| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা : জগদীশ নায়ারণ সরকার (২৪নং কিস্তি) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৫৪০ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২২

তৃতীয় খণ্ড

বীজাপুর অভিযান ১৬৫৭-৫৮

৩। মীর জুমলা এবং আওরঙ্গজেব বীজাপুরী আমলা, সেনা নায়কদের প্রলুব্ধ করলেন

আওরঙ্গজেব বীজাপুরি আধিকারিকদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। যদিও মীর জুমলা তখনও দক্ষিণে পৌছন নি, কিন্তু দক্ষিণী দরবারে অতীতে আওরঙ্গজেবের দরকষাকষির অভিজ্ঞতা তাঁকে এই কাজে কয়েক কদম এগিয়ে রেখেছিল। মুঘল সুবাদার বীজাপুরী উজির মুজফফরুদ্দিন ইখলাস খান মন জয় করলেন আওরঙ্গজেব।

কিন্তু বীজাপুরের অভিজাত মুল্লা আহমদ নাটিয়ার সঙ্গে দরকষাকষি সহজ হল না। বোঝা গেল মানুষটা কঠিন ঠাঁই। তার দৃঢ়তা ভাঙা আওরঙ্গজেবের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ল। ১৬৫৬-র জুলাইতেই আওরঙ্গজেব, মীর জুমলাকে অনুরোধ করলেন অভিজাততার দুর্ভেদ্য দুর্গ নাটিয়ার রক্ষণ ভাঙার মূলমন্ত্র দিয়ে তাঁকে সাহায্য করতে। মীর জুমলার দেওয়া তথ্য থেকেই আওরঙ্গজেব জানতে পারলেন বিজাপুরী কোন কোন আমলার সঙ্গে মুল্লার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা। মুল্লা সুলতানের এবং মুঘলদের মধ্যে বোঝাপড়া আলাপ আলোচনা চালানোর ঘোরতর বিরোধী। আওরঙ্গজেবের পক্ষে কাবিল খান মীর জুমলাকে জানালেন মীরের সঙ্গে যেহেতু নাটিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল, এবং সেই সম্পর্কের কোনও বাস্তব ভিত্তি যদি তখন সেই মুহূর্তে থেকে থাকে, তাহলে তাকে মুঘল পক্ষে আনতে গেলে সেই অতীত সম্পর্কে বাধ্যতামূলকভাবে ব্যবহার করতে হবে। তবে বন্ধুত্বের অবশেষ যদি নাই থাকে, তাহলে আর দেরি না করে মীর জুমলা তার সম্বন্ধে এমন কিছু ‘ইঙ্গিত’ দিন, যা দিয়ে নাটিয়ারের রক্ষণ ব্যুহ ভেদ করে তাঁকে উত্যক্ত করা যায়। মুঘলদের পাশে থাকার জন্য অনুরোধ জানিয়ে মীর জুমলা কিছু চিঠি মুল্লার উদ্দেশ্যে পাঠালেন। চিঠিগুলোর নকল আওরঙ্গজেবকেও পাঠালেন (৫ নভেম্বর ১৬৫৬)। আওরঙ্গজেব বীজাপুরের মুঘল হাজিবকে চিঠিগুলি পাঠিয়ে সেগুলি হয় চরের মাধ্যমে গোপনে অথবা প্রকাশ্যে হরকরা মার্ফত একটা জবাবি চিঠি লিখে মুল্লার কাছে পাঠাতে বললেন — যে পদ্ধতিটা মুল্লা পছন্দ। মীর জুমলার চিঠির উত্তরে আওরঙ্গজেব লিখলেন, ‘তিনি (মুল্লা) যদি আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহলে ভাল এবং মঙ্গলজনক; না হলে আমাদের পদক্ষেপ সামলাতে তাঁকে চরম ভোগান্তি পোয়াতে হবে’। মীর জুমলা বাস্তব অবস্থা সম্পর্কে সম্বন্ধে সচেতন করতে মুল্লাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলার কাজটি করলেন। মুল্লা, শেষ অবদি মুঘল প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ডিসেম্বরে সমাধান বেরিয়ে এল, আওরঙ্গজেব মুল্লা আহমদকে আশ্বাস দিলেন পাশে থাকার। ইখলাস খানের পরামর্শে মুল্লা বীজাপুরে মুঘল দূতের সঙ্গে দেখা করে আওরঙ্গজেবের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব তাঁকে সে মুহূর্তে বিশ্বাস করেন নি, মীর জুমলার আগমন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন, ‘তোমার আসার পরেই তোমার মত অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে’।

আওরঙ্গজেবের কাছে খবর এল, মীর জুমলার কর্ণাটক জায়গিরদারির কিছু গ্রাম (কোক্কানুর আর গোরুমকুণ্ডা?) তছনছ করা কুর্ণুলের সিদ্দি জৌহারও তাঁর পক্ষে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।

দক্ষিণ নিয়ে যে কোনও উদ্যম এখন আওরঙ্গজেব, মীর জুমলার সঙ্গে পরামর্শ না করে এগোন না। ১৬৫৬-র ডিসেম্বরের শুরুর দিকে মীর জুমলার কাছে আওরঙ্গজেব শিবাজীকে দলে টানার নীতিমালা পেশ করলেন। শিবাজীর দূত আওরঙ্গজেবের জন্য অপেক্ষা করে প্রস্তাব দিলেন বর্তমানে শিবাজী বীজাপুরী কোঙ্কণ নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁকে যদি যৌক্তিক মনসব এবং দেশটিকে উপযুক্ত তনখা (বেতন) হিসেবে উপহার দেওয়া হয়, তাহলে তিনি সারা সাম্রাজ্য আওরঙ্গজেবকে উপহার দিতে প্রস্তুত। আওরঙ্গজেব তাঁকে কিছু শর্তে রাজি হওয়ার আশ্বাস দিলেন এবং শাহজীকেও একই শর্ত দিলেন। মীর জুমলাকে জানালেন শিবাজীদের পক্ষ থেকে উত্তর পেলে তাঁকে জানানো হবে; তারা যদি আমার নির্দেশ মানে তো ভাল, না হলে তাদের কপালে সাম্রাজ্যের বাহিনীর হাতে অবধারিত চরম শাস্তি লেখা রয়েছে।

মহম্মদ আদিল শাহের মৃত্যুর পর বিজাপুরের ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা আমলাদের মধ্যে বিপুল কাজিয়া লেগেগেল। সেই ফাটল কাজে লাগিয়ে মুঘলেরা বীজাপুরী সেনাবাহিনীকে কব্জা করার অবস্থায় চলে আসে। ২৩ ডিসেম্বরের পরের কোনও এক সময়ে লেখা চিঠিতে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে জানালেন, ‘আমার সমস্ত উদ্যম, যে কোন উপায়ে বীজাপুর মুঘলদের পক্ষে চলে আসা দেখা। প্রখ্যাত সেনায়কেরাও ছোট্ট ধাক্কাতেই আমাদের পক্ষে চলে আসার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন’। রণদৌলা খানের পুত্র গাজি খান, আবদুল কাদির ঢাকতু, শেখ মুস্তাফা জুনায়েদি, হাজি খান মিয়ানা, যশোবন্ত, মুস্তাফা খান সহ অন্যান্য প্রখ্যাত সেনাপতি আওরঙ্গজেবের পক্ষ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। আওরঙ্গজেবের জানেন মীর জুমলা আসার পরে আরও অনেক বেশি অভিজাত-চাকুরেকে মুঘল শিবিরে জুটিয়ে নেওয়া যাবে।

