| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (৯১ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৭০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২

দারার জোট

যদুনাথ সরকার বলছেন দুর্যোগের সময় নিজের দল আর সাম্রাজ্যের কাঠামোকে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে তিনি [দারা] চরম ব্যর্থ। আধুনিক এবং ঔপনিবেশিক ইতিহাস দারার পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে দাঁড়িয়েছে — তাঁকে নায়ক এবং আওরঙ্গজেবকে খলনায়ক বানিয়েছে। তাসত্ত্বেও তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ দারার ব্যর্থতার যুক্তি খুঁজেছেন। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার দারার ব্যর্থতার যুক্তি খুঁজতে তাঁর বেড়ে ওঠা, তাঁর চরিত্রের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদুনাথ আওরঙ্গজেব বিরোধী। মুঘল সাম্রাজ্যে আকবরের পরেই  দারাকে শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে গণ্য করেন তিনি। যদুনাথ মনে করেন দারার পতনের কারণ তার চরিত্রের মধ্যেই নিহিত আছে। দারা হিন্দুস্তানের ধর্মান্ধ শক্তিগুলোর সক্রিয় বিরুদ্ধাচরণ করে হিন্দুত্ব আর ইসলামের মৌল বিশ্বজনীন চরিত্র মিলিয়ে মিশিয়ে একটি সংশ্লেষী সম্পর্ক তৈরি করার উদ্যম নিয়েছিলেন। কিন্তু বড় ছেলের প্রতি বাবার অন্ধ ভালবাসা দারার চরমতম ক্ষতি করেছে। তাঁকে চিরকালই দরবারের চার দেওয়ালের সুরক্ষায় আগলে রেখেছেন শাহজাহান — একমাত্র ব্যতিক্রম কান্দাহারের তৃতীয় যুদ্ধ — সেখানেও দারা চরম ব্যর্থ হন। তিনি নিজের হাতে যুদ্ধের প্রকরণের শিক্ষাগ্রহণ করেন নি; দরবারের বাইরে থেকে নিজের সাহসে, নিজের বলে, নিজের প্রজ্ঞায় সরকার চালানোর রণনীতি শেখার সুযোগ গ্রহণ করেন নি; চরমতম রাজনৈতিক, সামাজিক বিপদে এবং আতান্তরে পড়লে পাশে থাকা বন্ধুবান্ধব, সহকারী, সাহায্যকারীরা পক্ষে বিপক্ষে কী কী ধরণের আচার আচরণ করতে পারে, সেটা বোঝার পরীক্ষাও দিতে হয় নি; যুদ্ধের জন্যে তৈরি সেনার সঙ্গে কাজ করারও সুযোগ পান নি। সিংহাসনের লড়াইকে যদি আমরা মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীদের যোগ্যতমের উদ্বর্তনের প্রক্রিয়া হিসেবে গণ্য করি, সেই চরম পরীক্ষায় তিনি নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলেন দরবারি পরিবেশের বাইরে হাতে কলমে কাজ করার অভিজ্ঞতার অভাবের জন্যে। অতুলনীয় সম্পদের অধিকারী হয়ে, রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রে বছরের পর বছর কাটানোর প্রভাব তাঁর চরিত্রে পড়েছিল। চার দেওয়ালের ঘেরাটোপে বসে থাকায় তার মধ্যে মিতাচার এবং সংযমের অভাব ঘটেছিল। ঘটমান বর্তমান কীভাবে ভবিষ্যতের ঘটনাবলীতে প্রভাব ফেলতে পারে, সেই দূরদৃষ্টির বিকাশ তার মধ্যে ঘটে নি — যেটা সফল রাজনীতিকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। দরবারি চাটুকারিতার পরিবেশ তাকে গর্বিত করেছে। বাবা আর দিদির অনুগ্রহে নিজেকে দিল্লি সিংহাসনের স্বাভাবিক অপ্রতিদ্বন্দ্বী উত্তরাধিকারী হিসেবে ভেবে নিয়েছেন। প্রায় প্রত্যেক দরবারি উচ্চপদে বসে থাকা আমলার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন। মানুষের চরিত্র আন্দাজ করার যোগ্যতা তৈরি হয় নি বলেই স্বাভিমানী এবং সবল চরিত্রের মানুষেরা রাজনীতিতে পক্ষ বাছার চরম সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তার মত অকম্মা এবং নিরর্থক নেতাকে ত্যাগ করেন। যদুনাথের খেদ হল, দারা অসামান্য স্বামী, অনুরক্ত পিতা এবং উতসর্গিত সন্তান; কিন্তু শাহী পরিবারের প্রধানতম কাজ হল দুর্যোগের সময় মানুষকে নেতৃত্ব দেওয়া, সেই প্রাথমিক কাজে তিনি চরম ব্যর্থ। দীর্ঘকালীন স্বচ্ছল, নিরাপদ পরিবেশে বড় হওয়া তাকে ভঙ্গুর চরিত্রের মানুষ তৈরি করেছে। বিশেষ বিশেষ রাজনৈতিক পরিবেশের চাহিদাক্রমে সুচতুর পরিকল্পনা করে এগোনোর জন্যে যে মানসিক চরিত্র বিকাশের দরকার ছিল, সেই অনুশীলনের মধ্যে দিয়ে তিনি যান নি; ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে বিপক্ষের চোয়াল থেকে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া, নায়কেরমত চরম প্রত্যাঘাত করে জয়মাল্য ছোঁ দিয়ে কেড়ে আনার দক্ষতা, নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, যোগ্যতা তার ছিল না। সেনাপতি যদি সাধারণ সেনার সঙ্গে হাতে হাত লাগিয়ে যুদ্ধ করেন, যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুমুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেনার মধ্যে প্রতিকূল পরিবেশেও যুদ্ধ জয় করার প্রণোদনা জন্মায়। নিজের দক্ষতা মাঠে-ঘাটে প্রয়োগ করার সুযোগটাই সম্রাট তাঁকে করে দেন নি।  সৈন্যদলের ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত সমন্বয় করার ক্ষমতা বিকশিত হয় নি। সত্যকারের সেনানায়ক  মাথা ঠাণ্ডা করে চরমতম হিংস্র যুদ্ধের মাঝে দাঁড়িয়ে চলন্ত যুদ্ধের গতিশীলতা বুঝে, বিপক্ষের রণনীতি আগেই আন্দাজ করে তৎক্ষণাৎ দলকে চালনা করেন। সমস্যা হল স্বয়ং সম্রাটের অনুগ্রহেরর জন্যে, শাহী রাজকীয় নিরাপত্তার জন্যে, জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের এই সব শিক্ষা গ্রহণের সুযোগটাই অধরা থেকে যায়। যুদ্ধশিল্প শেখার কাজে শিক্ষানবিশি থেকে যাওয়ায় তিনি বিপক্ষের হাতে সিংহাসন তুলে দেওয়া নিশ্চিত করলেন।

দীর্ঘ সময় ধরে দরবারি রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় এবং সম্রাট প্রকাশ্যে বড় ছেলেকে তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করে দেওয়া সুবিধে দারা শুকো পেয়েছিলেন। সিংহাসন দখলের রাজনীতি সামাল দিতে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত দরবারি অভিজাত তাঁর সঙ্গে জোট বাঁধেন। দারার জীবনে শুধু বাবা সম্রাট শাহজাহানই দীর্ঘ ছায়া ফেলেন নি, দারা শুকোর জীবন গড়ে তুলতে অবিবাহিত দিদি জাহানারার বিপুল প্রভাব ছিল। বলা যায় বাবা ছাড়া তাঁর জীবনে সব থেকে বেশী প্রভাব ফেলেছেন দিদি জাহানারা। ১৬৩০ থেকে ১৬৫৮-র শেষ সময় পর্যন্ত পাদিশা বেগম জাহানারা ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের সব থেকে প্রভাবশালী মহিলা। সাম্রাজ্যের অন্যতম ধনী ব্যক্তি। তাঁর বাৎসরিক আয় ছিল ১ কোটি টাকা। মানুচির দাবি, এই বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে জাহানারা বিপুল সেনাবাহিনী, বিশাল আমলাতন্ত্র পালন করেছেন। শাহজাহান যখন শাহজাহানাবাদ [আজকের পুরাতন দিল্লি] শহর তৈরি করছেন, সে সময় বিশাল অর্থ বিনিয়োগ করে বিশাল বিশাল প্রাসাদ, অন্যান্য শহর কাঠামো তৈরি করিয়েছেন। নতুন দিল্লি, শাহজাহানাবাদে সব থেকে বড় বাজার, সব থেকে বড় রোশনাইওয়ালা বাগান তৈরি করান দারার দিদি। ১৬৪০-এর শেষের দিকে আগরায় সব থেকে বড় জামা মসজিদ, সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম নামাজ পড়ার কাঠামোটি তিনিই তৈরি করান। তিনি ছিলেন দারার ঢাল। যখনই দারা সমস্যায় পড়েছেন, জাহানারা দারাকে উদ্ধার করতে ক্ষমতার হাত, সম্পদের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ১৬৫৮-য় যখন সিংহাসনের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে, তিনি দারাকে শুধু অর্থই সাহায্য করেন নি, তাঁকে বিপুল গয়না সম্পদ দিয়েও সাহায্য করেছেন। সমুগড়ে দারার পরাজয়ের পরে সিংহাসনের লড়াইএর শান্তিপূর্ণ সমাধানের ভাবনা, ভাইদের মধ্যে সাম্রাজ্য ভাগের পরিকল্পনা তাঁর মাথাতেই প্রথমে আসে। আমাদের ধারণা জাহানারা পাঞ্জাব, গুজরাট এবং রাজস্থানে সুফি এবং মনসবদারির যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে দারাকে ১৬৫৮-৫৯-এ পালিয়ে থাকতে সাহায্য করেছেন।

দারা যেহেতু সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে বহুকাল থানা গেড়েছিলেন, তাই মুঘলদের সাম্রাজ্য বিস্তারে অর্থ সাহায্য করা জৈন সওদাগরদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এইরকম এক দারা ঘনিষ্ঠ জৈন ব্যবসায়ী ছিলেন শান্তি দাস। তিনি সুরাটের ব্যবসায়ী সংগঠনের মাথা এবং জমিদারও ছিলেন। দারার অভয়বাণী নির্ভর করে ১৬৪২ থেকে তিনি মুঘল হিন্দুস্তানের যে কোনও যায়গায় তার সম্পত্তি, সম্পদ সরিয়ে নিতে পারতেন। এস এ আই তিরমিজি’র মুঘল ডকুমেন্টস (এডি ১৫৭৭ টু এডি ১৮০৫) ৭১ পাতায় পাচ্ছি আহমেদাবাদে যে মন্দির আওরঙ্গজেব ধ্বংস এবং দখল নিয়েছিলেন সেটিকে নতুন করে গড়ে তোলার অনুমতি পেলেন শান্তি দাস। একই সঙ্গে শান্তি দাস বিদেশ থেকে দামি গয়না আমদানি করারও অবাধ অধিকার পেলেন। আমদানি করা গয়না, দামি রথ ইত্যাদি শাহজাহানকে দারার অনুগামী হিসেবে পেশকাশ রূপে দিতেন শান্তি দাস। ফলে দরবারে দারার গুরুত্ব বাড়ত। যদিও সিংহাসনের যুদ্ধের সময়, ১৬৫৭-য় শান্তি দাস দারার ভাই গুজরাটের সুবাদার মুরাদের পাশে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর দারা-আনুগত্য যায় নি। এক বছর পর ১৬৫৯-এ দারা গুজরাটে লড়াই চালাবার জন্যে অর্থ জোগাড়ে এলে, শান্তি দাস তাঁকে যথেষ্ট পরিমান অর্থ সাহায্য দিয়েছেন। এছাড়াও বৃন্দাবন দাস রাই লুবুততাওয়ারিখএ বলছেন, বাংলায় সুজাকে জব্দ করার ক্ষেত্রে আওরঙ্গজেব কী কী সমস্যায় পড়েছেন, সে সব খবরও বেশ কিছু অনামা গুজরাটি ব্যবসায়ী দারাকে দিতেন। হয়ত এই দলে শান্তি দাসও থেকে থাকবেন। এইসব তথ্য আর সম্পদের ওপর নির্ভর করে পলাতক দারা শুকো আজমেঢ়ে থানা গেড়ে সিংহাসনে আরোহন করা আওরঙ্গজেব এবং সাম্রাজ্যের অক্ষহৃদয়কে শেষ বারের মত ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা ছকেছিলেন।

শুধু জৈন ব্যবসায়ীই নয়, দারার অন্যান্য কিছু হিন্দু গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখার তথ্যও পাওয়া যাচ্ছে। ১৬৪৬-এ দারা নিজের সিল ব্যবহার করে সম্রাটের হয়ে ফরমান জারি করেন গোকুল আর গোপালপুর অঞ্চলে গোস্বামী ভিঠল রাইএর নামে। ফরমানে নির্দেশ দেওয়া ছিল মুঘল সাম্রাজ্য যাতে আদিআনন্তকাল রাজত্ব চালাতে পারে, তার জন্যে গোস্বামীরা যেন নিয়মিত প্রার্থনা করেন। ১৬৪৬-৪৭ বছরে এদের জন্যে দারা শুকো পর পর তিনখানা ফরমান জারি করেন সূত্র Imperial Farmans (AD 1577 to AD 1805) Granted to the Ancestors of His Holiness the Tikayal Maharaj, ed. K. M. Jhaveri, (Bombay, 1928)।

মূল ধারার ইসলামি ধর্মতাত্ত্বিক এবং ধর্মগোষ্ঠীদের প্রতি বহুল প্রচারিত মোহভঙ্গের সংবাদের মাঝেও দারা শুকোর সাম্রাজ্যজুড়ে বেশ কিছু ইসলামি গোষ্ঠীকে দান-ধ্যান করার নথি উদ্ধার করা গিয়েছে (লছমন সিং, তারিখ-ই-জিলাই-বুলন্দশহর বা এম এম বিলগ্রামীর তারিখ-ই-খতই-পাক-ই-বিলগ্রাম; শামসুদ্দিন বেলগাউমির তারিখ-ই-মুখতাসর-ই-দখন, এসএআই তিরমিজি মুঘল ডকুমেন্টস ইত্যাদি)। এসএআই জৌনপুরীর তারিখ-ই-সালাতিনই ঔর সুফিয়ায়িজৌনপুরে পাচ্ছি জৌনপুরের উলেমাকে মসজিদ-ই-দারাশুকো তৈরি করার জন্যে দান দিয়েছিলেন তিনি। আবুল হাসানাত নাদভি হিন্দুস্তান কি কাদিম ইসলামি দর্শগাহেঁতে বলছেন স্থানেশ্বরে তিনি একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র চালাতে অর্থ সাহায্য করেছেন। ১৬৫৬ দারা শুকো, মদিনায় নবী মহম্মদ মসজিদের জন্যে দামি কার্পেটের পাশাপাশি মক্কায় ১ লক্ষ টাকার দান দেওয়ারও নির্দেশ দেন। তিনি আজমেঢ়, দিল্লি আর দক্ষিণের খুলদাবাদের চিস্তি সুফি এবং তাদের দরগাতে নানান ধরণের দান দেন এবং তাদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তিনি জানতেন, সুফিদের প্রভাব যেহেতু বৃহত্তর জনসমষ্টির ওপরে বিস্তৃত হয়েছে বহুকাল জনসমক্ষে থাকার ফলে, তিনি শেষ মুহূর্তে শাসন ক্ষমতায় নিজের বৈধতা তৈরি করতে এই সব সুফি গোষ্ঠীকে নানান ধরণের দান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এমন কী যে সব সুফি খুব বিখ্যাত তারিকার অনুগামী বা অংশ নন, তাদেরও তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন — যেমন বিবসন কলন্দর সরমাদ। ১৬৫০-এর দশকজুড়ে কলন্দর সরমাদ, দারার ঘনিষ্ঠতম সন্ত ছিলেন। তিনি দারার জয়ের ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন। এইভাবে ধার্মিকেরা জনগণের মনে ভবিষ্যতের সম্রাটের বৈধতা তৈরি, আর সমর্থন জোগাড় করেছেন। এছাড়াও জৌনপুরের শাহ ফতেহ মুহম্মদ কলন্দর বা পাঞ্জাবের শেখ সুলেইমান মিসরি কলন্দর বা শাহ মুহম্মদ দিলরুবা এবং শেখ বারির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল। দারার নির্দেশ ছিল শেখ বারি মুলতান সুবার যে অঞ্চলেই যাবেন, সেখানে তাঁকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভব্য সম্মান দেখাতে হবে।  ১৬৫২-য় তাঁর মৃত্যুর পর রবি নদীতে বন্যা আটকানোর জন্যে সুফির সম্মানে একটা বাঁধ তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন।

এতসব মুসলমান সন্তদের পৃষ্ঠপোষকতা করার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, তাঁর সম্বন্ধে সাধারণ মানুষের মনোভাব পরিবর্তন। সাম্রাজ্যজুড়ে অধিকাংশ মানুষ দারাকে ইসলামধর্মতত্ত্ব বিরোধী শাহজাদা হিসেবেই দেখত। জনমানসে দারার ইসলাম বিরোধী রাজপুরুষ হিসেবে যে ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছিল, জীবনের শেষের দিকে বিভিন্ন তরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে সেই ধারণা বদলাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে কাদিরি তরিকার সঙ্গে তাঁর যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাকে দারা সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করেছেন (দারা শুকো, সাকিনাতুল-আউলিয়ায় [সম্পা তারা চাঁদ, রেজা জিলানি নাইনি] God’s grace in this world and the next)। এর প্রভাব আমরা পাই তার ছদ্মনাম নেওয়ার সিদ্ধান্তে। কবিতায় তিনি কাদরি সমাজ প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানি, দারার আতলিক মিঞা মীর বা মুল্লা শাহ বখশের স্মরণে ‘কাদিরি’ ছদ্মনাম নিয়েছেন। জনমানসে তৈরি হওয়া ভাবমূর্তি সমাধানে তিনি যে সব পদক্ষেপ করলেন তাতে অনেকগুলো ভুলও ছিল। অধিকাংশ মোকাম মনে করত তিনি একমাত্র মিঞা মীরের অনুগামী। ফলে কাদিরি তরিকা সহ অন্যান্য অন্যান্য সুফি মোকাম তাঁর পাশ থেকে সরে যেতে থাকে। ফলে দারাকে ধর্মীয় অগ্রাধিকার নিয়ে খুবই সমস্যাজনক বিতর্কে ঢুকতে হয়। এই ধরণের ভুল পদক্ষেপের ফলে আওরঙ্গজেব দাদাকে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার সুযোগ পেয়ে যান।

রিচার্ড ঈটন ইন্ডিয়া ইন পারসিয়ানেট এজ ১০০০-১৭৬৫ বইতে বলছেন দারার সমস্যা ছিল রাজনৈতিক। দারা রগচটা, নাক উঁচু, খারাপ ব্যবহারের জন্যে বিখ্যাত, সেটা স্বয়ং শাহজাহানের বয়ানে আহকমই আলমগিরিতে হামিদুদ্দিন খান বাহাদুর বলেছেন। শাহজাদাদের মধ্যে একমাত্র দারা শুকোই দরবারে ক্ষমতাধর উচ্চপদে নিযুক্ত আমীর অভিজাতদের না হক খেপিয়ে তুলেছিলেন। সিংহাসনে লড়াই-এর তুঙ্গ মুহূর্তে, মুঘলদের ক্ষমতাধর জোট সঙ্গী অম্বরের বয়স্ক কাছোয়া রাজা জয় সিংহকে তিনি অপমানসূচক নাচনেওয়ালি-গানেওয়ালিদের সঙ্গে তুলনা করে চটিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় রাজা চুপ করেছিলেন ঠিকই কিন্তু এর প্রভাব পড়েছিল যুদ্ধক্ষেত্রে। আরেক সেনাপতি-উজির, আওরঙ্গজেবের জোট সঙ্গী মীর জুমলাকে তিনি তাঁকে নানাভাবে খেপিয়েছেন। নিজের এবং সম্রাটের ক্ষমতা বোঝাতে তিনি দানেশমন্দ খানকে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদ থেকে টেনে নামান। মামা এবং চট্টগ্রাম থেকে ফিরিঙ্গি-মগেদের তাড়িয়ে দেওয়ার জন্যে বিখ্যাত, পরে বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানকেও তিনি চটিয়েছিলেন। বার্নিয়ের বর্ণনায় পাচ্ছি প্রবীণ গুরুত্বপূর্ণ শাহী সেনানায়ক খালিলুল্লা খানকে উন্মুক্ত দরবারে অন্যান্য অভিজাত আমীরের সামনে কোনও এক কারনে জুতোপেটা করেন দারা শুকো। আমীরের অপমান আগামী দিনে দাদার পক্ষে জীবনঘাতী হয়ে উঠবে। আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে সমুগড়ের ভাগ্য তৈরির যুদ্ধ তখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এত কঠিন যুদ্ধ হচ্ছিল যে আওরঙ্গজেব মাহুতকে হাতির চারটে পা, মাটিতে বেঁধে রাখার নির্দেশ দিলেন, যাতে হাতি পালিয়ে না যেতে পারে। অসামান্য সেনাপতি হিসেবে আওরঙ্গজেব জানতেন যুদ্ধের ভয়ঙ্কর আওয়াজে তাঁকে পিঠে নিয়ে হাতি যুদ্ধে ছেড়ে ভড়কে পালিয়ে গেলেই যুদ্ধ শেষ। এইরকম তীব্র যুদ্ধের মাঝে দারার হাতে খোলা দরবারে সকলের সামনে চটির ছপটি খাওয়া খালিলুল্লা খান অপমানের বদলা নিতে দারাকে প্রস্তাব দিলেন হাতি থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করার। জীবনে যুদ্ধ না করা নালায়ক দারা বুঝলেন না তিনি কোন ফাঁদে পা দিচ্ছেন। হাতি থেকে নেমে ঘোড়ায় চড়লেন — দূরে থাকা এক দল সেনা, যারা নায়কের ইঙ্গিতে যুদ্ধ করে, তারা হাতির ওপর সেনানায়ককে না দেখে মনে করল তাদের নায়ক মারা গিয়েছেন, কাছে থাকা অন্য দল ভাবল দারা হেরে যুদ্ধে ইস্তফা দিয়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। সেনারা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। সেই যুদ্ধ হেরে গেল দারা — সিংহাসন অধরা রয়েগেল তার।

আমরা যেন ভুলে না যাই, সিংহাসনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত দারা শুকোর পাশে ছিল স্বয়ং সম্রাট এবং দরবারি আমীর অভিজাতদের সমর্থন। তারা কিন্তু সম্রাটের বড় ছেলের পাশেই ছিলেন। দরবারে বসে থেকে দারা শুধু যে বিপুল সম্পদ, রসদ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতেন তাই নয়, সাম্রাজ্য জুড়ে খবরাখবর আনা পাঠানোর কাঠামো তাঁর হাতের মুঠোয় ছিল। দ্রুত যোগাযোগের আগে এই ধরণের সংবাদ নেটওয়ার্কের কী যে অসামান্য গুরুত্ব ছিল, এবং এটা কীভাবে বিপক্ষ থেকে তাকে কয়েক কদম এগিয়ে রাখত সেটা আজকে একটি বোতাম টিপে যোগাযোগ করার যুগে বোঝা যাবে না। কিন্তু দারার এত বিপুল সুযোগ, সম্পদ, ক্ষমতা আওরঙ্গজেবের প্রশাসনিক এবং মাথা ঠাণ্ডা রেখে যুদ্ধ করার দক্ষতা আর অভিজ্ঞতার সামনে তুচ্ছ হয়ে গেল।

মানুচি আওরঙ্গজেবকে ভাইদের থেকে আলাদা চরিত্রের মানুষ হিসেবে দেখছেন, আওরঙ্গজেব খুব গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাগুলো গোপনে তৈরি আর অসামান্য উদ্যমে সম্পাদন করতে পারতেন ‘…বিষণ্ণ মেজাজে তিনি প্রত্যেক মুহূর্তে নিজেকে কিছু না কিছু কাজের সঙ্গে জুড়ে রাখতে ভালবাসতেন’। বার্নিয়ে বলছেন, ‘আওরঙ্গজেব, দারা মত দরবারি ছিলেন না, তাঁর শরীরে শহুরে চাকচিক্য ছিল না, আকর্ষক ব্যক্তিত্বও ছিল না, কিন্তু তিনি দক্ষভাবে ঘটনার গতিপ্রকৃতি বুঝতে পারতেন, সৎ, বিশ্বস্ত, যোগ্য সহকারী নির্বাচনে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছেন… তিনি বুদ্ধিমানের মত চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রও মন দিয়ে করতেন… সেটা চক্রান্তগুলো এমন দক্ষতায় রূপায়িত করতেন যে, দরবারে একমাত্র দারা ছাড়া আওরঙ্গজেবের চরিত্র কেউ খুব একটা বুঝে উঠতে পারে নি’। যে জন্যে দারা দাঁত নখ বার করে দরবারে আওরঙ্গজেবের পাঠানো প্রায় সমস্ত প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev