
৩৯৩. প্রায় আট বছর আগে প্রস্তুতকরা একজন রায়তের হিসাবের নিম্নোক্ত সারাংশটি থেকে এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে সম্পন্ন হয়, তা বোঝা যাবে :
বাংলা
বিভিন্ন ফসলের ৭ বিঘা ১২ কাঠা ৭ ছটাক জমির খাজনা, যা উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে বিঘা প্রতি একটি নির্দিষ্ট হারে হিসাব করা হয়েছে; এটি ‘হিসাব-ই-করচা’ নামক দাবি ও পরিশোধের একটি হিসাবপত্র থেকে সংগৃহীত।
টাকা (Rs.) আনা (A.) গণ্ডা/পাই (G.) : ১৪ টাকা ০ আনা ৮ পাই
আবওয়াব বা উপকরসমূহ (Abwab Cesses) :
চৌথ (Chout): প্রতি রুপিতে ৩/১৬ অংশ ➔ ২ ১০ ০
পুলবন্দি (Poolbundy): আধ মাসের (M°) দাবি অথবা মোট জমার ১/২৪ অংশ ➔ ৯ ৭ ২
নজরানা (Nuzzerana): এক মাসের বা ১/২ অংশ ➔ ১ ২ ১৫
মাঙ্গন (Mangun): পূর্বোক্ত সমপরিমাণ (ঐ) ➔ ১ ২ ১৫
ফৌজদারি (Fouzdarry): এক মাসের পরিমাণের ৩/৪ অংশ অথবা ১/১৬ অংশ ➔ ১৪ ১৫ ০
কোম্পানির নজরানা (Company’s nuzzerah): সোয়া এক মাস (১ মাস ও এক চতুর্থাংশ) ➔ ০ ১ ৭
বাট্টা (Batta): প্রতি রুপিতে এক আনা ➔ ০ ০ ১৪
(এই সব মিলিয়ে আবওয়াবের মোট যোগফল ডানপাশে দেখানো হয়েছে: ৮ ১২ ২ ২)
মোট (Total): ২২ ১২ ১০ ২
খেলাত (Khelaat): উপরের মোট অঙ্কের প্রতি রুপিতে দেড় আনা (১ আনা ও অর্ধেক) হারে ➔ ২ ২ ১ ২
মোট জমা (Total jumma): ২৪ ১৪ ১২ ০
৩৯৪. ১৪ টাকা ০ আনা ৮ পাইয়ের প্রাথমিক অঙ্কটিকে জমির ‘আসল হার’ (original rate) বলা হয়, তবে এর মধ্যেও হয়তো একীভূত বা অন্তর্ভুক্ত কোনো উপকর (cesses) থাকতে পারে; পরবর্তীকালে যুক্ত হওয়া কিছু ‘আবওয়াব’ বা উপকর ‘দেওয়ানি’ আমলের পরবর্তী সময়ের।
৩৯৫. যদি একই জমির হিসাব এখন পরীক্ষা করা হয়, তবে আরও কিছু অতিরিক্ত কর বা বোঝা নজরে আসতে পারে। জমিদাররা দুই, তিন, চার বা পাঁচ বছরের ব্যবধানে ধাপে ধাপে এগুলি প্রবর্তন করেন এবং খুব কমই পরপর দুই বা তিন বছর ধরে তা চাপানোর চেষ্টা করেন। এগুলি কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনুরোধ-উপরোধ এবং প্রভাব—উভয়েরই সমান ব্যবহার করা হয়; আর রায়ত বা কৃষকরা, যদি বোঝাটি খুব বেশি ভারী না হয়, তবে প্রতিবাদ বা অভিযোগ করার চেয়ে বরং তা মেনে নেওয়াই শ্রেয় মনে করেন। সাময়িক জোরজুলুম বা অর্থ আদায় যেকোনো সময় করা যেতে পারে; কিন্তু বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রায়তদের ওপর এ ধরনের স্থায়ী কর খুব কমই চাপানো সম্ভব।
কিস্তি ৪৭ টিকা ৩৯৩ স্তবক
বিভিন্ন ফসলের ৭ বিঘা ১২ কাঠা ৭ ছটাক জমির খাজনা, যা উৎপাদিত ফসলের ওপর ভিত্তি করে বিঘা প্রতি একটি নির্দিষ্ট হারে হিসাব করা হয়েছে; এটি ‘হিসাব-ই-করচা’ নামক দাবি ও পরিশোধের একটি হিসাবপত্র থেকে সংগৃহীত।
টাকা (Rs.) আনা (A.) গণ্ডা/পাই (G.) : ১৪ টাকা ০ আনা ৮ পাই
আবওয়াব বা উপকরসমূহ (Abwab Cesses):
চৌথ (Chout): প্রতি রুপিতে ৩/১৬ অংশ ➔ ২ ১০ ০
পুলবন্দি (Poolbundy): আধ মাসের (M°) দাবি অথবা মোট জমার ১/২৪ অংশ ➔ ৯ ৭ ২
নজরানা (Nuzzerana): এক মাসের বা ১/২ অংশ ➔ ১ ২ ১৫
মাঙ্গন (Mangun): পূর্বোক্ত সমপরিমাণ (ঐ) ➔ ১ ২ ১৫
ফৌজদারি (Fouzdarry): এক মাসের পরিমাণের ৩/৪ অংশ অথবা ১/১৬ অংশ ➔ ১৪ ১৫ ০
কোম্পানির নজরানা (Company’s nuzzerah): সোয়া এক মাস (১ মাস ও এক চতুর্থাংশ) ➔ ০ ১ ৭
বাট্টা (Batta): প্রতি রুপিতে এক আনা ➔ ০ ০ ১৪
(এই সব মিলিয়ে আবওয়াবের মোট যোগফল ডানপাশে দেখানো হয়েছে: ৮ ১২ ২ ২)
মোট (Total): ২২ ১২ ১০ ২
খেলাত (Khelaat): উপরের মোট অঙ্কের প্রতি রুপিতে দেড় আনা (১ আনা ও অর্ধেক) হারে ➔ ২ ২ ১ ২
মোট জমা (Total jumma): ২৪ ১৪ ১২ ০
আবওয়াব ও প্রধান উপকরসমূহ
আবওয়াব (Abwab): মূল খাজনার বাইরে জমিদার বা সরকার কর্তৃক আরোপিত বিভিন্ন অতিরিক্ত উপকর বা বেআইনি আবদার।
চৌথ (Chout): মারাঠা বা স্থানীয় শক্তিকে আক্রমণ থেকে বিরত থাকার জন্য দেওয়া উৎপাদনের বা খাজনার চারভাগের একভাগ (১/৪) অংশ। তবে এখানে এটি একটি নির্দিষ্ট হারের উপকর হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পুলবন্দি (Poolbundy): নদীমাতৃক বাংলায় বাঁধ (পুল) এবং সেতু নির্মাণ বা মেরামতের জন্য কৃষকদের ওপর ধার্য করা উন্নয়ন কর।
ফৌজদারি (Fouzdarry): স্থানীয় পুলিশি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা (ফৌজদার) পরিচালনার খরচ মেটাতে প্রজাদের কাছ থেকে আদায় করা সুরক্ষা কর।
নজরানা ও বিশেষ আদায়
নজরানা (Nuzzerana): জমিদার, নবাব বা কোম্পানির কর্তাদের সন্তুষ্ট করতে বা কোনো বিশেষ সুবিধা পাওয়ার জন্য দেওয়া নগদ উপহার বা সেলামি।
মাঙ্গন (Mangun): জমিদার বা ভূস্বামীদের ঘরে কোনো বিশেষ উৎসব, বিবাহ বা অনুষ্ঠানের খরচ মেটাতে প্রজাদের কাছ থেকে চাওয়া ঐচ্ছিক বা বাধ্যতামূলক অনুদান।
খেলাত (Khelaat): নবাব বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সম্মানসূচক পোশাক (খেলাত) গ্রহণের আনুষ্ঠানিক খরচ বা ফি, যা প্রজাদের ওপর কর হিসেবে চাপানো হতো।
আর্থিক রূপান্তর সংক্রান্ত পরিভাষা
বাট্টা (Batta): মুঘল ও কোম্পানির আমলে বিভিন্ন অঞ্চলের মুদ্রার মান আলাদা ছিল। এক মুদ্রা থেকে অন্য মুদ্রায় রূপান্তর বা কয়েনের ক্ষয়ের কারণে যে এক্সচেঞ্জ রেট বা দালালি কাটা হতো, তাকেই বাট্টা বলা হতো।
মোট জমা (Total Jumma): মূল খাজনা এবং সমস্ত অতিরিক্ত কর (আবওয়াব) যোগ করার পর একজন কৃষককে সর্বমোট যে পরিমাণ চূড়ান্ত কর বা রাজস্ব পরিশোধ করতে হতো।
মুঘল আমলে ‘হিসাব-ই-খরচা’ (Hisab-i-Korcha) বলতে বোঝাত রাজকীয় আয় ও ব্যয়ের হিসাব বা আর্থিক হিসাব-নিকাশ। মুঘল প্রশাসন ব্যবস্থায় এটি রাজকোষ, রাজস্ব আদায় এবং বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক ও নথিপত্র সংক্রান্ত পরিভাষা।
আপনি যদি মুঘল আমলের রাজস্ব বা হিসাব ব্যবস্থা সম্পর্কে আরও জানতে চান, তবে নিচের বিষয়গুলো দেখতে পারেন:
জমা ও হাসিল: মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থায় ‘জমা’ অর্থ মোট ধার্যকৃত রাজস্ব এবং ‘হাসিল’ অর্থ বাস্তবে সংগৃহীত রাজস্ব।
দিওয়ান বিভাগ: সাম্রাজ্যের বা সুবার সমস্ত ‘হিসাব-ই-খরচা’ বা আর্থিক তদারকি করতেন প্রধান দিওয়ান বা রাজস্ব কর্মকর্তা।
টোদরমলের জাবতি প্রথা: সম্রাট আকবরের আমলে জমি মেপে উৎপাদনের গড় হিসাব করে নগদ অর্থে কর নির্ধারণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি চালু করা হয়। [১, ২, ৩]
আপনি কি মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় প্রশাসন, নাকি নির্দিষ্ট কোনো সম্রাটের আর্থিক নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান?
মুঘল আমলে ‘হিসাব-ই-খরচা’ (Hisab-i-Korcha/Kharcha) ছিল একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক দলিল, যা মূলত গ্রামীণ বা পরগনা স্তরের রাজস্ব ব্যবস্থার সাথে জড়িত ছিল। এটি কেবল সাধারণ খরচের খাতা ছিল না, বরং সম্রাট আকবরের সময় থেকে চালু হওয়া উন্নত আর্থিক প্রশাসনের একটি অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ছিল।
নিচে ‘হিসাব-ই-খরচা’র সাংগঠনিক রূপ, কাজের পদ্ধতি এবং গুরুত্ব বিশদে আলোচনা করা হলো:
১. হিসাব-ই-খরচার মূল ধারণা
মুঘল রাজস্ব প্রশাসনে দুটি প্রধান পর্যায় ছিল — ‘জমা’ (ধার্যকৃত কর) এবং ‘হাসিল’ (বাস্তব আদায়)। একজন চাষী বা গ্রামের বাসিন্দারা মোট কত টাকা কর হিসেবে জমা দিলেন এবং প্রশাসনের ঠিক কত টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ হলো—তার একটি চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাবপত্র বা ব্যালেন্স শিট তৈরি করা হতো। এই নির্দিষ্ট বিবরণীকেই বলা হতো হিসাব-ই-খরচা।
২. কারা এটি প্রস্তুত করতেন?
মুঘলদের বিকেন্দ্রীকৃত রাজস্ব ব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ে হিসাব রাখার দায়িত্ব ছিল নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার ওপর:
পাটওয়ারী ও কানুনগো: গ্রামের স্তরে ফসলের বিবরণ ও কৃষকদের খতিয়ান রাখতেন পাটওয়ারী। আর পরগনা (কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত অঞ্চল) স্তরে প্রধান হিসাবরক্ষক ছিলেন কানুনগো। [১]
বিটিকাচি (Bitikchi): জেলা বা পরগনা স্তরের এই লিপিকার বা হিসাবরক্ষক পাটওয়ারীদের পাঠানো কাঁচা তথ্য বা ‘বহি’ থেকে চূড়ান্ত সরকারি নথিপত্র এবং এই ‘হিসাব-ই-খরচা’ তৈরি করতেন। [১]
৩. হিসাব-ই-খরচায় কী কী লিপিবদ্ধ থাকত?
এই নথিতে মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ের নিখুঁত খতিয়ান থাকত:
সংগৃহীত রাজস্ব: নির্দিষ্ট মৌজা বা পরগনা থেকে নগদ (নকদ) বা শস্য আকারে মোট কত রাজস্ব আদায় হলো।
প্রশাসনিক ব্যয় (খরচা): রাজস্ব আদায়ের জন্য নিয়োজিত পেয়াদা বা আমলাদের বেতন, যাতায়াত খরচ এবং স্থানীয় দপ্তরের অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়।
রাজকীয় তহবিলে প্রেরণ: স্থানীয় খরচ মিটিয়ে অবশিষ্টাংশ কত টাকা মূল রাজকোষ বা ‘খাজানা-ই-আমেরা’-তে পাঠানো হলো।
৪. মুঘল রাজস্ব নীতি ও এর গুরুত্ব
মুঘল আমলে রাজা টোডরমলের প্রবর্তিত জাবতি প্রথা এবং আইন-ই-দহসালা (১০ বছরের গড় উৎপাদন ও মূল্যের হিসাব) ব্যবস্থার কারণে নিখুঁত হিসাব রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছিল। [২]
স্বচ্ছতা রক্ষা: এই হিসাবের মাধ্যমে কর আদায়ে নিযুক্ত চৌধুরী বা জমিদাররা সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে বাড়তি কোনো কর বা ‘আবওয়াব’ (বেআইনি কর) আদায় করছে কি না, তা কেন্দ্রীয় দিওয়ান বিভাগ তদারকি করতে পারত।
নিরীক্ষা (Auditing): বছর শেষে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা বা দিওয়ান-ই-কুল-এর দপ্তরে এই হিসাব জমা দিতে হতো। কোনো গরমিল পাওয়া গেলে স্থানীয় কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হতো।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মুঘলদের বিশাল সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার মূল ভিত্তি ছিল তাদের সুশৃঙ্খল অর্থনীতি। আর ‘হিসাব-ই-খরচা’ ছিল সেই অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ, যা প্রান্তিক পরগনা থেকে শুরু করে দিল্লির কেন্দ্রীয় রাজকোষ পর্যন্ত অর্থের সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত করত।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