“সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই” — বড়ু চণ্ডীদাসের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনা আজও বাংলার বহুসাংস্কৃতিক ভিত্তি ধরে রেখেছে। বঙ্গ সংস্কৃতির এই মিলনক্ষেত্রের মর্ম উপলব্ধি করতে আজকে আপনাকে আসতে হবে হুগলি জেলার ব্যাণ্ডেলে তামিল জনগোষ্ঠীর একটি রোমাঞ্চকর ও কঠোর জনপ্রিয় প্রাচীন বাৎসরিক অনুষ্ঠান ‘ভেল উৎসব’ বা ‘ভেল ভেল উৎসব’ (Vel Vel Festival) এ।
ব্যান্ডেলের ওলাইচণ্ডী মন্দিরে সকাল থেকেই চলছে ভক্তদের জনসমাগম। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে ভিড়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে যেমন চড়ক বা গাজন উৎসব হয়, অনেকটা সেই ধাঁচেরই এই উৎসব। হুগলি জেলার ইতিহাসে এই মেলা শতাব্দী প্রাচীন। প্রতিবছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কিংবা বাংলা নববর্ষের ৯ থেকে ১০ দিন আগে একমাত্র ব্যান্ডেলেই এই উৎসব হয়।

ভেল উৎসব মূলত শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর মন্দিরগুলিতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূলত তামিল জনগোষ্ঠীর ব্যাপক বসবাস এবং দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকা এলাকাগুলোতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ু, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ‘ভেল’ বা ‘থাইপুসাম’ উৎসব অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এই অনুষ্ঠানটি জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে অনুষ্ঠিত হয়।
একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার ব্যান্ডেলের দক্ষিণ নলডাঙ্গার বালিকাটা শীতলা মন্দিরে এই দক্ষিণ ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী উৎসব এপ্রিল মাসে প্রতিবছর পালিত হয়। তামিল জনগোষ্ঠীর অনেকেই থাকেন ব্যান্ডেলে, তারাই বহু বছর আগে এখানে শুরু করে ভেল ভেল উৎসব।
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভারতীয় দেবতাদের অনেক অবতার রয়েছে এবং তাদের মধ্যে একজন হলেন কার্তিক, যিনি মুরুগান নামেও পরিচিত। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে মুরুগানকে যুদ্ধের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হয়। কার্তিকেয় শিব পার্বতীর পুত্র এবং গণেশের ভাই। পার্বতী তার পুত্র মুরুগানকে একটি ভেল (শূল জাতীয় অস্ত্র) দান করেছিলেন, যার দ্বারা দুষ্ট আত্মা সুরপদ্মণকে তিনি পরাজিত করতে পারেন।
অসুর বংশের সুরপদ্মণের সঙ্গে মুরুগানের এক তুমুল যুদ্ধ হয়েছিল। যুদ্ধ চলাকালীন, সুরপদ্মণ যখন একটি আমগাছের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিল, তখন মুরুগান তাঁর দিব্য বর্শা (ভেল) ব্যবহার করে তাঁর পরাজয় সুনিশ্চিত করেন। মুরুগান তাঁর দিব্য বর্শা দিয়ে আমগাছটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলেন। আমগাছের একটি ভাগ ময়ূর এবং অপর ভাগটি একটি মোরগে পরিণত হয়। সেই থেকেই কার্তিকেয় সর্বদা ময়ূরকে তাঁর বাহন হিসেবে ব্যবহার করতে থাকেন এবং মোরগটি মুরুগানের পতাকার প্রতীক হয়ে ওঠে।

প্রাচীনকালে ‘ভেল’ তামিল রাজরাজাদের যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র বর্শা কিংবা শূলকে বলা হয়। প্রাচীন তামিল রাজারা এবং যোদ্ধারা যুদ্ধে যাওয়ার সময় বা বিজয় লাভের পর শক্তি ও সাহসের প্রতীক হিসেবে “ভেল, ভেল” বা “ভেতরিভেল, ভিরিভেল” (বিজয়ী বর্শা, সাহসী বর্শা) বলে চিৎকার করতেন। এটি কেবল অস্ত্র নয়, তামিল সংস্কৃতির বিশ্বাস অনুযায়ী এটি জ্ঞান, বীরত্ব এবং ন্যায়ের প্রতীক।
উৎসবের কয়েকদিন আগে থেকেই অংশগ্রহণকারীরা কঠোর উপবাস এবং সংযম পালন করেন। অনেকেই খালি পায়ে থাকেন ও শুধুমাত্র নিরামিষ খাবার খান। পুরুষরা সাধারণত দাড়ি কামান না বা চুল আঁচড়ান না। তাদের অবশ্যই কম কথা বলতে হয় এবং ঐশ্বরিক শক্তির মধ্যে লীন থাকার চেষ্টা করতে হয়।

