| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

জয়নুল আবেদিন-এর তুলিতে ৪৩-এর দুর্ভিক্ষ অবিস্মরণীয় হয়ে আছে : মনোজিৎকুমার দাস

Reporter
মনোজিৎকুমার দাস / ৮০৮৬ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২২

জয়নুল আবেদিনের আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রকর্ম বাস্তবতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর। তার বিখ্যাত চিত্রকর্মের মাঝে রয়েছে, — মই দেয়া, সংগ্রাম, সাঁওতাল রমণী, ঝড়, কাক, ইত্যাদি।

১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে গ্রামবাংলার উৎসব নিয়ে আঁকেন তার বিখ্যাত ৬৫ ফুট দীর্ঘ ছবি নবান্ন।

জয়নুল আবেদিন ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। এ ছাড়াও তার বিখ্যাত শিল্পকর্মগুলো হল: ১৯৫৭-এ নৌকা, ১৯৫৯-এ সংগ্রাম, ১৯৭১-এ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাডোনা প্রভৃতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জয়নুল আবেদিনের শিল্পী হওয়ার বাসনাটিই ছিল তৎকালীন সমাজবাস্তবতায় এক অসাধারণ চিন্তা। পূর্ব বাংলার মফস্বল শহরের নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের চাকরিজীবী পিতার জ্যেষ্ঠ সন্তান জয়নুল ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগেই সুদূর কলকাতায় শিল্পশিক্ষার জন্য অভিযাত্রা করবেন, এ ছিল খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। একটি পথিকৃৎ সিদ্ধান্তই বটে। কলকাতার আর্ট স্কুলে অবশ্য তার আগেই দুয়েকজন মুসলমান শিক্ষক বা ছাত্র ছিলেন, কিন্তু তারা পশ্চিম বাংলার। আর্ট স্কুলে জয়নুল তার মেধা ও শ্রম দিয়ে ছাত্র হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছিলেন, এবং ছাত্রত্ব শেষ হবার আগেই তার নিজের প্রতিষ্ঠানে অস্থায়ী শিক্ষক পদ লাভ করেছিলেন (১৯৩৭ সালে)। এটিও ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। অবশ্য এক্ষেত্রে জয়নুলের মেধার স্বীকৃতি জানিয়ে কলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ মহত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন।

শিক্ষকতার প্রথম পর্বে কয়েক বছর জয়নুলের চিত্রচর্চার আঙ্গিক ছিল বাস্তববাদী, পূর্ব বাংলার নদী, নিসর্গ ও প্রকৃতি ছিল যার মূল প্রেরণা। জয়নুলের বাল্যকাল ও কিশোর জীবনের ব্রহ্মপুত্রের সান্নিধ্য ছিল অভিজ্ঞতা ও অনুভবের জগৎ। রোমান্টিকতা ছিল মানসিকতায়। এই পর্বটি ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪৩-এর বাংলার মহা-মন্বন্তর ছিল জয়নুলের শৈল্পিক চেতনায় প্রচন্ড এক আঘাত। কলকাতা মহানগরীর ফুটপাতে অবস্থান নেওয়া অনাহারী মানুষের অসহায়ত্ব তার মনকে ক্ষত-বিক্ষত করে। শিশু, নারী, পুরুষ, এরা যেন আর মানুষ নয়, শুধুই কংকাল। কংকালসার মানুষ শহরের ডাস্টবিনের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্যান্বেষণে তাদের শেষ শক্তি দিয়ে কাক আর কুকুরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। মানবতার এই চরম অবমাননা জয়নুলকে ভীষণভাবে বিচলিত করে, আবেগাপ্লুত করে। কিন্তু সে-আবেগ তিনি শৈল্পিক সৃষ্টিতে রূপান্তর করেন। তিনি মোহগ্রস্তের মতো মহানগরের এসব অমানবিক দৃশ্যের স্কেচ করতে থাকেন, অনবরত অনুশীলন করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় আড়াই ডজন পরিপূর্ণ ছবি আঁকেন, যা পরবর্তীকালে পরিচিতি পায় তার অবিস্মরণীয় ‘দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা’ নামে।

জয়নুলের দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের চিত্রকলার ঐতিহ্যে এক বৈপ্লবিক ঘটনা। ন্যাচারালিজম ও রোমান্টিক ধারার শিল্প-আঙ্গিকের বাইরে সমাজবাস্তবতা বা সোশ্যাল রিয়েলিজম জাতীয় শিল্প-বক্তব্য উপস্থাপন করেন জয়নুল। বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপনার আঙ্গিক ও শৈলী, এমনকি অঙ্কনের মাধ্যম, সবকিছুই ভিন্ন প্রকৃতির। বিষয় ও আঙ্গিকের এত শক্তিশালী সমন্বয় বস্তুত বিশ্ব-চিত্রকলার ইতিহাসেই বিরল। অতিসাধারণ কাগজে শুধু কালো চায়নিজ ইংকে তুলির টানের রেখা সমৃদ্ধ ছবি যে এত বাঙ্ময় হতে পারে, তা জয়নুলের দুর্ভিক্ষ-চিত্রমালা না দেখলে বিশ্বাস হতো না। একটি, দু-তিনটি বা চারটি মাত্র ছবি নয়, প্রায় তিরিশটি ছবি আঁকেন তিনি এই ধারায়। বাস্তববাদী আঙ্গিক হলেও প্রতীচ্যের আঙ্গিকও নয়, পূর্ব এশীয় ধারাও নয়, বরং সবকিছুর সারমর্ম যেন ব্যবহৃত হয়েছে এই চিত্রমালায়। দুর্ভিক্ষ চিত্রমালার মাধ্যমে জয়নুল বক্তব্যপ্রধান ও নিজস্ব আঙ্গিকের শিল্প সৃষ্টি করে শিল্প-ঐতিহ্যে পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন, স্থায়ী অবদান রেখেছেন।

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে জয়নুল যেসব জলরং-এর ছবি এঁকেছেন, বাংলার প্রকৃতি (‘কালবৈশাখী ঝড়’) অথবা কৃষি সংস্কৃতির (‘মই দেওয়া’), তাতেও মাধ্যম চর্চা ও কম্পোজিশন নির্মাণে অসাধারণ মৌলিকত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। একই দশকের প্রায় মাঝামাঝি এসে তিনি আবার পথিকৃৎ শিল্পীর ভূমিকা পালন করেছেন, তবে পূর্ব বাংলার লোকশিল্প-ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক শিল্পের সমন্বয় করে একটি সিরিজ এঁকে। ‘পাইনার মা’, ‘নববধূ’, ‘পললী জননী’, ‘দুই রমণী’, ‘প্রসাধনরত নারী’ ইত্যাদি আপাত রোমান্টিক মেজাজের কাজে লোকজ ও আধুনিক ধারার সমন্বিত আঙ্গিক জয়নুলের অন্যতম পথিকৃৎ চিত্ররীতির দৃষ্টান্ত। বাংলার চিত্রকলার আধুনিকতার মূল শক্তি হবে লোকজ ঐতিহ্য, এমন বিশ্বাস থেকে জয়নুল এই সমন্বয়ী ধারাটির চর্চা শুরু করেছিলেন। তার কলকাতার শিষ্য ও ঢাকার সহযাত্রী কামরুল হাসানও প্রায় কাছাকাছি সময়ে এরকম সমন্বয়ী ধারা নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী কাজ করেছেন এবং অসাধারণ সফল শিল্পনিদর্শন রেখে গেছেন। পরবর্তীকালে আবদুস শাকুর ও অন্য কয়েকজন তরুণ শিল্পী লোকজ ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পরীতির সমন্বয়ী সুন্দর কাজ করেছেন; কিন্তু পথপ্রদর্শক ছিলেন জয়নুলই।

জয়নুলের ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের প্রথম পর্বের ছাত্ররা পঞ্চাশের দশকের শুরু থেকেই চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষার জন্য ইউরোপ ও আমেরিকায় যান এবং মধ্য দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে ফিরতে শুরু করেন।

জয়নুল ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের মার্চ মাসে। তিনি স্ক্রলচিত্র আঁকলেন ৬৫ ফুট দৈর্ঘ্যের ‘নবান্ন’ চিত্রটি (১৯৭০ সালে আঁকা)। ৪ ফুট প্রশস্থ কাগজে আঁকা এই স্ক্রলটি মূলত তুলির টানে কালো কালিতে আঁকা স্কেচধর্মী। এতে কালো কালির সঙ্গে মোম ও জলরঙের ব্যবহার ছিল। মোম দিয়ে তিনি সাদা রেখার সূচনা করেছেন। আঙ্গিক শৈলীতে এ-ধরনের অভিনবত্বের পাশাপাশি বিষয়বক্তব্যের জন্য ‘নবান্ন’ স্ক্রলটি অবিস্মরণীয়। এটি মূলত তখনকার বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রবল উত্তেজনাময় অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। ‘সোনার বাংলার শ্মশান’ হওয়ার আখ্যান ছিল ‘নবান্ন’ দীর্ঘচিত্র। বছর না ঘুরতেই বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় প্রচন্ড সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাতে তিন লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। বিধ্বস্ত হয় উপকূলীয় জনপদ ও সম্পদ। ’৪৩-এর জয়নুলের পুনর্জাগরণ ঘটল যেন এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে। ‘মনপুরা ’৭০’ শীর্ষক ৩০ ফুট দৈর্ঘ্যের আরেকটি স্ক্রলচিত্র আঁকেন তিনি। তবে তার আগে ঘটনার জায়গা ঘুরে এসেছেন, ত্রাণকর্মী হিসেবে। ‘মনপুরা ’৭০’ জয়নুলের এক মহৎ কাজের নিদর্শন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে প্রায় সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত মানব জাতির বিপন্ন অবস্থার মহা-আখ্যান এই চিত্রটি শক্তিশালী তুলির মোটা রেখা, সঙ্গে মোম ব্যবহার, সাদা কালোতেই বিশেষ তাৎপর্যময়। ‘নবান্নে’র তুলনায় ‘মনপুরা ’৭০’-এর রেখা বলিষ্ঠ।

‘মনপুরা ’৭০’ স্ক্রলটি আঁকার পাশাপাশি জয়নুল এই বিষয়-সম্পৃক্ত অনেকগুলো মাঝারি মাপের ছবি এঁকেছেন, যার একটিতে জননেতা মওলানা ভাসানীকে তিনি দুর্গত মানুষের ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রেও জয়নুল এক পথিকৃতের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। সত্তরের আগে বাংলাদেশের কোনো শিল্পী কোনো রাজনৈতিক নেতাকে বিষয় নির্বাচন করে বিশাল পরিসরে তেমন কোনো ছবি আঁকেননি (সাধারণ প্রতিকৃতি হয়তো এঁকেছেন)।

আধুনিক চিত্রকলায় ‘পারটিসিপেটরি আর্ট’ বা অংশগ্রহণমূলক শিল্পসৃষ্টির একটি ধারণা স্থান করে নিয়েছে। এতে মূল শিল্পীর কাজের সঙ্গে অন্যান্য সহযোগী শিল্পী বা বিশেষ করে দর্শকের একটি ভূমিকা থাকতে পারে। জয়নুল আবেদিন এদেশে এ-ধারার পথিকৃৎ। পঞ্চাশের দশকে আঁকা তার এক অসাধারণ সুন্দর জলরং ছবি ‘বুড়িগঙ্গায় নৌকা’ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিনের কক্ষে সংরক্ষিত), এতে মূল ছবির চারদিকেই অসংখ্য দর্শকের স্বাক্ষর নিয়েছেন শিল্পী। একই কাজ করেছেন তার মহামূল্যবান ‘নবান্ন’ স্ক্রলচিত্রটিতেও। এক্ষেত্রে অবশ্য ছবির শেষের দিকে অনেকটা জায়গাজুড়ে দর্শকের স্বাক্ষর নিয়েছেন। বড় শিল্পীর কাজে এমন দৃষ্টান্ত বিরল।

জয়নুল পথিকৃৎ ছিলেন শিল্পের বিষয় নির্বাচনেও। অবশ্যই তার মূল প্রেরণা ছিল, প্রাথমিকভাবে নিসর্গ, যা তিনি ধরে রেখেছিলেন জীবনের শেষ পর্যন্ত ‘দুর্ভিক্ষ’ পর্ব থেকে প্রধানত ‘মানুষ’, নানা অবস্থানে, নানা পরিস্থিতিতে মানুষ, কর্মে, বিশ্রামে, প্রসাধনে, দুর্যোগে, দুর্ভিক্ষে, প্রেমে, সংগ্রামে ও অর্জনে। তবে জীবন-সংগ্রামে গরুগাড়ির চালক, জেলে, মাঝি, কৃষক, পল্লি নারীকর্মী, আদিবাসী নর-নারী এরাই তার প্রিয় মানুষ। কালেভদ্রে শহুরে মধ্যবিত্ত, যদিও তিনি নিজে ছিলেন তাদেরই একজন।

সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকায় একটি চারুকলা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ ছিল জয়নুল আবেদিনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সুদূরপ্রসারী সাংগঠনিক অবদান। শুরু থেকেই ঢাকার সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউট ছিল অতি অসাম্প্রদায়িক আধুনিক চেতনাসমৃদ্ধ। অল্পদিনের মধ্যেই চারুকলায় ছাত্রীরা অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। অতিদ্রুত তিনি প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজস্ব ক্যাম্পাস নির্মাণে সমর্থ হয়েছিলেন। শাহবাগে চারুকলার স্থাপত্য ও সাইট পরিকল্পনার আধুনিকতা দৃষ্টান্তমূলক। স্থপতি মাজহারুল ইসলামকে এ-কাজে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন জয়নুল আবেদিন নিজে।

১৯৪৮ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই জয়নুল আর যে-একটি কাজ করেছেন, তা হলো তখনকার বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল সাহিত্যিক, অধ্যাপক ও সাংবাদিকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। রীতিমতো আড্ডার আসর ছিল তাদের। এতে শিল্পীদের মানসিক বিকাশে যেমন সহায়তা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারেও তেমনি ভূমিকা রেখেছে। এরকম বহুমাত্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক ঘরোয়া আড্ডার ব্যবস্থাও ছিল অগ্রসরচিন্তা।

ঢাকা আর্ট ইনস্টিটিউট ছিল সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রায় এক বছরের মধ্যে ঢাকা আর্ট গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করে শিল্পীদের নিজস্ব উদ্যোগ ও আয়োজনে গড়ে তুলেছিলেন একটি সহযোগী আন্দোলন। এক্ষেত্রে পথিকৃতের ভূমিকা নিয়েছিলেন অবশ্য কামরুল হাসান; কিন্তু গ্রুপের সভাপতি ছিলেন জয়নুল আবেদিন। চারুকলা ইনস্টিটিউট ও ঢাকা আর্ট গ্রুপ যে বাংলাদেশের শিল্পচর্চা তথা সাংস্কৃতিক বিকাশে কত বড় ভূমিকা রেখেছে, তার যথার্থ মূল্যায়ন অপেক্ষমান।

জয়নুল আবেদিন ১৯১৪ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহুকুমার (বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা) কেন্দুয়াতে জন্মগ্রহণ করেন।বাবা তমিজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পুলিশের দারোগা (সাব-ইন্সপেক্টর), মা জয়নাবুন্নেছা গৃহিনী। নয় ভাইবোনের মধ্যে জয়নুল আবেদিন ছিলেন সবার বড়। পড়াশোনায় হাতেখড়ি পরিবারের অভ্যন্তরীণ পরিমণ্ডলে।

খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। পাখির বাসা, পাখি, মাছ, গরু-ছাগল, ফুল-ফল এঁকে মা-বাবাকে দেখাতেন। ছেলেবেলা থেকেই শিল্পকলার প্রতি তার গভীর আগ্রহ ছিল। মাত্র ষোল বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সাথে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস ঘুরে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় জয়নুল আবেদিনের মন বসছিল না। তাই ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক (ম্যাট্রিক) পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখা বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুসমর্থনে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস-এ ভর্তি হন। তার মা জয়নুল আবেদিনের আগ্রহ দেখে নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে কলকাতার তখনকার আর্ট স্কুলে ভর্তি হতে সাহায্য করেন। জয়নুল আবেদিন ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত কলকাতার সরকারি আর্ট স্কুলে পড়েন। ১৯৩৮ সালে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

পূর্ববঙ্গের প্রথম প্রজন্মের শিল্পীদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব জয়নুল আবেদিন। ১৯৪৭ সালে ভারতবিভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে একটি চিত্রকলা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভূত হয়। জয়নুল আবেদিনের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে ঢাকার জনসন রোডের ন্যাশনাল মেডিকেল স্কুলের একটি জীর্ণ কক্ষে গভর্নমেন্ট আর্ট ইন্সটিটিউট স্থাপিত হয়। সূচনায় এর ছাত্র সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮। জয়নুল আবেদিন ছিলেন এ প্রতিষ্ঠানের প্রথম শিক্ষক। ১৯৫১ সালে আর্ট ইন্সটিটিউট সেগুনবাগিচার একটি বাড়িতে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৬ সালে আর্ট ইন্সটিটিউটটি শাহবাগে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৬৩ সালে একটি প্রথম শ্রেণির সরকারি কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং এর নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়। ১৯৭১-এ বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর একই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’। তিনি ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।প্রতিষ্ঠাকালে চারুকলা ইন্সটিটিউটের নাম ছিল ‘গভর্ণমেন্ট আর্ট ইনস্টিটিউট’। [১৯৬৩ সালে এটিকে প্রথম শ্রেণীর কলেজে উন্নীত করে নামকরণ করা হয় ‘বাংলাদেশ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়’। ১৯৮৩ সালে এই প্রতিষ্ঠানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে এনে ‘চারুকলা ইন্সটিটিউট’ নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে এটি অনুষদের মর্যাদা লাভ করে, চারুকলা অনুষদ নাম ধারণ করে।

জয়নুল আবেদিনের আগ্রহে ও পরিকল্পনায় সরকার ১৯৭৫-এ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে লোকশিল্প জাদুঘর ও ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে সংগৃহীত তার শিল্পকর্মের সংখ্যা ৮০৭। বেঙ্গল ফাউন্ডেশানের সংগ্রহে আরও প্রায় পাঁচশত চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে। তার পরিবারের কাছে এখনও চার শতাধিক চিত্রকর্ম সংরক্ষিত। ময়মনসিংহের সংগ্রহশালায় রক্ষিত চিত্রকর্মের সংখ্যা ৬২।

এছাড়া পাকিস্তানের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় তার বিপুল পরিমাণ চিত্রকর্ম সংরক্ষিত আছে।

জয়নুল আবেদিন ১৯৭৬ সালের ২৮ মে মৃত্যুবরণ করেন। চারুকলা ইনস্টিটিউটে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। তার আঁকা শেষ ছবি — “দুই মুখ”।

পরিশেষে বলতে হয়, শিল্পাচার্য জয়নাল আবেদিন চিত্রকলার অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি বেঁচে থাকবেন চিরভাস্বর হয়ে।

মনোজিৎকুমার দাস, কথাসাহিত্যিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev