এ বছর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্মশতবর্ষ (১৯২৬-১৯৪৭)। আর এ বছরই …। ব্যাপারটা কি কাকতালীয়? এ বছর আর কি? সেটা বলার আগে সুকান্তের কথা বলি। কি তাঁর কবিতার মূলমন্ত্র? মূলমন্ত্র হল অন্যায়, অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; মনুষ্যত্ববিরোধী সমূহ কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের আহ্বান। আজ যাঁরা সুকান্তের ছবিতে জুতোর মালা পরাচ্ছেন, তাঁরা কবিতা যেমন বোঝেন না তেমনি বোঝেন না মানবতার সুর। কাকতালীয় ব্যাপারটা বলার আগে সুকান্তের ‘অনুভব’ কবিতাটি একবার পড়ে নেওয়া দরকার :
বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,
এত বিদ্রোহ কখনও দেখেনি কেউ,
দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ;
স্বপ্নচূড়ার থেকে নেমে এসো সব—
শুনেছ? শুনেছ উদ্দাম কলরব?…
আমার লেখার শিরোনামে আমি সুকান্তের কবিতার লাইন ব্যবহার করেছি। ‘দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ’। আজ, এই ২০২৬ সালে ভারতের দিকে দিকে অবাধ্যতার ঢেউ উঠছে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। আর এবছরই বিদ্রোহী কবির জন্মশতবর্ষ। এটাই কাকতালীয়।
স্বাধীনতার এত বছর পরে শুধু কি এই সরকারের বিরুদ্ধে অবাধ্যতার ঢেউ? না, তা নয়। বিক্ষোভ, বিদ্রোহ আগেও হয়েছে। তবে তার পরিসর ছিল স্থানিক বা সীমাবদ্ধ। বিধানসভায় হয়েছে, লোকসভায় হয়েছে, বিরোধী দলের মিছিল ও জনসভায় হয়েছে। কিন্তু দলহীন যুবক-যুবতীদের এমন বিক্ষোভ এর আগে দেখা যায় নি। এই বিক্ষোভকে দমাতে বা কলঙ্কিত করতে শাসকের চেষ্টার ত্রূটি ছিল না। বলা হল এরা বিদেশি অর্থে মদতপুষ্ট। বাংলাদেশের ও নেপালের জেন জি বিক্ষোভের সমানধর্মী বলা হল। কিন্তু বিদেশি অর্থাগমের প্রমাণ দিতে পারল না সরকার। এখানকার বিদ্রোহী যুবশক্তি সংবিধান হাতে নিয়ে, বাবা সাহেব আম্বেদকরকে মাথায় নিয়ে নেমেছে রাস্তায়; লুটপাট ভাঙচুরের নৈরাজ্য তাদের নেই। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন গোটা সিস্টেমের মূলোচ্ছেদ চাইছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ বা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সিস্টেমের অবলুপ্তি।
আমাদের দেশের জেন জি-রা একটা মিথকে টুকরো টুকরো করে মিশিয়ে দিয়েছে মাটিতে। ‘মোদি- মিথে’র কথা বলছি। তাঁর দল তাঁর ভাবমূর্তিকে মালবীয় নেতৃত্বে ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ করে তুলেছিল। বলেছিল — ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’। সে প্রচার গড়াতে গড়াতে তিনি হয়ে গেলেন নন-বায়োলজিক্যাল, মানে ঈশ্বর স্বয়ং। যিনি ঈশ্বর তিনি তো অবশ্যই বিশ্বগুরু। সুতরাং, চূড়ান্ত অবৈজ্ঞানিক কথা বললেও তাকে গ্রাহ্য করতে হবে। অলীক ন্যারেটিভ তৈরি করলেও মানতে হবে তাকে। তিনি এবং তাঁর প্রচারকরা মোদিমোহমুগ্ধ এক পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছিলেন, যার থেকে অন্ধভক্তের জন্ম। আজ জেন জিদের জেদের কাছে জব্দ সেই অন্ধভক্তি। সমাজ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এত ট্রোল, এত বিদ্রূপ এর আগে কোনদিন দেখা যায় নি।
শুধু ‘মোদি-মিথ’ কেন, তার সঙ্গে ছিল ‘চাণক্য-মিথ’। মন্ত্রীসভার দ্বিতীয় ব্যক্তিকে সংবাদ মাধ্যম বলত চাণক্য। মানে কূট কৌশলী। কি সেই কূটকৌশল? ক্ষমতা লাভের জন্য, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ছল-বল-কৌশলের প্রয়োগ। এজেন্সির ব্যবহার, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে তাঁবে রাখা, দল ভাঙানো, দল -ভেঙে -আসাদের নিজের দলের সমর্থনে রাখা। জেন জি-রা সেই চাণক্যকে হতভম্ব করে দিয়েছে। উনি তাদের উল্টো ঝুলিয়ে সিধা করা তো দূরের কথা, প্রতিবাদও করতে পারছেন না।
স্নেহভাজন সঞ্জয় ভট্টাচার্য বলেছেন জেন জি-রা ‘দেশের মধ্যে থাকা পরজীবী বৌদ্ধিক formal media-র হাঁড়িটা ফাটিয়ে দিয়েছে জনসমক্ষে। যে কাজগুলো আমাদের মতো বৃদ্ধ রাজনৈতিক লিবারেল বিতার্কিকেরা দিনের পর দিন কলম শব্দ আর হতাশা খরচ করেও করতে পারি নি, এরা এই অপরাজেয় সংবাদ মাধ্যমের credibility-টাই ছিনিয়ে নিয়েছে।’ তাই তো আজ গোদি মিডিয়ার সাংবাদিকদের বড় ভয়, আর সেই ভয়েই ভয়-মিছিল।
কিন্তু শুধু গোদি মিডিয়া নয়, বোধ হয় ভয় ধরেছে বিচার ব্যবস্থার ধারক ও বাহকদের। রায় দিয়ে আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন না তাঁরা। মনে পড়বে জেন জির জন্মের কথা। অভিজিৎ দীপকে নামে এক অখ্যাত যুবকের সেই আহ্বান : ‘আরশোলারা যদি একজোট হয়!’ কি আশ্চর্য, সেটা আর কথার কথা রইল না। এক জোট হয়ে গেল নানা জাতের, নানা ধর্মের, নানা রাজ্যের আরশোলারা। ধর্মের মিথটাও টুকরো টুকরো করে দিল তারা। বুঝিয়ে দিল হিন্দুরা খতরে মে নয়, খতরে মে হ্যায় এ দেশের মানুষ।
অনেক কিছুই ভেঙে টুকরো করে দিল জেন জি-রা। বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও, ভাঙো …। কিন্তু ভাঙনের জয়গান গাইলেই হয় না, সৃষ্টিরও তো দরকার। সে কাজ বিরোধী রাজনৈতিক দলের। পারবেন কি তাঁরা সব ইগো, সব সংস্কার আর সব স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশগড়ার সাধারণ কর্মসূচিতে হাত লাগাতে? না পারলে, মনে রাখবেন, জেন জির পরে আসছে আলফারা। শেষ করি সুকান্তকে দিয়ে :
স্বপ্নচূড়ার থেকে নেমে এসো সব
শুনেছ? শুনেছ উদ্দাম কলরব?