উৎসবের দিন সকালে সকল ভক্ত প্রথমে শ্রীশ্রী ওলাইচণ্ডী মায়ের মন্দিরে আসেন। এই মন্দিরের কাছে দুটি বড় পুকুর আছে, যেখানে ভক্তরা নিজেদের শুদ্ধ করার জন্য স্নান করেন। স্নানের পর, ভক্তদের শরীরে হলুদের পেস্ট ও পবিত্র ভস্ম মাখানো হয়। তাঁদের হাতে ধর্মীয় সুতো বাঁধা হয় এবং কেউ কেউ কোমরে লেবু, নিমপাতা পরেন। যেকোনো অশুভ বা নেতিবাচক শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য এটি করা হয়।ভক্তদের ওপর প্রেতাত্মা বা দেবতা ইত্যাদির অধিষ্ঠান হয়, যাকে বলা হয় ‘ভর’, সেটিও এখানে হতে দেখা যায়।
এরপর ভক্তরা শ্রী শ্রী ওলাইচণ্ডী মাতার মন্দিরের দিকে অগ্রসর হন। অংশগ্রহণকারীরা ভেল (বর্শা বা শূল) দিয়ে নিজেদের জিহ্বা, গাল,পিঠ ও বুক বা শরীরের বিভিন্ন অংশ ফোঁড়ান।বঁড়শির নীচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় বিভিন্ন সামগ্রী।

কিছু ভক্তকে তাদের পিঠে গাঁথা ধাতব হুকের সাহায্যে এই ধরনের সজ্জা বা রথ টানতেও দেখা যায়।ভক্তরা নিজেদের শরীরকে বিভিন্ন উপায়ে যন্ত্রণা দিয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের মাধ্যমে ইষ্ট দেবতাকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করেন।
ভক্তরা ‘ভেল ভেল’ ধ্বনি দিয়ে শোভাযাত্রা করেন যাত্রাপথে অগণিত মানুষ তাঁদের পায়ে জল দেন। অনেকেই শিশুদের মাটিতে শুইয়ে দেন তাঁদের পদধূলি নেওয়ার জন্য। মুরুগান দেবতার উদ্দেশ্যে তামিল প্রথা অনুযায়ী বিশেষ সাজানো ‘কাভাদি’ কাঁধে (ময়ূরের পালক ও ঘণ্টা দিয়ে সাজানো কাঠের কাঠামো) কাঁধে নিয়ে নৃত্য করে এবং মাথায় কলস নিয়ে নাচতে নাচতে শোভাযাত্রায় অংশ নেন।

ভক্তরা শোভাযাত্রা শেষে দক্ষিণ নলডাঙ্গার শীতলা মন্দিরে পৌঁছে নিজেদের শরীর ছিদ্র করা (piercing) ধাতব শলাকা ও হুকগুলো খুলে ফেলেন। মন্দিরে পৌঁছে তারা পূজা-অর্চনা করেন, নৃত্যের মাধ্যমে দেবীর আরাধনা করেন এবং অগ্নিকুণ্ড (মন্দিরে গাছে একটি মাঠে জ্বলন্ত কয়লা বিছিয়ে রাখা হয়।) পার হয়ে (fire-walking) আচারের সমাপ্তি ঘটান।
ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এই অনুষ্ঠানটি অশুভ শক্তি থেকে পরিবারকে রক্ষা করবে এবং তাঁদের মনোবাসনা পূর্ণ করবে। বাঙালি সম্প্রদায়ও ওলাইচণ্ডী মাতার মূর্তিতে এবং শীতলা মন্দিরে দুধ ঢেলে এই উৎসব পালন করে।

এই অনুষ্ঠানের তারিখগুলোকে থাইপুসামের সাথে সরাসরি মেলানো যায় না। এই অনুষ্ঠান তামিল ও বাংলা উৎসবের এক মিশ্রণে পরিণত হয়েছে, যেখানে মুরুগান, ওলাইচণ্ডী মাতা এবং শীতলা মাতা (মুথুমারিআম্মান) অনায়াসে একটি একক উৎসবে একীভূত হয়েছেন।
— “ধর্ম যার যার, উৎসব সবার” — এই মন্ত্রেই বিশ্বাসী এই বহু সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র বঙ্গভূমি।হাজার বছরের ইতিহাস, বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর আগমন এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলা এক মিশ্র সংস্কৃতির (Syncretic Culture) ধারক ও বাহক হয়ে উঠেছে, “ভেল” উৎসবই তার অন্যতম উদাহরণ।