শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৮:০৬
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিচিত্র লোক সংস্কৃতি —‘পালনী ব্রত’ : সুব্রত দত্ত

সুব্রত দত্ত / ৪৩২ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬

“ — ঘরে কেন আলো?

— গিন্নী গেছেন বনভোজনে,

সবাই আছে ভালো।”

মাঠের মাঝে কলু-পুকুরের পাড়ে আজ ভীষণ ভিড়। বছর বছর চৈত্র মাসের শেষে এক ছবি। অধিকাংশই মহিলা, সঙ্গে কাচ্ছা বাচ্ছা, নাতি পুতি। এখন পূজার পরে বিকালে ফলার (ফলাহার) চলছে। দুধ দই চিড়ে মুরকি কলা। হাপুস হুপুস শব্দ। তবে চারিদিক নিস্তব্ধ নয়। হৈ চৈ ব্যাপার। পরস্পরের দেওয়া নেওয়া, অপরিচিতদের পরিচিত হওয়া চলছে।

আহার শেষে গিন্নিরা গাল গল্প করছে ইতি উতি। ছোট বাচ্চা গুলো খেলা করছে আশপাশে আর ঝুলিতে ভিক্ষে পড়লে ভিখারি যেমন মুখ ফেরায়,বড় বাচ্ছা গুলো বাড়ির পথ ধরেছে আহার শেষে। মা ঠাকুমার এখন ফেরার উপায় নেই। তারা আজ ব্রতচারিনী, মা রক্ষা কালীর ব্রত পালনে এসেছেন। সন্ধের ছায়া ঘনালে তবেই ঘরে ফেরা। সংসারের মঙ্গল আর সুরক্ষার জন্য আজ তাদের ব্রত। ভোর ভোর উঠে অনেকেই গঙ্গা স্নান করে শুচি হয়ে এসেছেন কাটোয়া থেকে। সেখান থেকে মাথায় করে বয়ে এনেছেন পূজার পবিত্র গঙ্গা জল। তখন থেকেই উপবাস। পূজার শেষে ফলাহার। বাড়ি থেকে আহারের আয়োজন এনেছেন সঙ্গে। তাই দেখে পেটুক বাচ্ছাগুলো পিছু নিয়েছে। পেট ছাড়া অন্য আকর্ষণ মাঠের মাঝে নতুন পরিবেশে খাওয়া, বনভোজনের মতই হৈহৈ আনন্দ। গ্রামের সব বন্ধুরা আসবে। খুব মজার ব্যাপার। ছোট বেলা আমরাও পিছু নিতাম মা পিসিমা’র। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারে তখন অনেক কাচ্চাবাচ্চা। ভাই ভাইপো ভাইঝি নিয়ে একটা বড় দল আমাদের। সামনে মা কিংবা পিসিমা,পিছনে আমরা। মাথায় হাতে ফলাহারের আয়োজন। কেউ জল,কেউ ফল,কেউ চিড়ে,কেউ থালা বাসন, এক একজন একটার দায়িত্বে। দুপুর বেলা বেরিয়ে পড়েছি সব। গ্রামের পুব দিকে কলু পুকুরের পাড়ে যেতে হবে। মা পিসিমা’র পর আমাদের বাড়ির ব্রত পালনের দায়িত্ব নিলেন আমার বৌদিরা। আমরা বড় হয়েছি। বৌদিদের পিছু নেয় আমাদের ছেলেপুলেরা। এ পর্যন্ত পুরোনো প্রথায় ছেদ পড়েনি। তারপরেই ছন্নছাড়া হলাম আমরা। ছেলের পড়াশোনা বা কাজের সূত্রে ছড়িয়ে পড়েছি নানান দিকে। আমাদের নাতি নাতনিদের গ্রামের মাঠে ‘পালনী পার্বণে’ যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের মত অনেকেই এক হাল। গ্রামেও এখন অধিকাংশের ছোট পরিবার, তাছাড়া জন্ম হার হ্রাস, নানান কারণে ভীড়ে ভাটার টান। তবে পার্বণ চলছে এখনও। এই উথাল-পাথাল সময়ের মাঝে এক টুকরো চড়ার মত জেগে আছে বাংলার বিচিত্র এক লোক-সংস্কৃতি।

এ শুধু আমাদের দুর্গাগ্রামের কথা নয়। কাটোয়া মহকুমা জুড়ে গ্রামে গ্রামে পালনী হয় শুনেছি। এ বিষয়ে কথা বলেছিলাম মঙ্গলকোট ব্লকের চৈতন্যপুর গ্রামের অশতিপর প্রবীণ ব্যক্তি লক্ষীনারায়ন রায় মহাশয়ের সঙ্গে। তার গ্রামেও এই অনুষ্ঠানের প্রচলন আছে। তবে এখন কেউ মাঠে যায় না। গ্রামের ভিতরে গ্রাম্য দেবতা শৈলেশ্বর (শিব) মন্দিরে সমবেত হন গ্রামের মহিলারা। তিনি ছোট বেলা তার মামার বাড়ি পলাশী গ্রামেও এই পালনী অনুষ্ঠান দেখেছেন। সেখানে এই অনুষ্ঠানের নাম ‘বন-বেড়ানো’। অর্থাৎ সমস্ত বর্ধমান জেলায় এই অনুষ্ঠানের প্রচলন আছে। তবে বৃহত্তর বাংলায় এর প্রচলন আছে কিনা জানি না। বাংলায় স্থানীয় ভাবে সংস্কৃতির নানান রূপ আছে। স্থানীয় বিশ্বাস জীবনভেদ এই রূপ গড়ে তুলেছে। যেমন মুর্শিদাবাদের বোলান গান, পুরুলিয়ার ছৌনাচ, মালদহের গম্ভীরা, বর্ধমানের ধর্মরাজ গাজন ইত্যাদি। অনেক সময় বৃহত্তর অঞ্চল তথা দেশ জুড়ে চালু সংস্কৃতি সময়ের সঙ্গে ক্ষীণ হয়ে কোন অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়েছে। তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।

আঞ্চলিক পালা পার্বণ, ইতিহাসের গুরুত্ব এখানেই। সামগ্রিক ভাবে প্রাচীন সব পালা পার্বণের রূপ বদল হয়েছে সময়ের সঙ্গে। বিশেষ করে আদিম যুগ থেকে প্রচলিত অনুষ্ঠানের। পরবর্তী ধর্ম রাজনীতির প্রভাবে পুরাতন অনেক প্রথা আমূল বদলে গেছে। এক সময় বাংলায় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম জনপ্রিয় ছিল। এখন ঐ ধর্ম নেই বললেই চলে। কিন্তু তার প্রভাব আছে আমাদের জীবনে ধর্মে সংস্কৃতিতে। সেজন্যেই বাংলার সংস্কৃতি এত বৈচিত্র্যময় ও অন্য প্রদেশের থেকে আলাদা। বাংলার নিচের তলার দেবদেবীর অধিকাংশ আদিম যুগের। এখানে বৃক্ষ নদী পাথর পূজা এখনও চলছে। বাংলার ব্রত পালা পার্বণের শিকড় অনেক গভীরে।

বাঙালি আসলেই অনার্য জাতির উত্তরসুরী। সন্ধ্যে হলে আজও আমরা তুলসী তলায় পিদিম জ্বালি, মারি-মড়কে মা শীতলার পূজা দিই, পালাপার্বনে উৎসবের আঙিনায় আম্র-পল্লবের চিত্র বিচিত্র ঘট সাজাই, মা ঠাকুমার কাছে মাথা পেতে ধান দূর্বার আশীর্বাদ নিই। প্রাচীন বাংলায় আদিবাসী মানুষের ভয়ভাবনা, বিস্ময় আর বিশ্বাসের অনেক কিছুই আজও আমরা মনের মধ্যে পুষে রেখেছি। আমাদের অনেক ধ্যানধারণায়, অনেক অভ্যাসে আজও জড়িয়ে আছে প্রাচীন বাঙালির সংস্কার-আচ্ছন্ন মন। বাঙালির ধর্মকর্মের গোড়াকার ইতিহাস হল জনপদবদ্ধ প্রাচীন বাংলার আদিবাসীদের পুজোআর্চা, ভয়ভক্তি, বিশ্বাস, সংস্কারেরই ইতিহাস।

বাংলার গাঁয়ে গাঁয়ে লোকালয়ের বাইরে, খোলা জায়গায়, কিম্বা গাছের ছায়ায় একটা করে ‘থান’ বা স্থান থাকে সেখানে থাকেন গ্রাম্য দেবতা। কোথাও কোথাও গ্রাম্য দেবতার বিগ্রহ থাকে, কোথাও থাকে না। এইসব জায়গায় পশুপাখি বলি দেওয়া হয়। লোকে গ্রাম্য দেবতার নামে মানত করে। তাকে খুশি রাখার চেষ্টা করে। এই গ্রাম্য দেবতা কোথাও কালী, কোথাও ভৈরব বা ভৈরবী, কোথাও বনদুর্গা বা চন্ডী, কোথাও আবার তাঁর স্থানীয় কোন নাম। গ্রাম দেবতা হলেন আর্য পূর্ব আদিম গ্রামগোষ্ঠীর ভয়ভক্তির দেবতা। তাই তার স্থান গ্রামে নয়, গ্রামের বাইরে। ব্রাহ্মণ্য বিধানে গ্রামদেবতার পূজো বারণ, যারা এই দেবতার পূজারী, মনুর বিধানে তারা পতিত হিসেবে গণ্য। তবুও কোন বিধিনিষেধই এইসব গ্রামদেবতার পূজো কোনদিন বন্ধ করতে পারেনি, এবং এদের কেউ কেউ ক্রমশ ব্রাহ্মণ্য সমাজে স্বীকৃত হয়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্মেকর্মে ঢুকে পড়েছেন। যেমন শীতলা, মনসা, বনদুর্গা, ষষ্ঠী, নানা রকম চন্ডী, নরমুন্ডমালিনী, শ্মশানচারী কালী, শ্মশানচারী শিব, পর্ণশবরী, জাঙ্গুলী।

এছাড়াও বাঙালি সমাজে মেয়েদের মধ্যে এবং সাধারণ আর্য ব্রাহ্মণ্য পুজো-আর্চার মধ্যে যা কিছু স্থানীয় লৌকিক অনুষ্ঠান প্রচলিত তার প্রায় সমস্তই পূর্বের কৌম সমাজের দান। আর পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাস, উৎপাদন শক্তি আর জাদু শক্তির প্রতীককে দেবতার আসনে বসানো তাদের শুভ অশুভ ঘটানোর ক্ষমতায় বিশ্বাস এ সমস্তই এসেছে প্রাচীন আদিবাসীদের ধ্যান ধারণা থেকে। সেই সব ধ্যান ধারণা আমাদের ধর্ম-কর্ম আর অভ্যাসে আজও দীর্ঘমূল হয়ে বসে আছে। ইত্যাদির গোড়ায় আছে আর্য পূর্ব সমাজের বিশ্বাস, শ্রাদ্ধের সঙ্গে জড়িত বৃষ কাষ্ঠ ও তার বিসর্জন, রান্নার পর কাক ডেকে খাওয়ানো, পিণ্ডদান ইত্যাদি সমস্ত আমরা পেয়েছি প্রতিবেশী শবর, পুলিন্দ, সাঁওতাল, কিরাত, মুন্ডা, কোল, ভিলদের কাছ থেকে। মঙ্গলানুষ্ঠানের শুরুতে আভ্যুদয়িক অনুষ্ঠানে মৃত পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও তাদের পুজো করবার প্রথা তাদের কাছ থেকেই আমরা পেয়েছি। বাংলা দেশের বিয়েতে হোম, সম্প্রদান আর সপ্তপদী ছাড়া স্ত্রী-আচার, লোকাচার ইত্যাদি সবকিছুই মূলত কৌম সমাজের দান।

এই সব আদিম সংস্কৃতির উপর প্রলেপ পড়েছে পরবর্তী কালের ধর্ম ও চিন্তার। মাঠ পালনী এক আঞ্চলিক ব্রত বা পার্বণ। কবে কখন কিভাবে এর সূত্রপাত কেউ জানে না। হয়ত আদিম কোন প্রথা! বনভোজন, বন বেড়ানো সেই বনের স্মৃতি তুলে ধরে। আবার নারী কেন্দ্রিক অনুষ্ঠান দেখে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের কথা মনে পড়ে।

এক সময় বাংলার নারী স্বাধীন ছিল। পুরুষের মতোই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করত। তার প্রমাণ আমাদের দেবীরা। তারপর কোন এক সময় তারা পুরুষদের গৃহ বন্দিনী হয়। একঘেয়ে সংসারের খাঁচা থেকে মুক্তির স্বাদ দিতেই কি বনভোজন, বন বেড়ানো অনুষ্ঠানের আয়োজন! ধর্মের অনুসঙ্গে তা হয়ে ওঠে মাঠ পালনী ব্রত! তবে এ সবই আমার অনুমান। সঠিক কথা জানে সময়।

ব্রত হলো গ্রামীণ বাংলার নারীদের দ্বারা পালিত লোকায়ত অনুষ্ঠান, যেখানে বিশেষ কামনা পূরণের জন্য আলপনা, ছড়া ও আচারের মাধ্যমে লৌকিক পূজা ও প্রার্থনা করা হয়। অধিকাংশ ব্রতই সংসার, সন্তান, শস্য ও পারিবারিক মঙ্গল কামনায় নারীরা পালন করেন।

শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থে ব্রতের সংজ্ঞা হিসেবে বলেছেন — “কিছু কামনা করে যে অনুষ্ঠান সমাজে চলে তাকেই বলি ব্রত।” তিনি ব্রতকে দুটি ভাগে ভাগও করেছেন শাস্ত্রীয় ব্রত এবং মেয়েলি ব্রত। আবার মেয়েলি ব্রতেরও দুটি ভাগ রয়েছে কুমারী ব্রত ও নারী ব্রত। অবনীন্দ্রনাথের ভাষায় “খাঁটি মেয়েলী ব্রতগুলিতে তার ছড়ায় এবং আলপনায় একটা জাতির মনের, তাদের চিন্তার, তাদের চেষ্টার ছাপ পাই।

ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় তার ‘বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেছেন, বাঙালির জীবনে একটা বড় জায়গা জুড়ে আছে ব্রত উৎসব। প্রাক বৈদিক আদিবাসী কোমদের সময় থেকেই এই ধর্মোত্সব চলে আসছে। আদি বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্ম এইসব গ্রাম্য লৌকিক ধর্মানুষ্ঠান পছন্দ করতো না। কিন্তু পরে যখন আর্যপূর্ব ও অনার্য নরনারীরা ক্রমেই বেশি বেশি সংখ্যায় আর্য ব্রাহ্মণ্য ব্রাহ্মণ্য সমাজে স্থান পেতে থাকলেন তখন অনেক ব্রত অনুষ্ঠান ব্রাহ্মণ্য ধর্মের স্বীকৃতি পেল। এইসব অনুষ্ঠানে বামুন পুরুতেরা এসে মন্ত্র পড়তে লাগলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মের স্বীকৃতি পায়নি এমন ব্রতের সংখ্যা আজও কম নয়। বাড়ির মেয়েরাই সেসব অনুষ্ঠানে পূজো করে থাকেন।

এইসব অসংখ্য ব্রতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বৈশাখে গোকুল, পুন্যপুকুর ব্রত, শিব পুজো, দশপুতুলের ব্রত, জৈষ্ঠ্যে জয়মঙ্গলের ব্রত, ভাদ্রে ভাদুরি, তিলকুজারি ব্রত, কার্তিকে কুকুরটি, ইতু পুজো, অগ্রহায়ণে যমপুকুর, সেজুতি ব্রত, মাঘে চারণ ব্রত, মাঘমণ্ডল ব্রত, ফাল্গুনে ইতু কুমার, বসন্ত রায়, চৈত্রে নখছুটের ব্রত। এর অনেকগুলিই গুহ্য যাদু শক্তির পুজো। এছাড়াও আরো অনেক ব্রত আছে তার কোনটা প্রাচীন বাংলায় প্রচলিত ছিল বলার উপায় নেই। যেমন। ষষ্ঠী, মঙ্গলচন্ডী, সুবচনি, কোজাগর পূর্ণিমা, ভাতৃদ্বিতীয়া, আকাশ প্রদীপ, অক্ষয় তৃতীয়া অশোকাষ্টমী, শিবরাত্রি, দীপদান, পূর্ণিমা ব্রত, আদিত্যশয়ান ইত্যাদি।

বাংলার ব্রত কথাতে উল্লেখিত দেবদেবীরা পুরানের দেবদেবীদের মত মানুষের পারলৌকিক পরমার্থ বিধান করেন না। তাদের আচার-আচরণও শাস্ত্রসম্মত নয় — একেবারে লৌকিক, সহজিয়া। যে বিষয়গুলি নারী অভিজ্ঞতায় প্রোজ্জ্বল এবং গুরুত্বপূর্ণ, যেমন — চাষবাস, স্বামীর বাণিজ্য, প্রজনন, প্রকৃতি বন্দনা, ঋতু বন্দনা, স্বামীর বহুপত্নীত্ব, সাংসারিক সমৃদ্ধি, সুরক্ষা — সেগুলিই এই ব্রতগুলির বৃত্ত রচনা করে। মাঠ পালনী ব্রতেও সংসারের সুরক্ষার কথা পরিস্ফুট।

অনেক দিন আগের কথা। যখন জীবন ছিল অনিশ্চিত। মানুষ ছিল বড়ই অসহায়। রোগ ভোগ, মহামারী, প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকত। ডাক্তার বদ্যি নেই, ঔষধ নেই। ওঝার ঝাড়ফুঁক, দেব দেবতার পুষ্প, স্নান জলের ভরসাতে বাঁচতে হত মানুষকে। নানান রোগ থেকে রক্ষা পেতে নানান দেবদেবীর ভাবনা মনে এসেছিল মানুষের। যেমন বসন্ত রোগ থেকে রক্ষাকারী দেবী শীতলা, কলেরা বা ওলা ওঠার জন্য ওলামা, সর্প দেবী মনসা, শিশু রক্ষক দেবতা পঞ্চানন্দ বা পঞ্চানন। এছাড়া গ্রামের সার্বিক মঙ্গল ও সুরক্ষার জন্য থাকতেন গ্রাম্য দেবতারা। প্রত্যেক গ্রামের নিজস্ব গ্রাম্য দেবদেবী আছেন। আমাদের গ্রামে আছেন দেবী পদ্মা। গ্রামের যে কোন উৎসব অনুষ্ঠানে তাকেই আগে স্মরণ করতে হয়। এই পালনী পার্বনের দিন দেবী পদ্মার পূজাও হয়। অনেকে এ দিনটিকে কালী-পদ্মা পুজোর দিন বলেন। যাইহোক, এ সব পূজা পার্বণ পুরুষ কেন্দ্রিক। তার বাইরে নারীরা নিজস্ব ভাবনার পরিসর খুঁজে নিয়েছে বার-ব্রত উদযাপনের মধ্যে। এ পথ একান্তই নিজেদের কামনা বাসনা চরিতার্থ করার পথ। ব্রতের নিয়ম কানুন মন্ত্র সবই নারীদের স্বকল্পিত রচনা। এভাবেই স্বামী পুত্রের সংসারে নিজের সুখ ও সুরক্ষার মাধ্যমে নিজেদের অনিশ্চিত জীবনের নিশ্চয়তা খুঁজেছিল নারী।

এক সময়ে শীতের পর থেকেই গ্রাম বাংলায় শুরু হত নানান রোগ ব্যাধি। কলেরা বসন্ত হাম টাইফয়েড ম্যালেরিয়া ছিল বড়ই বিভীষিকার। চৈত্র মাসে আকাশে কাল বৈশাখী, আর মাটিতে নানান রোগের প্রাদুর্ভাবে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর রোগের ভয়াবহতায় মানুষ বড়ই অসহায় ছিল সেদিন। তখন জ্ঞান বিজ্ঞান ছিল না। এ সবই দৈবী ঘটনা, ভূত প্রেত অপদেবতার ক্রোধ বলে বোঝাতেন ওঝা ওস্তাদরা। এজন্য পূজা প্রার্থনা করে তাদের খুশি করতে হবে। বিশেষ বিশেষ সময়ে ভীষণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রোগ ব্যাধি মহামারী আকার নিলে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হত। আমাদের গ্রামে এ সময় কালী পুজোর আয়োজন করা হত। সুরক্ষার জন্য পূজা তাই নাম রক্ষাকালী। চৈত্র মাসের এই পূজার দিন ক্ষণ পঞ্জিকায় নেই। পুরোহিত বা গ্রামবাসীরা সমবেত ভাবে দিন স্থির করতেন অমাবস্যা শনি মঙ্গলবার দেখে। সেদিন বাড়ি ছেড়ে সবাই হাজির হত গ্রামের নির্দিষ্ট পূজা অঙ্গনে।গ্রামের বাইরে বন-জঙ্গলে আয়োজন করা হত। প্রাচীন ধারণা এখানেই অপদেবতার অবস্থান। পূজার দিন সকাল থেকে সকলের উপবাস। পূজার পর সেখানেই খাওয়া দাওয়ার সেরে সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা। বাড়ি পাহারা দিতেন গৃহকর্তা। এর কারণ কি বোঝা যায় না। হয়ত বাড়ি রোগ জীবাণু মুক্ত করার ভাবনা ছিল পিছনে। তবে পরবর্তী কালে হয়ত নিয়ম শিথিল হয়। ব্রতচারিণী ছাড়া অন্যরা মাঠে না গেলেও চলত। আমরা ছোট বেলা থেকে এই নিয়মই দেখেছি। এখন উপবাস তারাই করেন। আগে সন্ধ্যায় গৃহদ্বারে প্রদীপ জ্বেলে অপেক্ষা করতেন গৃহকর্তা। এখন যে কেউ হাতে লণ্ঠন বা হারিকেন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

ওদিকে মাঠ থেকে দলবদ্ধ হয়ে উলুধ্বণি করতে করতে ঘরে ফেরে ব্রতধারিণীরা। উলুধ্বণি মুখরিত হয়ে ওঠে সন্ধ্যার আকাশ। সবার হাতে ঘটে ভরা পূজার মঙ্গলবারি। সেই জল গ্রামের নানা পূন্যস্থানে ঢালতে ঢালতে ঘরে ফিরতেন তারা। তার পর নিজ নিজ গৃহদ্বারে এসে দাঁড়াতেন। শঙ্খধ্বনি করে তাদের বরণ করা হয়। প্রদীপ নিয়ে সম্মুখে এসে দাঁড়ায় কেউ। ব্রত চারিণী তাকে প্রশ্ন করেন, “ঘরে কেন আলো?” অর্থাৎ গৃহের সব মঙ্গল কিনা। বরণকারীণী তাকে আশ্বস্ত করে এই বলে, ‘গিন্নি গেছেন বনভোজনে সবাই আছে ভালো’। তিন বার একই প্রশ্ন করে একই উত্তর শুনে আশ্বস্ত হয়ে ব্রতধারিণী পদার্পণ করেন গৃহে। এভাবেই প্রাচীন প্রথা এখনও চলছে।

আর এক পালনী ব্রত অনুষ্ঠান হয় গ্রামের ভিতর। বাড়ির কাছাকাছি কোন দেবদেবতার স্থানে এই পালনী হয়। পূজা অন্তে সেখানেই ফলাহার করেন গৃহিনীরা। এটা গ্রাম্য দেবদেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত পালনী। আমাদের গ্রাম্য দেবী পদ্মার (মনসা) উদ্দেশ্যে এই পালনী হয় আমাদের বাড়ির জগদ্ধাত্রী মন্দিরে। পাড়ার গৃহিণীরা এজন্য সমবেত হন। চৈতন্যপুর গ্রামে যা হয় শৈলেশ্বর শিব মন্দিরে।

আজ আর রোগ বিভীষিকা সেই নেই। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে মানুষ অনেক সুরক্ষিত। কলেরা বসন্ত প্লেগ অনেক মারন রোগের নামই জানে না আজকের শিশুরা। দেব-দেবতারা যা পারেননি তাই করেছে জ্ঞান বিজ্ঞান। ওঝা ওস্তাদ পুরোহিতদের সেই দিন নেই। তবে মানুষ দেবতাকে ভোলে নাই। অদৃষ্ট অনিশ্চয়তার জটিল জালে বাঁধা এখনও মানুষের ভাগ্য। তাই অধিকাংশ মানুষ এখনও অদৃশ্য শক্তি বশ! ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর।’

আজো তাই চৈত্র শেষের কোন এক দিন ভীড় জমে গ্রামের রক্ষা কালী তলায়। অতীত ফিরে আসে বর্তমানে। চলমান জীবনের মাঝে পিছনকে ফিরে দেখার এটা এক অবকাশ। সংস্কৃতির বৈচিত্র্য জীবনের এক অনন্য বিনোদন। আমাদের বাংলা সেই বিনোদনের অক্সিজেনে ভরপুর। বেঁচে থাক মাঠ পালনী, বেঁচে থাক বাংলার ঐতিহ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বিচিত্র লোক সংস্কৃতি —‘পালনী ব্রত’ : সুব্রত দত্ত”

  1. Anupam Biswas says:

    খুব সুন্দর। তথ্যসম্বলিত লেখা।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন