
আকাশের মুখ আঁধার। কদিন ঝির ঝির বৃষ্টি ঝড়ছে। স্কুলে যেতে হয়নি। বাইরে যেতে মানা কিন্ত ঘরে আটকে থাকার বান্দা নই আমরা। বাইরের বৃষ্টি আমাদের ডাকছে। বাড়ির উঠোনে জল জমেছে। সকালে সেখানে কাগজের নৌকা ভাসিয়েছি। বৃষ্টি একটু বিশ্রাম নিতেই বাড়ির বাইরে সব। জল থৈ থৈ করছে গ্রাম। পাড়ার পাশের নালাটা এখন নদী। সেখানে মাছ ধরছে অনেকেই। পুকুর ভেসে ছোট বড় সব মাছ এখন স্বাধীন। ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে। দেখব এবার জগৎটাকে’ — মাছেরা নালা বেয়ে খাল বিল নদীর উন্মুক্ত জগতে যেতে উদগ্রীব। সেখানে ডিম ছাড়বে। বংশ বৃদ্ধি হবে। বদ্ধ জলের ডিম পোনা ছানার অধিকাংশই শত্রুর পেটে যায়। তাই উন্মুক্ত স্রোত খোঁজে ওরা। কিন্তু সামনে বাধার প্রাচীর। মৎস শিকারী মানুষ নানা ফাঁদ, নানা কৌশলে মাছ ধরছে। কোঁচর ভরে বাড়ি ফিরছে সবাই। তা দেখে কার না লোভ হয়! অন্য শিকারে বাঙালির শত বদনাম কিন্তু মৎস শিকার রক্তে। জল আর মাছ দেখলে শিকারের নেশা চাগান দেবেই। আর কোন ভয় নেই। বরং ভরসা কিছু মাছ নিয়ে ফিরলে হয়ত বাহবা মিলবেই বাড়িতে। আমার পিছনে ভাই-ভাইপো-ভাইঝি। এমন মহাযুদ্ধে কোন নিরস্ত্র আমরা। কাজটাও সহজ নয়। বড় মাছেরা ঝটকা মেরে হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে যথার্থ শিকারীদের কাছে। আমরা হতভাগা। সৌভাগ্য কিছু হাঁদা ভোঁদা বোকা মাছ ছিল। দাঁড়কে, পুঁটি, বেলে, খলসে, চাঁদা, চ্যাঙ, ছিঁঙুরির ছানা। তারাই আমাদের শিকার হত। সে সব মুঠো ভরে বাড়ি ফিরতাম হৈ হৈ করে। ভাবতাম পুরস্কার জুটবে, জুটত তিরস্কার। জ্বর জ্বালা হলে ভোগ একার নয়। তাই কিল চড় চাঁটি, আর বৃষ্টির মত বকুনি ছিল পুরস্কার। ‘যখন জ্বরে পড়বি তখন বুঝবি মজা’। সে মজা কি জিনিস, জানতাম ভালোই। মাঝরাতে কান কটকট, জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকেছি কত, তবু জলের মায়া ছাড়তে পারি না। বর্ষা এসেই ডাকত আয় আয়। যাইহোক, ভিজে বেড়ালের মত জামা প্যান্ট ছেড়ে, কাদা মাটি ধুয়ে পুনঃ মুষিক হতাম ঘরে।

বন্ধ ঘরের জানলা দিয়ে দেখছি পশ্চিমের মাঠ জল থৈ থৈ। বান এলে ডুবে যেত মাঠ। যেন সমুদ্র। সেখানে মৎস শিকারের উৎসব চলছে। হাতে হাতে জাল, পলুই, বিত্তি। কেউ কেউ কাপড় গামছা টেনেই মাছ ধরছে। আমাদের কিছু সৌভাগ্যশালী বন্ধুকেও দেখতাম ঐ দলে। ছোট থেকেই জীবন সংগ্রামের পাঠ নিচ্ছে মাঠে। মাঠের মাছের মালিক নেই। বর্ষার শুরু থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত গ্রামের অনেকেই মাঠের মাছ ধরে দু-পয়সা কামাতো। তখন যেখানে জল সেখানেই মাছ। ওদের ছেলেরাও ঘুরত মাঠে মাঠে। এক বেলা নালা, খাল ছেচত, অন্য বেলায় বের হত ছিপ হাতে। পড়ার বালাই ছিল না। আসলে পেট বড় বালাই। বাপ সকালে বের হতে কাজে। ঘরে চালের জন্য। ভাত গেলার অনুসঙ্গ জোগাড় করত বউ মেয়ে ছেলেরা। মাঠে শাক পাতা মাছ গুগুলি শামুক ঝিনুক কাঁকড়া ছিল অফুরন্ত। আষাঢ-শ্রাবণে চষা জমি শামুক আর ছোট লাল কাঁকড়া’য় ভরে উঠত। সব গরীবের মিনি মাগনার পুষ্টিকর খাদ্য। এখন মাঠে সেই শামুক কাঁকড়া নেই, পুকুরের গুগলি ঝিনুক নেই। বিষিয়ে গেছে প্রকৃতি।
আমাদের পাশের গ্রামের বাগদী বৌ মেয়েরা তাদের বাঁশে বাঁধা জাল নিয়ে ভোর ভোর বের হত মাছ ধরতে। বিল, ক্যানাল, রাস্তার ধারের নয়নজুলিতে মাছ ধরে একটু বেলায় বিক্রি করত বাড়ি বাড়ি। এজন্য পয়সা নিত না। চাল মুড়ি পেলেই খুশি। চালের খুদ নিত মদ তোলার জন্য।
কিন্তু এত মাছ খাবে কে! চ্যাঙ, ছিঁঙুরি, মাগুর, কই, শিঙি মাছ গুলো অনেকেই জিইয়ে রাখত বাড়ির উঠানে গর্ত কেটে। এভাবে খাওয়া চলত অগ্রহায়ন মাস পর্যন্ত। তারপর যখন নয়ানজুলির জল কমে আসত, তখন শুরু হত খাল ছেচা (সেচা)। মাঠের মাছ শেষ হত এবার।

এত অভাব, আধপেটা খাওয়া, তবুও গ্রামের গরীব মানুষের স্বাস্থ্য ছিল নিটোল, লাবণ্যে ভরপুর। আমরা অখাদ্য বলে খাদ্য তালিকা থেকে যাদের বাদ দিয়েছি তার খাদ্যগুণ কম নয়। গ্রামের গরীব মানুষ তাই খেত। শামুক, গুগলি, শাক-পাতার খাদ্য গুণ কজন জানে। প্রোটিন ভিটামিন খনিজের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার।
এ সময় মাছের। গল্পেও মাছ। নানান গল্প। এক মেছুয়ার গল্প বলি। উমা মণ্ডল, আমাদের উমাদা। মাছ ছাড়া ভাত রোচেনা ওর। নিজের পুকুর নেই। তাতে কি! গ্রামের মাঠে ঘাটে মাছ। পুকুরে দু-একটা মাছ হাতে ধরা তখন অপরাধ ছিল না। গ্রামের কোন পুকুরে কত মাছ, কি মাছ, কে কখন কোথা থাকে, সব যেন ওর জানা। সন্ধ্যা হলেই বেরিয়ে যেতেন। ফিরতেন হাতে মাছ নিয়ে। শরীর খারাপ হলে ছেলেদের পাঠাতেন, “ওরে ওমুক পুকুরে যা এক্ষুনি। দক্ষিণের মাদায় (দুনিতে জল সেচের খাল) দেখবি দুটো শোল মাছ আছে। ধরে আন।” চ্যাঙ, ছিঙুরি, কই, মাগুর জাতের মাছ রাতের অন্ধকারে পোকা-মাকড় খেতে উঠে আসে পুকুরের ধারে। এমনই ছিল তার তীক্ষ্ণ নজর। তবে তার প্রিয় শিকার ক্ষেত্র ছিল করজ গ্রামের বিল। কয়েক শো একর এরিয়া। অফুরন্ত মাছ। বর্ষায় মাঠের জলের ঢল নামে বিলে। সেই স্রোতের উজানে ওঠে নানান মাছ। বর্ষাভর দিন রাত মাছ ধরা চলে। যেন উৎসব। ছোট থেকেই সেই মাঠে মাছের সঙ্গে মানুষ উমাদা। তাই সব মাছের চরিত্র চেনা। উমাদা’র শয়নে স্বপনেও মাছ। এক পৌষ সংক্রান্তির মাঝ রাত। কনকনে ঠান্ডা। ও পাড়ার ছেলেরা আগুন জ্বেলে ঘিরে বসে আছে তিলে পুকুরের পাড়ে। পাড়ার মেয়ে বউরা পৌষ নেয়ে সেখানে এসে দাড়িয়ে তাপ নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎই সবাই দেখে পৌষ নাইছে উমাদা কাঁথা কম্বল কাঁধে। সবাই অবাক। তবে কি বৌদির দায় কাঁধে নিয়েছে। ওকে বিশ্বাস নেই। রসিক মানুষ। অনেক রসের গল্প আছে ওর। হয়ত বৌদিকে বলেছে আমি পৌষ নাইলেও হবে। কিন্তু কাঁথা কম্বল কাঁধে কেন! স্নানের পর উমাদা তাপ পোহাতে এলে সবাই ওকে ঘিরে ধরে কারনটা জানতে। উমাদা গম্ভীর হয়ে বলে, “মাছের স্বপ্ন দেখেছি রে।”
“কিন্তু পৌষ নাইলে কেন?”