বিজাপুরিদের সপক্ষে এনে সেনাবাহিনীকে এলোমেলো করে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল করতে প্রচুর অর্থ জোগাড়ের কথাও উঠল। আওরঙ্গজেব বললেন, ‘অর্থ একান্তই জরুরি একটা বিষয়, অর্থ ছাড়া এত বড় ঘটনা ঘটানো যাবে না। লোভ জাগিয়ে না তুলতে পারলে উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের মন জেতা অসম্ভব। এই উপলক্ষে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে দক্ষিণের রাজকোষের অবস্থা নিয়ে একটা সমীক্ষা পাঠালেন। দৌলতাবাদ এবং আসিফ দুর্গের জন্য রাজকোষ থেকে ২০ লক্ষ টাকার বেশি এবং অন্যান্য দুর্গের জন্য ৩০ লক্ষ টাকার বেশি খরচ করার ক্ষেত্রে সম্রাট যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, তাতে সামগ্রিকভাবে মুঘল দক্ষিণের এক বছরের খরচও চালানো সম্ভব ছিল না। আওরঙ্গজেব এই সব বিষয় তার থেকে বেশি খবর রাখা দিল্লির উজিরকে লিখলেন, গোলকুণ্ডার জন্য সম্রাটের নিয়ন্ত্রণে থাকা কোষাগার থেকে অবিলম্বে ১০ লক্ষ টাকার খেসারত অর্থ জোগাড় করতে হবে, এবং ‘তার পরে আমরা দৌলতাবাদে বসে ঠিক করব আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খরচ (আমলাদের ঘুষ দেওয়ার) কিভাবে সামলানো যায়’।

৪। মীর জুমলার দক্ষিণ যাত্রা

দারার অধিকাংশ বিরোধিতা নিশ্চিহ্ন করে, বিচক্ষণ, দৌত্যদক্ষ উজির দরবারে আওরঙ্গজেবের পাঠানো নীতি/প্রস্তাবগুলোকে মনযোগ সহকারে অধ্যয়ন করে সম্রাটকে দিয়ে সফলভাবে অনুমোদন করিয়ে নিলেন। মাঝেমধ্যে শাহজাহানকে মনমুগ্ধকর দামি রত্ন উপহার দিয়ে মীর জুমলা সম্রাটকে বুঝিয়ে দিলেন দক্ষিণ অভিযান বাচ্চার হাতের মোয়ার বেশি কিছুই নয় এবং এই কাজ মীর জুমলা স্বয়ং নিজের হাতে করে দেখাবেন। দক্ষিণের হিরের খনি দখলের লোভে দারা আর জাহানারার সক্রিয় বিরোধিতা নস্যাত করে দিলেন সম্রাট। স্বয়ং সম্রাট অভিযানের নেতৃত্ব দিন, দারার এই প্রস্তাব বাতিল করে সম্রাট ২৬ নভেম্বর আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে এবং পরিকল্পনায় মুঘল রণসাজে দক্ষিণ অভিযানের অনুমতি দিলেন।

দক্ষিণে মালওয়া সেনা না পাঠনোর দারার প্রস্তাব নাকচ করিয়ে মীর জুমলা, আওরঙ্গজেবের শর্তে বীজাপুরে সামরিক অভিযান পাঠনোয় সম্রাটকে রাজি করালেন। সম্রাটের নির্দেশে খান জাহান শায়েস্তা খান অতিদ্রুত দৌলতাবাদে পৌঁছে আওরঙ্গজেব পৌঁছনোর জন্যে অপেক্ষা করে, তার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। ৬০ জনের বেশি মনসবদারের নেতৃত্বে বিপুল ২০ হাজার সেনা সুবাদারের হাত শক্ত করতে দক্ষিণে রওনা হল। যে সব সেনানায়ক বাড়িতে বা তাঁবুতে/শিবিরে দূরে সরকারি পদে আছেন তাঁদের অবিলম্বে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দিতে সম্রাটের নির্দেশ (ফরমান) পাঠানো হল। উজির, আমীর এবং মনসবদারেরা সরাসরি সম্রাটের নির্দেশ পেলেন। মীর জুমলা সম্রাটের নির্দেশবলে একটি বিশেষ খেলাত, হিরে জহরতে মোড়া একটি ছোরা (খঞ্জর মুরাসসা), সোনা আর রূপোর শৃঙ্খলে মোড়া দুটি ঘোড়া (একটি আরবি, একটি ইরাকি), রূপোর শৃংখলে মোড়া একটি হাতি, রূপোর হাওদাওয়ালা একটি মাদি হাতি এবং অন্যান্য নানান দ্রব্য উপহার পেলেন। প্রথম সাক্ষাৎ থেকে শুরু করে তিনি সম্রাটের থেকে উপহার পেয়েছেন ৭ লক্ষ টাকা যার মধ্যে ৫ লক্ষ নগদে, ঘোড়া, হাতি এবং অন্যান্য রূপো এবং দ্রব্য ২ লক্ষ টাকা।

উজিরের পুত্র মহম্মদ আমিনকে তার পিতা ফিরে না আসা পর্যন্ত দেওয়ানি দপ্তর দেখাশোনার ভার দেওয়া হল এবং তার পদ (৩,০০০ জাট, ১,০০০ সওয়ার) বাড়ানো হল ১,০০০ জাট।

কূটনীতির চরম প্রয়োগের দক্ষতায় দরবারে দারার বিরুদ্ধে মীর জুমলা জিতলেন। কিন্তু যাত্রার শেষ মুহূর্তে দারার এক চরম পদক্ষেপে মীর জুমলার সফলতার যাবতীয় চিহ্ন ম্লান হয়ে যাবে। উজির তার পুত্র এবং তার সমগ্র পরিবারকে বন্ধক রেখে দক্ষিণের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। আর মানুচির বক্তব্যকে যদি ধ্রুব সত্য ধরে নেওয়া হয়, তাহলে দারা শেষ মুহূর্তে (যাত্রা শুরুর তিন দিন আগে) মীর জুমলার ৮০ জন ফিরিঙ্গি সাঁজোয়া সেনা কিনে নিয়েছিলেন।

সম্ভবত দারা শেষ মুহূর্তের এই পদক্ষেপে মীর জুমলার যাত্রা কিছুটা দেরি হয়ে যায়। তিনি সম্রাটের কাছে ২৬ নভেম্বর তারিখ থেকে ছুটি নিলেও দিল্লি থেকে রওনা হলেন ১ ডিসেম্বর ১৬৫৬। গোয়ালিয়র এবং কুলারাস হয়ে দক্ষিণ যাওয়ার পথে তিনি আওরঙ্গজেবকে চিঠি লিখতে লিখতে এগিয়ে চললেন। আওরঙ্গাবাদে পৌছলেন ১৮ জানুয়ারি ১৬৫৭। তার বাহিনীর শ্লথ গতির কারণ হল সব মনসবদার রাস্তায় ঠিক সময়ে তার সঙ্গে যোগ দেন নি। কেউ কেউ দারাপন্থী, কেউ কেউ জায়গির ছাড়তে অলসতা করেছে, অনেকের নানান বাস্তব কারণেই দেরি হয়েছে। ১৬৫৬-র শেষের দিকে আওরঙ্গজেব মহবত খান, নাজাবত খান এবং মির্জা সুলতানকে বারংবার চিঠি লিখে মীর জুমলার সঙ্গে যোগ দিতে দেরি না করার উপদেশ দিয়েছেন। উজিরকে আশ্বস্ত করে তিনি লিখলেন যারা দেরি করছে, তাঁদের উপযুক্ত সময়ে যথাযোগ্য শাস্তি পেতেই হবে। প্রয়োজনে তিনি যেন হরকরাদের মার্ফত সম্রাটকে অভিযোগপত্র পাঠিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করে রাখেন। এছাড়াও তিনি মীর জুমলাকে বললেন, উত্তর ভারত থেকে যে সব অস্ত্রশস্ত্র আসার কথা তার জন্য অপেক্ষা না করেন। সেগুলো তাঁর কাছে আসতে ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৬৫৭ পেরিয়ে যাবে।

