Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সংগ্রাম, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার জীবনকাব্য — সত্যজিৎ নাথের উপন্যাস “শেষের বেলা” : যশোবন্ত রায় যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবিতার আয়ুষ্কাল — নজরুলের বিদ্রোহী : রফিকুর রশীদ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৩৮ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬

[২৩ কিস্তির টিকার ধারাবাহিকতা চলছে]

টিকা ২

(নম্বর—৮) — “দেওয়ানি ভূমির বন্দোবস্তে হ্রাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ, ১১৬৯ থেকে ১১৭২ অব্দ (বাংলা) পর্যন্ত, উভয় বছর অন্তর্ভুক্ত; অথবা ১৭৬২ সালের এপ্রিল থেকে ১৭৯৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত, উভয় বছর অন্তর্ভুক্ত।.”

কাসিম আলি খানের (মীর কাসিম) বন্দোবস্ত, ১১৬৯ বঙ্গাব্দ (১৭৬২-৬৩ খ্রি.) … ২,৪১,১৮,৯১২ টাকা নন্দকুমারের বন্দোবস্ত, ১১৭০ বঙ্গাব্দ (১৭৬৩-৬৪ খ্রি.) … ১,৭৭,০৪,৭৬৬ টাকা; যোগ: নজরানা-মুকরি ও পৃথকভাবে সংগৃহীত খাত … ৫,৬৪,৫৭৫ টাকা; বিয়োগ: রাজস্ব হ্রাস (বিভিন্ন জেলায় কর ছাড়) … ১৩,৪৯৭ টাকা; যোগ: আহুক (চুন/ভবন কর) বৃদ্ধি … ৬,৪০৯ টাকা; মোট বন্দোবস্ত (কর ছাড় ও বৃদ্ধি-সহ) … ১,৮২,৬২,২৫৪ টাকা; যোগ: শার্ফ সিক্কা (মুদ্রা বাট্টা) ও দিনাজপুরে বৃদ্ধি … ৮,৭২,৭৮১ টাকা; মোট (সকল সংযোজন-সহ) … ১,৯১,৩৫,০৩৬ টাকা

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ-৮ নং পরিশিষ্ট ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা ১৭৬২-৬৫ সালের (১১৬৯-১১৭২ বঙ্গাব্দ) বাংলার দেওয়ানি জমির রাজস্ব বন্দোবস্তের হ্রাসের ধারাবাহিক চিত্র আমাদের সামনে তুলে করে। এই তালিকা আদতে ব্রিটিশ-পূর্ব ও ব্রিটিশ—আমলান্তরকালীন রাজস্ব নীতির পরিবর্তন, কৃষক-শোষণের কাঠামো এবং ফিফথ রিপোর্টের গ্র্যান্ট-শোর বিতর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি।

এখানে আমি অনুবাদক আমলান্তরকালীন শব্দ ব্যবহার করেছি (আমল-শাসন, প্রশাসন বা রাজত্বকাল; আর অন্তর মধ্যবর্তী, পরিবর্তনের সময়)। আমলান্তরকালীন’ বলতে বোঝাচ্ছি দুই শাসনব্যবস্থার মধ্যে পরিবর্তনের সময়কাল —পুরনো শাসন শেষ হয়ে নতুন শাসন শুরু হচ্ছে, কিন্তু পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। বাংলার প্রেক্ষিতে, এটি মুঘল/নবাবি শাসন থেকে ব্রিটিশ শাসনে রূপান্তরের সময়কাল (প্রায় ১৭৫৭-১৭৭২)। একে ৪টে পর্বে ভাগ করেছি — ১৭৫৭-১৭৬৫ পলাশি থেকে দেওয়ানি — ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামমাত্র নবাবের অধীনে থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিতে শুরু করে। এই সময়ে রাজস্ব ব্যবস্থা ছিল দ্বৈত — একদিকে নবাবের নাম, অন্যদিকে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ। ১৭৬৫ দেওয়ানি — কোম্পানি সরাসরি রাজস্ব আদায়ের অধিকার পায়। এই সময় থেকেই ‘আমলান্তরকালীন’ পর্যায়ের সূচনা হয় — কারণ কোম্পানি এখন পুরোপুরি শাসক না হলেও রাজস্বের ওপর তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৬৫-১৭৭২ প্রথম ব্রিটিশ রাজস্ব সংস্কার — এই সময়ে কোম্পানি মুঘল/নবাবি রাজস্ব কাঠামোকে ভেঙে নতুন পদ্ধতি চালু করতে শুরু করে — যেমন হস্তবুদ (ভূমি জরিপ), আবওয়াব (অতিরিক্ত কর), ঠিকাদারি প্রথা ইত্যাদি। কিন্তু পুরনো কাঠামো সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি — তাই এটি ছিল ‘আমলান্তরকালীন’ পর্যায়। ১৭৭২ ওয়ারেন হেস্টিংসের সংস্কার — হেস্টিংস সরাসরি কোম্পানির মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি চালু করেন। এই সময় থেকেই ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় — অর্থাৎ ‘আমলান্তরকালীন’ পর্যায়ের সমাপ্তি। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে এই ‘আমলান্তরকালীন’ রাজস্ব নীতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যেতে পারে — দ্বৈত কাঠামো — মুঘল/নবাবি ও ব্রিটিশ — দুই কাঠামোর মিশ্রণ। যেমন — ‘তুমার জুমা’ (মুঘল প্রথা) ও ‘আবওয়াব’ (ব্রিটিশ—প্রবর্তিত কর); পরীক্ষা—নিরীক্ষা — কোম্পানি বিভিন্ন পদ্ধতি পরীক্ষা করে — হস্তবুদ, ঠিকাদারি প্রথা, সরাসরি রাজস্ব আদায় — কোনটি বেশি কার্যকর; কৃষক—শোষণের নতুন রূপ — পুরনো করের সঙ্গে নতুন কর যোগ হয় — যেমন শার্ফ সিক্কা, নজরানা — মুকরি, কুচ্ছা বলান্নি — যা কৃষকদের ওপর চাপ বাড়াল; জমিদারি ব্যবস্থার পরিবর্তন — জমিদাররা কোম্পানির এজেন্টে পরিণত হয়, যা পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তি তৈরি করে।

৫-৮ নম্বর পরিশিষ্ট ‘আমলান্তরকালীন’ রাজস্ব নীতির জটিলতা ও পরিবর্তনের ছবি তুলে ধরে — মীর কাসিমের বন্দোবস্ত (১৭৬২-৬৩) — পুরনো মুঘল কাঠামোর চরম রূপ; নন্দকুমারের বন্দোবস্ত (১৭৬৩-৬৪) — পরিবর্তনের সূচনা; মুহম্মদ রেজা খানের বন্দোবস্ত (১৭৬৫-৬৬) — নতুন ব্রিটিশ কাঠামোর প্রথম রূপ। এই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখি কীভাবে পুরনো কৃষি-ভিত্তিক রাজস্ব কাঠামো ভেঙে নতুন পদ্ধতিগত শোষণ-কাঠামো তৈরি হয় — যা পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়।

ফিরি টিকা বিশ্লেষণে। মূল পর্যবেক্ষণ :

১. মীর কাসিমের বন্দোবস্ত (১৭৬২-৬৩): সর্বোচ্চ রাজস্ব বন্দোবস্ত — ২,৪১,১৮,৯১২ টাকা। এই বিপুল বন্দোবস্ত প্রমাণ করে যে কোম্পানির চাপের ফল হিশেবে মীর কাসিম রাজস্ব বৃদ্ধির কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু আদায়ের পরিমাণ ছিল অনেক কম, যা কৃষকদের ওপর চরম শোষণের ইঙ্গিত দেয়।

২. নন্দকুমারের বন্দোবস্ত (১৭৬৩-৬৪): রাজস্ব বন্দোবস্ত কমে ১,৭৭,০৪,৭৬৬ টাকায় নেমে আসে — প্রায় ৬৪ লক্ষ টাকা কম। কমার কারণ: মীর কাসিমের পতন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা; কৃষক-বিদ্রোহ ও রাজস্ব আদায়ের জটিলতা; কোম্পানির হস্তক্ষেপ ও প্রশাসনিক পরিবর্তন।

৩. বিভিন্ন সংযোজন ও বাদ : নজরানা—মুকরি, আহুক বৃদ্ধি, শার্ফ সিক্কা, দিনাজপুরে বৃদ্ধি — এই সব সংযোজন ও কর্তনের পর মোট বন্দোবস্ত দাঁড়ায় ১,৯১,৩৫,০৩৬ টাকায়। এই জটিল হিসাব প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ—আমলান্তরকালীন রাজস্ব কাঠামো ক্রমশ জটিল ও বহুস্তরীয় হয়ে উঠছিল।

৪. নিট হ্রাস: মীর কাসিমের বন্দোবস্ত (২,৪১,১৮,৯১২) ও মুহম্মদ রেজা খানের বন্দোবস্তের (১,৯১,৩৫,০৩৬) মধ্যে পার্থক্য — ৫৮,৪৯,৫৬৯ টাকা। এই বিপুল হ্রাস (প্রায় ২৪%) বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার পতন ও কৃষক-শোষণের কাঠামোর পরিবর্তন নির্দেশ করে (টিকা ৩)।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য — এই সারণী ফিফথ রিপোর্টের জেমস গ্র্যান্ট ও জন শোরের বিতর্কের একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার: গ্র্যান্টের বক্তব্য তিনি এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে দেখাতে চান ব্রিটিশ শাসনে রাজস্ব বন্দোবস্ত ধীরে ধীরে ‘বাস্তবসম্মত’ হয়েছে। মীর কাসিমের অতিরিক্ত বন্দোবস্ত অযৌক্তিক, এবং ব্রিটিশ-আমলান্তরকালীন হ্রাস ছিল ‘সংস্কার’ ও ‘জনস্বার্থ’-এর পরিচায়ক। শোর গ্র্যান্টের বক্তব্য বাতিল করে বলেন এই ‘হ্রাস’ আসলে কৃষক—শোষণের নতুন রূপ। বরং মীর কাসিমের পতনের পরও রাজস্ব আদায়ের হার কমেনি, বরং কোম্পানি নতুন কর (শার্ফ সিক্কা, নজরানা-মুকরি) ও পদ্ধতি (হস্তবুদ, আবওয়াব) চালু করে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রেখেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে ১৭৭০-এর মন্বন্তরের পরও রাজস্ব আদায়ের হার বাড়ানো হয়েছিল।

টিকা ৩

টিকা ২-এর মূল পর্যবেক্ষণের ৪ নম্বর পয়েন্টে কেন বলছি ‘বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার পতন ও কৃষক—শোষণের কাঠামোর পরিবর্তন নির্দেশ করে?’ আমি আমি ‘পতন’ ও ‘পরিবর্তন’—এই দুটি শব্দের অর্থ ও প্রেক্ষাপট আলাদাভাবে ব্যাখ্যা করছি।

১. ‘রাজস্ব ব্যবস্থার পতন’ বলতে কী বোঝাচ্ছি? পতন বলতে আমি এখানে কেন্দ্রীভূত ও সুসংহত রাজস্ব কাঠামোর ভাঙন বোঝাচ্ছি, যে কাঠামো মুঘল আমলে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। ১৭৬২-৬৫ সালের মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি:

ক। মীর কাসিমের আমলে (১৭৬২-৬৩ রাজস্ব বন্দোবস্ত ছিল ২,৪১,১৮,৯১২ টাকা; ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ। কিন্তু আদায় ছিল মাত্র ৬৪,৫৬,১৯৮ টাকা, অর্থাৎ মাত্র ২৬.৮% আদায় হয়েছিল। এই বিপুল আদায়-ব্যবধান (১,৭৬,৬২,৭১৩ টাকা উদ্বৃত্ত) প্রমাণ করে রাজস্ব কাঠামো কার্যকর ছিল না — ‘কাগুজে রাজস্ব’ মাত্র, যার বাস্তব ভিত্তি ছিল না।

খ। নন্দকুমারের আমলে (১৭৬৩-৬৪) রাজস্ব বন্দোবস্ত কমে ১,৭৭,০৪,৭৬৬ টাকায় নেমে আসে, কিন্তু আদায় বেড়ে ৭৬,১৮,৪০৭ টাকায় দাঁড়ায় (৪৩% আদায়)। তবুও উদ্বৃত্ত ১,০০,৮৬,৩৫৮ টাকা — প্রমাণ করে যে রাজস্ব কাঠামো এখনও অকার্যকর।

গ। মুহম্মদ রেজা খানের আমলে (১৭৬৫-৬৬) রাজস্ব বন্দোবস্ত আরও কমে ১,৬০,২৯,০১১ টাকায় নেমে আসে, কিন্তু আদায় বেড়ে ১,৪৭,০৪,৮৭৫ টাকায় দাঁড়ায় (৯১.৭% আদায়)। উদ্বৃত্ত কমে ১৩,২৪,১৩৫ টাকায় দাঁড়ায়। এই ধারাবাহিকতা দেখায় ১৭৬২-৬৫ সালের মধ্যে রাজস্ব কাঠামো ভেঙে পড়েছিল — রাজস্ব বন্দোবস্ত কমেছে, কিন্তু আদায়ের হার বাড়িয়েই কোম্পানি তার রাজস্ব নিশ্চিত করেছে। এটি ‘পতন’ কারণ মুঘল আমলের তুলনামূলক স্থিতিশীল কাঠামো ভেঙে গিয়ে একটি নতুন, আরও পদ্ধতিগত শোষণ-কাঠামো তৈরি হয়েছে।

২. ‘কৃষক-শোষণের কাঠামোর পরিবর্তন’ বলতে কী বোঝাচ্ছি? পরিবর্তন বলতে আমি এখানে শোষণের পদ্ধতি ও স্তরের পরিবর্তন বোঝাচ্ছি, যা মুঘল আমলের তুলনায় আরও জটিল ও বহুস্তরীয় হয়ে উঠেছিল। এই পরিবর্তনের প্রধান উপাদানগুলো ছিল

ক। আবওয়াব বা অতিরিক্ত করের বিস্তার — মুঘল আমলে আবওয়াব ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত, কিন্তু ব্রিটিশ—আমলান্তরকালে তা বহু স্তরে বিস্তৃত হয় — নজরানা-মুকরি, শার্ফ সিক্কা, চৌত, ফিলখানা, ফৌজদারি আবওয়াব, আহুক, কিস্ত গোর, জু মাথাউত — এই সব কর কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

খ। হস্তবুদ ও জমিদারি ব্যবস্থার পরিবর্তন — ব্রিটিশরা হস্তবুদ (ভূমি জরিপ) ও জমিদারি ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। জমিদাররা এখন কোম্পানির এজেন্টে পরিণত হয়; তারা কৃষকদের থেকে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পায়। এই পরিবর্তন কৃষক—শোষণকে আরও পদ্ধতিগত করে তোলে।

গ। ঠিকাদারি প্রথার বিস্তার — রামনাথ বাড়ৈ বা আব্দুল আলী খানের মতো ঠিকাদারদের দিয়ে রাজস্ব আদায় — এই প্রথা কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ায়, কারণ ঠিকাদাররা নিজেদের লাভের জন্য বেশি রাজস্ব আদায় করতে চাইত।

ঘ। শার্ফ সিক্কা ও মুদ্রা বাট্টা — পুরানো আর নতুন মুদ্রার বিনিময়ে অতিরিক্ত কর — যা কৃষকদের আর্থিক লেনদেনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছিল।

ঙ। জমিদারি নিলাম আর জমি পুনরুদ্ধার — কুচ্ছা বলান্নি, গুইরে বলান্নি — এই করগুলো জমিদারি দখল বাড়ানোর কৌশল, যা কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদের হুমকি তৈরি করে।

৩. ‘পতন’ ও ‘পরিবর্তন’—এর মধ্যে সম্পর্ক — মীর কাসিমের রাজস্ব কাঠামোর পতন ঘটে, কিন্তু তার স্থানে ব্রিটিশরা একটি নতুন, আরও জটিল ও পদ্ধতিগত শোষণ—কাঠামো তৈরি করে। এই নতুন কাঠামোর বৈশিষ্ট্য — বহুস্তরীয় কর ব্যবস্থা: আবওয়াব, শার্ফ, হস্তবুদ, ঠিকাদারি প্রথা — সব মিলিয়ে কৃষকদের ওপর চাপ আরও বাড়ে; জমিদারি ব্যবস্থার পুনর্গঠন: জমিদাররা কোম্পানির এজেন্টে পরিণত হয়, যা কৃষক—শোষণকে আরও পদ্ধতিগত করে; আইনি কাঠামো — ব্রিটিশরা আইন ও প্রশাসনিক পদ্ধতির মাধ্যমে এই শোষণকে ‘আইনি’ ও ‘সংস্কার’—এর পোশাক দেয় — যা ফিফথ রিপোর্টের মতো দলিলে প্রতিফলিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে কৃষক—শোষণের কাঠামো আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়।

মীর কাসিমের রাজস্ব কাঠামো ‘পতন’ ঘটেছিল কারণ তা কার্যকর ছিল না — বিপুল বন্দোবস্ত, কিন্তু অত্যন্ত কম আদায়। ব্রিটিশ-আমলান্তরকালীন কাঠামো ‘পরিবর্তন’ ঘটেছিল কারণ তা আরও জটিল, পদ্ধতিগত ও কার্যকর ছিল — কিন্তু কৃষকদের ওপর চাপ বাড়িয়েই তা সম্ভব হয়েছিল। এই পরিবর্তনই কৃষক-শোষণের নতুন, আরও দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি করে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব — এই সারণী প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কৃষক—শোষণকে আরও পদ্ধতিগত ও কার্যকর করে তুলেছিল। মীর কাসিমের পতনের পরও কোম্পানি নতুন কর ও পদ্ধতি চালু করে রাজস্ব আদায় অব্যাহত রাখে, যা কৃষকদের ওপর চাপ কমানোর পরিবর্তে শোষণ—কাঠামোকে আরও সুসংহত করে। এই প্রক্রিয়াই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ভিত্তি তৈরি করে, যা বাংলার কৃষক সমাজকে চিরতরে বদলে দেয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তি নির্মাণ করে।

উপনিবেশের পতন হোক। লড়াই দীর্ঘজীবী হোক।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

 

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন