Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায়
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রসঙ্গ : খালিয়াজুরি পরগণার লম্বোদর : ফারুকুর রহমান চৌধুরী

ফারুকুর রহমান চৌধুরী / ১১৮১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণা জেলার খালিয়াজুরি উপজেলার প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্থানীয় ইতিহাসের যে উপকরণ পাওয়া যায় তাতে লম্বোদর নামটি অনেক গুরুত্ব বহন করে। মূলত এই নামটি উঠে এসেছে ময়মনসিংহ অঞ্চলের আঞ্চলিক ইতিহাসের আকরগ্রন্থ — কেদারনাথ মজুমদার প্রণীত ‘মৈমনসিংহের ইতিহাস ও মৈমনসিংহের বিবরণ’ হতে। লম্বোদর অতি সাধারণ কেউ হলে কয়েকশত বছর পর তাঁর নামটি স্থানীয় ইতিহাসের পাতায় উঠে আসাতো না। তাছাড়া ময়মনসিংহ গ্যাজেটিয়ার, একাধিক গ্রন্থে লম্বোদর নিয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা, দুটি পরিবার লম্বোদরের বংশধর দাবী, খালিয়াজুরি মৌজার জলাশয়ে বিদ্যমান লেম্বুদরের জনশূন্য ভিটা, স্থানীয় জনশ্রুতি ইত্যাদি পর্যালোচনায় লম্বোদর নিয়ে বেশ ধুম্রজাল পরিলক্ষিত হয়। তাই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধন করি। সঙ্গত কারণে, লম্বোদর সম্পর্কে শ্রীকেদারনাথ মজুমদার প্রণীত মৈমনসিংহের ইতিহাস ও মৈমনসিংহের বিবরণ গ্রন্থে যা লেখা হয়েছে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশটুকু এখানে তুলে ধরছি — “চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে জিতারী নামক জনৈক ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী কর্তৃক কামরূপের তৎকালীন রাজধানী ভাটী আক্রান্ত ও অধিকৃত হয়। …ময়মনসিংহের পূর্ব্ব প্রান্তস্থ খালিয়াজুরিকে ভাটী নামে অভিহিত হইতে অনেক প্রাচীন কাগজপত্রে দেখিতে পাওয়া যায়। খালিয়াজুরি পরগণার প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করিলে দেখা যায় যে, কতিপয় শতাব্দী পূর্বে লম্বোদর নামক একজন ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী এতৎপ্রদেশে আগমন করিয়া ভাটীর শাসনভার গ্রহণ করেন। এই সন্ন্যাসীর বংশ এখনও বর্তমান আছে। দিল্লীশ্বর জাহাঙ্গীর বাদশা হইতে ইহাদের পূর্ব্বপুরুষেরা ভাটী মুল্লুকের যে পাঞ্জাফরমান প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহাতে তাঁহাদিগকে ভাটীর শাসনকর্ত্তা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছিল। টিকা ৫ ‘…লম্বোদরের বংশধর আজও বর্তমান; লম্বোদর হইতে ১৬ কি ২০ পুরুষে নামিয়াছে। ৩ পুরুষে শতাব্দী গণনা করিলেও ন্যূনাধিক ৬০০ বৎসর হইবে। সুতরাং ‘লম্বোদর’ চতুর্দ্দশ শতাব্দীর পূর্ব্বে কখনই হইতে পারেন না” উল্লেখিত আলোচনা থেকে যে বিষয়গুলো আমাকে ভাবনায় ফেলেছে সেগুলো হচ্ছে- ১) লম্বোদর সন্ন্যাসী, ২) তাঁর বংশধর আছে, ৩) ভাটীর শাসনভার গ্রহণ এবং ৪) জাহাঙ্গীর বাদশা হইতে পাঞ্জাফরমান প্রাপ্তি।

সনাতন ধর্মে বর্ণ প্রথায় রয়েছে — ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। এই বর্ণ বিভাজন মূলত কর্ম ও সামাজিক ভূমিকার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ব্রাহ্মণ — শিক্ষক, পুরোহিত, পন্ডিত হিসেবে পরিচিত। ক্ষত্রিয় — যোদ্ধা, শাসক ও প্রশাসক হিসেবে পরিচিত। বৈশ্য — ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকাজে পরিচিত। সর্বোপরি শূদ্র — শ্রমিক বা কারিগর হিসেবে পরিচিত। সুতরাং লম্বোদর ক্ষত্রিয় হতেই পারেন। তবে তিনি যদি শাসনকর্তা হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাস অনেক গুরুত্ব বহন করে। প্রাগুক্ত গ্রন্থে লম্বোদর সম্পর্কে যে আলোচনা পাওয়া যায় তাতে বলা হয়েছে লম্বোদর ছিলেন ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসি, তিনি শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন, তার বংশধর আছে। আমরা জানি, সন্ন্যাসিরা সংসার ত্যাগ করে গৃহত্যাগী বা বিরাগী হয়ে ইশ্বরের চিন্তায় মগ্ন থাকেন। অথচ কেদারনাথ মজুমদারের বর্ণনামতে লম্বোদর সন্ন্যাসি ছিলেন তাঁর বংশধর ছিল ! শ্রীকেদারনাথ মজুমদার স্পষ্টই লিখেছেন লম্বোদর হইতে ১৬ কি ২০ পুরুষে নামিয়াছে। অবশ্য লম্বোদর যদি সংসার জীবন শেষে বৃদ্ধ বয়সে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে থাকেন তা ভিন্ন কথা। কিন্তু শ্রীকেদারনাথ মজুমদার স্পস্টই লিখেছেন- কতিপয় শতাব্দী পূর্বে লম্বোদর নামক একজন ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী এতৎপ্রদেশে আগমন করিয়া ভাটীর শাসনভার গ্রহণ করেন। অর্থাৎ লম্বোদর যখন শাসনভার গ্রহণ করেন তখন তিনি সন্ন্যাসী ছিলেন। সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়- তিনি যদি সন্ন্যাসী হয়েই থাকেন তাহলে তার বংশধর থাকে কিভাবে? তাছাড়া গৃহত্যাগী বা বিরাগী হয়ে ইশ্বরের চিন্তায় মগ্ন থাকা একজন সন্ন্যাসী কেন ই বা ভাটির শাসনভার গ্রহণ করলেন? তাছাড়া তিনি কোথা থেকে এলেন, কিভাবে ভাটির শাসনভার গ্রহণ করলেন, এজন্য কোনো যুদ্ধ হয়েছিল নাকি আপোষ মিমাংসায় সিংহাসনে বশিয়ে দেয়া হয়েছিল? এজন্য তিনি কি সন্ন্যাসব্রত ত্যাগ করেছিলেন? এ সংক্রান্ত কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি কোথাও! তাহলে এই দাবী রূপ কথার গল্প? নাকি অন্য কিছু? প্রশন্ন থেকেই যায়।

শ্রীকেদারনাথ মজুমদারের প্রাগুক্ত গ্রন্থে লিখেছেন — “চতুর্দ্দশ শতাব্দীতে জিতারী নামক জনৈক ক্ষত্রিয় সন্নাসী কর্তৃক কামরূপের তৎকালীন রাজধানী ‘ভাটী’ আক্রান্ত ও অধিকৃত হয়। ময়মনসিংহের পূর্ব্ব প্রান্তস্থ খালিয়াজুরিকে ভাটী নামে অভিহিত হইতে অনেক প্রাচীন কাগজপত্রে দেখিতে পাওয়া যায়। টিকা — (নগেন্দ্র বাবু লিখিয়াছেন জিতারী নামে এক সন্ন্যাসী ক্ষত্রিয় রাজা কামরূপ শাসন করেন। তাহার সময়ে কামরূপের রাজধানী গৌহাটী হইতে ‘ভাটী’ নামক স্থানে নীত হয়।” কামরূপের রাজধানী খালিয়াজুরিতে স্থানান্তরিত হয়েছিল এমন বক্তব্য জাতীয় ইতিহাসরে কোথাও লেখা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত মোঃ হাফিজুর রহমান ভূঞা তাঁর ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব ১৮৫৪-১৯৬০ গ্রন্থের ১০৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন — খালিয়াজুরি অত্যন্ত দূর্গম জলাবদ্ধ হাওর বাওর এলাকা। এখানে কামরূপের রাজধানী হওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না বলেই প্রতীয়মান হয়। জনাব ভূঁইয়া জিতারি সম্পর্কে লিখেছেন — “ত্রয়োদশ চতুর্দশ শতাব্দীতে বার বার মুসলিম আক্রমনের ফলে কামরূপ রাজ্যের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগে পূর্ব ময়মনসিংহের অরণ্যভূমিতে কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব হয়। এ ক্ষুদ্র রাজ্যগুলো স্থানীয় কোচ, হাজং, গারো ইত্যাদি সামন্ত সর্দারদের দ্বারা শাসিত হচ্ছিল। খালিয়াজুরি এলাকাও এসময় স্থানীয় শাসক-জিতারী নামক ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী কর্তৃক চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অধিকৃত হয়।” শ্রীকেদারনাথ মজুমদার তাঁর প্রাগুক্ত গ্রন্থেও লিখেছেন — “পূর্ব ময়মনসিংহের অরণ্য ভূমিতে কয়েকটি ক্ষুদ্র রাজ্যের উদ্ভব হয়। এই ক্ষুদ্র রাজ্যগুলি অসভ্য কোচ, হাজং, গারো প্রভৃতি দ্বারা কিশোরগঞ্জের অন্তর্গত জঙ্গলবাড়ীতে, নেত্রকোণার অন্তর্গত খালিয়াজুরি, মদন ও সুসঙ্গে সদরের অন্তর্গত বোকাইনগরে এবং জামালপুরের অন্তর্গত গড়দলিপায় প্রতিষ্ঠিত ইয়াছিল। …দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যেই পূর্ব্ব ময়মনসিংহের উত্তর ও দক্ষিণ ভাগ অসভ্যদিগের হস্ত হইতে মুক্ত হইয়া যায়। … খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী হইতেই পূর্ব্ব ময়মনসিংহ অল্পে অল্পে কামরূপের শাসন শৃঙ্খল পরিহার করিতেছিল।” সুতরাং খালিয়াজুরিতে কামরূপের রাজধানী ছিল এ বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। বরং খালিয়াজুরি এলাকা এসময় সামন্ত সর্দারদের দ্বারা শাসিত হচ্ছিল। যা জিতারী নামক ক্ষত্রিয় সন্ন্যাসী কর্তৃক চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অধিকৃত হয়। উল্লেখিত জিতারী এবং লম্বোদর ভিন্ন ব্যক্তি, তাদের সময়কালও ভিন্ন। জিতারী এবং লম্বোদর যে ভিন্ন ব্যক্তি, ভিন্ন সময়ের মানুষ কেদারনাথ মুজদার তাঁর প্রগুক্ত গ্রন্থে সন্দেহ প্রকাশ করে লিখেছেন — “লম্বোদরের নাম কোন গ্রন্থে দেখা যায় না। যদি লম্বোদর ও জিতারী দুই ব্যক্তি হয় তাহা হইলে তৎসম্বন্ধে কোন আপত্তির কারণ নাই।” জিতারী এবং লম্বোদর নামে ভিন্ন দুজন ব্যক্তি ছিলেন, তাঁদের সময়কাল ভিন্ন। এমনকি লম্বোদর নামেও ভিন্ন সময়ে ভিন্ন দুইজন ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া যায় খালিয়াজুরির প্রাচীন ইতিহাস অনুসন্ধানে।

খালিয়াজুরি উপজেলার বল্লী চৌধুরী বংশের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে — বাদশা আকবরের সময় দিল্লি থেকে মতান্তরে চিতোর থেকে ভাটি অঞ্চলে আগমন করেন। তাঁর নাম ছিল লম্বোদর সিং। তিনি ছিলেন সনাতন ধর্মালম্বী রাজপোত ক্ষত্রিয় এবং মোগল শাসন বিদ্বেষি। স্থানীয় জনশ্রুতি এবং হাসন রাজা সিনেসায় হুরমজাহান চৌধুরীর ডায়লগ থেকে জানাযায় ‘বল্লী চৌধুরী বংশের পূর্বপুরষ ভাটি এলাকায় আগমনের পর ঈশা খাঁ বাহিনীর পক্ষ হয়ে মোগল বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেন’। স্থানীয় কিংবদন্তী অনুযায়ী — তাঁর নাম ছিল লম্বোদর। তিনি একখন্ড ভূমি জায়গীর প্রাপ্ত হয়ে তাঁর পূর্বতন বসতী এলাকার সাথে মিল রেখে নতুন আবাস ভূমির নাম রাখেন বল্লী। যা পরবর্তীতে মৌজি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। জানাযায়, লম্বোদর সিং ভাটি অঞ্চলে আগমনের পর স্থানীয় প্রভাবশালী স্থায়স্থ বংশে বিয়ে করেন। তাঁর বংশরধর একজন বাদশা জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে পূর্বতন জায়গীর ভূমিটি পুনঃবন্দোবস্ত আনেন। এই জনশ্রুতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় — ১৬০১ খ্রিস্টাব্দে মোগল সেনাপতি মানসিংহের নেতৃত্বে ময়মনসিংহের অর্ন্তগত বোকাইনগর দূর্গ আক্রমন হয়েছিল। ইতোপূর্বে ১৫৯৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জের এগারসিন্ধু দূর্গ আক্রমণ হয়েছিল। এগারসিন্ধু যুদ্ধের বিবরণ বিভারিজ অনুদিত আকবরনামা প্রন্থের ৬৫৭-৫৬০ পৃষ্ঠায় এবং ব্লকম্যান অনুদিত আইন ই আকবরই গ্রন্থের ৪০০ পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে। অপরদিকে রফিক আখন্দ প্রণীত কিশোরগঞ্জ জেলার ইতিহাস গ্রন্থের ১১৮ পৃষ্ঠা হতে জানা যায়, ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে অষ্টগ্রামের কাস্তুল নামক স্থানে মোগল বাহিনীর সাথে ভাটিঅঞ্চলের তৎকালীন শাসনকর্তা মজলিশ দিলওয়ার বাহিনীর যুদ্ধ হলে মোগল বাহিনীর পরাজয় ঘটে। উল্লেখিত সময়ে, খালিয়াজুরি এলাকার প্রশাসনিক ব্যবস্থা স্পর্কে অনুসন্ধান করলে দেখা যায় — অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি প্রণীত শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত উত্তরাংশ ২৫৯ পৃষ্ঠায় (পরগণা সাতগাঁও) লিখা হয়েছে — “ময়মনসিংহের খালিয়াজুরি নিবাসী সতানাথ ওঁমের পুত্রের নাম রঘুনাথ, কামাখ্যা ও মহেশনাথ; ইহারা খোয়াজ ওসমান খাঁর কর্ম্মচারী নিযুক্ত হইয়াছিলেন। … খোয়াজ ওসমান ৯৬৩ হিজরী (১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দ) ইটার রাজা সুবিদ নারায়ণকে পরাস্ত করিয়া তথায় গড় ও বাড়ী প্রস্তুত করেন। এই যুদ্ধে সীতানাথের পুত্রগণ সহায়তা করায় সাতগাঁও উপত্যকা প্রদেশে তাঁহারা জায়গীর প্রাপ্ত হন, এবং ময়মনসিংহ পরিত্যাগপূর্ব্বক জায়গীরপাপ্ত ভূমে বাড়ী নির্ম্মাণ করিয়া এথায় আসিয়া বাস করেন।” উল্লেখিত বইয়ের (পরগণা সিংহচাপড়) ৩৬৩ পৃষ্ঠা থেকে জানা যায় — “ওঁম বংশের সতানাথ ওমের পুত্রগণ সাতগাঁও যাওয়ার পর ওঁম বংশের যে অংশ খালিয়াজুরি বসবাস করতেন সেই অংশ পরবর্তীতে খালিয়াজুরি পরিত্যাগ করে প্রথমে পাইলগাঁও পরে সিংহচাপড় পরগণার জগঝাপ মৌজায় চলে যান।” এ বিষয়ে অনুসন্ধান করলে দেখা গেছ, সিংহচাপড় পরগণার জগঝাপ মৌজা বর্তমানে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার অন্তর্গত। এই মৌজার মদি গ্রামে ওঁম বশের লোকজন ছিল। তাঁরা ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় ভূসম্পত্তি ফেলে ইন্ডিয়া চলে গেলে গেছেন। অপরদিকে সাতগাঁও উপত্যকা বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় অবস্থিত। সেখানে এই বংশের লোকজনের সন্ধান পাওয়া না গেলেও তাঁদের বসবাসের স্মৃতি চিহ্ন বিদ্যমান আছে। সার্বিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায় — খালিয়াজুরির বল্লী চৌধুরী বংশের পূর্বপুরুষ লম্বোদর সিং বাদশা আকবরের সময় অর্থাৎ ষোড়শ শতাব্দীতে ভাটি অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি ছিলেন রাজপোত ক্ষত্রিয় কৃতি যুদ্ধা। অতঃপর খালিয়াজুরি এলাকায় একখন্ড ভূমি জায়গির পেয়ে বসতি স্থাপন করেন। আমার ধারণা- খালিয়াজুরি এলাকায়, ঈশা খাঁ শামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রক সতানাথ ওঁম শ্রীহট্ট বা সিলেটের সাতগাঁও পরগণায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর রাজপোত ক্ষত্রিয় লম্বুদর সিং সতানাথ ওঁম এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। সম্ভবত এ কারণেই কয়েকশত বছর পরেও মৈমনসিংহের ইতিহাস ও মৈমনসিংহের বিবরণ গ্রন্থে লম্বোদর নামটি ভিন্নভাবে আলোচনায় এসেছে।

লম্বোদর বিষয়ে পর্যালোচনায় দেখা যায় — অস্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে খালিয়াজুরি সদরে ‘লম্বোদর’ নামে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি ছিলেন কায়স্থ হোম বংশের লোক। খালিয়াজুরির অহিন্দ্রনাথ হোম চৌধুরীর লেখা থেকে জানাযায়- লম্বোদর হোম তাঁদের পূর্বপুরুষ। তিনি নবাবী আমলের লোক। তাঁর বংশধর নাই। তাঁদের আদিবসতি অঞ্চল কর্ণসূবর্ণ। অহীন্দ্র নাথ হোম চৌধুরী প্রণীত খালিয়াজুরী হোম চৌধুরী বংশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস গ্রন্থের ৬১ পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে- “বংশাবলী অনুযায়ী লম্বোদর চৌধুরী খালিয়াজুরীর হোম চৌধুরীদের আদি পুরুষ ছিলেন না। তিনি পরবর্তী লোক। কারণ তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে মুর্শিদকুলী খার আমলের লোক। কারণ তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে মুর্শিদকুলী খার আমলে বৈকুন্ঠ বাসের ভয়ে মুসলমান হয়েছিলেন।” অপরদিকে হাফিজুর রহমান ভূঞা তাঁর ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব ১৮৫৪-১৯৬০ গ্রন্থের ১০৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন — ঈশা খানের মৃত্যুর পর এ পরগণা ঈশা খানের পারিষদ মজলিসগণের হস্তাগত হয়। পরবর্তীকালে তা হোম চৌধুরী বংশীয় লোকদের শাসনাধীনে আসে। হোম চৌধুরীগণ জলদস্যুতায় লিপ্ত ছিলেন। মুর্শিদ কুলি খান তাদের দমনের জন্য সেনাবাহিনী প্রস্তুতি নিলে হোম চৌধুরীদের একজন (লম্বোদর) মুর্শিদকুলি খানের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। লম্বোদর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর অপর ভাই দামোদর হিন্দু ধর্মেই বহাল থাকেন। অহিন্দ্রনাথ হোম চৌধুরীর লেখা, ময়মনসিংহ গেজেটিয়ার ইংলিশ ভার্সন এবং বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত মোঃ হাফিজুর রহমান ভূঞার লেখা ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব ১৮৫৪-১৯৬০ গ্রন্থ স্থানীয় কিংবদন্তি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, খালিয়াজুরি পরগণায় লম্বোদর নামে দুইজন লোক ছিলেন। তাদের আগমন স্থান এবং আগমনের সময়কাল ভিন্ন। উভয় লম্বোদরের মধ্যে, একজনের বসতি ছিল বল্লী মৌজায়। তিনি অনুমান ষোড়শ শতাব্দীর লোক। তিনি ছিলেন রাজপোত ক্ষত্রিয়। তার উপধি ছিল সিং। তাঁর আদি বসতি অঞ্চল দিল্লী মতান্তরে চিতোর। অন্যজনের বসতি ছিল খালিয়াজুরি মৌজায়। তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর লোক। তিনি ছিলেন কায়স্থ, তার উপাধি ছিল হোম; তাঁর আদি বসতি অঞ্চল কর্ণসুবর্ণ। আমার ধারণা, কেদারনাথ মজুমদার যখন মৈমনসিংহের ইতিহাস ও মৈমনসিংহের বিবরণ বইটি কাজ করেন তখন লম্বোদর বিষয়ে তথ্য দাতা উভয় লম্বোদরকে এক ব্যক্তি ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। বিধায় খালিয়াজুরি পরগণার প্রাচীন ইতিহাসে লম্বোদর বিষয়ে ধুর্মজাল সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া লম্বোদরের বংশধর বাদশা জাহাঙ্গীর কর্তৃক পাঞ্জাফরমান প্রাপ্তির যে বিষটি কেদারনাথ মজুমদার উল্লেখ করেছেন এই লেখা তৈরী করা পর্যন্ত সে বিষয়ে প্রমাণিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি পাঞ্জাফরমানটি কার কাছে কিংবা কোথায় সংরক্ষিত আছে সে বিষয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ করা হয়েছে, খালিয়াজুরি পরগণায় উভয় লম্বোদরের মধ্যে, একজন অনুমান ষোড়শ শতাব্দীর লোক। তিনি ছিলেন রাজপোত ক্ষত্রিয়। তাঁর আদি বসতি অঞ্চল দিল্লী মতান্তরে চিতোর। স্থানীয় কিংবদন্তী অনুযায়ী — তিনি একখন্ড ভূমি জায়গীর প্রাপ্ত হয়ে তাঁর পূর্বতন বসতী এলাকার সাথে মিল রেখে নতুন আবাস ভূমির নাম রাখেন বল্লী। যা পরবর্তীতে মৌজি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এ বিষয়টি পর্যালোচন করলে — পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যয় প্রণীত ভারতবর্ষের ইতিহাস (৩য় পুনঃমূদ্রণ, ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ) গ্রন্থ থেকে জানাযায় — ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে মেবারের মহারানা প্রতাপ সিং চিতোর পূনঃরোদ্ধারের লক্ষ্যে মোগল বাহিনীর বিরোদ্ধে এক যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন রাজপোত অনুচরের দল (মেবারি সৈনিক) ও পার্বত্য ভীম আদিবসী যুদ্ধা। ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের এই যুদ্ধেও মেবার রাজশক্তির পরাজয় ঘটে এবং রানা প্রতাপ সিং স্বসৈন্য আরাবল্লী গীরিকন্দরে আশ্রয় নেন। এক পর্যায়ে সেখানে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয় এবং বনের ফলমূল খেয়েই রাজ পরিবার ও সঙ্গী সৈন্যদের ক্ষুন্নিবৃত্তির উপক্রম হয়। এসময় ভাগ্যন্বেষণের লক্ষ্যে বেশকিছু মেবারি রাজপোত দলচ্যুত হয়ে চিতোরের আরাবল্লী পর্বত থেকে বিভিন্ন এলকায় আশ্রয় নেন। মেবারের রাজপোতগণ ছিলেন মোগল শাসন বিদ্বেষি। এসময় ভাটিঅঞ্চলের সায়র জলকর (খালিয়াজুরি, জোয়ানশাহী) ছিলে মোগল শাসন বিদ্বেষি শাসনকর্তার নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং সে সময় লম্বোদর সিং নামে একজন রাজপোত ক্ষত্রিয় চিতোরের প্রতিরক্ষা বেষ্টনি ‘আরাবল্লী’ পরিত্যাগ পূর্বক খালিয়াজুরি অঞ্চলে আসাটা অবান্তর নয়। সম্ভত এমন কারণেই জায়গিরপ্রাপ্ত ভূমিটি নিজ জন্মভূমি চিতোরের প্রতিরক্ষা বেষ্টনি ‘আরাবল্লী’ পর্বতের প্রতি বিশেষ আবেগ অনুভূতির তাগিদ থেকে নতুন বসতী অঞ্চল বল্লী নাম রেখেছিলেন।

লিখেছেন : ফারুকুর রহমান চৌধুরী, গীতিকার বাংলাদেশ বেতার এবং বহুমাত্রিক লেখক।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন