বাইরের মশলাদার খাবার একটু এপাশ-ওপাশ হতেই, পেটের ভিতর যেন একুশে আগস্টের গ্রেনেড ব্লাস্ট! আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে পেট যদি আগেই হয়ে থাকে ড্রাম, তবে স্বাভাবিকভাবেই আপনি হয়ে উঠবেন অতিষ্ঠ।তবে আপনার পেটের ভেতরের জ্যাম ছুটিয়ে দিতে জাদুর মতো কাজ করতে পারে মিষ্টি আলু বোখরা।এই ছোট্ট ফলটি পেটের ভেতরের সব গণ্ডগোল নিমেষেই দূর করে আপনাকে দেয় হালকা ও ঝরঝরে অনুভূতি!
ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর আলুবোখারা বা প্লাম(যা শুকনো অবস্থায় প্রুনস নামে পরিচিত) হজমশক্তি বাড়ানো, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং হৃৎপিণ্ড সুস্থ রাখার জন্য অত্যন্ত উপকারী।এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার, সরবিটল এবং প্রাকৃতিক উপাদান অন্ত্রের স্বাভাবিক গতি ফেরাতে সাহায্য করে, ফলে পেট পরিষ্কার হয় এবং হালকা বোধ হয়। নিয়মিত আলু বোখরা খেলে ধীরে ধীরে কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের মতো সমস্যাগুলো দূর হয়। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আলু বোখারা ঠিক তেমনই এক সুরক্ষাকবচ, যেমনটি ঝড়ের রাতে একটি শক্ত ছাদ বা গাছের ডাল। তবে কোনো ধরনের ক্রনিক সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আলু বোখারা নাম শুনলেই জিভে জল এসে যায়, কিন্তু অনেকেই ভাবেন এটি আসলে কী!ছোটবেলায় অনেকেরই প্রথম ধারণা ছিল, এটি বোধহয় আলু এবং বোখারার কোনো সংমিশ্রণ। একবার একটি বাচ্চাকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল– এটা তো জ্বর কমানোর কোনো ওষুধ!
কিন্তু আসল গল্প হলো, এই রসালো ফলটি মূলত ‘প্লাম’ (Plum)। মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের ‘বুখারা’ শহর থেকে এই সুস্বাদু ফলটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফার্সি ও উর্দুতে ‘আলু’ শব্দের অর্থ সাধারণত ফল বা প্লাম, আর ‘বোখারা’ হলো স্থানের নাম। এভাবেই প্লাম বা বরইজাতীয় ফলটি হয়ে গেল ‘আলু বোখারা’!
আসুন জেনে নেওয়া যাক আলু বোখারার প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতাগুলো :
কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে: এতে প্রচুর ডায়েটারি ফাইবার থাকে, যা হজম প্রক্রিয়া উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে কাজ করে।
রক্তচাপ ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ: আলু বোখারায় থাকা পটাশিয়াম শরীরে সোডিয়ামের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
হাড়ের সুরক্ষা: এতে ভিটামিন ‘সি’, ‘কে’ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে ও অস্টিওপোরোসিসের মতো সমস্যা প্রতিরোধে সাহায্য করে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: প্রতি ১০০ গ্রাম আলু বোখারায় মাত্র ৪৬ ক্যালোরির মতো থাকে। ফাইবার সমৃদ্ধ হওয়ায় এটি অনেকক্ষণ পেট ভরিয়ে রাখে এবং অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে।
রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ : আলু বোখারায় উপস্থিত আয়রন ও ভিটামিন ‘সি’ শরীরে রক্তের পরিমাণ বাড়াতে এবং রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সাহায্য করে।
ত্বকের উজ্জ্বলতা : এর ভিটামিন ‘সি’ ত্বকে কোলাজেন তৈরি করে, যা ত্বককে তারুণ্যদীপ্ত ও উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে।
মহিলাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য আলু বোখরা অত্যন্ত উপকারী।
রক্তাল্পতা প্রতিরোধ : মাসিকের সময় অনেক নারীরই রক্তের ঘাটতি বা অ্যানিমিয়া দেখা দেয়। আলুবোখারায় উপস্থিত আয়রন ও ভিটামিন সি শরীরকে রক্ত তৈরিতে সাহায্য করে এবং আয়রন শোষণে বড় ভূমিকা রাখে।
পেশির ক্র্যাম্প কমায় : এতে বিদ্যমান পটাসিয়াম এবং ভিটামিন মিনারেলস পিরিয়ডের সময় পেট বা কোমরের ব্যথা এবং মাসল ক্র্যাম্প কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক চাপ হ্রাস : ঋতুস্রাবের সময় অনেকেরই মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। আলু বোখারার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট নার্ভকে শান্ত রাখতে সাহায্য করে।
হাড়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষা : মেনোপজের পর মহিলাদের হাড় দুর্বল হওয়ার বা ক্ষয়ের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আলু বোখরায় উপস্থিত খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে ও অস্টিওপোরোসিস প্রতিরোধে দারুণ কার্যকর।
গর্ভাবস্থায় উপকারী : গর্ভাবস্থায় কোষ্ঠকাঠিন্য একটি সাধারণ সমস্যা। আলু বোখারায় প্রচুর ফাইবার থাকে যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে হজমশক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। এতে থাকা আয়রন রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়ায় এবং এনার্জি জোগায়।

খাওয়ার নিয়ম : প্রাপ্তবয়স্করা দিনে ২-৩টি তাজা বা শুকনো আলু বোখারা খেতে পারেন। শুকনো আলুবোখারা সারারাত জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে খাওয়া বেশি কার্যকর।
পরিমিত মাত্রায় আলুবোখারা খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর। তবে অতিরিক্ত খেলে এটি হজমে গণ্ডগোল, ডায়রিয়া এবং অতিরিক্ত ফাইবার বা শর্করাজনিত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত শুকনো আলুবোখারা খাওয়া উচিত নয়, কারণ এতে থাকা উচ্চ শর্করা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।
টক-মিষ্টি স্বাদের আলু বোখারা মূলত এর অনন্য গন্ধ এবং স্বাদ বাড়ানোর ক্ষমতার জন্য রান্নায় ব্যবহার করা হয়। যেমন ধরুন —
সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানি বা পোলাও রান্নার সময় আলু বোখারা দেওয়া হয়, যা খাবারের স্বাদ ও সুবাস বহুলাংশে বাড়িয়ে তোলে। টক-মিষ্টি স্বাদের কারণে এটি ভারী খাবারের স্বাদকে ভারসাম্যপূর্ণ করে।বিয়েবাড়ির বা ঘরের ডাইনিং টেবিলে পোলাও বা বিরিয়ানির প্লেটে দু-একটা আলু বোখারা থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, মাংসের চেয়ে আলু বোখারা নিয়েই আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়। টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি মুখে পড়লেই অন্যরকম এক তৃপ্তি আসে। তাই অনেকেই প্লেট থেকে আগে আলু বোখারা তুলে মুখে চালান করে দেন, পাছে অন্য কেউ খেয়ে ফেলে!
মাংসের শাহী পদ, যেমন চিকেন রোস্ট বা মাটন কোরমা রান্নার সময় আলু বোখারা ব্যবহার করা হয়। এটি মাংসের স্বাদকে চমৎকার ও চটপটা করতে সাহায্য করে।
চাটনি তৈরি: শুকনো আলু বোখারা দিয়ে চমৎকার টক-মিষ্টি চাটনি তৈরি করা যায়, যা বিভিন্ন স্ন্যাকস বা কাবাবের সাথে পরিবেশন করা যায়।
বিভিন্ন ধরনের রিফ্রেশিং ড্রিংক যেমন বোরহানি বা ফ্রুট সালাদে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য আলু বোখারা যোগ করা হয়।

আপনি ঘরে খুব সহজেই বানিয়ে ফেলতে পারেন আলুবোখরা চাটনি।
প্রয়োজনীয় উপকরণ :
আলু বোখারা (শুকনো): ১০০ গ্রাম
চিনি: ১ কাপের ৪ ভাগের ৩ ভাগ
তেঁতুলের ক্বাথ: দেড় টেবিল চামচ
ভিনেগার (সিরকা): ১ কাপের ৪ ভাগের ৩ ভাগ
আদা কুচি: দেড় চা চামচ
কিসমিস: ২ টেবিল চামচ
দারুচিনি: ১ টুকরো
তেল: ২ টেবিল চামচ
প্রস্তুত প্রণালি :
প্রথমে শুকনো আলু বোখারাগুলো গরম জলে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন, যাতে এটি নরম হয়ে ফুলে ওঠে।
একটি সসপ্যানে আলু বোখারা ভেজানো জল,চিনি এবং তেঁতুলের ক্বাথ দিয়ে মাঝারি আঁচে ফুটতে দিন।

অন্য একটি প্যানে তেল গরম করে তাতে আদা কুচি ও দারুচিনি হালকা ভেজে নিন। এরপর ফুটন্ত সিরায় ভেজে রাখা আদা, দারুচিনি, ভিজিয়ে রাখা আলু বোখারা এবং কিসমিস দিয়ে দিন। সবশেষে ভিনেগার মিশিয়ে দিন এবং মাঝারি আঁচে ৫ থেকে ১০ মিনিট জ্বাল দিন। চাটনি থকথকে ও ঘন হয়ে এলে গ্যাস বন্ধ করে ঠান্ডা করে নিন। তৈরি হয়ে গেলে পরিষ্কার ও শুকনো কাচের বয়ামে চাটনিটি সংরক্ষণ করবেন। ভাত, রুটি, পরোটার সাথে দারুন লাগে খেতে।
সাহিত্যেও ‘আলুবোখারা’ রূপকার্থক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলা সাহিত্যের বহুমুখী প্রতিভাবান লেখক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ শিশুদের জন্য বিনোদন ও শিক্ষামূলক গল্পের একটি সংকলন লিখেছিলেন যার নাম ছিল “আলু বোখারা”। তাঁর এই বইটিতে এমন কিছু গল্প রয়েছে যা শিশুদের মধ্যে বন্ধুত্ব, সততা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
আলুবোখরা নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হল,টক-মিষ্টি স্বাদের এই ফলটি ঠিক যেন জীবনের মতো, যেখানে কিছুটা কষ্ট (টক) আর কিছুটা আনন্দের (মিষ্টি) মিশেল থাকে। এর রসালো রূপ দেখে মনে হয়, যেন গ্রীষ্মের প্রখর রোদে কোনো এক স্নিগ্ধ বিকেলের মিষ্টি আমেজ। এই আমেজকে ধরে রাখতে নিয়মিত পরিমিত খান আলু বোখরা।।