| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পদে পদে বিস্মৃত জনপদে (শেষ পর্ব) : সুব্রত দত্ত

Reporter
সুব্রত দত্ত / ৪৬৮ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২২ মার্চ, ২০২৬

সূর্যদেব নাই। দিনের দখল নিয়েছে কুয়াশা আর ঠান্ডা বাতাস। বেলা কমছে দাপট বাড়ছে। এমন সময়ে সুখের ঘর ছেড়ে তেপান্তরে থাকে কে! গৃহিনীর মুখে বেজায় বিরক্তি। দুই মেরুর মানুষ আমরা। আমার যেমন বাইরের টান, ওর ঘরের বাইরে জগৎ নেই। ওর দোষ কি! আমরাই ঘর সংসারে বন্দী করেছি ওদের। অথচ একদিন ওরা স্বাধীন ছিল এ দেশে। পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করেছে বাঙালি মেয়েরা। তার অনেক প্রমাণ আছে ইতিহাসে। আমাদের দেবদেবীর অধিকাংশ যোদ্ধা নারী। নারী তাই শক্তির প্রতীক এ দেশে। সেই ইতিহাস বদলে গেছে মধ্যযুগে। এক সময় ‘মগের মুলুক’ হয়েছিল বাংলা। কারো কোন নিরাপত্তা ছিল না। বিপদ বেশি ছিল নারীদের। সিন্ধুকী নামক গুপ্তচরের কাজ ছিল পাড়ায় পাড়ায় সুন্দরী নারীর সন্ধান। তাই পর্দা, ঘোমটা, বাল্যবিবাহ নানান কুপ্রথা প্রচলন হয়েছিল এদেশে। শাসকদের কীর্তি কীর্তন করাই যেন বর্তমান ইতিহাসের কাজ! অথচ সেই শাসকদের কুশাসনের ফল ভোগ করছি আমরা এখনও। আজ পুরুষদের দায়ি করে নারী মুক্তির আন্দোলন হচ্ছে। নইলে সমাজ পিছিয়ে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের অবিচারেই ওরা গৃহবন্দী সেকথা ভেবেছি কি!

এবার ফেরার পালা। টৌটোওয়ালার সঙ্গে চুক্তি পিয়াসবাড়ি ফিরিয়ে দেবে। ওদিকে ওর হাতে এখনও বেশ কিছুটা সময়। শহর থেকে ফিরতি পথের যাত্রী নিয়ে আসতে পারলে পকেটে দুটো বাড়তি টাকা আসবে। খেটে খাওয়া মানুষের অন্ন চিন্তা পিছু ছাড়ে না! পেট ঝড় বৃষ্টি শীত গ্রীষ্ম মানে না। আজকে রোজকার মন্দ হয়নি কিন্তু কাল কি হবে ঠিক নেই। তাই আমাদের নামিয়ে হাইওয়ে মোড় যাচ্ছিল। কালকের কাজ আজ একটু এগিয়ে রাখবে। আমাদেরও যাবার প্রস্তাব দিল। সেখান থেকে আবার টোটো ধরে যেতে হবে মালদহ। তা হোক খানিক এগিয়ে থাকা যাক। নইলে পরে আপশোষ করতে হতে পারে। এখানে যানবাহন সহজলভ্য নয়। টোটোয় যেতে যেতে আশপাশটাও দেখা হবে। মালদহের নৈসর্গিক দৃশ্য কম সুন্দর নয়! দু-পাশে প্রচুর আম বাগান, দীঘি পুকুর খাল বিল। গঙ্গা মহানন্দার পলি মাটিতে এখানে সোনার ফসল ফলে। মালদহের আম এজন্যই জগত বিখ্যাত। তবে আম বাগানের সংখ্যা কমছে। সারা বছরে একবার ফলন। তাও সব বছর সমান ফলে না। সঠিক দাম মেলে না। জমিতে এখন বছরে তিন বার চাষ। তাই বাগান কেটে জমি হচ্ছে। তবে চাষেও তেমন লাভ নেই। এখন শহরমুখী সবাই।

গৌড় নগর এখন পিছনে। মনটাও পিছনে পড়ে। আর কোন দিন আসা হবে না। সামান্য সময়ের দেখা। তবু মন জুড়ে তার প্রান্তর। কিসের মায়া জানি না! আসলে আমাদের শিকড় নেই। স্রোতের শ্যাওলা মত কোথা থেকে কিভাবে এসেছি এই বর্তমানে জানি না। তাই অতীতের ঠিকানা খুঁজে বেড়াই।

১২ নম্বর ন্যাশনাল হাইওয়ের সুস্থানি মোড়ে এসে নেমেছি। এখানে চা খেয়ে টোটো ধরে চলেছি ইংলিশ বাজার। শহরটি এখন বৃহত্তর মালদার অংশ। ওল্ড মালদা মহানন্দা নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত যা বাংলার পুরানো রাজধানী পান্ডুয়ার একটি নদীবন্দর ছিল। ঐতিহাসিক জামে মসজিদ (১৫৬৬), নিমসরাই টাওয়ার সেই সময়ের স্মৃতি। ১৬৭৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে রেশম ও সুতি কাপড়ের বাণিজ্য কেন্দ্র বা কুঠি গড়ে। তবে শুধুমাত্র ব্রিটিশ নয়, ডাচ ও ফরাসিরাও এখানে কুঠি স্থাপন করেছিল। পলাশী যুদ্ধের পর মহানন্দার পশ্চিম তীরে জেলার প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে ইংলিশ বাজার। ১৮১৩ সালে এখানে একজন জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডেপুটি কালেক্টর নিযুক্ত করা হয়। ১৮৩২ সালে শহরে সরকারি খাজাঞ্চিখানা বা ট্রেজারি স্থাপিত হয়। ১৮৬৯ সালে পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। মালদহ শহর এখন খুব জমজমাট। শহরের বাইরে দিয়ে উত্তর বঙ্গে চলে গেছে ন্যাশনাল হাইওয়ে।

শীতের কামড় থেকে বাঁচতে পরদিন তাই চারচাকা চড়ে চলেছি। তাই দেখে সূর্যদেব হাসছেন আকাশে। সুন্দর মনোরম পরিবেশ আজ। মালদহ থেকে ১৮ কিঃমিঃ দূরে পাণ্ডুয়া। ১৩৩৮ থেকে ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত (মতান্তরে ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ) এই পান্ডুয়া ছিল বাংলার সুলতানদের রাজধানী। সে সময় নাম ছিল ফিরুজাবাদ। সুফি সাধকের কেন্দ্র হিসেবে শহরটিকে হযরত পান্ডুয়াও বলা হত। মিং রাষ্ট্রদূত মা হুয়ানের মতে, পান্ডুয়া একটি ছোট গ্রাম থেকে একটি বিশ্বজনীন রাজধানী এবং বাণিজ্য কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছিল, পাশাপাশি একটি সামরিক গ্যারিসনেও। জনসংখ্যার মধ্যে ছিল রাজপরিবার, অভিজাত, সৈন্য, ভাড়াটে, স্থানীয় এবং ইউরেশিয়ান ভ্রমণকারী এবং বণিক। পান্ডুয়া ছিল প্রাচীরে ঘেরা। শহরের দেয়ালগুলি খুব মনোরম, বাজারগুলি সুসজ্জিত, পাশাপাশি দোকানগুলি, সুশৃঙ্খল সারিতে সজ্জিত ও সমস্ত ধরণের পণ্যে পূর্ণ। এখানে ছয় ধরণের সূক্ষ্ম মসলিন, রেশম বস্ত্র, ওয়াইন পাওয়া যেত। এখানকার তুঁত গাছের ছাল থেকে উচ্চমানের কাগজ তৈরি করা হত। কাগজটি হালকা সাদা সুতির কাপড়ের মতো ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসত এখানে। বণিকরা জাহাজ তৈরি করত, বাণিজ্যের জন্য বিদেশে যেত এবং রাজদূত হিসেবে কাজ করত। ধনীরা পান্ডুয়ায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। তারা সকালে সানাইএর সুর শুনে ঘুম থেকে জেগে উঠত, নৃত্য গীতে আপ্যায়ন করা হত অভিজাত অতিথিদের। শহরের পুরুষ বাসিন্দারা সুতির পোশাক এবং শার্ট, পাগড়ি, ধুতি, চামড়ার জুতা এবং কোমরে বেল্ট পরতেন। মহিলারা সুতির শাড়ি পরতেন। উচ্চবিত্ত মহিলারা সোনার গয়না পরতেন। হিন্দুরা গরুর মাংস খেত না। বাংলা ছিল সাধারণ ভাষা। দরবারী এবং বণিকরা প্রায়শই ফার্সি বলত। পান্ডুয়ায় ছিল সুলতানদের টাকশাল। ১৬ শতক পর্যন্ত যা চালু ছিল এখানেই। শের শাহের আক্রমণ ও মহানন্দা নদীর গতি পরিবর্তনে পাণ্ডুয়ার সোনার দিন হারিয়ে গেল। বাংলার উচ্চ আর্দ্রতা এবং বর্ষা ও ১৯ শতকে ভূমিকম্পে এর ভবনগুলি ও স্থাপত্যের বেশিরভাগ ভেঙে পড়ে। উঁচু ঢিবিতে চিহ্ন ছাড়া রাজপ্রাসাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ১৮০৮ সালে ফ্রানিস বুকানন-হ্যামিল্টন বিস্মৃত পাণ্ডুয়াকে পুনরুদ্ধার করেন আবার।

১১৪ বছর ধরে, পান্ডুয়া থেকে নয়জন সুলতান বাংলা শাসন করেছিলেন। রাজা গণেশ, তাঁর পুত্র জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ এবং পৌত্র শামসুদ্দিন আহমদ শাহ ব্যতীত সকলেই ইলিয়াস শাহী রাজবংশের ছিলেন। তারা যে প্রাসাদ, দুর্গ, সেতু, মসজিদ এবং সমাধিসৌধ নির্মাণ করেছিলেন, তার দৃশ্যমান সামান্যই। পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শুধু আদিনা মসজিদ একলাখি সমাধিসৌধ এবং কুতুব শাহী মসজিদ। সুলতান সিকান্দর শাহ আদিনা মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদটি দামেস্কের গ্রেট মসজিদের আদলে তৈরি এবং ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম মসজিদ। এখন এই মসজিদ দর্শনে নানান বিধিনিষেধ। ফোন ব্যাগ জমা রাখতে হল। ধ্বংসের মাঝেও বিতর্কের চিহ্ন গুলো জ্বলছে স্থাপত্যের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে। তাই ছবি তোলা যাবে না। বিতর্ক এর নামেও। আদিনা কথাটা নাকি এসেছে জৈন তীর্থঙ্কর আদিনাথের নাম থেকে। মানুষের মুখে লাগাম লাগানোর সাধ্য ছিল না রাজা বাদশার। মুখে মুখে এখনও ফেরে সেই কথা। কোন জৈন মন্দির ধ্বংস করেই নাকি এ মসজিদ তৈরি।

দেখলাম একলাখি সমাধিসৌধ। এটি সম্ভবত ১৪১২ থেকে ১৪২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। লক্ষ টাকা ব্যায়ে নির্মিত তাই নাকি এই নাম। অপরূপ টেরাকোটা শিল্প শোভিত এই সৌধ বাঙালি স্থাপত্যের একটি উজ্জ্বল নিদর্শন ।এই সমাধিটির দরজার ওপর গণেশের মূর্তি খোদাই করা থাকায় অনেকে মনে করেন এটি হিন্দু স্থাপত্যের উপাদান ব্যবহার করে নির্মিত হয়েছিল। সৌধের অভ্যন্তরে দাঁড়িয়ে আছি এখন। আলোছায়ায় ইতিহাসের গন্ধ। সম্মুখে তিনটি সমাধি। মনে পড়ল আশমানতারার কথা। এখানেই ঘুমিয়ে আছেন তিনি। পাশে তার স্বামী যদু নারায়ণ বা বাংলার সুলতান জালালউদ্দীন ও পুত্র সামসউদ্দিন। আসমানতারার স্বপ্ন সার্থক হয়েছিল। কিন্তু কি করে!

পাণ্ডুয়া সব হারিয়েছে কিন্তু গল্প হারায়নি। আগন্তুকের কানে কানে এখন বলে সেই কথা।

বায়োজিদ শাহের পুত্র ফিরোজ শাহকে সরিয়ে একদিন গৌড়ের রাজা হয়ে বসেছিলেন ভাতুড়িয়ার জমিদার গনেশ (১৪১৪-১৪১৫ খ্রি.)। তারপর দনুজমর্দনদেব উপাধি গ্রহন করেন। এ সময় হিন্দুর ক্ষমতা দখল বাংলার ইতিহাসে এক বিষ্ময়! পরে তার পুত্র যদু নারায়ণ অবশ্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে সুলতান হন। বাংলার ইতিহাসে তিনিই প্রথম বাঙালি সুলতান। কিন্তু যদু নারায়ণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন কেন! প্রচলিত ধারণা গনেশ মসনদ দখল করতেই তাকে পদচ্যুত করতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মুসলিম ধর্মগুরু নুরকুতুব আলম। হিন্দুর এই স্পর্ধা তার সহ্য হয়নি। তার পত্রে ইসলামের রক্ষক হয়ে এগিয়ে এলেন জৈনপুরের সুলতান ইব্রাহিম সর্কী। সিংহাসন রক্ষা করতে গনেশ নুরকুতুব আলমের শর্ত মেনে নিলেন। যদু নারায়ণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে জালালউদ্দীন হয়ে মসনদে আসীন হলেন। কিন্তু ইব্রাহিম সর্কী জৈনপুরে ফিরতেই গনেশ আবার সিংহাসনের দখল নিলেন। ‘সুবর্ণধেনু’ যজ্ঞ করে যদুকে হিন্দু ধর্মে ফেরান। আমার প্রশ্ন এ খবর নিশ্চয়ই ইব্রাহিম সর্কী পেয়েছিলেন! কিন্তু তিনি ফিরে এলেন না কেন? অনেকেই বলেন গনেশ ইব্রাহিমকে পরাজিত করেছিলেন। এ সময় তাকে সাহায্য করেন মিথিলা রাজ শিবসিংহ। তাহলে যদু জালালউদ্দীন হন কখন! হয়ত আসমানতারার আসক্তিতে। কিন্তু তখন তিনি বিবাহিত। একজন সম্ভ্রান্ত নিষ্ঠাবান হিন্দু ব্রাহ্মণের পুত্র হয়ে বিধর্মীর প্রতি তার এই আসক্তি বেশ আশ্চর্যজনক! তবে কি নুরকুতুব আলম তথা গৌড়ের গনেশ বিরোধী আমীর ওমরাহদের ফাঁদে পা দিয়েছিলেন যদু? আর তাদের টোপ হয়েছিলেন আশমানতারা! আশ্চর্যের কিছু নেই। মসনদের লোভ কার নেই। বলা হয় গনেশের মৃত্যুর পর রাজা হন তার নাবালক পুত্র মহেন্দ্রদেব। ইতিহাসে তার প্রমাণ আছে। প্রশ্ন গনেশের জৈষ্ঠ পুত্র যদুকে রাজা হিসেবে মনোনীত করা হল না কেন! তাকে তো গনেশ হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু তা হয়ত সত্য নয় বা সত্য হলেও তিনি তখন হয়ত শত্রু পক্ষেই ছিলেন! মহেন্দ্র নারায়ণ বেশি দিন রাজত্ব করেননি। তবে কি যদু নারায়ণ বা জালালউদ্দীন কি তাকে হত্যা করেন? ইতিহাসে অসম্ভব কিছু নেই!

আশমানতারার সমাধির সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভাবছি ভালোবেসে কি পেলেন দুলারী বিবি। তিনিও ছিলেন এক সুলতানের আদরের দুলালী। তিনিও দিল দিয়েছিলেন ভাদুড়ী বংশের এক সন্তানকে। গৌড়ের রাজধানী তখন তাণ্ডা নগর। সুলতান সুলায়মান কররানীর একমাত্র কন্যা দুলারী হয়ত প্রাসাদের গবাক্ষপথে বিমুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখেছিলেন এক কৃষ্ণকান্তি বীর্যবান নওজোয়ানকে। বিষ্ণু মন্দিরের পথে পূজা দিয়ে ফিরছিল সে।

বেকার রাজীবলোচন রায় ওরফে কালাচাঁদ বর্তমান বাংলাদেশের নওগাঁ (মতান্তরে রাজশাহী) জেলার বীরজাওন গ্রাম থেকে তাণ্ডা শহরে এসেছিল কাজের খোঁজে। যদি একটা কাজ মেলে সুলতানী সেনাবাহিনীতে, তাহলে অচল সংসার সচল হবে তাদের। যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী সে। তার ঈষ্ট দেবতাকে কায়মনোবাক্যে তাই পূজা ও প্রার্থনা জানাচ্ছে এখন। অলক্ষ্যে ঈশ্বর হয়ত হেসেছিলেন তার ললাট লিখন দেখে! তাকে কালাপাহাড় হতে হবে! মহাকালের ইচ্ছে পূরণ করতে হবে!

ওদিকে রাজীবের জন্য নাওয়া খাওয়া ভুলেছেন দুলারী। বায়না ধরেছেন তাকে ছাড়া কাউকে শাদি করবেন না। একমাত্র কন্যার ইচ্ছেপূরণে সুলতান দরবারে তলব করলেন রাজীব লোচনকে। দুরু দুরু বক্ষে হাজির হলেন রাজীব। নিশ্চয়ই বড় কাজ পাবেন আজ! কিন্তু সুলতানের প্রস্তাব শুনে মনে হল বজ্রপাত হল। সুলতানের একমাত্র কন্যার পাণিগ্রহণ করতে হবে তাকে, নইলে চরম শাস্তি নিতে হবে। হয়ত রাজীব মনে ডেকেছিলেন ঈষ্ট দেবতাকে, ‘রক্ষা কর ঠাকুর’। রাজীব নাকি সুলতানকে বলেছিলেন,বিবাহ করলেও তিনি ধর্ম ত্যাগ করতে পারবেন না। সুলতান মুচকি হেসে রাজি হয়েছিলেন। তিনি ভবিতব্য জানেন। না, রাজীবকে এই অপরাধে হিন্দু সমাজ গ্রহন করেনি। তার কাকুতি মিনতি, কান্না কেউ শোনেনি। তিনি তাই কালাপাহাড় হলেন। বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন সমাজের বিরুদ্ধে। হিন্দু ধর্ম মুছে দিতে চাইলেন বাংলা থেকে। কামরূপ থেকে কলিঙ্গ মন্দির আর দেবদেবীর মূর্তি ধ্বংস যজ্ঞে মেতে উঠলেন। তখন তিনি মহম্মদ ফারমুলি। সুলেইমান কররানীর প্রধান সেনাপতি।

এদিকে বাংলার ভাগ্যাকাশে কালো মেঘ জমেছে পশ্চিমে। ১৫৭৪ দিল্লী থেকে ধেয়ে এল মুঘল বাহিনী। বাংলাকে পদানত করতে চায় ওরা। দাউদ খানের পক্ষে মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে আমৃত্যু সংগ্রাম করেন। তার মৃত্যু রহস্যে ঘেরা। ১৫৮৩ সালের এপ্রিল মাসে উড়িষ্যার সম্বলপুরে এক যুদ্ধে নিহত হন বলে ধারণা করা হয়। সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। কিন্তু দুলারীর কি হল কেউ জানে না! ইতিহাস তার নাম ভুলে গেছে কিন্তু গৌড় পাণ্ডুয়ার ইট কাঠ পাথর ভোলেনি।

গেলাম আদিনা ডিয়ার পার্ক দেখতে। শীতের মরশুমে মেলা বসেছে বাইরে। কাছেই ইলিয়াস শাহী সুলতানদের প্রাসাদের ধ্বংসস্তূপ। চীনা দূতের বিবরণে, এই রাজপ্রাসাদে ছিল উঁচু সিঁড়ি, নয়টি দেয়াল, তিনটি দরজা এবং একটি দরবার কক্ষ। দরবার কক্ষটি পিতল দিয়ে প্রলেপ দেওয়া, খোদাই করা, পালিশ করা, ফুল এবং প্রাণীর মূর্তি দিয়ে সজ্জিত। সুলতান মূল্যবান পাথর দিয়ে সজ্জিত একটি উঁচু সিংহাসনে বসে। তার কোলে দুই ধারের তরবারি। বাংলার সুলতানরা তখন পারস্যের রাজদরবারের ঐতিহ্য অনুকরণ করতেন। আজ কোথা সেই প্রাসাদ! কই সুলতান! কোথা দম্ভ! কোথা রক্তআঁখি!

রবীন্দ্রনাথের কবিতার কথা মনে পড়ল।

“রাজছত্র ভেঙে পড়ে, রণডঙ্কা শব্দ নাহি তোলে,

জয়স্তম্ভ মূঢ়সম অর্থ তার ভোলে,

রক্তমাখা অস্ত্র হাতে যত রক্ত-আঁখি

শিশুপাঠ্য কাহিনীতে থাকে মুখ ঢাকি।”

সেই সুলতানী সাতমহলা এখন সাপখোপের আড্ডাখানা।

ডিয়ার পার্ক দেখে ফেরার পথে বড় দরগা। এখানেই শায়িত আছেন নুরকুতুব আলম। যিনি বাংলার ইসলামী শাসন অব্যাহত রেখেছিলেন। এজন্য তার বিশেষ আত্মত্যাগ আছে। এই দরগার প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত সুফি সাধক জালালউদ্দীন তাব্রিজী। তিনিই সম্ভবত প্রথম বাংলায় ইসলাম ধর্ম প্রচার করতে আসেন। রাজা লক্ষনসেন তার পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

তারপর অনেকেই এসেছেন। ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে এই দরগার বিশেষ ভূমিকা ছিল। অগণিত ভক্তের ভীড়ে জমজমাট দরগা।

সেখান থেকে গেলাম জাগ্রত জহুরা কালী মন্দির দর্শনে। ইংরেজবাজার থানার রায়পুর গ্রামে এক আমবাগানের মধ্যে বর্তমান মন্দির। শোনা যায় এক সময় এখানে ঘন জঙ্গল ছিল। আর দেবী ছিলেন ডাকাতদের আরাধ্যা।অতি প্রাচীন দেবী কালী চণ্ডী রূপে পূজিত হন এখানে। এখানে দেবী মূর্তির কেবল লাল মুখ ও লকলকে জিভ দেখা যায়। বৈশাখ মাসে মাসব্যাপী পুজো ও শনি-মঙ্গলবার মেলা বসে। বর্তমান ও অতীতের মন্দির দেখা হল। তারপর অতীত পিছনে রেখে এলাম বর্তমানে। মালদহ শহরের মাঝে তখন দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততা, শীতের জমজমাট মেলা। বিকেলের বাড়তি সময়টা সেখানে কেনাকাটা করে কাটল। আর কি আসা হবে! গৃহিনীর মুখে হাসি। কাল সকালে ফেরার ট্রেন। মনে একটাই দুঃখ নিয়ে এলাম, মালদহের সমৃদ্ধ মিউজিয়ামটা দেখা হল না। (শেষ)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev