| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পুরনো কলকাতার ডাকাত (প্রথম পর্ব) : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ১০৯০ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২

কাশীপুর রোড আর চিৎপুর রোডের মোড়ে যে বিবিবাজার, তাকে পিছনে ফেলে গঙ্গার দিকে কয়েক কদম হাঁটলেই ডান হাতে চিত্রপুরের চিত্তেশ্বরী দুর্গার মন্দির। প্রতিষ্ঠা ১৬১০ সাল। প্রতিষ্ঠাতা চিতু বা চিতে ডাকাত। কাশীপুর রোড ধরে উত্তরমুখো হাঁটলে পড়বে রঘু ডাকাত প্রতিষ্ঠিত শিবমন্দির, রঘু ডাকাতের কালীর থান। কিছু লিখিত তথ্য, কিছু বংশপরম্পরায় শোনা, কিছুটা নিছক কিংবদন্তী মিলিয়ে-মিশেয়ে অন্য কলকাতার আদি পুরুষদের যে অবয়ব, তাঁরা ছিলেন ডাকাত। হাঁকডাকওয়ালা নামজাদা সব ডাকাত। অন্য কলকাতার অন্যতম আদি পেশাও ডাকাতি।

সুতানুটির উত্তরদিকটায় ছিল এদের নিরঙ্কুশ অধিষ্ঠান, প্রবল আধিপত্য। চার্ণক এখানে পা ফেলার আগে, নবাবী আমলের অন্য শহরের এরাই প্রধান বাসিন্দা। চিত্তেশ্বরী মন্দিরের সেবাইতের মুখে শোনা চিতু ডাকাতের বৃত্তান্ত এই রকম —

সে আমলে নবাব-মনসবদার-সুবেদারদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতেই হাতিয়ার ধরেছিল চিতু। সুতানুটির আশপাশের সাঁওতাল-মালোদের নিয়ে সে তৈরি করেছিল দুর্ধর্ষ এক দল, যার অবাধ যাতায়াত ছিল বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা সুবার সর্বত্র। নবাবী আমলের অত্যাচার থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে চিতু তাদের রীতিমতো ট্রেনিং দিয়ে রপ্ত করে তুলেছিল। তারপর নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে দিয়েছিল তার চরের দল। যেখানেই উৎপীড়ন হতো, রণপায় হেঁটে বা গঙ্গায় ছিপ বেয়ে দ্রুত গতিতে সে খবর চলে আসতো চিতুর কানে। প্রথমে হুমকি, হুঁশিয়ারি। তাতে কান না দিলে তড়িৎগতিতে হামলা। দলে থাকত পঞ্চাশ থেকে ষাটজন। লুঠ-করা মালপত্র নাকি চিতু ছুঁতো না। তা ভাগ করে দেওয়া হতো গবির-গুর্বোদের মধ্যে। কোম্পানির আমলে চিতুর দল দুর্বল হয়ে পড়ে। চিতুর পর দ্বিতীয় চিতুর আমলে দল প্রায় বসে যায়। বিলেতি ‘বুলডগ’-এর তাড়ায় ডাকাতির পেশা ছেড়ে চিতুর দলবল কেউ জেলে, কেউ মাল্লা বনে যায়। তাদের বংশধররা এখনও নাকি রয়েছে কাশীপুর-চিৎপুরের গঙ্গার কিনার ধরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। রঘুকে নিয়ে অবশ্য উপন্যাস-কিস্‌সা লেখা হয়েছে এ দেশে। কীভাবে রঘু চিঠি পাঠিয়ে ডাকাতির দিনক্ষণ আগাম জানিয়ে দিত, কীভাবে রাতের অন্ধকারে রন-পায় দৌড়ে তারা সম্পন্ন জমিদারের বাড়িতে গিয়ে পড়ত, নারীদের মাতৃজ্ঞানে কীভাবে কদর দিতো তারা — সে নিয়ে অনেক গল্প — কলকাতার সেকালের মায়েরা রোজ রাতে যা শুনিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াতেন। তবে অন্য কলকাতার আদি-ইতিহাসের এ অংশের সব থেকে রক্ত-হিম করা রটনা হলো — চিত্তেশ্বরী মন্দিরে প্রতি অমাবস্যায় নরবলি হতো। দারুনির্মিত চিত্তেশ্বরীর সিংহবাহন দশভূজা মূর্তির সামনে হাঁড়িকাঠে ফেলা হতো সুলক্ষণ এক একটি বালকে। তার রক্তে খড়গ ভিজিয়ে রওনা হতো চিতুর দল।

চিতু ডাকাতের চিত্তেশ্বরী দুর্গার মন্দির

চিৎপুর রোড বরাবর আরও উত্তরে রয়েছেন রঘু ডাকাতের কালী। জনশ্রুতি, রঘুর এই বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার মূলে আছে একটি স্বপ্নাদেশ। এখানকার বাতাসে আজও ওড়ে এসব গল্প। স্বপ্নে-পাওয়া বীজমন্ত্র সম্বল করে রক্তপিপাসু চামুণ্ডার ভয়ংকরতম উপাসক হয়ে ওঠেন রঘু। বিখ্যাত দস্যুদের নিয়ে ব্যালাড লেখার রেওয়াজ এ দেশে নেই। থাকলে হয়তো-বা আজও, একবিংশ শতকেও তা শোনা যেত ঘরে ঘরে। দক্ষিণে মনোহরপুকুরেও নাকি ছিলেন আর-এক ডাকাতে কালী। মনোহর ডাকাতের কালী। সব ডাকাতের কালীবাড়িতে একটা লোকপরম্পরায় শোনা যায় যে, তাঁদের চ্যালেঞ্জহীন রাজত্বের মূলে এই আদ্যাশক্তি। আবার হয়তো নিছক লোক টানবার জন্যই এসব গল্প তিল থেকে তাল হয়েছে। কে জানে! হলপ করে কিছু বলার মতো মালমশলা কারও হাতে নেই যে। তবে নার্ভাস, নির্জীব বাঙালি জাতের ধমনীতে কিছুটা চাঞ্চল্য আর শিভালরি এনেছিলেন অন্য কলকাতার আদি বাসিন্দারা, সে যুগে। এখন সে ডাকাত নেই, কায়দা-কানুন থেকে চরিত্র পর্যন্ত ডাকাতির খোলনলচে পাল্টে গিয়েছে তিন শতকে। অন্য কলকাতার আদি ডাকাতদের বংশধররা এখন সংখ্যায় আরও বেড়েছে। সেভাবে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের গঠন একালে মানা হয় না।

আঠার শতকের শেষ থেকে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত একটানা ডাকাত-রাজ। রঘু-চিতু-বিসেদের অন্য এই কলকাতা বা বৃহত্তর কলকাতা বেড়ে উঠেছে একটা অস্থির, টলমলে সামাজিক-রাজনৈতিক বাতাবরণে। নবাবী তখত-ই তাউসের তাকত যতই ঢিলে হয়েছে, ততই দাপটে বড় হয়েছে সাদা চামড়ার বেনিয়া-সাম্রাজ্য। পলাশীর আমবাগান থেকে ব্যারাকপুরের লাটবাগান, সিরাজ-ক্লাইভের যুদ্ধ থেকে পেপাই-বিদ্রোহ — প্রায় এক শতক জুড়ে ছড়ানো ডাকাতের, ডাকাতির ইতিহাস। প্রশাসন যখনই কমজোরি, তখনই বাড়বাড়ন্ত হয়েছে অন্য দুনিয়ার। ইতাহাস তাই-ই সাক্ষ্য দেয়। একদিকে ক্লাইভ-ভ্যান্সিটার্টদের দাবার ছকে নয়া নয়া চাল, অন্যদিকে ক্ষীয়মান নবাব-মানসবদার-রাজা ভুঁইঞাদের সামন্ত-শাসন। একদিকে গঙ্গা বেয়ে আসা মারাঠা বর্গীদের দুরন্তগতির হামলা, অন্যদিকে বিদেশী মুনাফাখোরদের কুঠি-দখলের লড়াই। সব মিলিয়ে, এ সময়টা নিশ্চিন্তে কাটিয়ে দেবার মতো ছিল না আদপেই। এবং তারই মাঝে ঠগী-ডাকাতদের একচেটিয়া লুঠতরাজ।

রঘু ডাকাতের কালীর থান।

অর্থনৈতিক কারণে কলকাতারও গুণগত পরিবর্তন হচ্ছিল এ সময়ে। ১৭৯৩ সনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ইংরেজদের মোসাহেবির প্রসাদে পরিপুষ্ট হঠাৎ-নবাবরা একেবারে দল বেঁধে চলে এলেন কলকাতায়। প্রচুর পয়সা, বিপুল জমিজমা, উড়িয়ে-ছড়িয়ে বসে খেলেও সাতপুরুষ চলে যায়। তাই বাই নাচ, বুলবুলির লড়াই, সোনাগাছি, হাফ আখড়াইয়ের জমজমাট মেহ্‌ফিল। এরই পাশাপাশি শহরের আশেপাশেই নীলকর সাবেবদের নির্মম অত্যাচার।

১৭৬৯-৭০ সালের মন্বন্তর, অভাবে-দারিদ্র্যে রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ আকালে উজাড় হচ্ছেন। সেই সময়ের অন্য কলকাতার এই হলো চালচিত্র। ফলে সে সময়ে ‘ধনীর শত্রু, গরিবের বন্ধু’ যারাই হোক না, তাঁরাই প্রায় অতিলৌকিক একটা স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে। তাই সে সময়ের রবীনহুডরা এসেছে ত্রাতার ভূমিকায়। ভয় নয়, ভক্তিতেই তারা পুজো পেয়ে এসেছে। সেসময়ে অন্য কলকাতার বিস্তর ধনী মানুষের বসত গজানো। চুম্বকের মতো সেদিকেই নজর যত গেছে, ততই ডাকাতদল গায়ে গতরে বেড়েছে। ততই তাদের পোয়া বারো। হাতে লাঠি, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কানে তাদের গোঁজা জবার ফুল — সে সময়ের ছেলেভুলানো গল্পগাঁথায় তাই তারা এক কাহিনি থেকে অন্য কাহিনিতে বিচরণ করেছে অনায়াসে।

ঐতিহাসিক সত্যটা হলো, অন্য কলকাতার এই আদি বাসিন্দাদের উপদ্রবে নাজেহাল ইংরেজ কোম্পানি ১৮৫২ সালে ডাকাত-কমিশন বসিয়েছিল। নথিপত্র বলে, এরপর থেকেই ডাকাতদের দূর্দিন ঘনিয়ে আসে। আগের মতো অতটা অবাধে কাজ কারবার চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। তাই এ সময়ে ডাকাতির রমরমায় কিছুটা ভাটা পড়ে। দল ভেঙে যায়। পেশা পালটে নতুনতর ক্রাইমে চলে যায় বেশির ভাগ। গোরা পল্টনের সেপাইরা পদে পদে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করে এদের। ভয়ংকর চাপে ছড়িয়ে পড়ে দলের স্যাঙাতরা।

রঘু ডাকাতের কালী।

পাশাপাশি ছিল ‘ঠগীর’ দল। মধ্যভারত থেকে শুরু করে কলকাতার উপকণ্ঠ পর্যন্ত একচেটিয়া রাজ চলেছিল তাদেরও। প্রাচীন সরকারি নথিতে রয়েছে তার ভুরি ভুরি প্রমাণ। একটা বয়ান এইরকম — সেনাবাহিনীর কিছু সৈন্য হঠাৎ হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের এদিকে টনক নড়ে। খোঁজ, খোঁজ। খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয় এই ঠগীর দল। শুধু গোরা পল্টনের সিপাই নয়, নিরীহ পথচারীরাও পড়তো এই ঠগীদের খপ্পরে। পথ চলার সময় স্রেফ গোবেচারা সহযাত্রীর ভান করে পথিকদের সঙ্গে দলে ভিড়ে পড়ত এরা। তাদের বিশ্বাস অর্জন করত। তারপর দ্বীতীয় কী তৃতীয় রাতে আচমকা ওই ‘সহযাত্রীদের’ ইশারায় অন্ধকার থেকে একটা ফাঁস এসে লটকে যেত পথিকের গলায়। টুঁ শব্দ করার আগে মাটিতে লুটিয়ে পড়তো তারা। তারপর মাটি খুঁড়ে গোর দেওয়া হতো তাদের। এই খুনের উদ্দেশ্য ছিল লুঠ-ডাকাতি। কেউ বা বলেন, বলি দেবার জন্যই নাকি এমনটা হতো। ঠগীদের উপদ্রবে নাজেহাল লর্ড বেন্টিঙ্ক ঠগী-দমনের ভার দেন কাপ্তেন শ্লিম্যানের ওপর। শ্রিমানই রীতিমতো গোয়েন্দাগিরি চালিয়ে, অজস্র রোমহর্ষক গল্পগাছার পরম্পরা তৈরি করে ঠগীদের ঠাণ্ডা করেন। শ্রিম্যান এমন করে ঠগীকে পাকড়াও করেছিলেন যে কবুল করেছেন তার নিজের হাতে ৭১৯টি খুনের কথা। সরকারি দলিল বলে পাঁচ বছরে কমকরে তিন হাজার ঠগের বিচার এবং সাজা হয়েছিল। চল্লিশ-পঞ্চাশটি এমন ঠগীদলের অস্তিত্ব ছিল সেকালে। বছরে নাকি বিশ থেকে ত্রিশ হাজার পথিক প্রাণ হারাতো এদের কবলে পড়ে। এ সংখ্যাটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের বেশি বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক। তবু এ তথ্য থেকে সেকালের ‘অন্য’ নাগরিকদের দাপট কিছুটা আঁচ করা যায় সহজেই।

প্রাচীন সংখ্যাতথ্য বলে, ১৮৪৪ সাল নাগাদ ডাকাতি কলকাতা আর তার আশপাশের জেলাতে ভয়ংকর বেড়ে যায়। ডাকাতি কমিশন বসেছিল একজন দেশীয় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট আর বাছাই-করা কিছু দারোগাকে নিয়ে। অন্য কলকাতার আদি বাসিন্দাদের শায়েস্তা করেছিল এই কমিশন। তাঁদের রিপোর্টে জানা যায়, ১৮৪৭ সাল থেকে ১৮৫১ সালের মধ্যে বর্ধমানে ডাকাতি হয়েছিল ১০১টি, হুগলিতে ডাকাতি হয়েছিল ৯৪টি, নদীয়ায় হয়েছিল ৯১টি, মেদিনীপুরে হয়েছিল ৫৬টি এবং ২৪-পরগনায় হয়েছিল ৪৩টি। ১৮৫২ সাল থেকে ১৮৬৪ সাল পর্যন্ত সংখ্যাটি কমে যায়। দেখা যায় উক্ত সময় বর্ধমানে ডাকাতির ঘটনা ঘটে ২৫টি, হুগলিতে হয় ৪০টি, নদীয়াতে ডাকাতি হয়েছিল ২৩টি, মেদিনীপুরে হয়েছিল ৩১টি ও ২৪ পরগনায় ডাকাতি হয়েছিল ১৪টি। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev