
রবীন্দ্র-যুগের অনেক পরে প্রকৌশলী-কবি বিনয় মজুমদারই রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাবনাবিশ্ব ও গানের মূল সুর যে অনির্দেশ্য কল্পলোকের দিকে যাত্রা এবং অচেনার আত্মউন্মোচন — বিনয় মজুমদার তা নিজের জীবনদর্শনের মিথস্ক্রিয়ায় বাংলা কবিতায় এনে দিয়েছেন এক নতুন ভূমি।
মানুষ কখনো-কখনো নিঃসঙ্গ হতে হতে স্থায়ী নৈঃসঙ্গ্যে পর্যবসিত হয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে — বার্ট্রান্ড রাসেল কথা বলেছেন মানুষের অস্থায়ী নৈঃসঙ্গ্য নিয়ে, অন্যদিকে কিয়ের্কেগার্দ তাঁর ‘আইদার/অর’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন স্থায়ী নৈঃসঙ্গ্যের কথা। ব্যক্তি বিনয় মজুমদারও জীবনে আজীবন এই স্থায়ী নৈঃসঙ্গ্যে সমাছন্ন হয়ে গিয়েছিলেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর প্রিয় গ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের ‘গীতবিতান’। মানুষ যখন মনে করে এই জীবন দু’জনের, অর্থাৎ যৌথতার জীবন — কিন্তু সে-জীবন যখন ক্রমশ একার জীবন, একলার জীবন কিংবা বিচ্ছেদের জীবনে পরিণত হয় এবং মানুষ উপলব্ধি করে যে জগতে প্রত্যেকেই মূলত আলাদা ও একা; তখনই সংশয় ও নৈঃসঙ্গ্যবোধ ধীরে ধীরে পুরো জীবনবোধকে গ্রাস করে নেয়। বিনয় মজুমদারের কবিতার যাবতীয় বিষয়-সম্পদ নিহিত রয়েছে ক্রমশ ওই দু’জনের একা হয়ে যাওয়ার দর্শনে, একলা হয়ে যাওয়ার নৈঃসঙ্গ্যবোধের ধৃকেন্দ্রে — যার মধ্য দিয়ে আবার একলা-একলাই পূর্ণতা পাওয়ার মন্ত্রশক্তিও লাভ করা যায়।
কেউ যখন ‘সংসারচক্রে’ দু’জন মানুষে আবদ্ধ হওয়ার স্বপ্ন দেখে, অথচ পরিস্থিতির বিপ্রতীপতায় তাদের পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থান করতে হয়; আর একসময় তাদের একজন উপলব্ধি করে যে পরস্পরের সঙ্গে আর কখনোই দেখা হওয়া সম্ভব নয়, মিলন তো সুদূর পরাহত — অথচ একসঙ্গে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি ছিল — তখন সে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। তাসের প্রাসাদের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
একজন যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বহু মানুষের মাঝে সতত মুখর, অন্যজন সেখানে স্তিমিত প্রদীপের মতো নিয়ত নীরব। পারস্পরিক সম্পর্কের এই আলো-আঁধারির মধ্য দিয়েই তো যৌথ জীবন ও একার জীবন, একলার জীবন, গুটিয়ে যাওয়া ও ছড়িয়ে পড়ার জীবন রূপ পরিগ্রহ করে। সম্ভবত বিনয় মজুমদারের কবিতার বিষয়-ভাবনার গভীর তলপ্রদেশে প্রবেশ করার পথটি এখানেই নিহিত।
অবিভক্ত বর্মার (মিয়ানমার) অন্তর্গত মায়ানমারে বিনয় মজুমদারের জন্ম। সেখান থেকে কীভাবে তিনি পায়ে হেঁটে, নৌকায় ভেসে আর পাহাড় ডিঙিয়ে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে (বর্তমান বাংলাদেশ) মামার বাড়িতে এবং পরবর্তীতে ভারতে এসেছিলেন — তা এক পরম বিস্ময়ের গল্প। তৎকালীন পাকিস্তান (পূর্ব পাকিস্তান) থেকে সমুদ্র পেরিয়ে আসার সময়ে বিনয় নিশ্চয়ই সামুদ্রিক নীল জলে মাছের খেলা ও লাফিয়ে ওঠা দেখেছিলেন। সম্ভবত সেই স্মৃতিসূত্র থেকেই পরবর্তীতে তাঁর সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি রচিত হয় —
একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
পুনরায় ডুবে গেলো — এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হ’লো ফল।’ — ফিরে এসো চাকা
এই সংসার-সমুদ্রে কোনো-এক নারীর ক্ষণিক আত্মপ্রকাশ এবং পরক্ষণেই অনন্ত নিখিলে মিলিয়ে যাওয়ার বেদনাকে কেন্দ্র করেই কি তিনি তবে পঙ্ক্তিটি লিখেছিলেন? এখানে ‘উজ্জ্বল মাছ’-এর অন্তর্ধান যেন প্রিয় নারীর আকস্মিক আবির্ভাব ও চিরন্তন অদৃশ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ারই এক গভীর রূপক। যাঁর আকস্মিক বিচ্ছেদ-স্মৃতি বহন করে বিনয় মজুমদারকে আজীবন ‘বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম’ হয়ে টিকে থাকতে হয়েছিল!
শৈশব থেকেই বিনয় ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। বউবাজার মিত্র ইনস্টিটিউশনে পড়তে যাওয়ার সময় তাঁর স্কুলব্যাগে স্থান পেত একটি শুঁয়োপোকা আর কয়েকটি শিমুল পাতা। হাঁটার পথে মাঝেমাঝেই তিনি ব্যাগের মুখ খুলে উঁকি দিয়ে দেখতেন — কখন সেই শুঁয়োপোকাটি ডানা মেলে প্রজাপতি হয়ে ওঠে!
প্রকৃতির এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই তিনি যেন অসুন্দরের ভিতর থেকে সুন্দরের জন্মরহস্য সন্ধান করে গিয়েছিলেন আজীবন।
পরবর্তীতে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ে বিনয় থাকতেন ইডেন হিন্দু হোস্টেলে। তখন হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন জনার্দন চক্রবর্তী। অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত ও সুশীল এই তরুণটির প্রতি হোস্টেল সুপারের গভীর স্নেহপ্রীতি ঝরে পড়ত। সেই সময়েই জনার্দন চক্রবর্তীর তেরো বছরের কিশোরী কন্যা গায়ত্রীকে বিনয় প্রথম দেখেন। আর সেই প্রথম দর্শন থেকেই বিনয় যেন কোনো-এক অদম্য টানে ধীরে ধীরে গায়ত্রীর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন।
আমরা জানি, কিশোর বয়সের কণ্ঠস্বর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিটি বঙ্গসন্তান গোপনে নামতাখাতায় প্রেমের কবিতা লিখতে শুরু করে — কখনও বিদ্রোহে ভেসে, কখনো-বা কোনো তরুণীর প্রতি রূপ-গুণের মুগ্ধতায়। তবে সময়ের অনিবার্য নিয়মেই অঙ্গসংস্থানের বদল ও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রথম ভালো লাগার অনুভূতিও একসময় বদলে যায়। কিন্তু বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে ঠিক এখানেই ঘটেছিল ব্যতিক্রম।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে অমিত রায়ের মুখে বলিয়েছিলেন — “পাঁচ বছর পূর্বেকার ভালো-লাগা পাঁচ বছর পরেও যদি একই জায়গায় খাড়া দাঁড়িয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে, বেচারা জানতে পারে নি যে সে মরে গেছে।” বিনয়ের জীবনে এই রবীন্দ্রবীক্ষণই যেন উলটে গিয়েছিল এক অদ্ভুত কাব্যাবেগে। তাঁর ক্ষেত্রে গায়ত্রীকে কেন্দ্র করে জেগে ওঠা প্রথম ভালো লাগা বা প্রেমের অনুভূতি সময়ের নিয়মে বদলে যায়নি, কিংবা ফিকে হয়ে মরেও যায়নি; বরং তা এক অনড়, শাশ্বত ধ্রুবক হয়ে রয়ে গিয়েছিল সারাজীবন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অধিকাংশ মানুষের আবেগ যেখানে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, সেখানে বিনয় মজুমদার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর সেই প্রথম প্রেমের অনুভূতির ভিতরেই জ্যান্ত হয়ে বাস করে গেছেন।
অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের এই মানুষটি যে-কবিতার টানে কলম ধরেছিলেন, আজীবন যেন সেই একই বিষয়কে কেন্দ্র করে দীর্ঘ একটিমাত্র কবিতার অলিন্দেই ঘুরপাক খেয়ে গেলেন।
গায়ত্রীর কথা কাউকে স্পষ্ট করে বলেছিলেন কিনা, তা জানা যায় না। কবিতা যেমন ব্যঞ্জনাময় ও দূরধিগম্য শিল্প, বিনয়ও তেমনই নিজের জীবনকে রহস্যের লতাগুল্মে জড়িয়ে রাখার জন্য এক নিজস্ব নির্মোক গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু আদতে তিনি তা রাখতে পেরেছিলেন কি? কিংবা হয়তো রাখতে চানইনি।
১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে গায়ত্রী চক্রবর্তী যখন বিদেশে পাড়ি দেন, তখন থেকেই বিনয় ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকেন। একদিকে অব্যক্ত প্রেম, অন্যদিকে তীব্র মানসিক যন্ত্রণা — এই দুইয়ের টানাপোড়েনে বইতে থাকে তাঁর বিরহঘন জীবনপ্রবাহ। ওদিকে গায়ত্রী চক্রবর্তী পাশ্চাত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে নিজের জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং পরবর্তীতে জ্যাক দেরিদার প্রিয় ছাত্রী ও অনুবাদক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। অন্যদিকে বিনয় মজুমদার ধীরে ধীরে স্তব্ধ হতে হতে নিজের ছায়ার চেয়েও গভীরতর নৈঃসঙ্গ্যে তলিয়ে যেতে লাগলেন।
লক্ষ করার বিষয়, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক পরবর্তীতে যে-বিনির্মাণ তত্ত্বের (Deconstruction) ভাষ্যকার ও অনুবাদক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন, তার মূলে রয়েছে উপস্থিতি বা কেন্দ্রের একরৈখিক সত্যকে ভেঙে দিয়ে অনুপস্থিতি ও অপূর্ণতার অন্তহীন বহুমাত্রিকতাকে উন্মোচন করা। কাকতালীয় হলেও সত্যি, ব্যক্তি বিনয় মজুমদারের প্রেম ও বিরহচেতনাতেও যেন ঘটে গিয়েছিল এক অন্তঃসলিলা বিনির্মাণ। গায়ত্রীর চিরন্তন ‘অনুপস্থিতি’ বিনয়ের জীবনে কোনো শূন্যতা তৈরি করেনি, বরং সেই বিচ্ছেদই হয়ে উঠেছিল তাঁর কাব্যবিশ্বের মূল ‘কেন্দ্র’। বিনয় তাঁর কবিতায় প্রেম ও প্রেমিককে প্রাপ্তির একরৈখিক উপস্থিতিতে সাজাননি; বরং বিচ্ছেদের নিখাদ অনুপস্থিতিকেই প্রতিনিয়ত পুনঃপাঠ করে নির্মাণ করে গেছেন একের পর এক অমর পঙ্ক্তি। অর্থাৎ, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্যে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের আঙিনায় যে-অনুপস্থিতি ও অর্থ-বিচ্ছেদের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছিলেন, কবি বিনয় মজুমদারও নিজের অজান্তেই যেন স্বকীয় জীবনে ও কবিতায় সেই বিচ্ছেদের বিনির্মাণ ঘটিয়ে গিয়েছেন অতি সন্তর্পণে।
এতক্ষণ আমরা দেখলাম, বিনয় মজুমদারের কবিতার অন্ধবিন্দু আবর্তিত হচ্ছে গায়ত্রীকে ঘিরেই; পরবর্তীতে আমরা জানব যে এই গায়ত্রীই তাঁর কাব্যভাবনাবিশ্বের একমাত্র মন্ত্র — আক্ষরিক অর্থেই যা তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল ‘গায়ত্রী-মন্ত্র’।
বিনয় মজুমদার এমনই এক কবি, যিনি কাব্যজীবনের শুরুতেই আত্মস্থ করেছিলেন গীতিকবিতার মর্মবাণী।
বহির্বিশ্বকে অন্তরে ধারণ করে এবং সমস্ত মহাজাগতিক ইশারার সাক্ষী থেকেও ঘনঘটার ঘনঘটায় না গিয়ে একান্ত নিভৃতে নিজের দেহ-মনের সঙ্গে কথা বলাই গীতিকবিতার মূল লক্ষণ। বিহারীলাল চক্রবর্তী পর্যন্ত গীতিকবিতা সম্পর্কে আমাদের এই ধারণাই গড়ে উঠেছিল — যা উনিশ শতকের কথা। কিন্তু বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকের কবি বিনয় মজুমদার যখন নিজের দেহ ও মনের কথা বললেন, তখন তিনি গীতিকবিতার সংজ্ঞায় যুক্ত করলেন এক নতুন মাত্রা; তা হল আবহমান বিশ্বমানবের যন্ত্রণা। একটু মনোযোগ দিলেই দেখা যাবে, বিহারীলাল চক্রবর্তী নিমজ্জিত ছিলেন প্রেমে, এবং সেখানেই ছিল তাঁর মানসিক প্রশান্তি। অন্যদিকে বিনয় মজুমদার এই প্রেমকে সম্প্রসারিত করে নিয়ে গেলেন রতিময়তায়। কবিতার ছত্রে ছত্রে শব্দ দিয়ে কীভাবে রতিবিহার করা যায় এবং কবিতার মধ্য দিয়েই যে কী অনন্য উপায়ে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব — তা একেবারেই বিনয় মজুমদারেরই মৌল বীক্ষণ।
তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে এই মানবজীবনটাই আসলে এক মহাজাগতিক ঠাট্টা; আর সেই নিরর্থকতার ভিতরেও নিজের জীবনকে স্বকীয় বলে উদ্ যাপনের জন্য চাই এক দুর্লভ মানসিক শক্তি ও বৈধতা। বিনয় মজুমদারের সেই ক্ষমতা ছিল — যার জ্বলন্ত প্রমাণ রেখে গেছেন তিনি তাঁর সারাজীবনের কাব্যকথায়।
দুই.
প্রতিটি মানুষই সামাজিক নিয়ম মেনে এক থেকে দুই হয়, বিনয়ের ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক তার বিপরীত — তিনি যেন দুই থেকে আবার এক-এ ফিরে এলেন। আমরা জানি, মানুষ জীবনচক্রের চিরাচরিত নিয়মে একের সঙ্গে এক যুক্ত হয়ে দুই হয়, আর সেই দুই থেকে বহু হয়। কিন্তু বিনয় মজুমদারের ক্ষেত্রে প্রাত্যহিক জীবনের এই চেনা হিসেব গেল বদলে। তিনি মনে মনে যে ‘দুই’-কে লালন করেছিলেন, পরম আত্মদর্শন ও আত্মবীক্ষণের মধ্য দিয়ে তাকেই ক্রমশ এক-এ নামিয়ে আনলেন; আর এভাবেই বদলে গেল তাঁর জীবনের পরিচিত সমীকরণ।
বিনয়ের প্রেমিক সত্তাকে যদি কয়েকটি পর্বে ভাগ করার কথা ভাবি, তবে দেখব তাঁর আবহমান প্রেমিক সত্তা চিরকাল গায়ত্রীকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে; এবং বিনয়ও সারাজীবনে কোনোদিন নিজেকে সেই কেন্দ্র থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করেননি।
তাঁর এই প্রেমিক সত্তার ক্রমপরিণতিকে মূলত চারটি পর্বে প্রত্যক্ষ করা যায় —
প্রেমিক সত্তা
↓
যন্ত্রণাদগ্ধ প্রেমিকসত্তা
↓
ব্যর্থতাসংক্রমিত প্রেমিকসত্তা
↓
স্মৃতিভারাতুর প্রেমিকসত্তা
প্রকৃত প্রস্তাবে এই সংরচিত সাবলীল আকল্পই বিনয়ের কবিতার মূল বিষয়, এবং অবশ্যই তার অবিসংবাদিত উৎস গায়ত্রী চক্রবর্তী। যিনি ‘চাকা’র রূপকে ফিরে এসেছেন তাঁর কবিমন ও কাব্যদর্শনের মৌল নিয়ন্ত্রণ বা চালিকাশক্তি হিসেবে। বোধকরি বিনয়ের কাব্যের বক্তব্যবিশ্বে গায়ত্রী চক্রবর্তী যুগপৎ প্রেমিকা এবং সরস্বতীর রূপকল্পে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট থাকলেন, কিন্তু ধরা দিলেন না বাস্তব জীবনে।
বহুদিন চোখের অন্তরালে থাকা গায়ত্রী পৃথিবীর যে-প্রান্তেই বাস করুন-না-কেন শুধু বিনয় কেবল সেই স্মৃতিঘেরা কিশোরী গায়ত্রীকে হৃদয়ে দেখেই শান্ত হননি; বরং অন্তরের এক প্রচ্ছন্ন প্রদেশে অনুভূতির জারকরসে সিক্ত হতে হতে আজীবন উচ্চারণ করে গেছেন — ‘কেবল ভিতরে দেখি, দেখাইতে নারি!’ এবং এই অনুভবে তিনি নিজেকে শুধু ভাবনার জগতেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তাঁর সমগ্র জীবনের কাব্যভাষায় একে স্থায়ী রূপপ্রতিষ্ঠা দিয়ে গেছেন।
বিনয় যখন তেরো বছরের কিশোরী গায়ত্রীকে দেখেছিলেন, তখন গায়ত্রী তাঁর কাছে ছিলেন রক্তমাংসের এক নারী। যাকে প্রাত্যহিক সাংসারিক গণ্ডিতে আবদ্ধ করা যায়, যার শরীরী সান্নিধ্যে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনে নেওয়া যায়। কিন্তু বিনয়ের জীবনে তা ঘটেনি। গায়ত্রী যখন বহুদূরে চলে গেলেন, তখন বিচ্ছেদের সেই তীব্রতায় সেই সাধারণ নারীই বিনয়ের কাছে হয়ে উঠলেন ঈশ্বরী — যাঁকে আর কোনো প্রাত্যহিক ঘূর্ণাবর্তে বেঁধে রাখা যায় না। কবির ভাববিশ্বে সেই নারীই শেষপর্যন্ত পরিণত হলেন কাব্য ও সৃষ্টিতত্ত্বের আদি উৎসে। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে স্মরণীয় বিনয়ের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থের সেই অমোঘ উৎসর্গবাণী বা নামকরণ — ‘আমার গায়ত্রীকে’।
ঈশ্বরী — নারী + সৃষ্টি+ বীজ + জীবচক্র
বিনয় — জীবন + দাম্পত্য + চরিতার্থতা
এভাবেই, ঠিক এই বিন্দুতেই বিনয় মজুমদারের জীবন ও কবিতার সঙ্গে সাংখ্যদর্শনের এক প্রচ্ছন্ন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। আমরা জানি, সাংখ্যদর্শন মূলগতভাবে দ্বৈতবাদী। এই দর্শন মনে করে জগৎ দুটি পরম সত্যের দ্বারা গঠিত — পুরুষ (চৈতন্য) ও প্রকৃতি (পার্থিব জড়)। আর জীব হল সেই চৈতন্যময় অবস্থা, যা কামনা-বাসনা নিয়ে প্রকৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। এই দার্শনিক ছাঁচে বিনয়ের আত্মজীবনের স্বরূপসন্ধান করলে বোঝা যায়, পার্থিব চৈতন্য নিয়ে কবি যেন প্রবেশ করেছেন বিশ্বময় প্রকৃতির গর্ভগৃহে; নিগূঢ় নিমগ্নতার গোপন সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেছেন বিশ্ববিবেকের না-পাওয়ার বেদনাবিধুরতায়। আর কবির এই চিরন্তন অতৃপ্তিই তৃপ্ত করে চলেছে বাংলা কবিতার আবহমান পাঠককে। সাহিত্য, বিজ্ঞান ও গণিত-আশ্লিষ্ট তাঁর জীবন আসলে স্বতন্ত্র এক অনন্য বীক্ষণের রসায়নজাত সমাহার এবং পরম সত্যের অনুসন্ধিৎসু প্রকাশ। গাণিতিক প্রত্যয়সিদ্ধ এই কবিই তাই তাঁর কবিতায় অবলীলায় উচ্চারণ করতে পারেন ঋষিবচনের মতো অমোঘ সত্য —
আমিই গণিতের শূন্য
আমিই গণিত-এর শূন্য। গণিতের বইতে শূন্য ছাপা হয় এই ভাবে ০ — এই ছাপা শূন্য আমি।
মার্কিন কবি জিন গ্যারেগ (Jean Garrigue) লিখেছিলেন — ‘একটি কবিতার প্রতিটি পঙক্তিই হল একটি আত্মজীবনী।’ এই দার্শনিক উক্তিটিই পরিষ্কার করে দেয় বিনয়ের সমগ্র কাব্যজীবন কীভাবে বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের যুগপৎ প্রত্যয়সিদ্ধ রূপান্তর। পঞ্চাশের দশকের বাংলা কবিতায় বিনয় মজুমদারের আবির্ভাব এক স্বতন্ত্র বাচনবিশ্বের রূপকার ও নির্মাতা হিসেবে। ত্রিশের কবি জীবনানন্দ দাশের স্বতন্ত্র ভাষা ও উপমার প্রভাব বিনয়ের প্রাথমিক পর্বের কবিতায় লক্ষ করা গেলেও, পরবর্তীতে তিনি তা সম্পূর্ণ অতিক্রম করে গড়ে তোলেন নিজস্ব এক অনন্য কাব্যবীক্ষাজগৎ — যা আজও বাংলা কাব্যসাহিত্যে অনতিক্রম্য এক মাইলফলক হয়ে আছে।
বিনয় মজুমদার কেবল আধুনিক বাংলা কবিতার এক ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বরই নন, তিনি নিজস্ব জীবন দিয়ে কাব্যবিশ্বে তৈরি করে গেছেন এক অনন্য সমীকরণ। কৈশোরের প্রথম ভালো লাগাকে আজীবন অনড় ও ধ্রুবক রেখে, সাধারণ প্রেমের স্থূলতাকে অতিক্রম করে তিনি তাকে রূপান্তর করেছিলেন এক মহাজাগতিক ও দার্শনিক উত্তরণে। গায়ত্রীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তাঁর এই বিচ্ছেদদীপ্ত প্রেম একদিকে যেমন রক্তমাংসের সংক্রমননিস্যন্দী নারী থেকে ‘ঈশ্বরী’ তথা সৃষ্টির আদি উৎসে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে তা-ই আবার রূপ নিয়েছে সাংখ্যদর্শনের পুরুষ-প্রকৃতির চিরন্তন দ্বৈতে। গাণিতিক প্রত্যয়সিদ্ধ নিখুঁত বিন্যাস, আধুনিক রতিময়তার রূপকল্প এবং অস্তিত্ববাদী নৈঃসঙ্গ্যের মধ্য দিয়ে ‘দুই থেকে এক’-এ নামার এই যে আত্মবীক্ষণ — তা বাংলা গীতিকবিতার সংজ্ঞাকেই নতুন করে সম্প্রসারিত করেছে। প্রাত্যহিক প্রথাগত নিয়মের বাইরে হেঁটে, নিজের ক্ষত ও যন্ত্রণাকে শিল্পে পরিণত করে তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, শূন্যতার ভিতরেই লুকিয়ে থাকে মহাবিশ্বের পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব। তাই আধুনিক কাব্যসাহিত্যের আকাশে বিনয় মজুমদার আজও এমন এক দীপ্যমান কেন্দ্র, যা কাল থেকে কালান্তরে অনতিক্রম্য হয়েই জ্বলতে থাকবে।