দক্ষিণের সুবাদার আওরঙ্গজেব, উত্তরে থেকে শাহী উজির মীর জুমলার আসার দেরিতে অসম্ভব অস্থির হয়ে উঠছিলেন। মীর জুমলাকে জানিয়ে দিলেন হয়ত শেষ পর্যন্ত উজিরের বাহিনীর জন্য অপেক্ষা করতে পারবেন না। তা হলে যে অব্যর্থ সুযোগ হাতে এসেছে সেটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। তবুও আবার তাঁকে শীঘ্র আসতে অনুরোধ করলেন। ২৪ ডিসেম্বর মীর জুমলার কুলারাস থেকে পাঠানো চিঠির উত্তরে আওরঙ্গজেব লিখছেন, ‘খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শুরু করা দরকার। বীজাপুর এখন দ’য়ে পড়েছে। মুঘল বাহিনী তার এই সমস্যার সম্পূর্ণ সুযোগ নিতে পারে, সেটা তাড়াতাড়ি নিশ্চিত করতে হবে, ক) খান মহম্মদ, আফজল, ফতে সারনাউবাত, বাহালোলের পুত্রদের মত সাধারণ সেনার মধ্যে অবিশ্বাসের পরিবেশ বেড়ে চলেছে, খ) নিজের ক্ষমতা দেখাতে শাহজী ভোঁসলা বিদ্রোহ করছে এবং তার সঙ্গে জোট গড়তে চলেছে শ্রীরঙ্গ রয়াল এবং তিনি কর্ণাটকের কিছু মহাল দখল করে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন’। তিনি লিখলেন ‘আমার আর দেরি করা চলে না, এরকম অবস্থা হয়ত আর আমি পাব না। খুব তাড়াতাড়ি এস, আমরা উভয়ে মিলে এই কাজটি সম্পন্ন করি। এখানে আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি’। সত্যিকারের তাই হয়েছিল। তার দেরি দেখে, মীর জুমলা কবে তার সঙ্গে দেখা করতে আসতে পারেন, আওরঙ্গজেব জ্যোতিষীদের সেই দিন গুণতে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

৫। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের রণনীতি মন্ত্রণা

মুঘল উজির মীর জুমলার ঠিক সময়ে দক্ষিণে পৌছতে না পারার জন্য দাক্ষিণাত্যের সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেবের বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পিত সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল। আওরঙ্গজেবের মনে হচ্ছিল তিনি বোধহয় সম্রাটের যুদ্ধে যাওয়ার নির্দেশ পালন করতে পারবেন না।

আদিল শাহের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সম্রাটের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল সম্ভব হলে আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে নিয়ে বিজাপুর সীমানতে পৌঁছে তাকে সম্পূর্ণভাবে দখলে আনবেন। না করতে পারলে আওরঙ্গজেব শুধু নিজামশাহীর (বিজাপুর থেকে ১৫৩৬ সালে আলাদা হওয়া) অধিকারের অংশটুইকুই দখল করবেন। বীজাপুরকে বাৎসরিক রাজস্ব আর মুঘল সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতির বদলে বীজাপুর তার স্বাধীনতা বজায় রাখার অধিকার পাবে। সেখান থেকে তিনি গোলকুণ্ডা দখলে যাবেন। গোলকুণ্ডা রাজ্যকে বীজাপুরের থেকেও সহজে জয় করা যায়। জ্যোতিষীরা আওরঙ্গজেবের বীজাপুর অভিযানের শুভ দিনক্ষণ ধার্য করেছিল ৮ জানুয়ারি। কিন্তু ডিসেম্বর পর্যন্ত জানা যায় নি বীজাপুর না গোলকুণ্ডা, কোনটা আগে মীর জুমলা আক্রমণ করতে চাইছেন। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পরিষ্কার হয়ে যায় ঠিক সময়ে মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে পারছেন না। আওরঙ্গজেবের আশংকা হচ্ছিল দুটো দেশ দখলের যে অবশ্যম্ভাবী যোগ তৈরি হয়েছে সেটা না হাতছাড়া হয়ে যায়। প্রথমে বীজাপুর দখল করে, মীর জুমলার অধিকৃত কর্ণাটক ছিনিয়ে নেওয়ার জন্যে কুতুব শাহকে শাস্তি দিয়ে, তার পরে ইচ্ছে মত, তুড়ি মেরে গোলকুণ্ডা দখল নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ১১ এবং ১৪ ডিসেম্বরের মীর জুমলার দুটি চিঠির উত্তরে আওরঙ্গজেব লিখলেন, এ বিষয়ে (আক্রমণের রণনীতি) উজিরের মত তিনি জানতে উৎসুক, তার মত আগামী দিনের যুদ্ধ পরিকল্পনা রূপায়নে সাহায়তা করবে। যদি মীর জুমলা তাঁকে প্রস্তাব দেন যে প্রথমে বীজাপুর অভিযান করে – পুরো বা আংশিক দেশ দখল করে এবং সুলতানের থেকে বিপুল পরিমান ক্ষতিপূরণ চেয়ে তারপরে গোলকুণ্ডা দখল করা হবে এবং পরে, হয় সেই বছর বা পরের বছর কর্ণাটকের দিকে এগোনো যাবে – তাহলে আওরঙ্গজেব তার মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিয়ে যথাযথ দিনক্ষণ মিলিয়ে বীজাপুরের দিকে অগ্রসর হবেন।

তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো আওরঙ্গজেব সম্রাটকে স্পষ্টভাবে জানাচ্ছিলেন। আওরঙ্গজেব মনে করতেন [মীর জুমলাকে ছেড়ে] তাঁর একার পক্ষে বিজাপুর এবং পরে সহজ গোলকুণ্ডা অভিযানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। যতক্ষণ মীর জুমলা এসে না পড়েন, সেই সময়টুকু তিনি শিকার (বীজাপুর সীমান্তে রামদোয়ায়) করে বেড়াবেন, এবং ঠিক সময়ে উজির এসে পড়লে অভিযানের দিন এবং গতিপথ তৈরি হবে। ১৬৫৭র জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তিনি জানতে পারলেন মীর জুমলা ১৮-র দিকে নিশ্চিতভাবে এসে পড়ছেন। আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব ছিল প্রথম মোলাকাতের দিনেই যৌথভাবে শিকার উৎসবে যাওয়া হবে এবং সেই সুযোগে রণনীতিও ঠিক হবে। যদি ঠিক হয় বীজাপুরের দিকে যাওয়া হবে তাহলে তো অন্য কিছু ভাবার নেই, না হলে গোলকুণ্ডার দিকে যাওয়া হবে।

৬। বীজাপুরী অভিযানে মীর জুমলার ভূমিকা

১৮ জানুয়ারি মীর জুমলা আহমদনগরে পৌঁছে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বীজাপুর রওয়ানা সিদ্ধান্ত নিলেন। খুবই ধীর গতির বিপুল আস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত সাঁজোয়া বাহিনীকে নিয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্দুরে পৌঁছে ওয়ালি মহলদার খানকে সেখানের সরবরাহ আর রাস্তার সুরক্ষার জন্য রেখে বিদর দুর্গের কাছে শিবির গাড়লেন।

দক্ষিণের রাজনীতিতে বলা হয় প্রায় দুর্ভেদ্য বিদর দুর্গ দখলে রাখা দক্ষিণ এবং কর্ণাটক জয় এবং সেই ভূখণ্ড জয় ধরে রাখার অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি। কেল্লার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন প্রবীন কিলাদার সিদ্দি মারজান। কেল্লায় ছিল ১,০০০ ঘোড়সওয়ার আর ৪,০০০ গোলান্দাজ, তুফাং চি, হাউইদার এবং তোপান্দাজ। তিনি কেল্লার সুরক্ষা এবং আক্রমণের রণনীতি নিশ্চিত করে কেল্লায় ঢোকা বেরোনো নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। আওরঙ্গজেবের সঙ্গে মীর জুমলা দুর্গ নিরীক্ষণ করলেন এবং বাইরে পরিখা (মালছার) দেখলেন। দুর্গ থেকে নিরন্তর গোলাগুলি চললেও সেই পরিখা ভর্তি করে, দুদিনের মধ্যে কামানগুলি বসাতে সক্ষম হলেন মীর জুমলা এবং বিপক্ষের আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে থাকল মুঘল বাহিনী। আক্রমন প্রতিআক্রমণে মুঘল বাহিনীর দিকে পাল্লা ভারি হতে থাকে। শেষে মুঘলেরা বিপক্ষের দুটি কামান ধ্বংস করে, বাইরের দিকের দেওয়ালের নিচের অংশ নড়িয়ে দেয়। ২৯ মার্চ ১৬৫৭-তে মহম্মদ মুরাদের নেতৃত্বে বাহিনী মীর জুমলার মালছারের উল্টোদিকের দেওয়াল বেয়ে দুর্গ বুরুজে উঠতে থাকে। মীর জুমলার বাহিনীর ছোঁড়া হাউইয়ের স্ফুলিঙ্গ বারুদের গুদামে পড়লে বিপুল বিষ্ফোরণ হয়, কেল্লাদার সিদ্দি মারজান আহত হন। তিনি দুর্গের নিয়ন্ত্রণ মুঘলদের হাতে তুলে দেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev