অনেক অনেক দিন বাদে আপনি আসছেন কলকাতায়। শুনে ভালো লাগছে। কলকাতাও আপনার দ্বিতীয় জন্মভূমি। সে কথা আপনি নানাভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। আর সেই কলকাতা থেকে ‘বিতাড়িত’ হওয়ার বেদনা ও ক্ষোভ আপনার ছিল। খুব অস্বাভাবিক নয়। ফেসবুক পোস্টে আপনি লিখেছেন সেসব। আপনি লিখেছেন, ‘বামফ্রন্ট সরকার আমাকে কলকাতা থেকে তাড়িয়েছিল। পরবর্তী তৃণমূল সরকারও আমাকে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকতে দেয়নি।’
বাক ব্যবহারে আপনি সর্বদা অকপট (খুল্লামখুল্লা বলা যেত)। তাই অবলীলাক্রমে ‘তাড়িয়েছিল’, ‘ঢুকতে দেয় নি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে পেরেছেন। শত্রুই শত্রুকে তাড়াতে পারে, ঢুকতে না দিতে পারে। কিন্তু যে দুই সরকারের কথা বললেন, তারা আপনার শত্রু তো নন। আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে পশ্চিমবঙ্গ একটি অঙ্গ রাজ্য। এখানে একটি ভিন্ন রাষ্ট্রের ‘বিতাড়িত’ মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার সার্বিক সিদ্ধান্ত রাজ্য নিতে পারে না। আপনার জন্য যদি আইন-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হত, তাহলে তার দায় রাজ্যকেই নিতে হত। তা ছাড়া রাজনীতিরও ভূমিকা আছে। ক্ষমতা লাভ যদি রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়, তাহলে ভোটব্যাঙ্কের কথাও মনে রাখতে হয়। আপনি পঃবঙ্গে থাকলে মুসলমান ভোটব্যাঙ্কে ধরতে পারে ফাটল, সে দুশ্চিন্তা ছিল আগের দুই সরকারের মাথায়।
তবে হ্যাঁ, মানবিকতারও একটা দায় আছে। সেই মানবিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে দুই সরকার অপরাধী। একথা স্বীকার করতে হবে। ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলিকে অনেক সময়ে ‘অ-মানবিক’ কাজ করতে হয়। আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় নি আগের দুই সরকার ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে আপনাকে যেমন আশ্রয় দেয় নি, তেমনি ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থেই বর্তমান সরকার আপনার আগমনের উপর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করছেন না !
আপনার পোস্টে আপনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন যে আপনাকে পঃবঙ্গে বিজেপি বা পঃবঙ্গ সরকার নিয়ে যাচ্ছে না। ঠিক কথা। আপনি লিখেছেন, ‘আমাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেকুলার মিশন নামে একটি সংগঠন। সংগঠনটির কর্ণধার একজন প্রগতিশীল মুসলমান — ওসমান গনি মল্লিক।’
সেকুলার মিশনের কার্যকলাপের সন্ধান করতে চেষ্টা করেছি। পাই নি। সন্ধান পাই নি ওসমান গনির প্রগতিশীল কার্যকলাপেরও। আমি সন্ধান পাই নি বলে যে তা নেই, সে কথা বলছি না। তবে রাজ্যের অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল নিয়ে যে কমিটি হয়েছে সেখানে শত্রুঘ্ন সিংহ, রত্না ভট্টাচার্ষ, গোপালচন্দ্র মিশ্র, নির্মাল্য ভট্টাচার্যের সঙ্গে আছেন ওসমান গনি মল্লিক নামে হাইকোর্টের এক আইনজীবী। সাধারণভাবে এ কথা সকলে জানেন যে সরকারি কোন কমিটিতে সরকারের বিরুদ্ধভাজন কেউ থাকেন না। আবার সেই ওসমান গনি মল্লিক ই টিভি ভারত-বাংলা টিমকে বলেছেন, ‘আমরা যখন ওঁর (তসলিমা নাসরিনের ) সম্মতি পাই তখন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ’ এই পর্যন্ত ঠিক আছে। আপনিও আপনার পোস্টে লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচিত সরকার শুধু আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। আমি যে রাজ্যেই যাই, সেখানে যে রাজনৈতিক দলেরই সরকার থাকুক না কেন, সেই সরকারই আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এটাই স্বাভাবিক প্রশাসনের দায়িত্ব।’
কিন্তু ওসমান গনি মল্লিক আরও কিছু বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, অনুষ্ঠানে তিনিও উপস্থিত থাকবেন।’
সরকারি কমিটিতে থাকা ওসমান গনি মল্লিকের আমন্ত্রণে আপনার আসা এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি — এখানেই আমাদের মতো রাজনৈতিক চেতনাসম্মন্ন অথচ দলহীন মানুষের সন্দেহ হয়। শুভেন্দু অধিকারী আগে অন্য একটি দলে ছিলেন। তখন তিনি কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতিকে তীব্র সমালোচনা করতেন। তারপর তিনি বিজেপিতে যোগ দিলেন। তখন আমরা সবিস্ময়ে তাঁর ‘কালাপাহাড়ী’ পরিবর্তন দেখলাম। দেখলাম উগ্র হিন্দুত্ব, যা আর এস এস থেকে আসা কর্মীদের মধ্যেও দেখতে পাইনি। প্রকাশ্যে শুভেন্দু বলেছিলেন মুসলমান বিধায়কদের তিনি রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলবেন, বলেছিলেন “যারা (হিন্দুরা) আমাদের সাথে আছে, আমরা শুধু তাদেরই সাথে থাকব।’ (নরেন্দ্র মোদির স্লোগানটাকে একেবারে উল্টে দিয়েছিলেন)। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে এবারে বিধানসভার নির্বাচনের আগে বহিরাগত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রায় ধর্মযুদ্ধ শুরু করেছিলেন শুভেন্দুসহ অন্যান্য নেতারা। তীব্র হয়েছিল ধর্মীয় মেরুকরণ। আর এই সেদিন কলকাতায় ছাত্রবিক্ষোভের সময় গোলমালকারীদের ‘শুক্রবারী’ (অর্থাৎ মুসলমান সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ) বলে সম্বোধন করলেন তিনি।
এর থেকে এ রকম একটা ভাবনা মাথায় আসে না কি যে, মুসলমানদের বিরুদ্ধে আপনি একটা হাতিয়ার হতে পারেন ! হ্যাঁ, আমরা জানি সাধারণ মুসলমান নয়, ইসলামি মৌলবাদীদের বিরুদ্ধেই ছিল আপনার যুদ্ধ। কিন্তু বহু দেশের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে মৌলবাদ সব ধর্মেই আছে। সব ধর্মেই আছে গোঁড়ামি, অনুদারতা, যুক্তিহীন বিশ্বাস, অর্থহীন আচার। আপনি বাংলা দেশে সংখ্যালঘু নির্ষাতনের প্রতিবাদ করেছিলেন। সঠিক কাজই করেছিলেন। কিন্তু এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন দেখলে আপনি কি চুপ করে থাকবেন ? তা যদি থাকেন, তাহলে তো দ্বিচারিতা হবে।
স্বাধীনতার উপাসক আপনি। তাই নতুন করে পরাধীনতার জালে যেন জড়িয়ে না পড়েন তাই সতর্ক থাকতে অনুরোধ। আপনার কবিতা উচ্চরণ করে শেষ করছি :
যুদ্ধ করেই বোঝাতে চাইছি যুদ্ধ করতে হয়,
স্বাধীনতা চাই সবাইকে দিতে, কেবল আমাকে নয়,
নিজে না ভাঙলে, নিজের শেকল কেউই ভাঙেনা এসে,
প্রয়োজনে পাশে মানুষ কোথায় দাঁড়াবে যে ভালোবেসে।
***
ধর্মতন্ত্র আমাকে ফাঁসিয়ে মিথ্যেকে দিল জয়,
লক্ষ নারীকে পুরুষতন্ত্র বন্দি করেছে ঘরে,
বিক্রি হচ্ছে শত শত লোক ধনতন্ত্রের কাছে,
স্বাধীনতা আজ দুর্লভ খুব দুর্ভাগাদের দেশে।
পরিশেষে বলি, আপনার ফেসবুকে একটা লেখা দেখলাম নয়নাঞ্জন চক্রবর্তীর। তিনি লিখেছেন :
‘একটা মৌলবাদকে ঘেন্না করতে গিয়ে আর একটা মৌলবাদের হাতে গিয়ে পোড়ো না তসলিমাদি … ওদের একমাত্র লক্ষ্য মুসলিম ভাবাবেগকে আঘাত করা এবং এজন্য তোমায় আর তোমার ইমেজকে ওরা ব্যবহার করছে ও করবে। কাল যদি এদের কোন কথা বা কাজ তোমার খারাপ লাগে আর তুমি তার বিরুদ্ধে বলো তাহলে রাও তোমায় ছুঁড়ে ফেলে দেবে যেভাবে মোল্লারা দিয়েছিল… আমাদের দেশে হিন্দু মৌলবাদীদের হাতে খুন হতে গৌরী লঙ্কেশ থেকে অনেককে দেখেছি… তোমায় খুব ভালোবাসি আর তোমার লেখাকে পছন্দ করি, তাই তুমি সাদা আর কালোর তফাৎটা বুঝবে এই আশাটা ভীষণভাবে রাখছি…’
আপনি কি কি লেখাটা পড়েছেন? স্মরণ রাখবেন কি লেখাটা?