২৫. একটা বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই খাজনা বা রাজস্ব আরোপের ভিত্তি ছিল মুঘল শাসনব্যবস্থায় অপরিচিত নীতিমালা; এবং ১৭২৮-এ এই অতিরিক্ত রাজস্ব যার সাথে যুক্ত করা হয়েছিল, সেই ‘তুমার জমা’ বা প্রমিত রাজস্বের standard assessment পরিমাণ ছিল ১,৪২,৪৫,৫৬১ টাকা। ১৪৬ বছরের ব্যবধানে টোডর মল নির্ধারিত ১,০৬,৯৩,১৫২ টাকার রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়ে ১,৪২,৪৫,৫৬১ টাকায় দাঁড়াল। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, নতুন অধিকৃত অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত ১৪,৩৫,৫৯৩ টাকার রাজস্ব এই পার্থক্যের একটি অংশ।
২৬. ১,১৬,২০,৯৮৯-এর সাথে ১৭২২-এ জাফর খান (মুর্শিদকুলি খান) আরোপিত ২,৫৮,৮৫৭ টাকার রাজস্ব যুক্ত করলে যে সমষ্টি পাওয়া যায়, তা-ই হলো ‘সুবাদারি আবওয়াব’ বা সুবাদারসুলভ রাজস্ব নির্ভর মোট বৃদ্ধির পরিমাণ; ‘সারসংক্ষেপ’-এ (পরিশিষ্ট, নং ১) উল্লিখিত বিবরণ অনুযায়ী এই করব্যবস্থা বারোটি প্রধান খাতের সমন্বয়ে গঠিত ছিল।
২৭. ১৭২২ থেকে সরকারি রাজস্বের দাবির যে বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছিল তার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কেবল এটুকু বলা যথেষ্ট হবে না যে, জাফর খানের আমলে বাংলার রাজস্বের পরিমাণ কম ধরা হয়েছিল; এই দাবির সপক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা যুক্তি থাকা প্রয়োজন। ওই নাজিমের কঠোর আর নির্মম স্বভাব, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের কড়াকড়ি, কঠোরভাবে তা কার্যকর করার প্রবণতা এবং তাঁর স্বীকৃত কর্মদক্ষতা — এসবই বরং বিপরীত ধারণারই ইঙ্গিত দেয়। অবশ্য যদি বিপরীত মতটিই গ্রহণ করা হয়, তবে একই সাথে তাঁর রাজনৈতিক সংযমের বিষয়টিও স্বীকার করে নিতে হবে।
২৮. তবে এমন কথা বলা যেতে পারে যে, পরবর্তী একচল্লিশ বছরে সম্পদ, কৃষি আর জনসংখ্যার নিরিখে দেশের যে উন্নতি হয়েছিল, তা নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি করেছিল। এই ভিত্তিটি মেনে নিলেও — যার প্রকৃত ব্যাপ্তি অবশ্য নিরূপণ করা প্রয়োজন — সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে হতে পারে; কিন্তু সুজার উত্তরসূরি সরফরাজ খানের অযোগ্যতা, আলীবর্দীর যুদ্ধবিগ্রহ, সিরাজউদ্দৌলার স্বৈরাচার আর অনভিজ্ঞতা, মীর জাফরের দুর্বলতা, অজ্ঞতা, বিলাসিতা এবং কাসিম আলীর সহিংসতা আর অর্থলুণ্টনের ঘটনাগুলো ওই ভিত্তিকে সমর্থন করার পরিবর্তে বরং নস্যাৎই করে। আর যে প্রেক্ষাপটেই হোক না কেন, অন্য সব যুক্তির বিপরীতে এই বিষয়গুলোও যে বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে, তা অনস্বীকার্য। সুজার শাসনব্যবস্থা ছিল পরিমিত, দৃঢ় এবং সতর্ক। সমগ্র সময়কালের মধ্যে — সম্ভবত আলীবর্দী খানের শেষ কয়েক বছর বাদে — এটিই ছিল একমাত্র সময় যখন সরকারের কার্যকলাপ কোনো না কোনোভাবে দেশের উন্নতির লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছিল।
২৯. কেবল রাজস্ব বৃদ্ধির পরিমাণ খতিয়ে দেখাই যথেষ্ট নয়; বরং কী নীতির ভিত্তিতে এই দাবি করা হয়েছিল এবং কী পদ্ধতিতে তা আরোপ করা হয়েছিল, সে বিষয়গুলোও আমাদের মনোযোগ সহকারে বিবেচনা করতে হবে। এই পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রচলিত রীতিনীতির এমন এক বিচ্যুতি বা ব্যত্যয় বেরিয়ে আসবে, যা বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বহু সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম।
