| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আবিদ হাসানের দৃষ্টিতে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর বাঙালিত্ব : উৎপল আইচ

Reporter
উৎপল আইচ / ১০৩০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১ আগস্ট, ২০২৪

সুভাষচন্দ্র বসু মনে প্রাণে যেমন ভারতীয় ছিলেন, তেমনি বাঙালিও ছিলেন। তিনি ভারতমাতার মুক্তির জন্য সংগ্রাম করাকে তাঁর জীবনের একমাত্র ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পুনরুত্থিত ভারতমাতার মূর্তির ধ্যান করতেন। কিন্তু পাশাপাশি তিনি অখণ্ড এবং মহান বঙ্গ-প্রদেশেরও স্বপ্ন দেখতেন, তিনি চাইতেন যে বাঙালিদের উচিত সমস্ত ক্ষুদ্র বিবাদ-বিসংবাদ ভুলে গিয়ে, ব্যক্তিগত মতভেদ বিসর্জন দিয়ে বাংলার এক হওয়া , মহান হওয়াকে বাস্তবায়িত করতে, সকলের প্রচেষ্টায় এক নতুন বাঙলাকে পেতে। [পরে এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য রয়েছে।]

আবিদ হাসান হচ্ছেন সেই ব্যক্তি যিনি সাবমেরিনে ইউরোপ থেকে পূর্ব এশিয়া আসার সময় ৯০ দিন নেতাজীর সহযাত্রী ছিলেন। সেই আবিদ হাসান পরে শ্রীমতী কৃষ্ণা বসুকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে তাঁর সাথে সুভাষচন্দ্র বসুর প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে, বার্লিন শহরে। তখন তিনি বার্লিনে একজন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি অসুস্থ সুভাষচন্দ্র বসু ব্রিটিশ সরকারের আদেশে ইউরোপে নির্বাসিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট শারীরিক ভাবে ছাড়াও অসুস্থ সুভাষচন্দ্রকে মানসিক ভাবেও অনেক উত্যক্ত করছিল সেসময়। প্রতিহিংসাপরায়ণ সরকার তাঁকে তাঁর মা-বাবা এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও দেখা করতে দেয়নি। সেসময় তাঁর মা এবং বাবা দুজনেই অসুস্থ ছিলেন। তাঁদের পক্ষে ট্রেনে করে এসে লক্ষ্ণৌ-এর বলরামপুর হাসপাতালে বা বোম্বাইয়ের জেটিতে সুভাষচন্দ্রের সাথে দেখা করা সম্ভব ছিল না। প্যারোল তো দূরে থাক, প্রহরীদের সাথে অসুস্থ সুভাষচন্দ্রকে মা-বাবাকে দেখার উদ্দেশ্যে একদিনের জন্যও কটক বা পুরী যেতে দিতেও সরকার বাহাদুর তখন রাজী হয়নি। সরকারী মেডিকেল বোর্ড সন্দেহ করেছিল যে সুভাষচন্দ্রের intestinal tuberculosis বা অন্ত্রের ক্ষয়রোগ (যক্ষ্মা) হয়েছে। বরঞ্চ সুভাষচন্দ্র বসুকে নিজ খরচায় ইউরোপে চিকিৎসা করাতে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল।

যাবার দিন (২৩শে ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩) স্ট্রেচারে করে তাঁকে বোম্বাই বন্দরের জেটি থেকে লয়েড ট্রিয়েস্টিনোর (ইটালিয়ান কোম্পানির) জাহাজ এস. এস. গঙ্গে-তে তুলে দেবার পর ‘দয়াশীল’ ব্রিটিশ সরকারের বদান্যতায় সুভাষচন্দ্র বসুকে শর্তসাপেক্ষ মুক্তি দেওয়া হয় এই বলে যে ভারতে ফিরলে তাঁকে আবার কারাগারে প্রেরণ করা হবে। সেই জাহাজ থেকে অসুস্থ সুভাষচন্দ্র দেশবাসীর উদ্দেশে বাণী পাঠিয়েছিলেন: “যদি বাংলা মরে যায়, তবে বাঁচবে কে? আর যদি বাংলা বেঁচে থাকে, তাকে কে মারবে?” [১]

অবশ্য দেশে ফিরলেই কারাগারে যেতে হবে জেনেও তিনি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মার্চ ইটালির নেপেলস্ বা নাপোলি বন্দর থেকে ‘কন্টে ভার্ডে’ জাহাজে করে বোম্বাই রওনা হন এবং ৮ এপ্রিল বোম্বাই পৌঁছানো মাত্র গ্রেফতার হন।

যাইহোক, ভারতে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে সুভাষ চন্দ্র পরাধীন ভারতের স্বাধীনতালাভের প্রয়াসের কথা প্রচারের উদ্দেশ্যে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে সফরে গিয়েছিলেন এবং সেই সফরে তিনি জানুয়ারি ১৯৩৬ এ বেলজিয়াম যাওয়ার পথে প্রাগ ও বার্লিন গিয়েছিলেন। তারপর তিনি আয়ারল্যান্ড, ইত্যাদি দেশে যান। খুব সম্ভব আবিদ হাসান ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের সেই বার্লিন সফরের সময় প্রথমবারের মত সুভাষচন্দ্র বসুর সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।

এবার আমি আবিদ হাসানের বর্ণিত নেতাজীর বাঙালিত্ব বিষয়ে আসি। সিঙ্গাপুরে খাবার টেবিলে আবিদ হাসান সাহেব নেতাজীকে একদিন বলেছিলেন, আপনাকে দেখলে তো চট করে ধরতে পারা যায় না আপনি কোন দেশের মানুষ। ওইরকম টকটকে রং, তাতে স্যুট পরনে, কথা যদি ইংরেজিতে বলেন কিছুই ধরবার উপায় নেই। কিন্তু শুধু একটা সময়ে আপনার মুখেচোখে ধরা যায় যে আপনি বাঙালি।

নেতাজী শুনে বললেন: কীরকম?

আবিদ হাসান উত্তরে জানিয়েছিলেন: কেন, আপনি যখন মাছ খান তখন! [২]

কলকাতায় দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে আবিদ হাসান কৃষ্ণা বসুকে আরও জানিয়েছিলেন যে তাঁর সাথে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল যুদ্ধের সময় বার্লিনে। অন্যান্য ভারতীয় ছাএদের সাথে আবিদ হাসানও যুদ্ধের জন্য জার্মানীতে আটকে পড়েন। দেশের জন্য কী করা যায় এসব কথা গোপু নামের এক ভারতীয় বন্ধুর সাথে আলোচনা করতেন। তখন সেই বন্ধুর মারফত তিনি জানতে পারেন যে অরল্যান্ডো মাৎসোটা নামের একজন ইটালিয়ান কাউন্ট বার্লিনে এসেছেন এবং তিনিও ভারতের জন্য কিছু করার কথা ভাবছেন। প্রথমে মনে সংশয় থাকলেও আবিদ হাসান বন্ধুর সঙ্গে সেই কাউন্টের সাথে দেখা করতে গেলেন। “বেশ বড়সড় একটা বাড়ি। ভিতরে ঢুকে একটা লম্বা ধরনের ঘর। তার অপর প্রান্তে টেবিলে একজন বসেছিলেন। হাসান সাহেব ঢুকতে উঠে দাড়িয়ে ওঁর দিকে অগ্রসর হয়ে এলেন। আবিদ হাসানের মনে আজও গেঁথে আছে সেই দৃশ্য। আশ্চর্য, অবান্তর খুঁটিনাটি মনে পড়ছে না। ঘরে কি আর কেউ ছিল? গোপু সঙ্গে ছিল কি ছিল না কিছু তেমন স্পষ্ট মনে নেই। শুধু লম্বা একটা ঘরের একপ্রান্ত থেকে হেঁটে এগিয়ে আসছেন ওর দিকে একজন। কাছাকাছি আসার পর আবিদ হাসানের গলা দিয়ে কোনওমতে আওয়াজ বার হল -সু-ভা-ষ-বা-বু ! উনি একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন।”

তার পরের কাহিনী কমবেশি সকলেরই জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংরেজদের থেকে মুক্ত হয়ে আবিদ হাসান সাহেব তাঁর নিজের শহর ভারতের হায়দ্রাবাদে চলে যান এবং পরে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ে যোগদান করে ইজিপ্ট, ডেনমার্ক, প্রভৃতি দেশে ভারতীয় রাজদূত হিসাবে কাজ করে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন।

খুবই দুঃখের বিষয় যে লিখবো লিখবো করেও দীর্ঘসূত্রতা বশত আবিদ হাসান নিজে নেতাজীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা, জার্মানীতে গঠিত ইন্ডিয়ান লিজিওনের কথা, পূর্ব এশিয়াতে গঠিত আজাদ হিন্দ সরকার ও আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা লিখে যেতে পারেননি।

কিন্তু আবিদ হাসানের উদ্ভাবন করা ও নেতাজীর অনুমোদিত অভিবাদন দিয়ে প্রতিবারের মত আজও আমার এই ছোট্ট লেখাটার পরিসমাপ্তি করছি।

“জয় হিন্দ!”

পাদটীকা

[১] পৃষ্ঠা ১০৯, ‘ব্রিটিশ কারাগারে সুভাষচন্দ্র’ প্রিয়ব্রত মুখোপাধ্যায়; পত্রলেখা, জানুয়ারি ২০১৪। প্রিয়ব্রত মুখোপাধ্যায়ের বইয়ের ‘নেতাজীর এই বাণীটার’ সামান্য সংশোধন প্রয়োজন। বঙ্গবাসীর প্রতি নেতাজী এস.এস. গঙ্গে থেকে পাঠানো বাণীর শেষ অংশে লিখেছিলেন, “যত যাই বলুন, বাঙলা বাঁচলে কে মরবে, বাঙলা মরলে কে বাঁচবে?” [৩] নং পাদটীকা দ্রষ্টব্য।

[২] পৃষ্ঠা ৪৩-৪৫, প্রবন্ধ: ‘সৈনিকের স্মৃতি’, ‘প্রবন্ধ সংগ্রহ ১৯৫১-২০২০’, কৃষ্ণা বসু , গ্রন্থনা ও সম্পাদনা: সুমন্ত্র বসু, আনন্দ পাবলিশার্স, জুলাই, ২০২১ ।

[৩] সুভাষচন্দ্র বসু এস.এস. গঙ্গে থেকে ২রা মার্চ ১৯৩৩ তারিখে বঙ্গবাসীর প্রতি যে বিদায়-বাণী লিখে পাঠিয়েছিলেন, তা আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত “শ্রী সুভাষচন্দ্র বসু সমগ্র রচনাবলী”-র পঞ্চম খণ্ডের ১৭৭-১৭৮ পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে পুরো বাণীটা নীচে উদ্ধৃত করা হল :—

এস. এস. গঙ্গে থেকে পাঠানো বাণী

“এক বছরের অধিক আমি আমার নিজের প্রদেশ থেকে নির্বাসিত হয়ে আছি। যে অবস্থার মধ্যে আমি বন্দি সেটা অস্বাস্থ্যকর হওয়ার দরুন এই সময়ে আমার স্বাস্থ্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। আমার অবস্থা যত খারাপ হয়, আমাকে এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে স্থানান্তরিত করা হতে থাকে — কিন্তু যে-সব হাসপাতাল এবং চিকিৎসক আমার চিকিৎসা করবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে ছিলেন, ইচ্ছে করে তাদের কাছ থেকে আমাকে দূরে রাখা হয়। এমনকি বঙ্গদেশের সব জেলখানা, আমার হাজার হাজার স্বদেশবাসীকে যারা এত সাদরে বরণ করে থাকে, তারাও আমার মুখের ওপর তাদের দরজা বন্ধ করে দিল।

“আমার শারীরিক পীড়ার সঙ্গে যুক্ত হল মানসিক যন্ত্রণা। বঙ্গদেশের বাইরে বন্দি হয়ে থাকার সময়ে ক্রমবর্ধমান বেদনা এবং অসহায়তার বোধ নিয়ে আমি দেখতাম কী নিপীড়ন চলছে আমার প্রদেশে। সেই অবস্থায় আমি কেবল আমার নির্জন সেল-এ বসে শ্রীশ্রী মায়ের কাছে নীরবে প্রার্থনাই করতে পারতাম, আমার স্বদেশবাসীকে যেন তিনি শক্তি দেন, এক নতুন বাঙলা যেন জন্মগ্রহণ করে।

“জীবনের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, ওই দীর্ঘ এবং অন্ধকার প্রহরগুলিতে আমি আশ্রয় খুঁজতাম ধ্যানের মধ্যে। আমার মনশ্চক্ষে ভেসে উঠত, ভারতের যে মূর্তি প্রত্যক্ষ করেছেন, পূজা করেছেন বঙ্কিম এবং বিবেকানন্দ থেকে দ্বিজেন্দ্রলাল এবং দেশবন্ধু পর্যন্ত। আমার মনশ্চক্ষে ভেসে উঠে আমাকে সান্ত্বনা দিত, সাহস দিত, অনুপ্রেরণা দিত। আমি উপলব্ধি করতাম — আগে কোনদিন তেমন ভাবে উপলব্ধি করিনি, — যে সেই মূর্তি, ভারতমাতা যা হবেন, সেইটেই চূড়ান্ত সত্য, বর্তমান মুহূর্তের সব ত্রুটি, সব অসম্পূর্ণতার উর্ধ্বে অবস্থিত। কোনও পার্থিব শক্তির ক্ষমতা ছিল না আমার সেই স্বপ্নে দেখা মূর্তি আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয়। প্রতিদিন আমি পূজার অর্ঘ্য নিবেদন করেছি তার বেদীমূলে।

“একটি স্বপ্ন আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে, আমাকে এনে দিয়েছে জীবনের একটি উদ্দেশ্য। সে এক অখণ্ড বঙ্গের স্বপ্ন, যে বঙ্গ ভারতের এবং বিশ্বমানবের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছে, যে বঙ্গ সমস্ত জাতি ও গোষ্ঠীর ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে, যে বঙ্গ মুলসমান, হিন্দু, ক্রিশ্চান, বৌদ্ধ সকলেরই মাতৃভূমি — যে বঙ্গ এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে, আমার জীবনের প্রতিদিন যাকে আরাধনা করি আমি, যার সেবা করার চেষ্টা করি।

“এই স্বপ্নের যথার্থ স্বরূপ হৃদয়ঙ্গম করা, বাস্তবে তাকে রূপ দেওয়া, আমার জীবনের একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা। আমাদের মধ্যে যা কিছু শ্রেষ্ঠ, সব কিছু দিয়ে এর সাধনা করতে হবে, যদি সিদ্ধিলাভ করতে হয়। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে এমন কোনও ত্যাগ নেই যা করা চলে না, এমন কোনও কষ্ট নেই যা স্বীকার করা চলে না। বন্ধুগণ, আপনারা কি সেই উচ্চে উঠবেন না, যেখানে আমাদের সামনে বিরাজ করবে একটিমাত্র সত্যবস্তু, এক মহান, অখণ্ড বঙ্গদেশ। আমাদের মহান পূর্বপুরুষেরা কী উত্তরাধিকার রেখে গেছেন আমাদের জন্য, স্মরণ করুন। ভুলবেন না, তাঁদের স্বপ্নের উত্তরাধিকারী আপনারা — আমাদের দেশের ভবিষ্যতের আশা আপনারা। আপনারা যদি চিন্তায় এবং কাজে বড় হন, তবেই আপনারা আপনাদের দেশকে বড় করতে পারবেন। তাই, আমি যতদূর আমার সাধ্য, অন্তরের থেকে বলছি, ‘ভুলে যান আপনাদের ক্ষুদ্র বিবাদ-বিসংবাদ, বিসর্জন দিন যত ব্যক্তিগত মতভেদ, চেষ্টা করুন, বাঙলা যাতে এক হয়, মহান হয়, যাতে বাঙলার গৌরবের মধ্যেই খুঁজে পাই আমাদের সর্বোচ্চ সুখ এবং গৌরব। যত যাই বলুন, বাঙলা বাঁচলে কে মরবে, বাঙলা মরলে কে বাঁচবে?'”

সুভাষচন্দ্র বসু

এস. এস. গঙ্গে

২/৩/৩৩

সংযোজন (এটাচমেন্ট)

(১) এম্বুলেন্সে করে বোম্বাই বন্দরের জেটিতে সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে গিয়ে স্ট্রেচারে করে এস.এস. গঙ্গে জাহাজে তোলা হচ্ছে। এই ফটোটা বেশ কয়টা বইতেই রয়েছে কিন্তু যেহেতু প্রফেসর সুগত বসুর লেখা ‘হিজ ম্যাজেস্টিস অপনেন্ট’ বইয়ের ফটোগুলো বেশী পরিষ্কার (sharp), তাই এই বই থেকে এই ফটোটা এই লেখার সাথে সংযোজন করা হল। তবে এই বইতে অধ্যাপক সুগত বসু ভুল করে লিখেছেন যে সুভাষচন্দ্র বসু ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ তারিখে বোম্বে থেকে জাহাজে ইউরোপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন, যা ঠিক নয়। তিনি এস. এস. গঙ্গে জাহাজে রওনা হয়েছিলেন বৃহস্পতিবার, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৩৩ তারিখে।

(২) এটা ১লা মার্চ ১৯৩৩-এ সুভাষ চন্দ্র বসুর দ্বারা স্বাক্ষরিত একটা ছবি যা নেতাজী রিসার্চ ব্যুরোর সৌজন্যে অধ্যাপক সুগত বসুর বইয়ে এবং অন্যত্র ছাপা হয়েছে এবং অধ্যাপক বসুর বই থেকে একই কারণে কপি করে এই লেখাটার সাথে সংযোজন করা হল।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev