২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের ময়দানে ফের একবার সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম শুভেন্দু অধিকারীর লড়াই। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হাই প্রোফাইল কেন্দ্র ছিল নন্দীগ্রাম। কারণ সেখানে নির্বাচনের লড়াইতে অবতীর্ণ হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী এবং শুভেন্দু আধিকারী। একদা তৃণমূল সুপ্রিমোর মমতা যদি নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মুখ হয়ে থাকেন, তবে শুভেন্দু ছিলেন তার প্রধান সেনাপতি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, যে জমিতে তাঁরা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন, সেই কেন্দ্রে তাঁদের দু’জনের ভোটযুদ্ধ বঙ্গবাসীর কাছে ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল, যদিও তাঁরা একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করার জন্যই ভোট-সমরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। আর এবার নন্দীগ্রামের বদলে ভবানীপুর কারণ, এবার স্থানবদল হয়ে ব্যাটেলগ্রাউন্ড হয়েছে দক্ষিণ কলকাতার উল্লেখযোগ্য বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুর।
ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটযুদ্ধ ঘিরে বঙ্গবাসীর আগ্রহ আসীম কারণ এই কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর এবার সেই আগ্রহ বেড়ে গিয়েছে আরও কয়েক গুণ। কারণ এবার ভবানীপুরেই ফের মুখোমুখি সেই দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২১ সালের নন্দীগ্রামের উত্তাপ যেন নতুন করে ফিরে এসেছে ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে। লড়াইয়ের ময়দান বদলেছে ঠিকই কিন্তু বদলায়নি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। উল্লেখ্য, শুভেন্দু আওধিকারী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের কয়েক মাস আগে বিজেপি দলে যোগ দেন এবং তারপরেই তিনি মমতা এবং তাঁর দল তৃণমূলের সবচেয়ে কট্টর বিরোধী এবং কঠোর সমালোচকে পরিণত হন। এরপর বিজেপি থেকে শুভেন্দুকে নন্দীগ্রাম আসনে লড়াই করার মনোনীত করা হয়। অন্যদিকে মমতাও ঘোষণা করেন যে তিনি তাঁর প্রাক্তন সহকর্মীর রাজনৈতিক ঘাঁটি নন্দীগ্রামেই তাঁর মোকাবিলা করবেন। কারণ, নন্দীগ্রাম শুভেন্দুর বিরোধীতা এবং সমালোচনার জবাব দেওয়ার পক্ষে প্রতীকী জায়গা, কারণ ২০০৭ সালে পুলিশের গুলিতে মহিলাসহ ১৪ জন গ্রামবাসীর মৃত্যুর প্রতিবাদে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা শাসক দল সিপিএম-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে এই মাটিতেই এক দীর্ঘ সহিংস রাজনৈতিক লড়াই করেছিলেন। সেদিনের সেই সংগ্রাম আন্দোলনে মমতার অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১ হাজার ৯৫৬ ভোটে হেরেছিলেন। পাঁচ বছর পর ফের মুখোমুখি তাঁরা ভবানীপুরে। যদিও শুভেন্দু শুধু এখানেই নয়, নিজের পুরোনো আসন নন্দীগ্রাম থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভবানীপুর আসনেও যে এবার তীব্র লড়াই হবে সেকথা বলাই বাহুল্য। আর সেই কারণেই আসনটি ঘিরে বঙ্গবাসীর বিপুল আগ্রহ। কেন্দ্রটিতে ৩০ থেকে ৩৪ শতাংশ অবাঙালি ভোট আছে। যার সিংহভাগ বিজেপির দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুটি ওয়ার্ডে মুসলিম ভোটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। সেই ভোট তৃণমূলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ভবানীপুরে বেশ কিছু বস্তি এলাকাও রয়েছে। সেখানেও তৃণমূলের প্রভাবই বেশি। কিন্তু ভবানীপুরে ঠিক একইভাবে মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত ভোটার, অভিজাত বহুতলবাসী ভোটারের সংখ্যাও যথেষ্ট। সেই ভোটের ভাগ পাবে কারা? এই ভোটারদের সিংহভাগ যদি ভোট দিতে পারে তবে ভবানীপুরের ভোটচিত্র অনেকটাই বদলাবে বলে মনে করেন বিশেষঙ্গরা। তার সঙ্গে আছে এসআইআর। ইতিমধ্যেই ভবানীপুরের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৪৮ হাজার নাম বাদ পড়েছে। আরও ১৪ হাজারের মতো নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
তৃণমূল জানাচ্ছে তারা এবার আরও বেশি আসন পেয়ে টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করবে। অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, তারা এবার বাংলায় ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকার গড়বে অর্থাৎ কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের শাসন। এই আবহে এ রাজ্যে প্রার্থী ঘোষণার পরই বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী এলাকা এবং রাজ্য রাজনীতির তীব্র ও উত্তপ্ত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সাক্ষী হতে যাওয়া যতগুলি কেন্দ্রের উপর আগ্রহীদের নজর পড়েছে তাদের মধ্যে অন্যতম হল ভবানীপুর। এবারের বিধানসভায় যতগুলি হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে অন্যতম নিঃসন্দেহে মমতা ও শুভেন্দুর লড়াই। কারণ ভবানীপুর কেন্দ্রের ভোটযুদ্ধ রাজনৈতিক আধিপত্যের এক তীব্র পরীক্ষা। এখানে মমতা এবং শুভেন্দু লড়বেন শহরের রাজনীতি আধিপত্য ও ভোটারদের আস্থার জন্য। এই প্রতিদ্বন্দ্বীতা শুভেন্দুর রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যেমন নির্ধারণ করবে অন্যদিকে বাংলায় মমতাই একমাত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে। ভবানীপুর কেন্দ্রটি বাঙালি, গুজরাটি, শিখ এবং মুসলিমদের সংমিশ্রণের এলাকা। এখানকার ৭৩, ৭৭ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের যেমন শক্তিশালী সংগঠন অন্যদিকে ৬৩, ৭০, ৭১, ৭২ এবং ৭৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিজেপি ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তবে এলাকাটিতে অবাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় প্রভাবশালী।
২০২১ সালে তৃণমূল এই এলাকায় যত সংখ্যক ভোট পেয়েছিল ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাদের ব্যবধান কমে প্রায় ৮,২০০ ভোটের। যদিও ভবানীপুরে মমতা কোনো নির্বাচনেই হারেননি। ১৯৯১ সাল থেকে তিনি সাংসদ এবং ২০১১ সাল থেকে বিধায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১১ সালে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি ভবানীপুরকে তাঁর বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে বেছে নেন। সেই বছর তিনি বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি এবং তাঁর দলের বিজয়ের পর, তিনি একটি উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভবানীপুর থেকে ৫৪,২১৩ ভোটে জেতেন। ২০১৬ সালে তার জয়ের ব্যবধান কমে, সেবার তিনি দীপা দাসমুন্সিকে ২৫,৩০১ ভোটে পরাজিত করেন। আর সে বছর বিজেপি পেয়েছিল মাত্র ২৬,২৯৯ ভোট। ২০২১ সালে, মমতা নন্দীগ্রাম থেকে শুভেন্দুর কাছে ১,৯৫৬ ভোটে হেরে গেলেও, ভবানীপুরে তৃণমূল আসনটি ধরে রেখেছিল শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বিজেপির রুদ্রনীল ঘোষকে ২৮,৭১৯ ভোটে হারিয়ে। যদিও বিজেপির ভোট শতাংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ৩৫.২%-এ পৌঁছেছিল। সেই বছরের ভবানীপুর উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৫৮,৮৩৫ ভোটে জিতে ফিরে আসেন। ভবানীপুর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুকে এবার পদ্মশিবিরের হয়ে বাজি ধরেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দুকে দাঁড় করানো বিজেপির মাস্টারস্ট্রোক নিছক এক ডিফেন্সিভ স্ট্রোক নয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে বিজেপির এই রণকৌশল কী এখানে সফল হবে নাকি চিত্রনাট্য উলটে যাবে?