
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর লেখাপত্রে কতজায়গায় যে ‘রাখী’ শব্দটি ব্যবহার করে গেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। তাঁর বিখ্যত রাখীবন্ধনের ঘটনাটি অবশ্য অবন ঠাকুরের লেখায় পাচ্ছি। যেবার তিনি নাখোদা মসজিদের ইমামদেরও রাখী পরিয়েছিলেন।
গীতবিতানের পূজা-বিশ্ব-এ পাই —
প্রভু, # আজি তোমার দক্ষিণ হাত রেখো না ঢাকি।
এসেছি তোমারে, হে নাথ, পরাতে রাখী।।
যদি বাঁধি তোমার হাতে # পড়ব বাঁধা সবার সাথে,
যেখানে যে আছে কেহই রবে না বাকি।।
আজি যেন ভেদ নাহি রয় আপনা পরে,
তোমায় যেন এক দেখি হে বাহিরে ঘরে।
তোমা-সাথে যে বিচ্ছেদে # ঘুরে বেড়াই কেঁদে কেঁদে
ক্ষণেকতরে ঘুচাতে তাই তোমারে।
চণ্ডালিকা নৃত্যনাট্যে পাওয়া যায়,
মা। যেমন বলেছিলেম তেমনি প্রস্তুত হয়েছ তো?
প্রকৃতি। হয়েছি! কাল ছিল শুক্লাদ্বিতীয়ার রাত, করেছি গম্ভীরায় অবগাহন-স্নান। এই তো চাল দিয়ে, দাড়িমের ফুল দিয়ে, সিঁদুর দিয়ে, সাতটি রত্ন দিয়ে, চক্র এঁকেছি আঙিনায়। পুঁতেছি হলদে কাপড়ের ধ্বজাগুলি, থালায় রেখেছি মালাচন্দন, জ্বালিয়েছি বাতি। স্নানের পর কাপড় পরেছি ধানের অঙ্কুরের রঙ, চাঁপার রঙের ওড়না। পুবদিকে আসন করে সমস্ত রাত ধ্যান করেছি তাঁর মূর্তি। ষোলোটি সোনালি সুতোয় ষোলোটি গ্রন্থি দিয়ে রাখী পরেছি বাঁ হাতে।
মা। আচ্ছা, তবে নাচো তোমার সেই আহ্বানের নাচ — প্রদক্ষিণ করো। আমি বেদীর কাছে মন্ত্র পড়ছি। ডাকি।
গীতবিতান প্রকৃতি পর্যায় —
গহন রাতে শ্রাবণধারা পড়িছে ঝরে,
কেন গো মিছে জাগাবে ওরে।।
এখনো দুটি আঁখির কোণে যায় যে দেখা
জলের রেখা,
না-বলা বাণী রয়েছে যেন অধর ভরে।।
নাহয় যেয়ো গুঞ্জরিয়া বীণার তারে
মনের কথা শয়নদ্বারে।
নাহয় রেখো মালতীকলি শিথিল কেশে
নীরবে এসে,
নাহয় রাখী পরায়ে যেয়ো ফুলের ডোরে।
কেন গো মিছে জাগাবে ওরে।
কবিগুরুর লেখা স্ফুলিঙ্গ-এ পাওয়া যাচ্ছে,
আমি বেসেছিলেম ভালো
সকল দেহে মনে
এই ধরণীর ছায়া আলো
আমার এ জীবনে।
সেই-যে আমার ভালোবাসা
লয়ে আকুল অকূল আশা
ছড়িয়ে দিল আপন ভাষা
আকাশনীলিমাতে।
রইল গভীর সুখে দুখে,
রইল সে-যে কুঁড়ির বুকে
ফুল-ফোটানোর মুখে মুখে
ফাগুনচৈত্ররাতে।
রইল তারি রাখী বাঁধা
ভাবী কালের হাতে।
গীতবিতান প্রেমপর্যায়-এ পাচ্ছি,
সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে, # ফুলডোরে বাঁধা ঝুলনা।
সেই স্মৃতিটুকু কভু খনে খনে # যেন জাগে মনে, ভুলো না।।
সেদিন বাতাসে ছিল তুমি জানো— আমারি মনের প্রলাপ জড়ানো,
আকাশে আকাশে আছিল ছড়ানো তোমার হাসির তুলনা।।
যেতে যেতে পথে পূর্ণিমারাতে চাঁদ উঠেছিল গগনে।
দেখা হয়েছিল তোমাতে আমাতে কী জানি কী মহা লগনে।
এখন আমার বেলা নাহি আর, # বহিব একাকী বিরহের ভার—
বাঁধিনু যে রাখী পরানে তোমার সে রাখী খুলো না, খুলো না।।
গীতবিতান পূজাপর্যায়ে আরও পাই,
তোমার হাতের রাখীখানি বাঁধো আমার দখিন-হাতে
সূর্য যেমন ধরার করে আলোক-রাখী জড়ায় প্রাতে।।
তোমার আশিস আমার কাজে # সফল হবে বিশ্ব-মাঝে,
জ্বলবে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে।।
কর্ম করি যে হাত লয়ে কর্মবাঁধন তারে বাঁধে।
ফলের আশা শিকল হয়ে জড়িয়ে ধরে জটিল ফাঁদে।
তোমার রাখী বাঁধো আঁটি— সকল বাঁধন যাবে কাটি,
কর্ম তখন বীণার মতন বাজবে মধুর মূর্ছনাতে।
প্রেমপর্যায়-এ আরও পাই,
ভালবেসে, সখী, নিভৃতে যতনে
আমার নামটি লিখো— তোমার
মনের মন্দিরে।
আমার পরানে যে গান বাজিছে
তাহার তালটি শিখো— তোমার
চরণমঞ্জীরে।।
***
ধরিয়া রাখিয়ো সোহাগে আদরে
আমার মুখর পাখি— তোমার
প্রাসাদপ্রাঙ্গণে।
মনে ক’রে সখী, বাঁধিয়া রাখিয়ো
আমার হাতের রাখী— তোমার
কনককঙ্কণে।।
***
আমার লতার একটি মুকুল
ভুলিয়া তুলিয়া রেখো— তোমার
অলকবন্ধনে।
আমার স্মরণ-শুভ-সিন্দূরে
একটি বিন্দু এঁকো— তোমার
ললাটচন্দনে।
***
আমার মনের মোহের মাধুরী
মাখিয়া রাখিয়া দিয়ো— তোমার
অঙ্গসৌরভে।
আমার আকুল জীবনমরণ
টুটিয়া লুটিয়া নিয়ো— তোমার
অতুল গৌরবে।।
মহুয়া কাব্যগ্রন্থে পাই,
রাখীপূর্ণিমা
কাহারে পরাব রাখী যৌবনের রাখীপূর্ণিমায়,
হে মোর ভাগ্যের দেব। লগ্ন যেন বহে নাহি যায়।
মেঘে আজি আবিষ্ট অম্বর, ঘন বৃষ্টি-আচ্ছাদনে
অস্পষ্ট আলোর মন্ত্র আকাশ নিবিষ্ট হয়ে শোনে,
বুঝিতে পারে না ভালো। আমি ভাবিতেছি একা বসে
আমার বাঞ্ছিত কবে বাহিরিল প্রচ্ছন্ন প্রদোষে
চিহ্নহীন পথে। এসেছিল দ্বারের সম্মুখে মোর
ক্ষণতরে। তখনো রজনী মম হয় নাই ভোর,
হৃদয় অস্ফুট ছিল অর্ধ জাগরণে। ডাকে নি সে
নাম ধরে, দুয়ারে করে নি করাঘাত, গেছে মিশে
সমুদ্রতরঙ্গরবে তাহার অশ্বের হ্রেষাধ্বনি।
হে বীর অপরিচিত, শেষ হল আমার রজনী,
জানা তো হল না কোন্ দুঃসাধ্যের সাধন লাগিয়া
অস্ত্র তব উঠিল ঝঞ্ঝনি। আমি রহিনু জাগিয়া।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যভুবন যেন রাখীর সুতোয় বাঁধা। তবে এই রাখী কিন্তু বঙ্গজীবনে সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক নেতার কব্জি থেকে বগল পর্যন্ত নানারঙের ডিজাইনার রাখীতে সুশোভিত থাকে রাখীবন্ধনের দিনটিতে, কিন্তু ছাপোষা গেরস্ত মানুষের অনেকেরই হাতে রাখী থাকে না দিনের শেষে। এ এমন এক দৈবদ্রব্য যে পকেটে রেস্ত থাকলেও বাজার থেকে কিনে নিজে নিজে পরা যায় না। বেঁধে দেওয়ার জন্যে কাউকে না কাউকে লাগেই। তবে ওই যে কথায় আছে রাখে হরি মারে কে! একটু পাল্টিয়ে বলা যায়, ‘রাখী হরি, মারে কে’!