
৫৮. নোবেল প্রাইজের বদলে সান্ত্বনা পুরস্কার পেলেন কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়
ম্যালেরিয়া (Avian Malaria) নিয়ে গবেষণা করছেন রোনাল্ড রস। ভারতে জন্ম হলেও তিনি একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। স্যার প্যাট্রিক ম্যাসনের উৎসাহ ও পরামর্শে কাজ শুরু করেছেন তিনি। কিন্তু সহকারী দরকার। সহকারীর জন্য ইন্টারভিউ শুরু হয়েছে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালের গবেষণাগারে। অনেকে ইন্টারভিউ দিয়েছেন। তার মধ্যে এক যুবককে বেশ পছন্দ হল রোনাল্ড রসের।
যুবকের নাম কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭-১৯২৯)। তাঁদের পৈত্রিক নিবাস পানিহাটিতে। ‘নিলামবাটি’ তাঁদের বাড়ির নাম। কিন্তু কিশোরীমোহনের জন্ম মাতুলালয়ে। কলকাতার এন্টালি অঞ্চলে। প্রেসিডেন্সি থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক হয়েছেন। তাছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রে আগ্রহ আছে। কারণও আছে তার। যুবকের পিতামহ দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেকালের এক নামকরা আয়ুর্বেদাচার্য। যুবক তাঁর ঠাকুরদাকে সাহায্য করতেন। মনে মনে ভাবতেন স্বদেশি ওষুধের সঙ্গে বিদেশি ওষুধের কি মেলবন্ধন করা যায়!
রোনাল্ড রস দেখলেন যুবকের মেধা আছে। ইংরেজি ভাষাটা তিনি ভালোই রপ্ত করেছেন। প্রগলভ না হলেও বাক-চতুর এবং সপ্রতিভ। বিভিন্ন স্থান থেকে তিনি রোগী নিয়ে আসতে পারবেন, কেননা তাঁর জনসংযোগ ক্ষমতা আছে।
সুতরাং রোনাল্ড রস সহকারী হিসেবে কিশোরীমোহনকেই নির্বাচিত করলেন। কলকাতার কানিংহাম ল্যাব থেকে হুগলির পাণ্ডুয়া ব্লকের মহানাদে যখন গবেষণাগার স্থানান্তরিত হল, তখন ব্যবস্থাপনা্য় ছিলেন কিশোরীমোহন। মহানাদে স্কটিশ মিশনের একটি প্রশস্ত ঘরে স্থাপিত হয় গবেষণাগার। পরে এই ঘরটি কিনে নিয়েছিলেন ডা. অবনীমোহন ভট্টাচার্য।
কিন্তু কিশোরীমোহন শুধুমাত্র সহকারী ছিলেন না, কার্যত তিনি ছিলেন রোনাল্ড রসের সহকারী গবেষক। মশার কামড়ে যে জ্বর হয় সেকথা বাঙালি অনেক আগে থেকেই জানত। তাই মশারির ব্যবহার ছিল আমাদের দেশে। তাছাড়া ঠাকুরদার ডাক্তারখানায় বহু রোগীকে দেখেছেন কিশোরীমোহন। রোগীদের সঙ্গে কথা বলে উপসর্গ, লক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য জোগাড় করার ভার ছিল নাতির উপর। ঠাকুরদার অনুমান ছিল মশার কামড়েই জ্বর হচ্ছে। এসব কথা কিশোরীমোহন জানিয়েছিলেন রোনাল্ড রসকে। অনুমান থেকে রোনাল্ড রস সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।
সিদ্ধান্ত হল স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা-ই ম্যালেরিয়া রোগের কারণ।
এই আবিষ্কারের জন্য ১৯০২ সালে রোনাল্ড রসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরে বাঙালি সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হল। প্রশ্ন হল কিশোরীমোহন ব্রাত্য হলেন কেন? অ-ব্রিটিশ বলে। কি আশ্চর্য, রোনাল্ড রসও তাঁর আত্মজীবনীতে কিশোরীমোহনের অবদানের কথা উল্লেখ করেন নি।
অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হল। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, জগদীশচন্দ্র বসু, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, শিবনাথ শাস্ত্রী, প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছুটে গেলেন ভাইসরয় লর্ড কার্জনের কাছে। তাঁদের দাবি, রোনাল্ড রসের সঙ্গে কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সম্মানিত করা হোক। লর্ড কার্জন আশ্বাস দিলেন প্রতিবাদীদের।
সান্ত্বনা পুরস্কার আর কি!
২০০৩ সালে দিল্লিতে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে কিশোরীমোহনকে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে একটি বিশেষ স্বর্ণপদক দেওয়া হল। পদকের একপিঠে অ্যানোফিলিস মশার ছবি ও কিশোরীমোহনের নাম। প্রায় হাতের সমান বড়মাপের স্বর্ণপদক, যার ওজন ৩ ভরি। সঙ্গে একটি মানপত্র, যাতে সম্রাট ৭ম এডওয়ার্ডের স্বাক্ষর।
কিশোরীমোহনের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিজ্ঞানী ক্রিস্টোফ বোয়েটে। ড. অ্যান এইচ কেলি ও ড. উলি বিজেল ‘বায়োসোসাইটিজ’ পত্রিকার ষষ্ঠ খণ্ডে (২০১১ সালে প্রকাশিত) তাঁদের ‘নেগলেকটেড ম্যালেরিয়াজ : দ্য ফ্রন্টলাইনস অ্যাণ্ড ব্যাক অ্যালিজ অব গ্লোবাল হেল্থ’ গবেষণাপত্রে কিশোরীমোহনের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন যে তাঁকে আশানুরূপ গুরুত্ব দেওয়া হয় নি। ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষ তাঁর ‘দ্য ক্যালকাটা ক্রোমোজম’ উপন্যাসে বলেছেন জাতিবৈষম্যের কারণেই কিশোরীমোহনকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় অনিতেশ চক্রবর্তী লিখেছেন :
‘পদকের ওজন (যে স্বর্ণপদক দেওয়া হয় কিশোরীমোহনকে) যতই হোক, তা নোবেল পদক নয়। ইতিহাসও তাই ম্যালেরিয়ার কারণ আবিষ্কারের জন্য রোনাল্ড রসকে মনে রেখেছে, তাঁর সহ-গবেষক কিশোরীমোহনকে রাখে নি। নোবেল-প্রাপ্তির ইতিহাসে একই গবেষণার জন্য যৌথভাবে নোবেল পেয়েছেন অনেকে। কিন্তু কিশোরীমোহন সেই সৌভাগ্যবানদের দলে পড়েন না। প্রথম ব্রিটিশ নোবেল-প্রাপকের সঙ্গে তাঁর নাম জুড়ে যাক, চান নি ঔপনিবেশিক প্রভুরা। তাই তাঁর নাম সুপারিশই করা হয় নি। ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া পদক আদতে সান্ত্বনা পুরস্কার ছাড়া আর কিছুই ছিল না।’
এই বৈষম্যে আহত হয়েছিলেন কিশোরীমোহন। কিন্তু নিশ্চেষ্ট হয়ে যান নি। রোনাল্ড রস দেশে ফিরে যাবার পরে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষের মনে ম্যালেরিয়া সচেতনতা জাগাতে চেষ্টা করে গেছেন। ম্যালেরিয়া প্রচারের সময় তিনি প্রোজেক্টারের সাহায্যে স্লাইড দেখাতেন। সেই সব স্লাইড তৈরি করতে সাহায্য করতেন বাংলার প্রথম পেশাদার ফটোগ্রাফার লক্ষ্মীনারায়ণ চৌধুরী। মশারির ব্যবহার বাড়াতে, তাঁতিদের মশারি তৈরি করতে উৎসাহ দিতেন। এসব করতে গিয়ে দেখেছিলেন গ্রামবাসীদের আর্থিক দুরবস্থা। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে তাই তৈরি করেছিলেন পানিহাটি কো-অপারেটিভ। সে প্রতিষ্ঠান আজও বেঁচে আছে। কিন্তু পানিহাটিবাসী তথা বঙ্গবাসী বিস্মৃত হয়েছে কিশোরীমোহনকে। তাঁর নামে একটি রাস্তা আছে পানিহাটিতে। সে রাস্তা কি স্মরণ করায় তাঁর বিস্ময়কর কাহিনি?
অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য পেয়ে সম্মৃদ্ধ হলাম।
আপনার কাছে আরও অনেক কিছু সোনার ও জানার ইচ্ছা রইলো।