
৬৪. আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চায় সুধীরকুমার মিত্র
১৯৩৩ সালের কথা। গান্ধীজি জেলে। কলকাতার কালীঘাটের ২, কালী লেনের ‘মিত্র কটেজ’ বাড়ি থেকে তাঁর কাছে একটা চিঠি গেল। চব্বিশ বছরের এক যুবক লিখেছেন চিঠি। কালীঘাটের কালীমন্দিরের গর্ভগৃহে অস্পৃশ্যদের প্রবেশাধিকার নিয়ে তিনি একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে চান। তাই তিনি গান্ধীজির আশীর্বাদ প্রার্থনা করেছেন। উত্তরে গান্ধী লিখলেন, ‘মনে হয় না, অস্পৃশ্যতা নিয়ে একটি আস্ত মাসিক পত্রিকা চলতে পারে। ফলে আপনাকে আশীর্বাণী না পাঠাতে পারার জন্য ক্ষমা করবেন।’
গান্ধীকে পত্রলেখক যুবকের নাম সুধীরকুমার মিত্র (১৯০৯-১৯৯৩)। হুগলি জেলার জনাই-বাকসা গ্রামে তাঁর জন্ম। আশুতোষ মিত্র ও রাধারানিদেবীর একমাত্র সন্তান তিনি। সুধীরকুমারের মনে ইতিহাস ও সাহিত্যের নেশা ধরিয়ে দেন তাঁর বাবাই। বাড়িতে আসত নানা বই ও পত্র-পত্রিকা। কিশোর সুধীর সেগুলি ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভবিষ্যৎ জীবনের অনুপ্রেরণা খুঁজে পান। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কথা। গোটা দেশের ইতিহাস এক রকমের ; কিন্তু দেশ তো নানা অঞ্চলে বিভক্ত। সেই বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের ইতিহাসের সুলুক সন্ধান দরকার।
প্রথম দিকে কলকাতার মসজিদবাড়ি স্ট্রিটে বাস করতেন তাঁরা। পড়েছেন স্কটিশচার্চ স্কুল ও কলেজে। প্রথম জীবনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিরক্ষা বিভাগের কলকাতা অফিসে কাজ করতেন। পরে তাঁকে সিমলায় বদলি করতে চান সরকার। তখন সুধীরকুমার চাকরি ছেড়ে দিয়ে এক বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতে শুরু করেন। সেই সঙ্গে চলতে থাকে পড়া ও লেখা। লেখা মানে কবিতা। আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চার কথাটা অবশ্য মনে থাকে। সেই টানেই একদিন লিখে ফেললেন ‘পারিবারিক বংশলতিকা আর জেজুর গ্রামের ইতিবৃত্ত।’ জেজুর গ্রামের এক টেরাকোটা মন্দির দেখেই তিনি এই প্রবন্ধ লিখেছিলেন।
রিয়া পুরকাইত সঠিকভাবেই বলেছেন যে যৌবনের সূচনাতে তিনি কবিতা প্রবন্ধ রচনা করলেও ক্রমশ আঞ্চলিক ইতিহাস তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তারপর শুরু হল তাঁর সাধনা। সপ্তাহের শেষে শনি ও রবিবার তিনি তাঁর নিজের জেলা হুগলির গ্রামে গ্রামে ঘুরে সংগ্রহ করতে লাগলেন আঞ্চলিক ইতিহাসের উপকরণ। প্রাচীন কোন মন্দির মসজিদ বা মুর্তি দেখলে খুঁটিয়ে তার খবর নিতেন। মনীষীদের বই বা চিঠি কারোর বাড়িতে থাকলে তার খবর নিতেন। হুগলি জেলার প্রায় ১৮০০ টি গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করে তিনি প্রকাশ করলেন ‘হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গ সমাজ’। ১১০০ পাতার সুবিশাল বই। পরবর্তীকালে পরিবর্তিত ও পরিমার্জিত হয়ে বইটি দুটি খণ্ডে প্রকাশিত হয়।
প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোড়ন তোলে সেই বই। রাজারাজড়ার ইতিহাস নয়, এক ভিন্নদৃষ্টিতে গ্রামে গ্রামে ঘুরে মন্দির-মসজিদ-গ্রন্থাগার-স্কুল-কলেজ-রাস্তা-নদীনালা — যা কিছু তিনি চাক্ষুষ করেছেন, তার বিবরণ এই বই। একটি জেলাকে কেন্দ্র করে তার ইতিহাস-সমাজ ও সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন, পাশাপাশি আছে সামগ্রিক বঙ্গ সমাজের ছবি। বইটি পড়ে লেখক অচিন্ত্য সেনগুপ্ত লিখেছিলেন — “হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ’ কী শুধু ভূগোল না ইতিহাস? এ এক পরিব্যাপী গভীর বিস্তারী অনুসন্ধান। এ অনুসন্ধান শুধু আমার নয়, তারিখের নয়,শুধু ঘটনার বা রটনার নয় ; এ অনুসন্ধান প্রাণের, রসের, মানবীয়তার পুঙ্খানুপুঙ্খ থেকে তুঙ্গাতিতুঙ্গ পর্যন্ত। এক কথায় বলা যায় এও বঙ্গসন্ধান।”
সুধীরকুমার মিত্র আঞ্চলিক ইতিহাসের যে চর্চা শুরু করেছিলেন সেই ধারাতেই অগ্রসর হয়েছেন হরিহর শেঠ, পঞ্চানন রায়, তারাপদ সাঁতরা, যজ্ঞেশ্বর চৌধুরী, মোহিত রায়, শিবেন্দু মান্না, মণীন্দ্রনাথ আশ, কমল চৌধুরী, কালিদাস দত্ত, নরোত্তম হালদার, প্রণব রায়, বিজয় বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিকলাল সিংহ, চিত্তরঞ্জন দাশগুপ্ত, কেদারনাথ মজুমদার প্রভৃতিরা। এঁরা নীরবে, প্রভূত পরিশ্রমে বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাস ও পুরাকীর্তির বিবরণ লিপিবদ্ধ করার কাজে জীবন ব্যয় করেছেন।
বাংলা ও বাঙালি তথা ভারতের প্রতি ছিল সুধীরকুমারের তীব্র আকর্ষণ। বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন ‘বঙ্গভাষা সংস্কৃতি সম্মেলন।’ এই সম্মেলনের সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা এবং খুলনায় যে সব বাৎসরিক সম্মেলন হয়, তাতে অনেক বিশিষ্ট মানুষ বাংলা ভাষা-শিক্ষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে সুগভীর ভাবনার কথা লিখিতভাবে তুলে ধরেন। সত্যচরণ ইন্সটিটিউট, কালীঘাট নারীশিক্ষা সমিতি, কালীঘাট স্বাস্থ্য সমিতি, বঙ্গীয় বেকার যুবক সংঘ তাঁর সৃষ্টি। রাসবিহারী, বাঘা যতীন, বিবেকানন্দ, নেতাজি সুভাষ, কানাইলাল, প্রফুল্ল চাকী, রামকৃষ্ণের জীবনী লিখেছেন।
তিনি যে নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষের অনুরাগী ছিলেন সেকথা জানা গেছে তাঁর মৃত্যুর পরে, ২০০৯ সালে। তাঁর পুরানো পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করে সুনীল দাসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘গিরিশ পরিচয়।’ সুধীরকুমারের মনে হয়েছে জীবৎকালে যোগ্য সমাদর পান নি গিরিশচন্দ্র। তিনি বলেছেন, ‘গিরিশচন্দ্র নাট্য সাহিত্যের মধ্য দিয়া বাঙ্গালাদেশে ধর্ম, সমাজ ও রাজনীতিতে যে অপূর্ব চিন্তাধারা দিয়া গিয়াছেন — তাঁহার প্রতিভা উৎসের ভাবপ্রবাহিণী হইতে বাঙ্গালি যে নূতন জীবনরস প্রাপ্ত হইয়াছে, তাহাই ভারতের শ্বাশত মর্মবাণী।’