কলকাতা শহরে চড়কের ক্লাসিকাল বিবরণ পাওয়া যায় কালীপ্রসন্ন সিংহ বিরচিত ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’-য়।
‘কলিকাতা সহরের চার দিকেই ঢাকের বাজনা শোনা যাচ্চে, চড়্কীর পিঠ সড়্ সড়্ কচ্চে, কামারেরা বাণ, কাঁটা ও বঁটি প্রস্তুত কচ্চে — সর্ব্বাঙ্গে গয়না, পায়ে নূপুর, মাথায় জরির টুপি, কোমোরে চন্দ্রহার, সিপাইপেড়ে ঢাকাই সাড়ি মালকোচা করে পরা, তারকেশ্বরে ছোবান গাম্চা হাতে বিল্বপত্র বাঁদা, সূতা গলায় যত ছুতর, গয়লা, গন্ধবেণে ও কাঁশারির আনন্দের সীমা নাই — ‘আমাদের বাবুদের বাড়ি গাজোন৷’ (বানান অপরিবর্তিত)
আরও যা বিবরণ পাচ্ছি —‘ক্রমে দিন ঘুনিয়ে এলো, আজ বৈকালে কাঁটা ঝাঁপ৷ আমাদের বাবুর চার পুরুষের বুড়ো মূল সন্ন্যাসী কানে বিল্বপত্র গুঁজে হাতে এক মুঠো বিল্বপত্র নিয়ে ধুক্তে ধুক্তে বৈঠকখানায় উপস্থিত হলো, সে নিজে কাওরা হলেও আজ শিবত্ব পেয়েছে, সুতরাং বাবু তারে নমস্কার কল্লেন; মূল সন্ন্যাসী এক পা কাদা শুদ্ধ ধোব ফরাশের উপর দিয়ে বাবুর মাতায় আশীর্বাদের ফুল ছোঁয়ালেন, — বাবু তটস্থ৷’ (বানান অপরিবর্তিত)
‘আজ কার সাধ্য নিদ্রা যায়৷ — থেকে থেকে কেবল ঢাকের বাদ্যি,সন্ন্যাসীর হোররা ও ‘বলে ভদ্দেশ্বর শিবো মহাদেব’ চীৎকার’৷
সে কালের চড়ক উৎসব প্রসঙ্গে কালীপ্রসন্ন সিংহ ‘হুতোম প্যাঁচার নক্শা’-য় আরও লিখেছেন ‘…রাস্তায় লোকারণ্য, চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, ধুনোর ধোঁ, আর মদের দুর্গন্ধ। সন্ন্যাসীরা বাণ, দশলকি, সূতোশোন, সাপ, ছিপ, ও বাঁশ ফুঁড়ে একবারে মরিয়া হয়ে নাচ্তে নাচ্তে কালীঘাট থেকে আস্চে।…চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে মোচ বেন্ধে মাথায় ঘি কলা দিয়ে খাড়া করা হয়েচে। ক্রমে রোদ্দুরের তেজ পড়ে এলে চড়কতলা লোকারণ্য হয়ে উঠল।…এদিকে চড়কতলায় টিনের ঘুরঘুরি, টিনের মুহুরি দেওয়া তল্তা বাঁশের বাঁশি, হলদে রং করা বাঁখারির চড়কগাছ, ছেঁড়া নেকড়ার তৈরি গুরিয়া পুতুল, শোলার নানা প্রকার খেলনা, পেল্লাদে পুতুল, চিত্তির করা হাঁড়ি বিক্রি করতে বসেচে…। এক জন চড়কী পিঠে কাঁটা ফুঁড়ে নাচ্তে নাচ্তে এসে চড়কগাছের সঙ্গে কোলাকুলি কল্লে — মইয়ে করে তাকে উপরে তুলে পাক দেওয়া হতে লাগলো। সকলেই আকাশ পানে চড়কীর পিঠের দিকে চেয়ে রইলেন। চড়কী প্রাণপণে দড়ি ধরে কখনও ছেড়ে, পা নড়ে ঘুরতে লাগ্লো। কেবল ‘‘দে পাক দে পাক’’ শব্দ। কারু সর্ব্বনাশ, কারু পৌষ মাস! একজনের পিঠ ফুঁড়ে ঘোরান হচ্চে, হাজার লোক মজা দেখচেন।’ (বানান অপরিবর্তিত)
কলকাতার চড়কডাঙা এবং চড়ক ও গাজন মেলার গল্প বহু পুরাতন।