“পৌষ নাইনি, কাঁথা কম্বল একাকার হয়েছে।”
মানে!
স্বপ্নে দেখি মিঠিনি পুকুরের মোহনায় আড়া পেতেছি। মনের আনন্দে মাছ পড়া দেখছি। হঠাৎই পেটে জোর মোচর দিল। একটু সরে গিয়ে পিছনের হুরপি খুলে দিয়েছি। হঠাৎই জোর ধাক্কা।

‘ওরে বাঁশবুকো এ কি করলি’!
ঘুম ভাঙতেই বুঝলাম কি করেছি। কাঁথা কম্বল একাকার। আজ সারাদিন পিঠে খেয়েছি পেট পুরে। কম্বলের গরমে অম্বল হয়ে গেছে। তাই পোষ নাইতে হল।
তখন মাছের নেশা সব ঘরেই ছিল। আমার সেজদাদা আর ফুলদাদার ছিল ‘মাছ পাগল’। এজন্য বর্ষার বেশ আগে থেকেই যন্ত্র মন্ত্রে শান দিত। মাঠে আড়া দেওয়ার বার বুনত বাঁশের। হাট থেকে বিত্তি, পলুই, জাল কিনে আনত। পাকা বাঁশের কঞ্চি কেটে ছিপ তৈরি হত। ছিপের কলকাঠি’র জন্য ময়ূর পুচ্ছ কিনত। নানান মাপের মাছের বরশি কিনে আনত। নলকাঠি, ঝোঁপা, তগি মৎস শিকারের অস্ত্র মজুত করত ঘরে! সেজদা সখ করে একটা হুইল ছিপ কিনে এনেছিল কাটোয়া থেকে। এত খরচ, উদ্যমের দাম উসুল হয়েছে কিনা কে জানে! ছিপে বড় মাছ ধরার চার বানাতে হত ধুম করে। খোল পচার দুর্গন্ধে বাড়িতে টেকা দায়। কাঁচি মদের ‘মেওয়া’ কিনতে যেতাম গোপালপুরের সাহা বাড়ি। আমি ফাই ফরমাস খাটতাম ওদের। পুরস্কার পেতাম দু-একটা কঞ্চির ছিপ। দল বেঁধে যেতাম মাছ ধরতে। দু-চারটে পুঁটি, চ্যাঙ, ছিঁঙুরি ধরেছি তাতে। বড় মাছ ধরার সৌভাগ্য হয়নি। ঘন্টার পর ঘন্টা ছিপের কলকাঠিতে (ফাৎনা) নজর রাখার ধৈর্য ছিল না আমার, আর ঠিক সময়ে ছিপে খ্যাচ মারার বিদ্যেটাও কিছুতেই রপ্ত করতে পারিনি। তাই বড় শিকারীর পোস্টে পদোন্নতি হয়নি আমার।
গ্রামে মাঠের মাছ ধরতে গিয়ে একবার যে শিক্ষা পেলাম তা ভুলতে পারিনি এখনো। তখনও আমার শিক্ষানবিসী চলছে। আমার ফুলদাদা (সলিল) আপাগাড়ি পেতেছিল মাঠে। গ্রামে বর্ষায় মাছ ধরার এটা একটা জনপ্রিয় পদ্ধতি। নালার জল বাঁশের ছাঁকনি (আড়া) দিয়ে বয়ে যায়। মাছেরা বিকল্প পথে যেতে গিয়ে একটা মাটির গর্তে (আপাগাড়ি) এসে পড়ে।

বাড়ি থেকে একটু দূরে আলদে ডাঙার পাড়। পাশের নালা দিয়ে গ্রামের জল বয়। একদিকে গ্রামের পুকুর ভাসা মাছ। অন্যদিকে উজানে উঠে আসত মাঠের মাছ। তারাই ফাঁদে পড়ত। সব ছোট মাছ। বড় মাছেরা চালাক, ফাঁদে পা দিত না। দাঁড়কে, চ্যাঙ, পুঁটি, বালি ট্যাঙরা, কই, মাগুর কতরকম মাছ! মাছ খাবার থেকেও মাছ ধরে আনন্দ বেশি।
কদিন খুব বৃষ্টি বাদল চলছে। নালা বেয়ে যাচ্ছে গ্রামের পুকুর ভাসা জল। খুব মাছ পড়ছে আমাদের আপাগাড়িতে। দিনে রাতে তিন চার বার করে যাচ্ছি মাছ আনতে বা পাহারা দিতে। মাঠে মাছ চোরের অভাব নেই। মানুষ ছাড়াও চোর আছে জানতাম না। পাকা চোর ঢোড়া সাপ গুলো। অন্য সাপ মাছ খায় কিনা জানি না! ঢোড়া সাপের মাছ খুব প্রিয় খাবার। এজন্যই ওরা জলে থাকে। বর্ষা কালে ওরা পুকুর থেকে মাঠে উঠে আসে। আপাগাড়িতে নেমে জমা মাছ চুরি করে খেত বা আশপাশে ওঁত পেতে থাকত মাছের জন্য। বেশি উৎপাত নিঝুম রাতে। এজন্য মোটা লাঠি নিতাম হাতে। আমাদের দেখেই ছুটে পালাতো চোর। গর্তে আটকে পড়লে রাগ মেটাতাম পিটিয়ে।

এমনই এক রাতে গেছি মাছ আনতে। আলো দেখে আর পায়ের শব্দে চালাক চোরেরা এলাকা ছাড়া। গর্ত ভরা মাছ। মনে খুব আনন্দ। নালা পেরিয়ে দাদা আপার গর্তে নামবে। হাতে বালতি। আমার হাতে আলো। দেখাব বলে যেই নালায় পা রেখেছি। পা পড়ল একটা মোটা দড়ির উপর। কিছু বোঝার আগেই আমার ডান পা জড়িয়ে ধরে বুড়ো আঙুলটা কে যেন জোরে কামড়ে ধরল। বিদ্যুত গতিতে নালা থেকে উঠে এসে দেখি এই মোটা একটা ঢোড়া সাপ। জলের ভিতরে মাছের জন্য ওঁৎ পেতে ছিল। আমাদের আসার খবর পায়নি নিশ্চয়ই। আতঙ্কে চীৎকার করছি। জোরে জোরে পা ঝাড়া দিচ্ছি। দাদা এসে হাতের লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে। তবুও পা ছাড়ে না। ঝরঝর করে রক্ত ঝড়ছে আঙ্গুল থেকে। খুব রাগ হয়েছে কিংবা প্রতিবাদ! মাঠের সব মাছের দখল নিয়েছি আমরা। পৃথিবীর সব কিছুই যেন আমাদের। অন্য জীবজন্তুরা কোনঠাসা। ঢ়োড়া সাপটা যেন তার প্রতিবাদ করছে। খুব কষ্ট করে ছাড়া পেলাম ওর মুখ থেকে। সাপটা আধমরা হয়ে পালালো। আমিও আতঙ্কে আধমরা। নির্বিষ সাপ, ভয়ের কিছু ছিল না। তবুও আতঙ্কটা থেকেই গেছে। মাঠের মাছ ধরা ছেড়েছি সেদিন থেকে।
ধন্যবাদ মাননীয় সম্পাদক, পেজ ফোর নিউজ।
সুধী পাঠকদের শৈশবে মাছ ধরার স্মৃতি কি এমনই ছিল?