তসলিমা নাসরিনের কলকাতা ফেরার খবর যখন সাংস্কৃতিক মহলে আনন্দের রেশ বয়ে এনেছে পাশাপাশি নির্বাসনের বিতর্কটাও চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
এমতাবস্থায় তসলিমার বহু ছবি আমার ক্যামেরায় ধরে রাখার যে মুহুর্তগুলি তার প্রেক্ষাপটের গল্পগুলো মনের মধ্যে ফ্ল্যাশব্যাকের মতই আসা যাওয়া করছে। সেই নস্টালজিয়ারই একটা ছবির স্মৃতিকথায় একটু ফিরে গিয়ে দেখি একটি মেয়ের জীবনের পথ দ্বিখণ্ডিত কি করে হয়ে গেল?
আসলে শিকড় উপড়ে যাওয়া মানুষের শিকড়ের টান অনুভব করার মন নিয়ে রাজনীতি করা যায় কিন্তু শাসনকার্য পরিচালনা করা একপ্রকার অসম্ভব। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যেরও বোধহয় তাই হয়েছিলো….
২০০৩ সালের ২৮ শে নভেম্বর তসলিমার আত্মজীবনীর তৃতীয় খণ্ড দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় পশ্চিমবঙ্গে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বুদ্ধিজীবীদের সাথে পরামর্শ করে বইটি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এবং সেই সময়ের বাংলার প্রথম সারির পঁচিশ জন সাহিত্যিক তসলিমার বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবীপত্রে সই করেছিলেন। আজ আমি তাদের নাম বলতে চাইনা কিন্তু তাদের এহেন কীর্তির কথা শুনে আমি রীতিমত অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও সরকারিভাবে বলা হয়েছিলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এটা করার প্রয়োজন ছিলো।
এখানে বলে রাখি, তখনও কিন্তু তসলিমা পাকাপাকি কলকাতায় থাকতো না। মাঝেমধ্যে আসা যাওয়া করতো। একমাত্র বইমেলার সময় টানা থেকে যেত। সেসময় শিল্পী সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক জগতের নামিদামি ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার একটা সাবলীল সম্পর্ক ছিলো। স্বাভাবিকভাবেই তসলিমাকেও আনন্দবাজার সমাদরের সঙ্গেই গ্রহণ করেছিলো। নাহলে কি দু-বার আনন্দ পুরস্কার পায়? এবং সেই সূত্রেই আমার ওর ছবি তোলার নানান পরিসর তৈরি হয়।
পোস্টের ছবিটিও সেরকমই একটি বিশেষ দিনের মুহূর্ত…. আপনারা হয়তো অনেকেই জানেন না তসলিমার বই দ্বিখণ্ডিতের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়াটি শুরু করেছিলো এপিডিআর। মূলত সুজাত ভদ্র বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের এই কেসটি হাইকোর্টে উকিল হিসাবে লড়েছিলেন জয়মাল্য বাগচী। হ্যাঁ যিনি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। এই ছবিটিতে তসলিমা, এপিডিআর এর সুজাত ভদ্র ও দ্বিখন্ডিত এর প্রকাশনা সংস্থা পিপলস বুক সোসাইটি এর প্রশান্ত রায়; জয়মাল্য বাগচীর চেম্বারে আলোচনারত এই ছবিটি আমারই তোলা।
আমি সেসময় বইটির ঠিক কি বিষয়ে এত বিতর্ক সেসব নিয়ে ওত মাথাব্যথা করিনি। আমার মূল লক্ষ্য ছিলো ছবি। সেটা কিভাবে করবো তাতেই আমার দিন কাটতো। এমনকি আমি দ্বিখন্ডিত পড়েও দেখিনি আজ অবধি। এই লেখা লেখবার আগে আমার কিছু তথ্যের প্রয়োজনে সুজাত ভদ্রকে ফোন করেছিলাম…. সুজাতদার থেকেই জানলাম দ্বিখন্ডিত এর একটি বা দুটি পাতায় হজরত মুহাম্মদ সম্মন্ধে কিছু কথাতেই মূল আপত্তি উঠেছিলো। সেখান থেকেই যাবতীয় বিতর্কের সূত্রপাত। পরবর্তীতে নাকি বইয়ের ওই পাতাগুলো বাদ দিয়েই দ্বিখন্ডিত এর সংস্করণগুলো প্রকাশ হয়েছে। তবে সুজাত ভদ্র ও তসলিমার যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত “নিষিদ্ধ মত দ্বিখন্ডিত পথ” বইটিতে যাবতীয় বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে।
মজার ব্যাপার ২০০৩ সালে দ্বিখণ্ডিত নিষিদ্ধ হওয়ার পরও তসলিমা কিন্তু ভাবেনি যে কলকাতার দরজাও একদিন তারজন্য বন্ধ হয়ে যাবে!! ভাবলে ২০০৪ সালে সে ঘরভাড়া নিয়ে এখানে থাকতে শুরু করতো না। সবথেকে বড়কথা ২০০৫ সালে সুপ্রিম কোর্টও দ্বিখন্ডিত-এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবার নির্দেশ জারি করে।
২০০৪-২০০৭ অবধি তসলিমা পুলিশি প্রহরা নিয়েও যে সে কলকাতায় থাকতে পারছে এটাই তার ভরসা ছিলো। এমনকি কলকাতায় ওর বন্ধু স্বাতী মিত্র, স্বপ্না রায়, উশ্রী মজুমদার, শর্মিলা সেনগুপ্ত, শর্মিষ্ঠা বাগ এই পাঁচজন রাষ্ট্রপতির কাছে তসলিমার হয়ে আবেদন করে ওকে রাজনৈতিক আশ্রয়দান করা হোক।
তসলিমা বিশ্বাস করতো কলকাতা তাকে বুঝবে। যেহেতু বাঙালি সংস্কৃতিবান মানুষ। উনিশ শতকের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের সহিষ্ণুতা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির ভিতরে ধর্মীয় গোঁড়ামি নয় বরং মানবিক উদারতার বীজ বুনে দিয়েছে এই ধারণাই হয়তো ছিলো। কিন্তু বইটির নিষেধাজ্ঞার উঠে যাওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শেষ হবার কিছুদিনের মধ্যেই খোদ লেখককেই হঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়।
২০০৭ সালে সম্ভবত ২১শে নভেম্বর কলকাতা উত্তপ্ত হয়ে উঠলো দাঙ্গায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যে কলকাতার ইতিহাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আবহে নির্বাচন, বাবরী মসজিদ ধ্বংসের পরবর্তী সময়ে দাঙ্গা সামাল দিতে সেনা নেমেছিলো। আর নামলো তসলিমার জন্য।
ক্রমাগত বাড়তে থাকা চাপের মুখে তসলিমা কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হলো। প্রথমেই ও দেশ ছেড়ে যায়নি। রাজস্থানে শেল্টার দেওয়া হয়। কিন্তু ওখানেও আইন শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার আশঙ্কায় কিছুদিনের মধ্যেই ওকে দেশ ছাড়তে হয়।
তসলিমা কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও ভাবেনি যে আর কলকাতায় ফিরতে পারবে না। ওর মনে হয়েছিলো এই ক্ষোভ বিক্ষোভ সাময়িক। এটা কমে গেলে আবার চলে আসবে। যে কারণে দীর্ঘ সাত আট মাস কলকাতার বাড়িটির ভাড়া অবধি দিত। অবশ্য পুলিশ থেকেও নাকি সেরকমই আশ্বাস দেওয়া হয়েছিলো যে এই ঝামেলা সাময়িক।
কিন্তু না, কলকাতায় তসলিমার আর ফেরা হয়নি। তবে ও হালও ছাড়েনি। বারবার ভারত সরকারকে অনুরোধ করতো ওকে আসতে দেওয়া হোক। এবং কয়েকবছর পর কেন্দ্রের বিদেশমন্ত্রী শিবরাজ সিং পাটিলের সময় দিল্লীতে থাকার অনুমতি মিলেছিলো। সেই থেকে দু-বছর অন্তর অন্তর রিনিউ ভিসায় ও দিল্লীতেই থাকতে শুরু করে। তবে কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর এটা একবছরের সময়কাল করা হয়েছে।
আমার সঙ্গে তসলিমার বন্ধুত্ব ও যোগাযোগ এখনও আগের মতই আছে। দিল্লী গেলেই ওর সঙ্গে আড্ডা ভালোই জমে। এবং আজ অবধি এমন একবারও হয়নি যেবার ও বলেনি, “অশোক আমি কেন কলকাতায় থাকতে পারবো না ? দেখো না চেষ্টা করে….” আমি প্রতিবারই নীরব থাকতাম।
শেষপর্যন্ত তসলিমার প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে। ১লা আগস্ট দীর্ঘ কুড়ি বছরের নির্বাসন কাটিয়ে কলকাতা এসেছে তসলিমা। আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে।
আজকের নিরিখে দেখলে তসলিমার প্রতি এই নির্বাসনের ফতোয়া কি খুব প্রাসঙ্গিক মনে হয়? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি ধর্ম সে যে যেটাই পালন করুক সেটা অতো ঠুনকো নয় যে কে কি লিখলো বা বললো তাতে অসম্মানিত হবে। সব ধর্মমতের মানুষদের সহিষ্ণুতাই তার ধর্মকে আরও উঁচুতে উঠতে সাহায্য করে।
এই প্রসঙ্গে মকবুল ফিদা হুসেনের কথা না বললেই নয়। ওনার মত শিল্পীকেও হিন্দু দেবীমূর্তি নিজস্ব কল্পনায় আঁকার জন্যই মাথায় নিষেধের ফতোয়া নিয়ে দেশ ছাড়তে হয়েছিলো। নিজের দেশে মৃত্যুর ইচ্ছাও তাঁর পূরণ হয়নি।
আমার মনে হয় শিল্পী সাহিত্যিকদের সৃষ্টির পিছনে তাদের একাত্ম ভাবনার যে জগতটি রয়েছে তাদের সেখানেই সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। সেগুলো সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা চাওয়াটাই একপ্রকার ছেলেমানুষি। কারণ তারা আপন কল্পনায় ভেসে কি লিখবে কি আঁকবে সেটা তাদের ব্যাপার। কিন্তু সমাজের সবার কাছে সেটা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। তারজন্য সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা বা মাথায় মৃত্যু ফতোয়া জারি করলে সমাজে অসহিষ্ণুতাই বাড়বে।
আমাদের দেশ ভারতবর্ষ যুগ যুগ ধরে সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের পীঠস্থান। আর্য অনার্য শক হুন দল পাঠান মোঘল এক দেশে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকার এমন আর দেশ কোথায়? এই বৈশিষ্ট্যই দলাই লামাকে এখানে আশ্রয় দিয়েছে। শেখ হাসিনাকেও দিয়েছে।
তাই তসলিমা যখন প্রশ্ন করে, “ভারত তো কত মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে! কত নির্যাতিত, নিপীড়িত, নির্বাসিতের ভরসা ভারত। ভারতের একটি ভাষা আমার ভাষা! আমি কেন সেখানে থাকতে পারবো না? আমার অপরাধ কি?”….তখন আমরা তাকে ভরসা জোগাতে পারবো না কেন?
তসলিমা কলকাতা এসেছে। যাদের এখনও মনে দ্বিধা কাজ করছে তারা ওকে লেখক না ভেবে একজন মানুষ হিসাবেই বিবেচনা করে গ্রহণ করুন। আমাদের কি পরিবার, বন্ধু, প্রিয়জনদের সঙ্গে মনোমালিন্য ঝগড়া ঝামেলা হয়না? আমরা কি তাদের ত্যাগ করে দিই? তসলিমা শুধু নয় বিশ্বের সব নিষিদ্ধের ফতোয়া উঠে যাক। মানবতার ভাষায় বিশ্বের সকল দেশের মানুষ শান্তির পথ অনুসরণ করুক…. একটাই তো জীবন আসুন না হাতে হাত রেখে কাটিয়ে দিই!
একজন লেখকের নির্বাসন কখনোই শুধু একজন মানুষের দেশছাড়া হওয়ার কাহিনি নয়; তার সঙ্গে নির্বাসিত হয় ভাষার স্মৃতি, সংস্কৃতির শিকড়, পরিচয়ের গভীর বোধ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
অশোক মজুমদারের লেখায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সময়ের ইতিহাস একসঙ্গে মিশে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে—কোনো মত বা লেখার সঙ্গে দ্বিমত থাকলেও, তার জবাব কি নির্বাসন হতে পারে? সাহিত্য বিতর্ক সৃষ্টি করবে, প্রশ্ন তুলবে, কখনও অস্বস্তিও তৈরি করবে। কিন্তু সেই অস্বস্তির উত্তর হওয়া উচিত যুক্তি, আলোচনা ও পাঠ—নিষেধাজ্ঞা বা বর্জন নয়। লেখাটি পাঠককে সহিষ্ণুতা, মানবিকতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। এমন একটি গভীর, প্রাসঙ্গিক ও মননশীল লেখা উপহার দেওয়ার জন্য লেখককে আন্তরিক অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা।