বেগম রোকেয়া-র সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্রর লেখা তেলেনাপোতা আবিষ্কারের মতো ঘটনা। নারী নবজাগরণের পথিকৃৎ সাহিত্যিক তথা নারীশিক্ষা- নারীস্বাধীনতার কাণ্ডারী বেগম রোকেয়াকে সমাহিত করা হয় গঙ্গার তীরবর্তী সোদপুরের পানিহাটি গ্রামে। এক সময় পানিহাটি ছিল নিভৃত গ্রাম, এখন সেখানে শহরের চিহ্ন। বেগম রোকেয়া কলকাতায় বসবাস করতেন। কিন্তু কেন তাঁকে সে সময়ে মূল শহর কলকাতা থেকে অনেক দূরে পানিহাটিতে সমাহিত করা হয়েছিল?
এ নিয়ে দুটি মত রয়েছে —
প্রথমত, সেখানে বেগম রোকেয়ার আত্মীয়-স্বজনের পারিবারিক কবরস্থান ছিল। স্যার আবদুল করিম গজনবী ছিলেন রোকেয়ার বড় বোনের বড় ছেলে। তিনিই সেখানে রোকেয়াকে সমাহিত করায় উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৯৭ সালের ৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর রোকেয়ার কবরে উন্মোচন করেন একটি স্মৃতিফলক।
তবে রোকেয়াকে সেখানে সমাহিত করার কারণ হিসেবে আরেকটি জোরালো মতও রয়েছে। ১৯৩২ সালে বেগম রোকেয়ার মৃত্যুর পর কলকাতার রক্ষণশীল মুসলমান সমাজের একটি অংশ তাকে কলকাতায় কবর দিতে আপত্তি জানায়। তাদের কাছে শিক্ষা ও জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়া এই মহিয়সী নারী ধর্মদ্রোহিণী ছাড়া কিছুই নয়। তাদের অভিযোগ, মুসলিম নারীদের তিনি পাপের পথে চলতে উৎসাহ দেন।কারণ যাই হোক, বেগম রোকেয়া আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে আছেন পানিহাটিতে।
তবে বিশ্বে কত বিস্ময়ের ঘটনাই না ঘটে। রোকেয়ার জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে পানিহাটিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য জমি খোঁজা হচ্ছিল। উদ্যোক্তারা স্থানীয় পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সহায়তা চাইলেন। পৌরসভা থেকে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল রোকেয়ার ওই আত্মীয়ের পারিবারিক সম্পত্তির একটি অংশ। তবে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিংবা পৌরসভা কেউই জানত না যে, এ এলাকাতেই রয়েছে নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার কবর। পশ্চিমবঙ্গের স্পিকার মনসুর হবিবুল্লাহ নব্বইয়ের দশকে উদ্যোগী হন রোকেয়ার কবরস্থানটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে। তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।সে সময়ে পানিহাটি পৌরসভার পুরনো নথিপত্র ঘেঁটে রোকেয়াকে সমাহিত করার স্থানটির সন্ধান মেলে।
বাংলা নবজাগরণ ও নারীজাগরণের ইতিহাসে বেগম রোকেয়া এক অনন্য নাম। নারীশিক্ষা, নারী-অধিকার এবং সমাজসংস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উপমহাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। অথচ জীবদ্দশায় অসামান্য অবদান রাখা এই মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যুর বহু বছর পর পর্যন্ত তাঁর সমাধিস্থল সাধারণ মানুষের কাছে কার্যত বিস্মৃত ছিল। পরবর্তীকালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক অমলেন্দু দে সেই হারিয়ে যাওয়া সমাধির অবস্থান শনাক্ত করেন। এই ঘটনাটি কেবল একটি সমাধির সন্ধান পাওয়ার ইতিহাস নয়; এটি ইতিহাসচর্চা, দলিল-অনুসন্ধান এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি সংরক্ষণের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ‘নারীর অধিকার’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখছিলেন। তাঁকে উত্তর কলকাতার সোদপুর অঞ্চলে সমাহিত করা হয়। কিন্তু সময়ের প্রবাহে তাঁর সমাধির অবস্থান মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে অনেকেই জানতেন না যে নারীজাগরণের এই পথিকৃৎ কোথায় শায়িত আছেন।
এমন পরিস্থিতিতে অধ্যাপক অমলেন্দু দে ইতিহাস গবেষকের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টি অনুসন্ধান শুরু করেন। একজন ইতিহাসবিদের কাজ কেবল অতীতের ঘটনা বর্ণনা করা নয়; বরং হারিয়ে যাওয়া তথ্য, স্থান ও স্মৃতিকে পুনরুদ্ধার করা। অমলেন্দু দে উপলব্ধি করেছিলেন যে, বেগম রোকেয়ার মতো একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সমাধি অজ্ঞাত অবস্থায় থাকা জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতির জন্য এক বড় ক্ষতি।

গবেষণার প্রথম ধাপে তিনি রোকেয়ার জীবন, মৃত্যুর সময়কার সংবাদ, সমসাময়িক স্মৃতিচারণ, বিভিন্ন সাময়িকপত্র এবং উপলব্ধ জীবনীগ্রন্থ পর্যালোচনা করেন। ইতিহাস গবেষণায় এ ধরনের প্রাথমিক ও গৌণ উৎস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর স্থান, জানাজা, সমাধিস্থল বা সংশ্লিষ্ট এলাকার উল্লেখ প্রায়ই সংবাদপত্র, ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা কিংবা প্রতিষ্ঠানের নথিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে। বিভিন্ন উৎসের তথ্য মিলিয়ে একটি সম্ভাব্য অনুসন্ধান-ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়।
এরপর তিনি কলকাতার উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে সোদপুর ও পানিহাটি অঞ্চলের পুরোনো নথি এবং স্থানীয় মানুষের স্মৃতিকে অনুসন্ধানের অংশ করেন। ইতিহাসবিদরা জানেন, সব তথ্য সরকারি নথিতে থাকে না; অনেক তথ্য প্রবীণ বাসিন্দাদের মৌখিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত থাকে। তাই স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকার, এলাকার পুরোনো প্রতিষ্ঠান এবং কবরস্থান-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হয়ে ওঠে।
এই অনুসন্ধানে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয় যে বেগম রোকেয়ার সমাধি সোদপুরের পানিহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে অবস্থিত। বহু বছর ধরে যথাযথ পরিচর্যা ও প্রচারের অভাবে এটি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে ছিল। অধ্যাপক অমলেন্দু দে বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে নিশ্চিত হন যে এটিই বেগম রোকেয়ার প্রকৃত সমাধিস্থল। তাঁর এই গবেষণার ফলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় আবার সামনে আসে।
এই আবিষ্কারকে কেবল একটি কবর শনাক্তকরণের ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর তাৎপর্য আরও গভীর। একটি জাতির ইতিহাস কেবল রাজনীতি বা যুদ্ধের ইতিহাস নয়; বরং তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সমাজসংস্কার এবং মানবিক মূল্যবোধের ধারকদের স্মৃতিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেগম রোকেয়ার সমাধি পুনরাবিষ্কারের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতিকে নতুনভাবে সংরক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
অমলেন্দু দে যে পদ্ধতিতে কাজ করেছিলেন, তা ইতিহাস গবেষণার একটি আদর্শ উদাহরণ। প্রথমত, তিনি লিখিত দলিল সংগ্রহ করেন। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন উৎসের তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধান চালান এবং স্থানীয় মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। সর্বশেষে তিনি সংগৃহীত তথ্যের ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করেন। এই ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার কারণেই তাঁর অনুসন্ধান গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক সময় ঐতিহাসিক স্থানের অস্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায় না; বরং মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়। তাই একজন গবেষকের দায়িত্ব কেবল নতুন তথ্য আবিষ্কার করা নয়, বিস্মৃত তথ্যকে পুনরুদ্ধার করা। অমলেন্দু দে সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছিলেন। তাঁর কাজ দেখিয়ে দেয় যে ইতিহাসচর্চা গ্রন্থাগারের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান, নথি বিশ্লেষণ এবং সামাজিক স্মৃতির সমন্বিত প্রয়াস।
সমাধিটি চিহ্নিত হওয়ার পর বেগম রোকেয়াকে নতুন করে স্মরণ করার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ মানুষ তাঁর সমাধিস্থলে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন। একই সঙ্গে তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে নতুন গবেষণারও আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। এই আবিষ্কার বেগম রোকেয়ার উত্তরাধিকার সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বেগম রোকেয়ার অবদান বিবেচনা করলে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, মুসলিম নারীদের শিক্ষার জন্য নিরলস সংগ্রাম করেন এবং ‘সুলতানার স্বপ্ন’, ‘অবরোধবাসিনী’, ‘মতিচূর’-এর মতো রচনার মাধ্যমে সমাজের কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কলম ধরেন। এমন একজন মহীয়সী নারীর সমাধি বিস্মৃত অবস্থায় থাকা ইতিহাসের জন্য দুঃখজনক ছিল। তাই তাঁর সমাধি পুনরায় চিহ্নিত হওয়া ছিল ইতিহাস ও সমাজ—উভয়ের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
অধ্যাপক অমলেন্দু দের এই অবদান ইতিহাস গবেষণার সামাজিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। ইতিহাসবিদ কেবল অতীতের বিশ্লেষক নন; তিনি সমাজের স্মৃতির রক্ষকও। তাঁর গবেষণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে সাহায্য করে। বেগম রোকেয়ার সমাধি পুনরাবিষ্কার সেই অর্থে একটি সাংস্কৃতিক পুনরুদ্ধারের কাজ।
বর্তমানে বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে আলোচনা হয়। প্রতি বছর রোকেয়া দিবস পালিত হয় এবং তাঁর আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হয়। এই স্মরণচর্চাকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে তাঁর সমাধিস্থলের সঠিক পরিচয় প্রতিষ্ঠা, যার কৃতিত্ব অধ্যাপক অমলেন্দু দের গবেষণাকে দেওয়া হয়।
সবশেষে বলা যায়, অধ্যাপক অমলেন্দু দের এই অনুসন্ধান প্রমাণ করে যে ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া সত্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যদি গবেষক ধৈর্য, নিষ্ঠা এবং তথ্যনির্ভর পদ্ধতি অনুসরণ করেন। বেগম রোকেয়ার সমাধির সন্ধান তাঁর গবেষণাজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণে ইতিহাসচর্চার গুরুত্ব অপরিসীম এবং মহান ব্যক্তিদের স্মৃতি রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব।
তবে সম্প্রতি রোকেয়ার সমাধি নাকি রোকেয়ার জন্মস্থল বাংলাদেশের রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার দাবি উঠেছে সেখান থেকে।