের টানে আট থেকে আশি সকলে এক আলোমাখা মুখ নিয়ে উপরে উঠছেন। যেন একবার পৌঁছতে পারলেই জীবনের সব না পাওয়ার বেদনা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে।

একেবারে শেষের ধাপে পৌঁছে সোজা সিঁড়ি বেয়ে উঠতে সত্যিই চাপ বোধ হয়। তবু আমার আগেই মাসিমা দিব্যি শাড়ি পরে উঠে পড়েছেন মুক্তির সন্ধানে। দু-একজন উল্লম্ব সিঁড়ির পাশে বসে একটু হাঁপাচ্ছেন। দু-একজন বেশ কিছুতলা উঠেও আর না পেরে ফেরার পথে নামলেন। কেউ একজন হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে অনেককেই উঠিয়ে দিচ্ছেন। না, শাহরুখ নন, রাজ নন, তবে সহযাত্রী তো বটেই। কারণ আমরা এখানে একসাথে সকলে উঠতে শুরু করেছিলাম। তাই যে কজন লাইটহাউসের একদম টপে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা বসে আছি তারা কিছুক্ষণের জন্য সবাই সবাইকার আপন।

একবার উপরে উঠে পড়লেই এক আকাশ পাগলা বাতাসের এলোমেলো আদর, চারিদিকে নির্ভেজাল সবুজ আর ঘন নীলের হাতছানি মুহূর্তে এক আনন্দখনির সন্ধান হাতে তুলে দিল এই সারাজীবন ম্যাজিক খুঁজে চলা মানুষটিকে। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের একটা গল্প আছে যে, অনেক মানুষ হাঁটতে হাঁটতে একটা বিরাট প্রাচীর দেখতে পেল। প্রাচীরের ওপারে কী আছে তা কেউ জানে না। কিন্তু ওপার থেকে এক আনন্দের আওয়াজ আসছে। মনে হচ্ছে যারা ওপারে আছে তারা ভীষণ খুশিতে আছে। এক এক করে এপাশের লোক প্রাচীরের উপরে উঠছে, তারপর আনন্দে লাফিয়ে পড়ছে ওদিকে। কেউ কিন্তু ওদিকে ঠিক কী আছে বা কী ঘটছে সে খবর এদিকে দিয়ে লাফাচ্ছে না। আমাদেরও সেই একই অবস্থা। এতক্ষণ সিঁড়ি ভেঙে বদ্ধ অবস্থার মধ্যে দিয়ে আসার পরেই একই সঙ্গে এত আলো এত বাতাস আর এত রঙের প্রাবল্যে মন বাঁধনহারা।

আমার দহন, আমার বেদনা, আমার বিপন্নতা যখনই কুরে কুরে আমাকে শেষের দিকে নিয়ে যায়, আমি খুঁজে চলি, খুঁজে চলি সেই আলোকবর্তিকার, যে আমাকে আমার নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। এবার সেই ঠিকানায় সঠিক মানুষটি দরজা খুলল কি খুলল না, সে ধরা দিল কি দিল না — সে কথা ওই নীল আকাশ বলুক, ওই সবজেনীল সাগর বলুক, এই এলোমেলো পাগল বাতাস বলুক। আরে মশাই, ওদেরও যে অনেক কিছু বলার আছে, একবার লাইটহাউসের টপে উঠে পড়ে তো দেখুন, ওরা কি বলছে আপনার কানে কানে। আমি সেই ম্যাজিক লন্ঠন একা চুরি করে নিয়ে পালাতে পারলাম না। হয়ত তাইই উচিত ছিল। কিন্তু আমার ভিতরের অন্তহীন বিষাদ যখন এই আলোর ছোঁয়া পেয়ে জীবনের দিকে মুখ ফেরাল, তখন এই আনন্দ সবার মাঝে বিলিয়ে দেওয়াই শ্রেয়। বিষাদটুকু একলারই থাক।


আপনার মতামত লিখুন :

4 responses to “ম্যাজিক লন্ঠনের খোঁজে : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী”

  1. Debapriya Pramanik says:

    অনবদ্য লেখনী

  2. Nandini Adhikari says:

    বেশ লাগলো লেখাটি। অন্যরকম বেড়ানোর গল্প!

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন