‘ফুলবউ’-এর মাধ্যমে কথাশিল্পী আবুল বাশারের কথাসাহিত্যের সঙ্গে আমার পরিচয়। ‘অগ্নি বলাকা’, ‘শেষ রূপকথা’, ‘মরুস্বর্গ’, ‘মহিষমঙ্গলাকাব্য’-এর মতো উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিরল। ‘মাটির ভিয়েনে মৃৎপাত্র কথার ভিয়েনে সাহিত্য’, তাঁর ‘জল মাটি আগুনের উপখ্যান’ উপন্যাসের এক অবিস্মরণীয় লাইন।
‘গহন’ পত্রিকার ‘তত্ত্ব ও বাংলা সাহিত্য’ সংখ্যায় ‘ছন্দের তত্ত্ব তালাশঃ একটি খসড়া’— শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। একটি গদ্যে ছন্দের প্রয়োজনীয়তা যে অপরিহার্য সে বিষয়েই অসম্ভব জরুরি একটি আলোচনা। বাশারের গদ্যরীতি ও ভাষাশৈলী এ দুইই ভাষাশিক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাংলা ভাষার মধ্যে আরবি, ফার্সি, উর্দু ও হিন্দি যে কত সহজে মিশে যেতে পারে ও এই মিশে যাওয়া এক অদ্ভুত দ্যোতনার সৃষ্টি করে তা বুঝতে গেলে বাশার সাহিত্য অবশ্যই পাঠ্য হওয়া উচিৎ। ‘ফুলবউ’-এর প্রধান চরিত্রের নাম মিল্লাত। মিল্লাত শব্দটির অর্থ যে ধর্ম তা ‘ফুলবউ’ না পড়লে হয়ত জানাই হতো না।
‘উম্মি’ শব্দটার অর্থ যে নিরক্ষর তা জানা হতো না শারদীয় আজকাল-এ তাঁর বড়গল্পটি না পড়লে। পয়গম্বর নবী হজরত মহম্মদ-কে উম্মি বলা হয়। ঈশ্বরের বার্তাপ্রচারক নিজে অক্ষর চিনতেন না!
গল্পে ‘উম্মি’-র নাম রুহু। প্রকৃত নাম রুহ্। যার অর্থ আত্মা। উচ্চারণের অপভ্রংশে তা রুহু। গল্পের শুরুতেই পাঠক একটা নতুন পাখির নাম জানতে পারছে। ‘পাখিটির নাম গয়ার। পানকৌড়ি জাতের পাখি।’ ‘গয়ার’ নামটির মধ্যে দিয়ে একটা বিশেষ অঞ্চলের ছবি পাঠকের মনে এঁকে দিচ্ছেন তিনি। সচেতন এই নির্মাণ। গল্পটি পড়ে বহুজনকে জিজ্ঞেস করেছি গয়ার নামটি আগে শুনেছেন কিনা? এ নাম ভৈরবের তীরের মানুষদের দেওয়া। তাই ওই অঞ্চলের মানুষ ছাড়া আর কেউই বলতে পারলেন না। গল্পে রুহু আর লেখকের উপস্থিতিতে ভৈরবের জলে শুশুকের শ্বাস প্রশ্বাস ও মোষের ডুবে থাকা যেভাবে মিশে আছে এতে মনে হয় লেখক আসলে তাঁর পরিচিত গ্রামখানির ছবিই এঁকেছেন। এই ছবির মধ্যে দিয়ে গল্প এগোলে খুব চেনা এক অতীতকে দেখতে পাই। যে অতীত আমাদের প্রজন্ম না দেখলেও বইয়ের পাতায় এত বিস্তারে পড়েছে যে তা দৃশ্যমান মনে হয়।
ভূমি সংস্কার আন্দোলন পাঠ্যবইয়ের বিষয়। সেই আন্দোলনের সূচনা লগ্ন থেকেই গল্পটি শুরু। গল্পটি উম্মি রুহু অথবা তার বেওয়া সৎ মায়ের গল্প শুধু নয়। গল্পটি মাস্টার কাইয়ুম খান ও তার কন্যা ইত্তিকার গল্পও নয়। গল্পে লেখক নিজে উপস্থিত থাকলেও এ তাঁর আত্মকাহিনী নয়। হয়ত অংশ বলা যেতে পারে। গল্পটি পড়তে পড়তে অন্তত তাই মনে হয়। লেখক নিজেই এই সময়কে প্রত্যক্ষ করেছেন। প্রতিটি চরিত্র যেন তাঁর অতি চেনা!
‘রাজশরিক’ শব্দ বা লব্জটি সাধারণ কোনও অভিধান দূর, মার্ক্স এংগেলস-এর বইয়ের অনুবাদে কোথাও আছে কিনা তাও জানা যায়নি। অথচ এই শব্দের ব্যবহার যেন একটা নেশার মতো কিছু মানুষকে আচ্ছন্ন করেছিল। শ্রম যার জমি তার- এমনিই একটা ধ্বনি প্রতিধ্বনির সময়ের গল্প উম্মি। মার্কস সাহেব তাঁর Das Capital নামক মহাগ্রন্থে ঠিক একথাই লিখেছেন কিনা এ বিষয়ে খুব একটা তত্ত্ব তালাশ করতে কখনওই রাজি হয়নি আমাদের রাজনীতিবিদগণ। সম বন্টন তত্ত্বটিকেও নাকচ করেই ‘অপারেশন বর্গা অভিযান’, যার প্রত্যক্ষ একটা রূপ এই গল্পটি। ‘উম্মি’ কেবল একটি গল্প নয়, যেন একটি ঐতিহাসিক সময়ের বা সিদ্ধান্তের দলিল। ইতিহাসকে বুঝতে ও সময়কে জানতে সাহিত্য যে কতটা প্রয়োজনীয় তা এই গল্পটি পড়লে উপলব্ধি করা যায়।
সোনারপুরে যে এখনও বাঁশবাগান, পুকুর, নালা ও কিছু সবুজ বেঁচে আছে, তা সোনারপুরের বাসিন্দা মাত্রই জানেন। আবুল বাশারের ‘বারুইপুরজংশন’ আসলে সেই সবুজ বাঁচিয়ে রাখার আখ্যান। উপন্যাসের শুরুতেই তিনি পাঠককে সতর্ক করে দিচ্ছেন, ‘সব ঘটনা সত্য কিন্তু চরিত্রগুলি কাল্পনিক’! উপন্যাসের সূচনাতেই তিনি হাঁটার কথা বলছেন। জীবনানন্দ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের হাঁটা থেকে আবুল বাশারের পথ হাঁটা এসবই উপন্যাসের ভূমিকা বলা যেতে পারে। যে ভূমিকা বলে দেয় পথ আসলে অতীতের কোনও নদী। নদী মরতে মরতেই পথের জন্ম। সে পথে হাঁটি আমরা সকলেই। উদ্দেশ্য বা গন্তব্য কোনোকিছুই মেলে না, তবুও হাঁটি। এটুকু অংশই বুঝিয়ে দেয় এই উপন্যাসেও আবুল বাশারের প্রবল উপস্থিতি। বেন ওকেরির ফেমিশড রোড থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা — এ উপন্যাসে অনায়াস ও প্রয়োজনীয় অংশ।
বাশার নিজে ছায়া (ভার্চুয়াল) সমাজ মাধ্যমে অর্থাৎ ফেসবুকে সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। তাই তিনি জানেন না রাজ্যের মুখমন্ত্রীর কবিতা নিয়ে সমাজ মাধ্যমে কী প্রবল ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও তিরস্কার। এসবের মাঝখান থেকে আমরা কোনোদিনই প্রকৃতপক্ষে তাঁর কবিতা পড়তেও পারিনি। বারুইপুরজংশন-এ বাশার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইকো ফেমিনিস্ট দিকটি আমাদের দেখিয়ে দিলেন, ও বিষয়টির ওপর তার একটি মরমী কবিতাও এই উপন্যাসের অংশ হয়ে রইল।
উপন্যাসটি ইকো ফেমিনিজমের ওপরেই। উপন্যাসের দুই মুখ্য চরিত্রের একজন বয়স্ক নারী বিবি বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরেকজন পাগল, যার নাম রব, যে আসলে লখনৌয়ের অর্থাৎ লক্ষণটিলার নবাব। এই দুজনেই আগলে রাখতে চাইছে আড়াই বিঘা জমি। যে জমিতে কেবল মানুষের অধিকারই নয়, সেখানে বসবাসকারী গাছ গাছালি, পশু পাখি, প্রজাপতি পতঙ্গ সকলেরই সমান অধিকার। কেবল মানুষ নয় মনুষ্যেতর প্রাণীও এই আখ্যানের অংশ। সেভাবেই পাই নয়নতারা ও তার বাচ্চাদের। নয়নতারা একটি পথকুকুর। যে কিনা ফুড টেস্টারও। আড়াই বিঘা জমির লোভে একটি বৃদ্ধাকে হত্যা করতে পারে তার পরিবারের লোকজন। তাই খাবার প্রথমে নয়নতারাকে দেওয়া হয়, তারপর মানুষের পাতে সে খাবার পরিবেশিত হয়। এখানেই পাগল ও অতীত নবাব রব-এর ভূমিকা। রব নয়নতারা ও তার বাচ্চাদের সুরক্ষিত রাখতে নিজে এগিয়ে এসে খাবার পরীক্ষা করে। অর্থাৎ ফুড টেস্টার আসলে রব। সে বারুইপুর লোকালে গান করে। রবের গান গেয়ে উপার্জিত টাকায় তার ধর্মবোন সৌন্ধবী কয়ালের সংসার নির্বাহ হয়। মানুষের অপরিসীম লোভ ও তার ঈর্ষার হাতে নয়নতারা খুন হল। নয়নতারা মারা গেলে রব তার বাচ্চাদের নিয়ে অজানা একটা দ্বীপে চলে আসে। পারস্যরাজ জাম-এ জামশেদ-এর মতো একটা জলপাত্রে সে নয়নতারাকে দেখতে পায়। সেখান থেকেও ফিরে যেতে হয় তাকে। রব ফিরে পায় তার লক্ষণটিলার স্মৃতি, স্ত্রী মানজুম ও কন্যাকেও। কেবল ফিরে যাওয়ার সময় বারুইপুরের স্মৃতি হারিয়ে ফেলে সে।
ফ্রয়েড, ইয়ুং ও স্ট্রিম অফ কনশাসনেশ-এর জ্ঞান এই উপন্যাস পড়তে সাহায্য করে। আবার এ বিষয়ে একদম না পড়াশনা থাকলেও উপন্যাসটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। মিথের ব্যবহার এই উপন্যাসে অনবদ্য। মিথ ও উপন্যাসের কাহিনী এমন অদ্ভুত দক্ষতায় মিশে আছে যে এই ক্রাফটের কাছে সম্মানে সম্ভ্রমে মাথা নীচু হয়ে আসে। বহুপাঠ এ উপন্যাসের অবশ্যই প্রাপ্য।
শারদীয় ‘লেখাজোকা’ পত্রিকায় পড়লাম তাঁর আরেকটি অসামান্য উপন্যাস ‘বাঁশরি কয়াল।’ সুন্দরবন এই উপন্যাসের পটভূমি হলেও এখানে সুন্দরবন যতটা উপস্থিত ঠিক ততটাই বাঘ ও মানুষের সম্পর্কও প্রবলভাবে উপস্থিত। লেখক সুন্দরবন নিয়ে কোনও বিস্তৃত বর্ণনায় উপন্যাস ভারাক্রান্ত করেননি বরং জীবন ও অনুভূতি এ উপন্যাসের বিষয় বলা যেতে পারে। গোপীনাথের ‘দাদিবুঢ়া’ উপন্যাসটি এই আখ্যানের নায়ক ছন্দস ও নায়িকা বাঁশরির সঙ্গে জড়িয়ে। সেই জড়িয়ে থাকার কারণ যেমন সাহিত্য অকাদেমির অনুষ্ঠানে আবুল বাশারের ‘দাদিবুঢ়া’ নিয়ে আলোচনা শোনা, তেমনই বাঘের মতো দৈব একটা বিষয় ওদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়াও। বাঘ যেন ছন্দসের নিয়তি। ঠিক যেমন বিধবা পল্লীর অজস্র শ্বেতশুভ্র পোষাকপরিহিতা নারীর আজন্ম দুঃখের নিয়তির সঙ্গে জুড়ে আছে সুন্দরবনের বাঘ! এরই সঙ্গে ছন্দস বাঁশরির বিরহে এসে মিশেছে একটা মানপাতার মুখোশ। বাঘের আক্রমণে যাদের মুখ বিকৃত হয়ে যায় তারা নিজেদেরকে মানপাতার মুখোশে ঢেকে রাখেন। আবার আশ্চর্যজনকভাবে এই মুখোশের আড়ালেও সেই বাঘের মুখোশই অনেকে বিক্রি করেন।
কান্তিবিদ্যাও খুব প্রয়োজনীয়ভাবেই এই উপন্যাসের অংশ। ঠিক যেমন বাঁকা বাওয়ালি ও তাঁর বাঘা বাধার মন্ত্র, সুন্দরবনের বাঘ অর্থাৎ লকলকি ও বিধবা পল্লির ননি, নালুয়া গ্রাম ও সেই গ্রামের বিশাল আকারের মানপাতাও যেমন এই উপন্যাসের শ্বাস প্রশ্বাসে মিশে আছে। আশ্চর্যজনকভাবে উপন্যাসের পরিসমাপ্তিও ঘটছে বাঘবিধবা পল্লির মাধ্যেমই। বাঘ বিধবা ননীই ছন্দস ও বাঁশরিকে মিলিয়ে দিয়েছে। যে মিলনের বাধা ছিল বাঘের আক্রমণে রূপ হারিয়ে ফেলা ছন্দসের মুখ নিয়ে তার নিজস্ব তৈরি করা ভীতি!
রূপমাধুরীই যে প্রেমের পরাকাষ্ঠা নয় তা যেন বুঝিয়ে দিল বাঁশরি। অথবা রূপমাধুরী যে কেবল বাহিরের রূপ নয় অন্তরের রূপটিই তার আসল পরিচায়ক সেই বার্তাই নেমে এল উপন্যাসের শেষ অংশে।
বিজ্ঞান ও সৌন্দর্যের মিলাপ বাহির সৌন্দর্যের জন্য প্রয়োজনীয়। হৃদয়ের কারিবারীদের চোখ যে অন্তরের সৌন্দর্যে সেঁধিয়ে, এ এক মর্মস্পর্শী দৃশ্য ও অনুভব! বাঁশরি কয়াল সেই বার্তাই বহন করে।
বাশারের এই দুটি উপন্যাসের অভিনব গদ্যশৈলী পাঠককে মুগ্ধ করে ও হয়ত দূরবর্তী সময়ে গবষকদের প্রলুব্ধ করবে এই শৈলীর নতুন কোনও নামকরণে।