
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সুকান্ত ভট্টাচার্য এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নাম। তাঁকে বলা হয় গণমানুষের কবি — কারণ তাঁর কবিতার মূল সুরই ছিল অসহায়, নিপীড়িত ও সর্বহারা মানুষের জীবনসংগ্রাম। মানুষের সুখ-দুঃখ, বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের লড়াই তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রে স্থান পেয়েছে।
বাংলা কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য নজরুলের পথরেখা ধরেই আবির্ভূত হয়েছেন। নজরুলের কাছে তাঁর ঋণ আছে। তবে নজরুল ও সুকান্তের মধ্যে পার্থক্যও আছে। প্রথম পার্থক্য রাজনৈতিক মতাদর্শের। দ্বিতীয় পার্থক্য নন্দনের। রাজনৈতিক মতাদর্শই সুকান্ত ও নজরুলের কবিতার মধ্যকার নন্দনতাত্ত্বিক পার্থক্য সূচিত করেছে। নজরুলের কাব্যজীবনের শুরুতে যে কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা শুরু হয়েছিল, তার বিকাশ ও মজবুত সাংগঠনিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সুকান্ত ভট্টাচার্যের বেড়ে ওঠার সময়ে। ফলে সুকান্ত ও নজরুল ভিন্ন হতে বাধ্য।
সুকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির কনিষ্ঠ সদস্য। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ফলে তাঁর কবিতা নজরুলের মতো গরিবের জন্য সহানুভূতি বা উদার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে মার্ক্সবাদী সাহিত্যের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো সুকান্তও শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ধনী মহাজন ও অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে তাঁর কলম ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী অস্ত্র। সমাজের শ্রেণিবৈষম্য দূর করে মানবতার প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন —
“বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারই দিনপঞ্জিকা লিখে।”
সুকান্ত বিশ্বাস করতেন, বিদ্রোহের জাগরণ ছাড়া অবহেলিত মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। তাই তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে বিদ্রোহের আহ্বান। তবে তাঁর বিদ্রোহ ধ্বংসাত্মক ছিল না; বরং তা ছিল নির্মাণের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ।
মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত সুকান্ত বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তাঁর কবিতায় গণমানুষের প্রতি গভীর মমতা ও সহমর্মিতা প্রকাশ পেয়েছে। বিষয়বৈচিত্র্য ও ভাষার সহজতা তাঁর কবিতাকে করেছে অনন্য। তিনি সাধারণ বস্তুকেও কবিতার বিষয় করে তুলেছেন। যেমন ‘সিঁড়ি’ কবিতায় তিনি সমাজের শ্রেণিবৈষম্যকে অত্যন্ত সহজ অথচ তীব্র প্রতীকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন —
“আমরা সিঁড়ি,
তোমরা আমাদের মাড়িয়ে
প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,
তারপর ফিরেও তাকাও না পিছনের দিকে।”
এই কয়েকটি লাইনের মধ্যেই তিনি শোষণ ও বঞ্চনার গভীর সত্য প্রকাশ করেছেন।
সুকান্তের কবিতা শুধু বাস্তবতার প্রতিফলন নয়, এটি সংগ্রামের প্রেরণাও জোগায়। জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা মোকাবিলার সাহস তাঁর কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তিতে মানবমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আহ্বান তাঁর কাব্যে সুস্পষ্ট। তাই তিনি লেখেন —
“আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়,
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়,
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা।”
স্বল্পায়ু জীবন সত্ত্বেও তিনি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন অনন্য অবদানে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখ দিকপাল কবিদের ভিড়েও তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এই সব মহান কবি-সাহিত্যিকদের ভিড়ের মাঝেও সুকান্ত উল্কার বেগে আবির্ভূত হয়ে নতুন সাজে কবিতার ডালি সাজিয়েছিলেন। কবিতার মাধ্যমে তিনি অবাক পৃথিবীর স্বতন্ত্র রূপ অনুভব করে বলে উঠেছেন —
“অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি!
জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশভূমি!”
এমন স্বাভাবিক ও শক্তিশালী অভিব্যক্তিতে পৃথিবীর সর্বজনীন বিস্ময় খুব কম লেখনিতেই ধরা পড়েছে।
নব চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে সুকান্ত দুঃখী মানুষের অন্তর মহলে পৌঁছে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের কথা, খেটে খাওয়া মানুষের ব্যথা — স্বতন্ত্র উপমা, শব্দ ও উচ্চারণে তাঁর কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিটি জীবনকে তিনি আশার আলো দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ‘হে মহাজীবন’ কবিতায় তিনি জীবনকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন —
“হে মহাজীবন, আর এ কাব্য নয়,
এবার কঠিন, কঠোর গদ্যে আনো,
পদ্য লালিত্যের ঝংকার মুছে যাক,
গদ্যের কড়া হাতুড়িকে আজ হানো।”
সুকান্তের কবিতায় অন্যায়, অবিচার ও শোষণের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, একদিন এদেশে বিপ্লব ঘটবেই, এবং সেই বিপ্লবের কণ্ঠস্বরই তাঁর কবিতায় প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন —
“বেজে উঠলো কি সময়ের ঘড়ি,
এসো তবে আজ বিদ্রোহ করি।”
তারপর বলেছেন —
“দেখবো, ওপরে আজও কারা,
খসাব আঘাতে আকাশের তারা,
সারা দুনিয়াকে দেব শেষ নাড়া,
ছড়াবো ধান।”
তাঁর লেখনী আজও পাঠকদের উদ্দীপ্ত করে, সাহস জোগায় এবং সংগ্রামের পথে আহ্বান জানায়।
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত জীবন তাঁকে দিয়েছিল গভীর উপলব্ধি। তাই তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে দরিদ্র মানুষের অন্তরের ভাষা। পূর্ণিমার চাঁদকে তিনি যখন ‘ঝলসানো রুটি’র সঙ্গে তুলনা করেন, তখন তাঁর বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গির তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সুকান্ত সত্যিই গণমানুষের কবি। জনগণকে যন্ত্রণামুক্ত করে জাগিয়ে তুলতে গিয়ে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন —
“আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন ভাঙা নৌকার পাল,
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল,
ভাঙা ঘর ফাঁকা ভিটেতে জমছে নির্জনতার কালো,
হে মহামানব, এখানে শুকনো পাতার আগুন জ্বালো।”
আজও যখন সমাজে বৈষম্য, অবিচার এবং সংগ্রাম বিদ্যমান, তখন সুকান্তের কবিতা নতুন করে পড়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়। তাঁর কণ্ঠস্বর আমাদের মনে করিয়ে দেয় — নীরবতা নয়, প্রতিবাদই মানবতার পথ।
সুকান্ত ভট্টাচার্য মাত্র একুশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি যা সৃষ্টি করে গেছেন, তা অনেক সাহিত্যিকের পক্ষে সম্ভব হয়নি। বুদ্ধদেব বসু সুকান্ত সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘কবি হওয়ার জন্যই জন্মেছিল সুকান্ত, কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হলো।’ কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর ভাষায় এই ‘না হতে পারা’ কবিই ক্ষণিকের জীবনে যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা আজ হাজারো কবির আরাধ্য।
আজকের আধুনিক ভোগবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজে, যেখানে বৈষম্য ও অন্যায় নতুন নতুন রূপে শেকড় পোঁড়ায়, সেখানে সুকান্তের কবিতা আমাদের মানবিক হতে শেখায়। শেখায় কীভাবে চোখ বুজে না থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হয়, কীভাবে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করে শোষিত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই বার্তা আজও যেন বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়-
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।”
পরিশেষে বলা যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য শুধু একজন কবি নন — তিনি একটি যুগের কণ্ঠস্বর, একটি আন্দোলনের প্রতীক। তাঁর কবিতা আজও মানুষকে জাগায়, সাহস দেয় এবং নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখায়। গণমানুষের দুঃখ-কষ্টকে নিজের করে নিয়ে যিনি কলম ধরেছিলেন, তিনিই সত্যিকার অর্থে গণমানুষের কবি।
কবির জন্মদিনে তার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। সুকান্ত কোনো অতীতের চরিত্র নন, তিনি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের অবিনাশী অনুপ্রেরণা।