Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নুসরাত সুলতানা-র ছোটগল্প ‘ইনকিউবেটর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রথ নিয়ে বাংলা প্রবাদ ও তার সামাজিক তাৎপর্য : অসিত দাস মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-র ছোটগল্প ‘গোধূলির চিতায়’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৪২ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬

জনগণ কথিত ক্ষীণদৃষ্টি পরিচারিকা ও টেরা-চোখ বাটলারের ধাক্কা লাগার চুটকুলাটা এখানে উল্লেখ করলে হয়তো খুব একটা দোষের হবে না। আহত আভিজাত্য নিয়ে বাটলার বলে উঠলেন, “কোথায় যাচ্ছেন তা দেখে চলেন না কেন?” জবাবে বেয়াদব মেয়েটি পাল্টা ধমক দিয়ে বলল, “আপনি যেখানে তাকিয়ে আছেন, সেখানে যান না কেন?” (টিকা ১ রূপকের মানে কি) ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নিবদ্ধ গ্রান্টের সাথে পেশাগত দৃষ্টিভঙ্গিনিবদ্ধ শোরের তুমুল সংঘাত বেঁধেছিল। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সমসাময়িক দুই লেখকের মধ্যে মতপার্থক্য বা সংঘাত ছিল মৌল গ্রান্ট বাংলার ইতিহাস ছেনে তার সময়ের প্রশাসকদের জানান বাংলায় রাজস্বের মূল্যায়ন কম করা হয়েছিল এবং শোরের দাবি ছিল মূল্যায়ন অত্যধিক ছিল — উভয়েই একটি অভিন্ন সিদ্ধান্তে উপনীত হন। (টিকা ২ কেন গ্রান্ট অতিরিক্ত খাজনা চাপানোর প্রস্তাব দিলেন) অভিজ্ঞতার আলোকে শোরের পুরো যুক্তিটিই আসলে এই সত্যকে তুলে ধরে যে, কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট পরিপক্বতা সেই অভিজ্ঞতার তখনও হয়নি। চিন্তার জগতে তখনই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়, যখন চিন্তাবিদ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছান যেখানে তিনি নিজের অর্জিত জ্ঞান যাচাই করতে পারেন এবং অকপটে স্বীকার করতে পারেন — “সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রাখার মতো যথেষ্ট জ্ঞান আমার এখনও হয়নি।” চমকপ্রদ সব মন্তব্য বা বক্তব্য সাধারণত চিন্তার অপরিণত বা শৈশবকালীন অবস্থারই পরিচায়ক, পরিপক্ব চিন্তার নয়। শোর তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথিপত্র বা ‘মিনিটস’-এ ঠিক এই অবস্থানটিই গ্রহণ করেছিলেন। জ্ঞানের সেই পরিপক্বতাই — যা এক স্কটিশ ছাত্রের চরম বিরক্তির কারণ হয়েছিল — নেটলশিপকে প্লেটোর একটি দুরূহ অংশের অর্থোদ্ধারে নিজের অক্ষমতার কথা স্বীকার করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ক্ষুব্ধ ছাত্রটি বলে উঠেছিল, “আমাদের বুঝিয়ে বলার জন্যই তো আপনাকে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়!” অথচ নেটলশিপের সেই দ্বিধা বা সংশয় তাঁর প্রাপ্ত পারিশ্রমিকের চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান ছিল। অন্যদিকে গ্রান্ট — যিনি ‘সামান্য ব্যক্তিগত খরচে ও প্রভাব খাটিয়ে’ সংগৃহীত ফারসি নথিপত্রের বিশ খণ্ডের ওপর অত্যধিক নির্ভর করেছিলেন — তাঁকেও শেষ পর্যন্ত একটি বিস্তারিত ‘হস্ত-ও-বুদ’ (বাস্তব উৎপাদন ও রাজস্বের বিশদ জরিপ) ব্যবস্থা প্রবর্তনের সুপারিশ করতে হয়; আর এর মধ্য দিয়েই তিনি স্বীকার করে নেন যে, তাঁর ঐতিহাসিক সমীক্ষাটি এমন কোনো পর্যাপ্ত ভিত্তি তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছিল যার ওপর দাঁড়িয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাবনা পেশ করা সম্ভব।

১৭৬৫ সাল থেকে পরবর্তী বিশ বছর ধরে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকার সুপরিকল্পিত তছরুপ বা আত্মসাৎ ঘটেছিল বলে গ্রান্ট যে দাবি করেছেন, সে বিষয়ে আমরা যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রাখতে পারি। ১৭৭২ সালে কথিত তছরুপের অভিযোগে মুহাম্মদ রেজা খানকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছিল এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছিলেন; অথচ গ্রান্ট তাঁকেই এক বড় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং সুনির্দিষ্টভাবে ২ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনেছেন। (মিঃ অ্যাসকোলি [উদ্ধৃত গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৪৮] উল্লেখ করেছেন যে, ১৭৮৮ সালে ব্যাংকার জগৎ শেঠের কাছে মুহাম্মদ রেজা খানের ৩ লক্ষ টাকা ঋণ ছিল। এ কথাও যোগ করা যেতে পারে যে, ১৭৮৮ সালের মার্চ মাসে তিনি ক্যাপ্টেন টমাস বার্জেসের কাছে ১ লক্ষ ৭ হাজার ৭৩৩ ‘কারেন্ট রুপি’র (Ct. Rs.) বিনিময়ে পুরনো ‘গভর্নমেন্ট হাউস’টি বন্ধক রেখেছিলেন। দ্রষ্টব্য: Bengal: Past and Present, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ১৭৬-৭৭; আরও দেখুন পি. সি. মজুমদার: The Musnud of Murshidabad, পৃষ্ঠা ২১০-১২।) গ্রান্টের যুক্তিটি এই ধারণার ওপর নির্ভরশীল যে, মুঘল আমলে কর-নির্ধারণের মাধ্যমে ধার্যকৃত মোট অর্থ বাস্তবে নিয়মিতভাবে আদায় করা হতো — অথচ এই ধারণাটি টিকিয়ে রাখা কঠিন, বিশেষ করে বর্তমান গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ভূমিকায় দ্বিতীয় অধ্যায়ে যা আলোচনা করা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে। গ্রান্টের ফারসি নথিপত্রগুলোকে যদি খাঁটি বলেও ধরে নেওয়া হয়, তবুও এটি স্পষ্ট যে, তিনি সেগুলোর বিশ্লেষণের জন্য যে প্রত্যক্ষ পদ্ধতি প্রয়োগ করেছেন তা এগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বরং এগুলোকে নগদ অর্থের হিসাবের পরিবর্তে বাজেট বা প্রাক্কলিত হিসাব হিসেবে গণ্য করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। (সিলেটের রাজস্বের মূল্যমান সম্পর্কে গ্রান্টের বক্তব্যের — যা ৩৭৬ পৃষ্ঠায় রয়েছে — সাথে কালেক্টর মাননীয় আর. লিন্ডসের নিম্নলিখিত মন্তব্যটি তুলনা করে দেখুন: ‘মুঘল শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় নির্বাহের ক্ষেত্রে সিলেটের অবদান ছিল নগণ্য বা শূন্যের কোঠায়। বরং উল্টো চিত্রই দেখা যেত; পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আক্রমণ থেকে অঞ্চলটিকে রক্ষার জন্য সরকারের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রচুর অর্থ পাঠানো হতো — অথচ বাস্তবে ওই পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যতটা না শক্তিশালী বা ভীতিকর ছিল, তাদের সম্পর্কে তার চেয়ে অনেক বেশি অতিরঞ্জিত ধারণা প্রচার করা হতো। সাধারণত নবাবের কোনো নিকটাত্মীয় বা অত্যন্ত বিশ্বস্ত বন্ধুকেই ‘ফৌজদার’ পদে নিযুক্ত করা হতো। কার্যত এই পদটি ছিল তাঁর জন্য এক ধরণের ‘জাগির’; আর সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁর কাছে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করা হতো না — কেবল বাছাই করা কয়েকটি হাতি, চুন, কমলালেবু এবং সুন্দর পালকযুক্ত পাখির বিনিময়েই সন্তুষ্ট থাকা হতো।’ ফার্মিঙ্গার: সিলেট ডিস্ট্রিক্ট রেকর্ডস, খণ্ড ২, নং ২৯৪।)

টিকা ১, ২ ফার্মিঙ্গারের রূপক আর গ্রান্টের বাংলার ভূমি রাজস্ব আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিষয়ে কর্তাদের পেশ করা প্রস্তাব

টিকা ১

গ্রান্টের এই মন্তব্য অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ, তীক্ষ্ণ। তিনি এখানে ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে জেমস গ্র্যান্ট আর জন শোরের (লর্ড টেনমাউথ) মধ্যে রাজস্ব সংক্রান্ত বিতর্ক বোঝাতে রূপকথা ব্যবহার করেছেন —

রূপককের মানে

জনৈক কানা দাসী (short-sighted maid servant) এবং এক টেরা-চোখে বাটলার (cross-eyed butler) বিবাদমান। কোনও এক প্রশ্নের উত্তরে দাসী আহত হয়ে বলেন, “আপনি যেখানে যাচ্ছেন, সেদিকে তাকান না কেন?” বাটলার জবাব দিলেন, “আপনি যেদিকে তাকাচ্ছেন, সেদিকে যান না কেন?” গ্রান্টের এই রূপকথা আড়চোখো বাটলার ও ক্ষীণদৃষ্টির দাসীর গল্প বাংলার রাজস্ব নীতি নিয়ে ফার্মিঙ্গার বা গ্রান্টের কোনো সরাসরি মন্তব্য নয় — বরং ফিফথ রিপোর্টের সম্পাদক ফার্মিঙ্গার এই গল্প ব্যবহার করেছেন জেমস গ্রান্ট ও জন শোরের মধ্যে চলা তীক্ষ্ণ মতবিরোধ বোঝানোর জন্য। আমরা এই প্রসঙ্গ আগেও আলোচনা করেছি। ফার্মিঙ্গার এই গল্প বলেছেন গ্রান্টের ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি আর শোরের পেশাদারি প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সংঘাত তুলে ধরতে। গল্পের দাসী আর বাটলারের পারস্পরিক দোষারোপ যেমন হাস্যকর, তেমনই গ্রান্ট আর শোরের মধ্যে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ নিয়ে তর্কও ছিল যেন দু’টি ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে একই বাস্তবতাকে দেখা।

ফার্মিঙ্গার এই গল্পে গ্রান্ট শোরের অবস্থানকে বিদ্রূপ করেছেন। শোর ছিলেন পেশাদার প্রশাসক — যিনি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা দেখছিলেন। গ্রান্ট বলছেন, শোর দূরে দেখতে পান না short-sighted — তিনি কেবল বর্তমানের কষ্ট দেখেন, অথচ গ্রান্টের ঐতিহাসিক দলিল ফার্সি রাজস্ব নথি অনুযায়ী বাংলার জমি থেকে আরও রাজস্ব আদায়ের সম্ভাবনা ছিল – যেমন মুঘল আমলে কিছু অঞ্চলে রাজস্ব কম আদায় করা হত — ‘under-assessed’। অন্যদিকে, শোরের কাছে গ্রান্ট ছিলেন টেরা-চোখে cross-eyed — যিনি ফার্সি নথির ভিত্তিতে রাজস্ব বৃদ্ধির যে পথ দেখছেন, সেটি বাস্তবে কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে, যেমনটা পরে ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে প্রমাণিত হয়েছিল।

গ্রান্টের বিদ্রূপের স্তরগুলো

পেশাদার বনাম ঐতিহাসিক — ফার্মিঙ্গার যেমনটি বলেছেন, গ্রান্টের সঙ্গে শোরের এই সংঘাত ছিল ‘ঐতিহাসিক পূর্বানুরাগ’ historical pre-occupation আর ‘পেশাদার পূর্বানুরাগ’ professional pre-occupation-এর মধ্যে। গ্রান্টের চোখে শোরের অভিজ্ঞতা কম, আবার শোরের চোখে গ্রান্টের ঐতিহাসিক দলিল অপ্রাসঙ্গিক;

‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ বিতর্ক — গ্রান্টের বক্তব্য ছিল বাংলার কিছু অঞ্চলে রাজস্ব মুঘল আমলের তুলনায় কম, তাই বাড়ানো সম্ভব। শোর বলেছিলেন, বাস্তবে কৃষকরা ইতিমধ্যেই অত্যাচারিত, রাজস্ব বাড়ালে বিপর্যয় হবে। গ্রান্টের রূপক শোরের এই ‘বাস্তববাদী’ দৃষ্টিকে কানা বা সীমিত দৃষ্টি বলেই চিহ্নিত করে;

উপনিবেশিক কর্পোরেট মানসিকতা — গ্রান্টের এই মন্তব্য উপনিবেশিক কর্পোরেট মানসিকতারও প্রতীক — যেখানে ঐতিহাসিক দলিলের ভিত্তিতে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা খোঁজা হয়, কিন্তু প্রজাদের জীবন-দুর্দশার বাস্তবতা উপেক্ষা করা হয়।

গ্রান্টের এই প্রস্তাবে কোম্পানির প্রতি আনুগত্য ও ব্যক্তিগত স্বার্থ উভয়ই কাজ করেছিল বলে আমাদের স্পষ্ট মনে হয়েছে —

উন্নতির বাখান — গ্রান্টের যুক্তি, বাংলার ভূমি রাজস্ব বাড়ানো গেলে কোম্পানির আরও লাভ হবে; তাঁর দৃষ্টিতে সেটাই ছিল ‘উন্নয়ন’;

লুঠের অন্তর্নিহিততা — এই রাজস্ব বৃদ্ধির অর্থই ছিল কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ, যা কার্যত তাদের উৎপাদিত সম্পদ কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার নামান্তর। ফার্মিঙ্গার যেমন বলেছেন, গ্রান্টের প্রস্তাবিত রাজস্ব ‘ঐতিহাসিক দলিলের অন্ধ অনুকরণ’ মাত্র, যেখানে প্রকৃত কৃষকের জীবন-জীবিকা উপেক্ষিত। আর জন শোর এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

খুশি করার প্রবণতা — গ্রান্ট উচ্চপদস্থ কর্তাদের (যারা কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে আগ্রহী) খুশি করতে চেয়েছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত কোম্পানির স্বার্থেই কাজ করেছিল।

ফার্মিঙ্গারের মন্তব্যের সঙ্গে সম্পর্ক

ফার্মিঙ্গার ঠিকই বলেছেন — গ্রান্ট ও শোর উভয়েই শেষ পর্যন্ত একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন (যদিও ভিন্ন পথে)। গ্রান্টের এই রূপক সেই সংঘাতেরই বুদ্ধিদীপ্ত, কটাক্ষপূর্ণ সারসংক্ষেপ। গ্রান্ট শোরের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন, কিন্তু নিজেও সেই ফার্সি নথির সীমাবদ্ধতা কম খরচে নথি সংগ্রহের বাস্তবতাকে নজরান্দাজ করেছেন — ফার্মিঙ্গারের মতে, মোমবাতির দুপ্রান্তে জ্বালিয়ে বেশি আলো ছড়ানোর চেষ্টা।

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে গ্রান্টের এই যুক্তি আর শোরের বিরোধিতাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে তা ‘বাংলা লুঠের’ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোরই একটি অংশ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, গ্রান্ট যাকে ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ কম রাজস্ব বলেছেন, তা থেকে কোম্পানির রাজস্ব বাড়ানোর পথ তৈরি হয়; আর সেই বাড়তি রাজস্ব শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এটি ছিল সম্পদ পাচারের একটি পরোক্ষ কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি।

টিকা ২

গ্রান্ট এবং মুঘল রাজস্ব নথি

গ্রান্ট বাংলার ভূমি রাজস্ব আরও বৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে যে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল ঐতিহাসিক দলিলের অন্ধ বিশ্বাস, অভিজ্ঞতার অভাব ও প্রশাসনিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার মিশ্রণ। Revenue records, in Persian with raqam annotation – এই শব্দবন্ধটির অর্থ হলো “ফার্সি ভাষায় লেখা রাজস্ব-সংক্রান্ত নথিপত্র, যেখানে ‘রকম’ (raqam) পদ্ধতিতে হিসাব-নিকাশ ও টীকা (annotation) দেওয়া আছে”। আমরা যে ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে গ্র্যান্টের সূত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি, তার উত্তর অনেকটাই লুকিয়ে আছে এই ‘রকম’ শব্দটির মধ্যেই।

‘রকম’ (Raqam) আসলে কী? ‘রকম’ শব্দটি ফার্সি ও উর্দুতে ব্যবহৃত হয়, যার অর্থ “লিখিত আদেশ”, “অনুমোদন”, “হিসাবের চিহ্ন” বা “সংখ্যার প্রতীক”। ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এর দুটি অর্থ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ —

১. এক ধরনের প্রশাসনিক আদেশ (Decree/Order) — মুঘল, সাফাভিদ ও কাজার আমলে ‘রকম’ ছিল একটি বিশেষ ধরনের শাহি বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আদেশ, যা ভূমি-রাজস্ব, অনুদান বা কর-ছাড়ের মতো বিষয়ে জারি করা হত। অর্থাৎ, এটা ছিল কোনো নির্দিষ্ট এলাকার রাজস্ব আদায়ের ‘নির্দেশনা’ বা ‘অনুমোদনপত্র’।

২. হিসাব-নিকাশের বিশেষ পদ্ধতি (Siyāq Notation): এটি ছিল মুঘল ও পারস্য আমলে রাজস্ব দপ্তরে ব্যবহৃত এক বিশেষ গণনা ও হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি। একে ‘সিয়াক’ (siyāq) বা ‘রকম-ই-সিয়াক’ (raqam-i siyāq) বলা হত। এটি মূলত আরবি সংখ্যার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ ছিল, যা দ্রুত হিসাব করার জন্য ব্যবহৃত হত। এই পদ্ধতি বুঝতে পারা মানেই ছিল মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থার ‘ভাষা’ আয়ত্ত করা। শোর হয়ত মনে করতেন, এবং আমাদেরও আন্দাজ এই প্রায় এনক্রিপ্টেড রকম-গুলোর মানে বোঝাই ছিল আদতে রাজস্ব ভাষা শিক্ষা।

গ্র্যান্টের ‘রকম annotation’-এর রহস্য

এই প্রশ্নটি বিহুকাল ধরে তুলছি — জেমস গ্র্যান্ট কীভাবে ফার্সি নথি পেলেন, যার ভিত্তিতে তিনি কর্তাদের বললেন বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব। আমাদের সেই প্রশ্নের উত্তর এই ‘রকম annotation’-এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে।

গ্র্যান্টের ব্রিটিশ লাইব্রোরি সংগ্রহ – ব্রিটিশ লাইব্রোরির ক্যাটালগে গ্র্যান্টের নাম ছাপা ‘রকম’-সহ বেশ কিছু ফার্সি রাজস্ব পুঁথি এখনও সংরক্ষিত আছে। এই নথিগুলোর শেষে জেমস গ্র্যান্টের বিশেষ ডিম্বাকৃতি মোহর রয়েছে, যাতে লেখা আছে: “Jams Grānt ṣadr-i sarishtah’dār … az ṭaraf-i dīvān-i ṣūbah’jāt-i Bangālah…” অর্থাৎ, জেমস গ্রান্ট সদই সেরিস্তাদার… আজ তিরফই দেওয়ান-ই-সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ “জেমস গ্র্যান্ট, বাংলা ও বিহারের দেওয়ানি দফতরের পক্ষ থেকে প্রধান হিসাবরক্ষক ও সমস্ত দফতরের তত্ত্বাবধায়ক”। (নিচে বিশদ নাম উল্লিখিত হল)

তথ্য সংগ্রহের পদ্ধ —: গ্র্যান্ট ১৭৮৬ সালে ‘চিফ শেরিস্তাদার’ বা প্রধান রাজস্ব হিসাবরক্ষক নিযুক্ত হন। এই পদে থেকেই তিনি বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের রাজস্বের ‘রকম’ বা হিসাব-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করেছিলেন। ফার্মিঙ্গার যেমন বলেছেন, এই নথিগুলো “হালকা ও ব্যক্তিগত মানিব্যাগের প্রভাবে” (অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে) ব্যক্তিগত হাত থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।

‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ — এই ‘রকম’ নথিগুলোতে মুঘল আমলের রাজস্বের পরিমাণ ও আদায়ের পদ্ধতির বিশদ বিবরণ ছিল। গ্র্যান্ট সম্ভবত এই নথিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেন যে বাংলার কিছু অঞ্চলে রাজস্বের পরিমাণ ইংরেজ আমলে তুলনামূলকভাবে কম ছিল (অর্থাৎ ওই অঞ্চলগুলো ‘আন্ডার-অ্যাসেসড’)। কিন্তু জন শোর এর তীব্র বিরোধিতা করেন, কারণ তিনি তার ২৪ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে জানতেন যে কৃষকরা ইতিমধ্যেই যে রাজস্ব দিচ্ছে, তা তাদের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কঠিন।

https://www.fihrist.org.uk/catalog/manuscript_18241 লিঙ্কে বলা হয়েছে

ফারসি ভাষায় ‘রকম’ টীকা সহ রাজস্বের নথি, এবং বাংলার বিবরণ, যার মধ্যে রয়েছে রাজস্বের বিস্তারিত তথ্য এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ‘মদদই মআশ’-এর তালিকা, সাথে তাদের মালিকদের নাম ও অবস্থান; এছাড়াও এতে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সনদ বা আইনি দলিলের প্রতিলিপি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, সাথে মূল সীলমোহরের বিবরণ (সম্রাট শাহ আলমের রাজত্বকালের উল্লেখ-সহ) এবং রিসালাহ অনুমোদনসমূহ রয়েছে।

শুরুতে এবং শেষে জেমস গ্রান্টের তারিখযুক্ত ডিম্বাকৃতি সীলমোহর: Jams Grānt ṣadr-i sarishtah’dār (sic) va mulāḥiẓ-i kull-i dafātir az ṭaraf-i dīvān-i ṣūbah’jāt-i Bangālah va Bihār va gairah, madār al-mahām sipah sālār-i Angrīz-i Kampanī, sanah 1193 Bangalah (জেমস গ্রান্ট সাদর-ই সরিশতাহদার (সিক) ওয়া মুলাহহিজ-ই কুল-ই দফাতির আজ তারাফ-ই দিওয়ান-ই সুবাহজত-ই বাঙ্গালাহ ওয়া বিহার ওয়া গৈরামাহাসিরা সালার-ই আংগ্রিজ-ই কাম্পানি, সনাহ ১১৯৩ বাংলা-সহ)

সবুজ চামড়ার বাঁধাই, যেখানে লেখাগুলো উল্টো করে বাঁধাই করা; ভঙ্গুর। তারিখবিহীন এবং সমাপ্তি-পত্র অনুপস্থিত। পত্রকবিহীন; আনুমানিক ২০০ পত্রাংশ

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন