
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত বঙ্গীয় শব্দকোষ অভিধানে ‘শারদ’ শব্দটির অর্থ, শরৎসম্বন্ধী। ‘কবিকঙ্কণ-চণ্ডী’-তে পাই, শারদ ইন্দু। জ্ঞানদাস লিখেছেন, শারদ যামিনী অর্থাৎ শরৎকালীন রাত্রি। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর লিখেছেন, ‘কে বলে শারদ শশী সে মুখের তুলা’। ঋগ্বেদ-এ শারদ মানে কাশ, বকুল, হরিৎমুদগ বলা হয়েছে। শারদ+উৎসব=শারদোৎসব। অর্থাৎ শরৎকালীন উৎসবসমূহ।
‘শারদা’ শব্দের অর্থ, —
১. দুর্গা : ‘শরৎকালে পুরা যস্মান্ নবম্যাং বোধিতা সুবৈঃ। শারদা সা সমাখ্যাতা পীঠে লোকে চ নামতঃ।।(তিথ্যাদিতত্ত্ব)
২. সরস্বতী : শারদা মানে সরস্বতীকেও বোঝায়। ‘শারদী’ মানে সরস্বতীর হাতের বীণাকেও বোঝায় (বঙ্গীয় শব্দকোষ), তার অপর নাম কচ্ছপী বীণা।
শারদা+উৎসব=শারদোৎসব। কিন্তু উৎসবটি দুর্গার না সরস্বতীর, সেটি বোঝার উপায় নেই।
বঙ্গীয় শব্দকোষে শারদপার্ব্বণ শব্দটির অর্থ, শরৎকালীন উৎসব, শারদোৎসব। উদাহরণ বা প্রয়োগ,
‘কিম্বা দীপাবলী, অম্বিকার পীঠতলে শারদপাব্বণে’। (মেঘনাদবধকাব্য)
সুতরাং শারদোৎসবের মধ্যে দীপাবলী বা কালীপূজাও পড়ে যাচ্ছে।
শারদোৎসব মানে শরৎকালে অনুষ্ঠেয় উৎসব। তারমধ্যে নিম্নোক্ত উৎসবগুলি পড়ে।
১. দুর্গাপূজা : দুর্গাপূজা বাঙালির শরৎকালীন সেরা উৎসব। মহালয়ার মাধ্যমে দেবী দুর্গার আবাহন ঘটে এবং ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে চলে মূল পূজা। সপ্তমীর নবপত্রিকা স্থাপন তথা কলাবউ স্নান, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে সন্ধিপূজা, নবমীর বলি (লাউ বা কলা), দশমীর বিসর্জন।
হুতোম প্যাঁচার নকশায় ‘দুর্গাপূজা’-শীর্ষক আখ্যানে কালীপ্রসন্ন সিংহ লিখেছেন, “এদিকে দেখতে দেখতে দিনমণি যেন সম্বৎসরের পুজোর আমোদের সঙ্গে অস্ত গেলেন। সন্ধ্যাবধূ বিচ্ছেদবসন পরিধান করে দেখা দিলেন। কর্মকর্ত্তারা প্রতিমা নিরঞ্জন করে, নীলকণ্ঠ শঙ্খচিল উড়িয়ে ‘দাদা গো’ ‘দিদি গো’ বাজনার সঙ্গে ঘট নিয়ে ঘরমুখো হলেন। বাড়ীতে পৌঁছে পূর্ণঘটকে প্রণাম করে শান্তিজল নিলেন, পরে কাঁচা হলুদ ও ঘটজল খেয়ে পরস্পরকে কোলাকুলি কল্লেন। অবশেষে কলাপাতে দুর্গানাম লিখে সিদ্ধি খেয়ে বিজয়ার উপসংহার হলো।”
২. লক্ষ্মীপূজা : দুর্গাপূজা শেষ হওয়ার ঠিক পরের পূর্ণিমা তিথিতে (কোজাগরী পূর্ণিমা) ধন ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। এটি প্রায় প্রতি বাঙালি হিন্দুর ঘরে অনুষ্ঠিত হয়।
৩. কালীপূজা ও দীপাবলি ও ভূতচতুর্দশী : কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে শক্তির দেবী কালীর পূজা করা হয়। একই সাথে প্রদীপ ও আলোর উৎসব দীপাবলি উদযাপিত হয়।
কালীপূজার আগের দিন আবার ভূতচতুর্দশী। এদিন দুপুরে খাওয়ার ওই ১৪ টি শাকের নাম হল — ওল, নটে, বেথুয়া, সর্ষে, কালকাসুন্দী, জয়ন্তী, নিম, হেলেঞ্চা, সজনে, পলতা, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা, শলপা, শুষণী।
ভূতচতুর্দশীতে চোদ্দশাক খাওয়া যেন সুজলাসুফলা শস্যশ্যামলা ধরিত্রী বা পৃথিবীর বন্দনা করা। পৃথিবী, জল, বাতাস, আগুন, আকাশ তো প্রাণের দ্যোতক। এখানেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর পরিপোষণ হয়।
তারপর সন্ধ্যায় চোদ্দ প্রদীপ জ্বালা হয়, চোদ্দ পুরুষের জন্যে। তাঁরা হলেন পিতা, মাতা, পিতামহ, পিতামহী, মাতামহ, মাতামহী, প্রপিতামহ, প্রপিতামহী, প্রমাতামহ, প্রমাতামহী, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহী, শ্বশুর, শাশুড়ি।
মতান্তরে, প্রদীপগুলি মূলত নিবেদিত হয় স্বর্গত পিতৃপুরুষ, ধর্ম, রুদ্র, বিষ্ণু, কান্তারপতি বা অরণ্যে অধিষ্ঠিত দেবতাদের উদ্দেশ্যে।
অমাবস্যা শুরুর সাথে সাথে শুরু হবে মা কালীর পূজা ও দীপাবলি। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করার জন্য প্রদীপের আলোয় চারদিকে উদ্ভাসিত হবে। আগের দিন পালিত হয় ভূতচতুর্দশী। এই রাতে নাকি বিদেহী আত্মারা নেমে আসে মর্ত্যে। তবে এই দিনটি নিয়ে নানা কাহিনী আছে। দেখে নেওয়া যাক কী কী সেই কাহিনী।
দানবরাজ বলির বড্ড অহংকার ছিল দানবীর হিসাবে। তিনি ছিলেন প্রহ্লাদের পৌত্র ও কশ্যপের বংশধর। তিনি স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর হয়েছিলেন পৌরাণিক যুগে। এতে ধীরে ধীরে একসময় দারুণ সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেন দেবতারা। তখন দেবগুরু বৃহস্পতির পরামর্শে ভগবান বিষ্ণু বামনরূপে এসে তাঁর পা রাখার জন্য তিন পা পরিমাণ জমি ভিক্ষা চাইলেন রাজা বলির কাছে।
স্বয়ং বিষ্ণু যে এসেছেন রাজার কাছে এ বিষয়টা পরিস্কার ছিল, কিন্তু কোনওভাবে এতটুকুও বিষ্ণুকে বুঝতে দেননি রাজা বলি। তবুও তিনি দান দিতে রাজি হলেন কথা রক্ষার্থে।
তখন বামনরূপী ভগবান বিষ্ণু একটা পা রাখলেন স্বর্গে, আর একটা পা দিলেন মর্ত্যে। এবার নাভি থেকে বের হল আর একটা পা। এই পা রাখলেন রাজা বলির মাথায়।
এর পর ধীরে ধীরে বলি ঢুকে গেলেন পাতালে। বলি জেনে বুঝেও দান করেছিলেন বলে ভগবান বিষ্ণু রাজা বলির নরকাসুর রূপের পুজোর প্রবর্তন করেন মর্ত্যলোকে।
নরকাসুররূপী বলি রাজা কালীপুজোর আগের দিন অর্থাৎ ভূতচতুর্দশী তিথিতে মর্ত্যে আসেন পুজো নিতে। সঙ্গে থাকে রাজার অসংখ্য অনুচর। প্রচলিত বিশ্বাস, তাদের দূরে রাখার জন্য জ্বালানো হয় প্রদীপগুলি। এই হল ভূতচতুর্দশীর মোদ্দাকথা।
৪. ভ্রাতৃদ্বিতীয়া (ভাইফোঁটা) : কালীপূজার ঠিক দুদিন পর কার্তিক মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে এই উৎসব হয়। বোনেরা তাদের ভাইদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে কপালে চন্দনের ফোঁটা দেয়।
জগদ্ধাত্রী পূজা : দেবী দুর্গারই অপর রূপ জগদ্ধাত্রীর পূজা কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষীয় নবমী তিথিতে ধুমধামের সাথে উদযাপিত হয়, বিশেষ করে চন্দননগর ও কৃষ্ণনগরে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
কার্তিক পূজা : শরৎকালের শেষের দিকে (কার্তিক সংক্রান্তিতে) সন্তান ভাগ্য ও সংসারের মঙ্গলের জন্য দেবসেনাপতি কার্তিকের পূজা করা হয়।
নবান্ন উৎসব : শরতের শেষ দিকে এবং হেমন্তের শুরুতে নতুন আমন ধান কাটার পর এই উৎসব হয়। নতুন চালের গুঁড়ো, দুধ ও গুড় দিয়ে তৈরি করা হয় পিঠে-পায়েস।
‘শারদোৎসব’ লিখলে কোনও মতেই দুর্গাপূজা বোঝায় না। শারদা-উৎসব লিখলে দুর্গাপূজার কাছাকাছি যাওয়া যায়। তবে সরস্বতীও এর দাবিদার হয়ে দাঁড়ায়। তবে কালটা যেহেতু শরৎ, দুর্গার দাবিই প্রাধান্য পাবে। যে বাংলা একদা ‘বামদুর্গ’ বলে পরিচিত ছিল, সেখানে তার স্মরণে প্যান্ডেলের বাইরে বইয়ের স্টলের ব্যানারে যদি ‘দুর্গোৎসব’ লেখা হয়, তাহলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। দুর্গ + উৎসব = দুর্গোৎসব। সেক্ষেত্রে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।