৩০. তৈমুরী ও আকবরী শাসনবিধি, সম্রাটদের জারি করা নির্দেশাবলি এবং তাঁদের প্রতিনিধিদের কার্যকলাপ থেকে মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার যে নীতি সম্পর্কে আমরা ধারণা পাই — বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা যতই সীমাবদ্ধ হোক না কেন — তার মূল লক্ষ্য ছিল বর্ধিত কৃষিকাজ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে উদ্ভূত সুফলের একটি অংশ সম্রাটের জন্য নিশ্চিত করা। চাষাবাদ আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি যখনই নজরে আসত, তখনই ‘তুমার’ বা প্রমিত রাজস্ব-নির্ধারণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হতো। এই নীতির ন্যায্যতা বা যৌক্তিকতা যা-ই হোক না কেন, এর প্রয়োগপদ্ধতির একটা অন্তত বিশেষ গুণ ছিল, তা দেশের প্রকৃত ও বিদ্যমান সম্পদের সঠিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল।
৩১. এই নীতিগুলোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের নিযুক্ত করা হয়, যাদের কাজ ছিল জমি, এর খাজনা আর ফসল সংক্রান্ত সমস্ত লেনদেন পর্যবেক্ষণ আর নথিবদ্ধ করা; চাষাবাদের পরিমাণ বাড়লে বা কমলে — উভয় ক্ষেত্রেই তা লিপিবদ্ধ করা বাধ্যতামূলক ছিল।
৩২. এই পরিস্থিতিতে একজন জমিদারের থেকে বাড়তি রাজস্ব আদায় করা হলে তা তাঁর মুনাফাকে প্রভাবিত করত ঠিকই, কিন্তু রায়তদের (কৃষকদের) ওপর ধার্য হারে কোনো পরিবর্তন আনত না; তিনি তাঁর জমিতে করা উন্নয়নমূলক কাজের ফলে প্রাপ্ত বাড়তি খাজনার একটি অংশ পরিশোধ করতেন, কিন্তু এই দাবির কারণে কৃষকদের ওপর খাজনার হার বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি হতো না। এই বাড়তি দাবি ‘তুমার’ বা প্রমিত রাজস্ব নির্ধারণের (standard assessment) পরিমাণ বাড়িয়ে দিত; জাফর খানের তদন্তের ফলে এই নির্ধারিত রাজস্বের পরিমাণ ১১,৭২,২৭৯ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
৩৩. কিন্তু ১৭২৮-এর পর থেকে খাজনার যে বৃদ্ধি ঘটে — যা আজ ‘আবওয়াব-ই-সুবাদারি’ বা সুবাদার-প্রবর্তিত অতিরিক্ত আবওয়াব বা অতিরিক্ত খাজনা হিসেবে পরিচিত — তার প্রভাব ছিল বিপরীতমুখী; কারণ এগুলোর ফলে খাজনার হার বেড়েছিল। সাধারণত মূল নির্ধারিত রাজস্বের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট অনুপাতে এই অতিরিক্ত আবওয়াবগুলো ধার্য করা হতো। যেসব জমিদার তাদের নিজ নিজ প্রজার কাছ থেকে — প্রজাদের প্রদেয় খাজনার পরিমাণের অনুপাতে এই কর পরিশোধ করতেন, — সেই একই হারে তা আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। যেমন, ‘সারফ-ই-সিক্কা’ (serf sicca) নামক করটি আবওয়াব আর খাজনার হার প্রতি শতকে নয় টাকা ছয় আনা পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। যেসব ক্ষেত্রে এই অনুপাত সুনির্দিষ্ট ছিল না, সেখানে রাজস্বের দাবি মূলত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ইচ্ছাধীন ছিল; আর যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ আংশিক হওয়ার কথা ছিল, যেখানে সরকারের পক্ষে এমন কোনো দাবি না থাকলেও, নিম্নপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়শই এমন সব ক্ষেত্রে সেই সব আবওয়াব আদায় করতেন।
৩৪. জাফর খানই ছিলেন এই নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তক; এর পরিণাম সম্ভবত তিনি আগে থেকে আঁচ করতে পারেননি। তিনি যে আবওয়াব আরোপ করে এই নজির স্থাপন করেছিলেন, তার পরিমাণ ছিল সামান্য এবং আপাতদৃষ্টিতে তা ‘খালসা’ (সরকারি রাজস্ব বিভাগ)-র কর্মকর্তাদের পারিশ্রমিক বা ফি হিসেবেই ধার্য করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই ধরনের আবওয়াব আরোপের মাত্রা কতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল, তা আমি আগেই দেখিয়েছি।
৩৫. টোডর মলের সময়কাল থেকে জাফর খানের শাসনকাল পর্যন্ত বাণিজ্য ও নগদ অর্থের specie পরিমাণ বৃদ্ধির যুক্তিতে করের হার বাড়ানোর বিষয় সমর্থনযোগ্য হতে পারে; যদিও জাফর খানের কার্যকলাপ থেকে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে — বরং তাঁর উত্তরসূরি সুজার কার্যকলাপই এই ধারণাকে সমর্থন করে। তবে এই ব্যবস্থাটি কার্যকর করার পদ্ধতি ছিল অসাংবিধানিক এবং এর অপব্যবহারের ব্যাপক সম্ভাবনা ছিল — যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রমাণিত হয়েছে।
৩৬. আমি এখন সেই পরিস্থিতিগুলো ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব যা সম্ভবত নাজিমদের মনে এই কার্যক্রমের ধারণা ও বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা জাগিয়েছিল; অন্যথায় এই প্রক্রিয়া হয়তো তার প্রকৃত অনিয়মের মাত্রার চেয়ে কম অস্বাভাবিক মনে হতে পারত।
৩৭. জাফর খানের আমলের অনেক আগে থেকেই, ‘তুমার’ বা প্রমিত রাজস্ব-নির্ধারণের standard assessment অতিরিক্ত হিসেবে বিভিন্ন নামে ও বিপুল পরিমাণে কর বা বাড়তি বোঝা রায়তদের ওপর চাপানো হতো। অনেক জায়গায় এই বাড়তি করগুলোকে মূল রাজস্ব বা ‘আসল’-এর সাথে একীভূত করে ফেলা হয়েছিল এবং পরবর্তী রাজস্ব-নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে এক নতুন মানদণ্ড গ্রহণ করা হয়। যেসব জমিদার আর কর্মকর্তা এই বাড়তি রাজস্ব আদায় করতেন, তাঁরা সরকারের সামনে এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন — যা সরকার জানত এবং সম্ভবত তাতে মৌন সম্মতিও দিয়েছিল। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এমন একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত দাবির তুলনায় ওই অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি; কারণ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে একের পর এক বাড়তি কর চাপানো হলেও রাষ্ট্রের মূল দাবির পরিমাণ সে অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। [টিকা ১]
৩৮. আমার ধারণা, নাজিমরা যে সময়ে তাঁদের আবওয়াবের সংখ্যা আর পরিমাণ বাড়াচ্ছিছিলেন, তখন তাঁরা এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে সেই কাজটা করেছিলেন; তাঁরা রায়তদের ওপর আরোপিত বাড়তি আবওয়াবগুলোকে জমিদার আর নিম্নথাকবন্দীর প্রতিনিধিদের উপার্জনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, এর একটা অংশ নিজেরা আদায় করার অধিকার তাঁদেরও রয়েছে।
৩৯. ঘটনা বা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে তাদের তুলে ধরা যুক্তিটাকে সে সময়ের জন্য উপযুক্ত যুক্তি হিশেবে মেনে নিলেও, তাদের একটা ভিন্ন এক কর্মপন্থা অনুসরণ করা উচিত ছিল; তাদের প্রথমেই যাচাই করে নেওয়া দরকার ছিল, কোনো রকম চরম দুর্দশা ছাড়াই রায়তরা জমিদারদের আরোপিত কর বা দাবি মেটাতে সক্ষম কি না, এবং যেসব আবওয়াব ছিল নিপীড়নমূলক ও অনেকটাই বেশি রকমের, সেগুলো বাতিল করা দরকার ছিল। আর যখন তারা এই খাজনা বা ফসলের অংশ নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন যেসব আবওয়াব তারা বহাল রাখতে চেয়েছিলেন সেগুলোকে নিজেদের কর্তৃত্ববলে বৈধতা দেওয়া এবং একই নামে প্রয়োজনীয় অর্থ দাবি করা উচিত ছিল; অথবা যেখানে তারা নতুন কোনো রাজস্ব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন, সেখানে সেগুলোকে একমাত্র বৈধ কর হিসেবে ঘোষণা করা উচিত ছিল। এর ফলে রায়তদের ওপর আরোপিত খাজনার বোঝা যৌক্তিক সীমায় আবদ্ধ রাখা সম্ভব হতো; কিন্তু এই বিষয়গুলো হয়তো তাদের চিন্তায় আসেনি অথবা তারা এগুলোর কোনো গুরুত্বই দেননি। নাজিমরা জমিদারদের ওপর নতুন রাজস্ব আরোপ করতেন, আর জমিদাররা — ইতিপূর্বে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থের পাশাপাশি — রায়তদের থেকে সেই নতুন করের পুরো বা আংশিক অর্থ আদায় করতেন। এভাবে, জমিদাররা ইতিমধ্যে যে পরিমাণ অর্থ (বা তার চেয়েও বেশি) আদায় করছেন — এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে নাজিমরা যখন ‘তুমার’ বা মূল নির্ধারিত রাজস্বের ওপর ২৫ শতাংশ বাড়তি অর্থ আদায়ের চেষ্টা করলেন, তখন কার্যত তারা জমিদারদের হাতেই রায়তদের ওপর সমপরিমাণ নতুন দাবি চাপানোর সুযোগ আর স্বাধীনতা তুলে দিলেন — যা ইতিমধ্যে আরোপিত অতিরিক্ত করের ওপর বাড়তি বোঝা হিসেবে যুক্ত হলো। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিশদ হিসাব-নিকাশ এই ব্যাখ্যার সত্যতা প্রমাণ করে এবং দেখায় যে, বাস্তবে কর আদায়ের এই প্রক্রিয়া জমিদারদের প্রকৃত বা আনুমানিক আদায়ের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
টিকা ১
এই স্তবক ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে জেমস গ্র্যান্টের রাজস্ব বিশ্লেষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা মূলত মুঘল আমলের রাজস্ব ব্যবস্থার জটিল প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করছে। মাত্যহায় রাখতে হবে ব্রিটিশ আমলে এসে গ্র্যান্টআরও শোরের মধ্যে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছিল এই রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াটি।
৩৭ স্তবকের মূল বক্তব্য হলো —
১। ‘আসল’ রাজস্বের ওপর বাড়তি কর (আবওয়াব) চাপানো — মুঘল আমলে রাজস্বের ‘আসল’ বা ‘তুমার জুমা’ মূল খাজনা-তালিকা ছিল। এই রেন্ট রোল টোডরমলের করা বাংলা ভূখণ্ডজুড়ে মুঘল জরিপের ভিত্তিতে নির্ধারন করা হয়েছিল। কিন্তু এই নির্ধারিত রাজস্বের ওপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে — যেমন ফৌজদারি আবওয়াব, চৌথ মারহাট্টা, নজরানা ইত্যাদি — বিপুল পরিমাণ বাড়তি কর (আবওয়াব) চাপানো হতো। এই আবওয়াবগুলো মূলত স্থানীয় প্রশাসন, সামরিক ব্যয়, নবাবের খরচ, এমনকি মারাঠা আক্রমণ ঠেকানোর সময় ধার্য করা হতো (যেমন চৌথ)।
২। বাড়তি খাজনার একীভূতকরণ — এই বাড়তি করগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল রাজস্বের সঙ্গে একজোট করে ফেলা হয়। অর্থাৎ, যেসব আবওয়াব বা খাজনা একসময় ‘অস্থায়ী’ বা ‘অতিরিক্ত’ ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে রাজস্বের স্থায়ী অংশে পরিণত হয়। ফলে পরবর্তী রাজস্ব-নির্ধারণের সময় পুরোনো ‘আসল’ জুমার পরিবর্তে এই নতুন, বাড়তি কর-সহিত মোট রাজস্বকেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হতো। এভাবেই রাজস্বের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে, যা ফিফথ রিপোর্টের ছবি-১ ও ২-তে দেখানো হয়েছে — যেখানে ১৫৮২-এর ১,০৬,৯৩,১৫২ টাকা থেকে ১৭৬৩-এ তা দাঁড়ায় ২,৫৬,২৪,২২৩ টাকায়।
৩। জমিদার ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা কি ছিল — যেসব জমিদার ও কর্মকর্তা এই বাড়তি খজনা আদায় করতেন, তারা সরকারের কাছে এই প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক আর চালু রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। সরকারও এই বাড়তি রাজস্ব আদায়ের বিষয় জানত এবং সম্ভবত তা মৌনভাবে অনুমোদনও করত। কারণ এই আবওয়াবগুলো মোট রাজস্ব বাড়ানোর অন্যতম সহজ উপায় ছিল — যার ফলে কৃষকদের ওপর সরাসরি নতুন বোঝা চাপানোর প্রয়োজন পড়ত না, বরং পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যেই বাড়তি রাজস্ব আদায় করা যেত।
৪। ‘গোপন সম্পদ’-এর ধারণা — এই প্রক্রিয়ার ফলে স্বাভাবিকভাবেই একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল যে, রাষ্ট্র রাজস্ব আদায়ের যে নির্ধারিত দাবি করেছে, তার তুলনায় ওই অঞ্চল থেকে পাওয়া প্রকৃত আয়ের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ার কথা ছিল। কারণ অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে একের পর এক বাড়তি কর চাপানো হলেও রাষ্ট্রের মূল দাবির পরিমাণ (আসল জুমা) সে অনুপাতে বাড়ানো হয়নি। অর্থাৎ, মূল্যায়নের ভিত্তি ছিল পুরোনো, অথচ আদায় হচ্ছিল অনেক বেশি। এটাই গ্র্যান্টের মূল যুক্তির ভিত্তি — যে বাংলার রাজস্ব ‘আন্ডার-অ্যাসেসড’ (কম মূল্যায়িত)।
৫। গ্র্যান্ট ও শোরের বিতর্কের প্রেক্ষাপট — গ্র্যান্ট এই ধারণার ভিত্তিতেই বলেন যে বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে, জন শোরের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য ছিল এই বাড়তি আবওয়াবগুলোই কৃষকদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনার প্রমাণ, এবং এই পরিমান আরও বাড়ালে বিপর্যয় হবে। শোরের মতে, কাগজে লেখা রাজস্বের পরিমান আর আদায়যোগ্য রাজস্ব এক নয় — গ্র্যান্ট যে ঐতিহাসিক নথির ওপর নির্ভর করেছেন, শোর সেই নথির বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ফলে আমরা বলতে পারি, এই ৩৭ স্তবক মূলত মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার এমন এক প্রক্রিয়ার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে, যেখানে বাড়তি আবওয়াবগুলো মূল রাজস্বের সঙ্গে জুড়েগিয়ে রাজস্বের পরিমাণ সময়ে সময়ে ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এই প্রক্রিয়াই গ্র্যান্টকে ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’-এর যুক্তি তুলে ধরতে সাহায্য করেছে, যা ব্রিটিশ রাজস্ব বৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করেছিল — যদিও শোর এর বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