ওয়ারেন হেস্টিংসের সেই আমলে কলকাতা শহরের থানাগুলির নাম উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে বলেই মনে হয় — আর্মেনিয়াম চার্চ, ওল্ড ফোর্ট, চাঁদপাল ঘাট, লালদীঘির দক্ষিণ দিক, ধর্মতলা, ওল্ড কোর্ট হাউস, ডোমতলা, আমড়াগলি, পঞ্চাননতলা, চিনাবাজার, চাঁদনিচক, তুরুলবাজার, গৌমাপুকুর, চড়কডাঙা, শিমলাবাজার, নুনলঙ্কাবাজার, মলঙ্গাপটলডাঙা, কুবেরডাঙা, বৈঠকখানা, শ্যামপুকুর, শ্যামবাজার, পদ্মপুকুর, কুমারটুলি, জোড়াসাঁকো, মেছুয়াবাজার, জানবাজার, ডিঙাভাঙা, সুতানুটি-হাটখোলা, দয়েহাটা, হাঁসপুকুরিয়া, কলিঙ্গা, জোড়াবাজার৷ হরিসাধন মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘কলিকাতা সেকালের ও একালের’ বইয়ে লিখেছেন, — এর মধ্যে কয়েকটি থানা ভবিষ্যতের মিউনিসিপ্যালিটির ম্যাপ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে৷ যথা তুরুলবাজার, নুন-লঙ্কাবাজার, ডোমতলা, গৌমাপুকুর ও কুবেরডাঙা৷ জায়গাগুলির অবস্থান নির্ণয়ও অধুনা দুঃসাধ্য৷
তবে চড়কডাঙা বলে যে আস্ত একটি থানা ছিল সেকালে, সেটাই কলকাতায় সেযুগে চড়কের রমরমার কথা মনে পড়ায়।
বিডন স্কয়ার অর্থাৎ বর্তমানে রবীন্দ্র কাননের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণের সামনে চিৎপুরের পশ্চিম দিক থেকে একটা গলি গঙ্গার দিকে চলে গেছে, সেটির নাম চড়কডাঙ্গার রাস্তা ছিলো। এই রাস্তার ধারে টেগোর ক্যাসেল নির্মাণ হলে, সেটিকে এই চড়কডাঙ্গার নামে চড়কডাঙ্গার দুর্গ বলা হতো। পরবর্তীকালে টেগোর ক্যাসেলের নামে এই রাস্তার নাম বদল করে টেগোর ক্যাসেল ষ্ট্রীট রাখা হয়।
রাস্তাটি নাম চড়কডাঙ্গা হলেও এই রাস্তায় চড়কমেলা হতো না মেলাটি হতো যেখানে বিডন স্কয়ার অর্থাৎ রবীন্দ্র কানন আছে সেখানে। কিন্তু তখন সেখানে উদ্যান হয় নি, একটা খালি মাঠ ছিলো।
পরবর্তীকালে এই উদ্যানটি তৈরি হলে চড়কমেলাটি বিডন ষ্ট্রীটের রামদুলাল নিবাসের উল্টোদিকে অবস্থিত অনাথনাথ দেব বাজার অর্থাৎ ছাতুবাবু বাজারে উঠে আসে। আজও এখানে চড়কমেলা অনুষ্ঠিত হয় ও ব্যাপক জনসমাগমও হয়।
এটি ছাড়া কলকাতায় আরো অনেক চড়কডাঙ্গা ছিলো।
একটা ছিলো নারকেলডাঙ্গায়। সেখানে চড়কডাঙ্গা রোড নামে একটা রাস্তা ছিলো, যেটির নাম বদল করে কবি সুকান্ত সরণি করা হয়।
ভবানীপুর-পদ্মপুকুরে আর একটা চড়কডাঙ্গা ছিলো। সেখানে প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তির দিনে মেলা বসতো।
হাজরা মোড়েও একটা চড়কডাঙ্গা ছিলো।
সিমলায় বারাণসী ঘোষ ষ্ট্রীট অর্থাৎ বর্তমানে তারক প্রামাণিক রোডে শ্রী শ্রী সীতানাথ জীউ ও শ্রী শ্রী বালকনাথ জীউর মন্দিরের নিকটেও চড়কমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সম্ভবত এই মেলাটি দানবীর তারকনাথ প্রামাণিক দ্বারা প্রবর্তিত।
কলেজ স্কয়ারেও ছোটো করে একটা চড়কমেলা বসে।
কালীঘাটের গাজন মেলা বিখ্যাত। আর বিখ্যাত রূপচাঁদ পক্ষী দ্বারা প্রবর্তিত বহুবাজারের জেলিয়াপাড়ার চড়ক ও গাজন মেলা।
বেহালা চৌরাস্তায়ও চড়ক মেলা হয়।
কিন্তু এই মেলাগুলি আর আগের মতন জাঁকজমক নেই।
কলকাতায় বিভিন্ন চড়কডাঙ্গার নাম বদল করার ফলে সেগুলি ক্রমশ হারিয়ে যাছে, কিন্তু সৌভাগ্যবশত আজও কিছু চড়ক ও গাজন মেলা অনুষ্ঠিত হয়, তাই সেগুলির পুরনো কাহিনী আজও শোনা যাচ্ছে, অন্যথা সেগুলিও হারিয়ে যেত।
‘চড়কদেবতা’ নামে কোনো দেবতার নাম কোনো বইয়ে উল্লিখিত হয়নি৷ জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধান’ গ্রন্থে পাওয়া যায়, সংস্কৃত ‘চক্র’ থেকে ‘চড়ক’ শব্দের উৎপত্তি৷ ‘শিবের গাজন মহোৎসবে চড়কগাছে ঘুরিয়া চক্রভ্রমণ৷’ অর্থাৎ ‘চক্র’ শব্দ থেকে চক্র, চর্কো হয়ে চড়কো তথা চড়ক শব্দের আগমন৷ চিন্তাহরণ চক্রবর্তীর ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ বইটিতে চড়কের দেবতাদের নামের উল্লেখ করা হয়েছে৷ ‘এই উপলক্ষে পূজিত প্রধান দেবতার নাম কালার্করুদ্র৷’ তিনি লিখেছেন, ‘এই প্রসঙ্গে অর্চিত দেবীর নাম নীল চণ্ডিকা বা নীল পরমেশ্বরী৷’ বস্তুত ‘কালার্করুদ্র’ শিবেরই একটি রূপ৷ ‘চণ্ডিকা’ তেমনি দুর্গার একটি রূপ৷ বস্তুত চড়কপুজোর বাণ-বঁড়শি ফোঁড়া, কাঁটা ঝাপ, বঁটি ঝাপ ইত্যাদি প্রিমিটিভ ও ভয়ংকর পর্ব দেখে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী চড়ককে প্রাচীন ‘পাশুপত’দের অনুষ্ঠান বলে ভেবেছেন৷ পশুপতি বা শিবের ভক্তদের বিশেষ সম্প্রদায় হচ্ছে এই পাশুপতগোষ্ঠী৷
আমার মনে হয় ‘চড়ক’ শব্দটির মধ্যেই চড়কের দেবতার নাম লুকিয়ে আছে৷ বস্তুত ‘কালার্করুদ্র’-র আর একটি নাম ছিল ‘চণ্ডার্ক’ বা ‘চণ্ডক’৷ চণ্ডক > চঁড়ক > চড়ক, এই পথেই চড়কের সৃষ্টি৷ ‘চড়ক’ শব্দটির নামেই তাই শিব৷ চড়ক শতকরা একশোভাগ শিব বা মহাদেবের পুজো৷
অন্য একটি মত হল ‘চড়ক’ একটি বৌদ্ধ অনুষ্ঠান৷ সম্রাট অশোকের সময় নিম্নবর্গীয় মানুষদের মধ্যে এই পার্বণটির প্রচলন ঘটে৷ গৌতমবুদ্ধের রথের সারথির নাম চণ্ডক। ‘চণ্ডক’ একজন বৌদ্ধ দেবতার নাম হওয়াও সম্ভব৷ আবার ‘চণ্ডাশোক’ থেকেও অপভ্রংশে ‘চড়ক’ আসা সম্ভাবনা আছে। যথা, চণ্ডাশোক > চণ্ডাওক > চণ্ডক > চড়ক৷
কলকাতার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা এই চড়কের উৎসবে মেতে উঠতেন কিনা খোঁজ নেওয়া দরকার।