৬৩. বাংলায় রাজস্ব বন্দোবস্তের এই পর্যালোচনায়, ১৬৫৮-য় সুলতান সুজার করা রাজস্ব নির্ধারণের বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করা আমি প্রয়োজন মনে করিনি। ১৫৮২ সালে রাজা টোডরমলের সময় থেকে ১৭২৮-এ জাফর খানের সময় পর্যন্ত রাজস্বের এই বৃদ্ধি ছিল পরিমিত; এরপর থেকে ১৭৫৫-য় আলীবর্দীর শাসনকাল সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তা দ্রুতগতিতে বাড়লেও সম্ভবত অত্যধিক ছিল না; কিন্তু ১৭৬৩-তে এই বৃদ্ধি ছিল অত্যন্ত তীব্র ও আকাশচুম্বী।
৬৪. সুবাদারি কর বা আবওয়াব (imposts) ধার্য করার মূল নীতির বিষয়ে আমার আপত্তি মূলত সেই পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত, যার প্রেক্ষাপটে এই করগুলো প্রবর্তিত হয়েছিল। যদি রায়তদের ওপর তোড়রমলের সময়ে করা রাজস্ব-বণ্টন বা ‘তকসিম’-এর হার সুবাদারি কর-কাঠামোর বাইরের কোনো পৃথক আর স্বতন্ত্র করের মাধ্যমে আগেই বৃদ্ধি করা না হতো, তবে সম্ভবত রাজস্ব বৃদ্ধির সর্বোত্তম উপায় হওয়া উচিৎ ছিল, দেশের উন্নয়নের মাত্রা বিবেচনায় রেখে সেই মূল হারের অনুপাতে অতিরিক্ত কর দাবি করা। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন; জমিদারদের ওপর আরোপিত এই বাড়তি করের দাবি রায়তদের ওপর তাদের (জমিদারদের) নিজস্ব জীবিকা ও উপার্জনের জন্য আগে থেকেই চাপানো করের বোঝাটিকে কেবল পাকাপোক্তই করেনি, বরং ভবিষ্যতে সীমাহীন শোষণের পথও প্রশস্ত করেছিল।
৬৫. আমি যে অনুসন্ধান করেছি, সেই সূত্রে, মিস্টার গ্রান্টের বিশ্লেষণে এমন কোনো প্রমাণ পাই নি, বাংলার জমিদারদের জীবিকা নির্বাহের জন্য উৎপাদনের নির্দিষ্ট অংশ কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে বা কার্যত তাঁদের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। ‘মুজুনেট’ (muzoonet) নামক সাধারণ শিরোনামের অধীনে যেসব ছাড়ের ব্যবস্থা ছিল, তা নানাবিধ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতো; আর ‘নানকার’ (nankar) বা ‘রুসুম-ই-জমিদারি’ (rusoom zemindarry) হিসেবে জমিদাররা যে অংশটুকু পেতেন, তা চরম মিতব্যয়িতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও তাঁদের ভরণপোষণের জন্য বিন্দুমাত্রও যথেষ্ট ছিল না। তবে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে একটা বিষয়ই প্রমাণ হয়, আলিবর্দি খানের শাসনকালে জমিদারদের আর্থিক অবস্থা সাধারণভাবে বেশ সচ্ছল ছিল। এই সচ্ছলতা কেবল তখনই সম্ভব হতে পারত যখন কর বা রাজস্বের হার ছিল সহনীয় — যেখানে জমিদারদের স্বার্থের মত বিষয়কে উপযুক্ত বিবেচনায় রাখা হতো — এবং তাঁরা নিজেরাও মিতব্যয়ী ব্যবস্থাপনার নীতি অনুসরণ করতেন। জমিদারদের দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়ার যে নীতি প্রস্তাব করা হয়েছিল, তা নিঃসন্দেহে অবিবেচনাপ্রসূত; কিন্তু জমিদারদের জন্য ঠিক কতটা অংশ অবশিষ্ট রাখার পরিকল্পনা ছিল তা আমাদের জানা না থাকায়, এর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কোনো মন্তব্য করা কঠিন। তবে বাস্তবে আমরা সাধারণভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, এই নীতি কর্মোদ্যম কমিয়ে দেওয়া আর শিল্পোদ্যোগ বা কর্মস্পৃহা ধ্বংস করার প্রবণতা সৃষ্টি করেছিল। সেই সঙ্গে আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে এ কথাও বলতে পারি যে, মধ্যস্বত্বভোগী বা মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনার সমস্ত প্রাপ্তি বা প্রতিদান ধ্বংস করার লক্ষ্য নিয়ে যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা কেবল নীতিগতভাবেই অন্যায্য নয়, বরং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তা অকার্যকর। ১৭৫৬ পর্যন্ত আরোপিত সুবাদারি করসহ অন্য করের বোঝা এই পরিস্থিতি তৈরিতে ঠিক কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা এখন আর সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আমি ধরে নিচ্ছি যে, জমিদারদের হাতে তখনও কিছু না কিছু উদ্বৃত্ত থাকত; কারণ তা না থাকলে, তাঁরা নিশ্চয়ই তা আদায় করে নিতেন।
৬৬. কাসিম আলীর কার্যকলাপের ক্ষেত্রে এমন কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। প্রজারা কী পরিমাণ খাজনা দিত তা নিশ্চিতভাবে জানার পর, তাঁর পরবর্তী লক্ষ্য ছিল সেই অর্থের যতটা সম্ভব নিজের কোষাগারে জমা করা; তিনি মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাতা কমিয়ে দিয়েছিলেন এবং সরকার আর কৃষকের মধ্যবর্তী সকল স্তরের মধ্যস্থতাকারীদের যথাসম্ভব বিলোপ করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর গৃহীত পরিকল্পনা আর পদক্ষেপগুলো যদি দীর্ঘকাল ধরে অব্যাহত থাকত, তবে রাজ্যের প্রজারা কেবল তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ত — নিপীড়িত কৃষক, অর্থলোলুপ কর-সংগ্রাহক এবং ত্রাস সৃষ্টিকারী সামরিক বাহিনী। তাঁর নির্ধারিত করের পরিমাণ আমি দেশের প্রকৃত [আর্থিক] সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করি না; বরং আমি একে বলপ্রয়োগ ও জবরদস্তিমূলক অর্থ আদায়ের নিদর্শন হিসেবেই গণ্য করি, যা পরবর্তীকালে রাজ্যের অবক্ষয় অনিবার্য করে তুলেছিল। আমার এই মতের পক্ষে কেবল দিনাজপুর ও রংপুরের বন্দোবস্তের বিবরণ এবং বাংলার সামগ্রিক করের যথেচ্ছ ও অত্যধিক বৃদ্ধিই নয়, বরং স্থানীয় অধিবাসীদের সাক্ষ্য এবং সেই সময়কাল থেকে অর্জিত আমাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতাও জোরালো প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।
৬৭. বাংলা ১১৬৯ সনের জন্য কাসিম আলীর রাজস্ব-বন্দোবস্ত সম্পর্কে আমার কাছে যে নথি সূত্রে হিসাবপত্র এসেছে, তার উপাদান ও মোট অর্থের পরিমাণ — উভয় দিক থেকেই — মিস্টার গ্রান্ট তাঁর ‘অ্যানালিসিস’ (বিশ্লেষণ)-এ যে বিবরণ দিয়েছিলেন তার সাথে এগুলোর যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে (অথচ আমি এতদিন পর্যন্ত মিস্টার গ্রান্টের সেই বিবরণকেই আমার মন্তব্যের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে এসেছি)। তাই আমি এই হিসাবের দুটো সারসংক্ষেপ পরিশিষ্টে সন্নিবেশিত করব এবং এখানে তাদের অমিলের একটিমাত্র উদাহরণ তুলে ধরব। মিস্টার গ্রান্টের ‘অ্যানালিসিস’-এর প্রথম অংশে দিনাজপুরের নিট রাজস্ব-বন্দোবস্তের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ১৮,০২,৯৪৬ টাকা; অথচ সরকারি নথিপত্র (সাধারণ ও বিশেষ উভয় প্রকার) থেকে আমি যে হিসাব পেয়েছি এবং যা আমি নির্ভরযোগ্য বলে মনে করি, তাতে দেখা যায় — সমস্ত খরচ ও পূর্ববর্তী বকেয়া বাদ দিয়ে — এর পরিমাণ ২৬,৪৪,৭৩৩ টাকা।
৬৮. তুলনামূলক বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য বাংলার রাজস্ব-নির্ধারণ সংক্রান্ত এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত তুলে ধরা হলো। এছাড়া, এই সময়কালকে আমাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরুর সময়ের সাথে জোড়ার লক্ষ্যে, আমি ‘খালসা’ আর ‘কানুনগো’দের নথিপত্র থেকে সংগৃহীত বাংলার দেওয়ানি এলাকার রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় ও বকেয়ার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করব। এই বিবরণে ১৭৬২-র এপ্রিল থেকে ১৭৬৬-র এপ্রিল পর্যন্ত — অর্থাৎ পরপর চারটি বছরের — হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম বছর ছিল কাসিম আলীর আমলের; দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছর ছিল মীর জাফরের সময়ে নন্দকুমারের আমলের; এবং চতুর্থ বছর ছিল মোহাম্মদ রেজা খানের সময়ের, — দেওয়ানি শাসনের প্রথম বছর। (পরিশিষ্ট ৫, ৬ ও ৭ দ্রষ্টব্য।)
বাংলার রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় ও উদ্বৃত্তের বিবরণী (বিভিন্ন বছর)
বঙ্গাব্দ খ্রিস্টাব্দ শাসক/কর্তৃপক্ষ মোট বন্দোবস্ত (টাকা) আদায় (টাকা) উদ্বৃত্ত/বকেয়া (টাকা)
১১৬৯ ১৭৬২-৬৩ কাসিম আলি (মীর কাসিম) ২,৪১,১৮,৯১২ ৬৪,৫৬,১৯৮ ১,৭৬,৬২,৭১৩
১১৭০ ১৭৬৩-৬৪ নন্দকুমার ১,৭৭,০৪,৭৬৬ ৭৬,১৮,৪০৭ ১,০০,৮৬,৩৫৮
১১৭১ ১৭৬৪-৬৫ শূন্য (মধ্যবর্তী) ১,৭৬,৯৭,৬৭৮ ১৮,৭৫,৫৩৩ ৯৫,২২,১৪৪
১১৭২ ১৭৬৫-৬৬ মুহম্মদ রেজা খান ১,৬০,২৯,০১১ ১,৪৭,০৪,৮৭৫ ১৩,২৪,১৩৫
অনুবাদকেরে টিকা – ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট – তালিকাটা ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান সংকট ও শাসকদের বিভিন্ন নীতির ফলাফল তুলে ধরে।
মূল পর্যবেক্ষণ —
১. মীর কাসিমের সময় (১৭৬২-৬৩) : সবচেয়ে বেশি রাজস্ব বন্দোবস্ত (২.৪১ কোটি টাকা) করা হয়েছিল, কিন্তু আদায় হয়েছিল মাত্র ৬৪.৫৬ লাখ টাকা — যা প্রমাণ করে যে নির্ধারিত রাজস্ব কৃষকদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব ছিল। বকেয়ার পরিমাণ ছিল ১.৭৬ কোটি টাকা, যা বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার পতনের ইঙ্গিত দেয়।
২. নন্দকুমারের সময় (১৭৬৩-৬৪) : রাজস্ব বন্দোবস্ত কিছুটা কমে ১.৭৭ কোটি টাকায় নেমে এলেও আদায় বেড়ে ৭৬.১৮ লাখ টাকায় পৌঁছায়। তবুও বকেয়া ছিল ১.০০ কোটি টাকা, যা দেখায় যে কৃষক-শোষণ অব্যাহত ছিল।
৩. মধ্যবর্তী সময় (১৭৬৪-৬৫) : রাজস্ব বন্দোবস্ত প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও আদায় বিপর্যয়করভাবে কমে ১৮.৭৫ লাখ টাকায় নেমে আসে। এটি সম্ভবত রাজনৈতিক অস্থিরতা, কৃষক-বিদ্রোহ বা প্রশাসনিক বিপর্যয়ের ফলে ঘটে।
৪. মুহম্মদ রেজা খানের সময় (১৭৬৫-৬৬) : রাজস্ব বন্দোবস্ত ১.৬০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়, কিন্তু আদায় বেড়ে ১.৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়ায় — যা ছিল সর্বোচ্চ আদায়ের হার। বকেয়া কমে মাত্র ১৩.২৪ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এটি দেখায় যে ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ‘কার্যকর’ হতে শুরু করছিল, অর্থাৎ কৃষকদের ওপর চাপ আরও সুসংহত হচ্ছিল।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য — এই তালিকাটি ফিফথ রিপোর্টের গ্র্যান্ট-শোর বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভাণ্ডার। জেমস গ্র্যান্ট এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে যুক্তি দেন যে ব্রিটিশ শাসনে রাজস্ব আদায় ধীরে ধীরে উন্নত হয়েছে, তাই বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে, জন শোর সতর্ক করেন যে এই ‘উন্নতি’ আসলে কৃষক-শোষণেরই একটি রূপ, এবং রাজস্ব বাড়ালে বিপর্যয় হবে। এখানে দেখা যাচ্ছে, মুহম্মদ রেজা খানের সময় রাজস্ব আদায় বাড়লেও তা মূলত কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ানোর মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছিল, যা ১৭৭০-এর মন্বন্তরের পূর্বাভাস দেয়। এই তালিকা প্রমাণ করে ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কৃষক-শোষণকে আরও পদ্ধতিগত ও কার্যকর করে তুলেছিল — যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩), যা বাংলার কৃষক সমাজকে চিরতরে বদলে দেয়।
৬৮ স্তবকে উল্লিখিত পরিশিষ্ট ৫, ৬ ও ৭
বাংলার দেওয়ানি জমির রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় ও উদ্বৃত্তের সারসংক্ষেপ (১১৬৯-১১৭২ বঙ্গাব্দ)
সারণী ৫: নবাব কাসিম আলি খানের (মীর কাসিম) আমলে ১১৬৯ বঙ্গাব্দের (১৭৬২-৬৩ খ্রি.) রাজস্ব বিবরণী
খাত টাকা আনা পয়সা
পূর্ববর্তী বছরের উদ্বৃত্ত ৭৯,৭৪,০৬৫ ৬ ১৮ ২
১১৬৯ বঙ্গাব্দের রাজস্ব বন্দোবস্ত ২,৪১,১৮,৯১২ ৪ ৫ ২
মোট (উদ্বৃত্ত + বন্দোবস্ত) ৩,২০,৯২,৯৭৭ ১১ ৪ ০
উদ্বৃত্তের আদায় ৬৫,৬০,৯৯১ ১৪ ১০ ০
বর্তমান বছরের বন্দোবস্তের আদায় ১,৮৯,৭০,৯৯৪ — — —
মোট আদায়
(মাঘ মাসের ১৬ তারিখ পর্যন্ত) ২,৫৫,৩১,৯৮৫ ১২ ১৪ ০
পূর্ববর্তী বছরের উদ্বৃত্ত ৭৮,৬৯,২৭২ ৩ ১ ১
১১৬৯ বঙ্গাব্দের উদ্বৃত্ত ১,৭৬,৬২,৭১৩ ৯ ১২ ৩
মোট উদ্বৃত্ত ২,৫৫,৩১,৯৮৫ — — —
সারণী ৬ : মীর জাফরের সুবাদারিত্বে নন্দকুমারের প্রশাসনে ১১৭০ ও ১১৭১ বঙ্গাব্দের (১৭৬৩-৬৫ খ্রি.) রাজস্ব বিবরণী
খাত টাকা আনা পয়সা
খালসা জমি ৬৭,৯৮,৩৮৬ ৯ ১১ ৩
জাগির বা বণ্টিত জমি :
সিরকার ২৫,১৮,০৬৯ ১৪ ১১ ২
বকশি ১,১৫,০৯১ ২ ০ ১
মুশরুত তনজাউত ২,৪৮,৮২৩ ২ ১৪ ৩
মুশরুত দেওয়ানি ৪,৫৭,৬৩৬ ২ ০ ১
মোট জাগির ৩৩,৩৯,৬২০ ৫ ৬ ৩
মোট খালসা ও জাগির ১,০১,৩৮,০০৭ ১৪ ১৮ ০
আবওয়াব (মূল রাজস্বের ওপর কর) :
চৌত (মারাঠা কর) ১১,০৫,৫১৩ ৮ ১৭ ১
খাস নোভেসি ২,২২,২৩৩ ২ ৬ ৩
নজরানা মনসুর গঞ্জ ৩,৭০,০২৫ ১২ ৯ ১
ফিলখানা (হাতির খরচ) ২,১০,৯৩৮ ১ ১০ ০
আহুক ১,৪৬,৫৩৭ ৮ ৩ ২
আবওয়াব ফৌজদারি ৫,৮৮,৮২৯ ৮ ৫ ৩
কিস্ত গোর ৮,০০০ ০ ০ ০
জু মাথাউত ১,০১,৪১৬ ১ ৬ ০
মোট আবওয়াব ২৭,৫৩,৪৯৩ ১০ ১৮ ২
আসল ও আবওয়াবের মোট ১,২৮,৯১,৫০০ ৯ ১৭ ০
কেফায়েত (আয়-ব্যয়ের সারাংশ) ৪৮,১৩,২৬৫ ১৫ ৫ ৩
মোট রাজস্ব ১,৭৭,০৪,৭৬৬ ৯ ২ ৩
বছরের আদায় ৭৪,১৩,৩৬০ ১০ ৪ ২
উদ্বৃত্ত ১,০২,৯১,৪০৫ ১৪ ১৮ ১
বছর শেষে আদায় ২,০৫,০৪৬ ১৫ ১৯ ৩
অসংগৃহীত উদ্বৃত্ত ১,০০,৮৬,৩৫৮ ১৪ ১৮ ২
১১৭১ বঙ্গাব্দ (১৭৬৪-৬৫ খ্রি.)
খাত টাকা আনা পয়সা
পূর্ববর্তী বছরের বন্দোবস্ত ১,৭৭,০৪,৭৬৬ ৯ ২ ৩
রাজস্ব হ্রাস ১৩,৪৯৭ ১২ ১২ ১
অবশিষ্ট বন্দোবস্ত ১,৭৬,৫১,২৬৮ ১২ ১০ ২
আহুক (চুন/ভবন কর) বৃদ্ধি ৬,৪০৯ ১৩ ১১ ১
১১৭১ বঙ্গাব্দের মোট বন্দোবস্ত ১,৭৬,৯৭,৬৭৮ ১০ ১ ৩
বছরের আদায় ৭৬,০২,৪৪২ ১ ১৬ ০
উদ্বৃত্ত ১,০০,৯৫,২৩৬ ৮ ৫ ৩
বছর শেষে আদায় ৫,৭৩,০৯১ ৯ ০ ৩
অসংগৃহীত উদ্বৃত্ত ৯৫,২২,১৪৪ ১৪ ৫ ০
সারণী ৭ : নবাব মুহম্মদ রেজা খানের দেওয়ানি প্রশাসনে ১১৭২ বঙ্গাব্দের (১৭৬৫-৬৬ খ্রি.) রাজস্ব বিবরণী
খাত টাকা আনা পয়সা
পূর্ববর্তী বছরের বন্দোবস্ত ১,৭৬,৯৭,৬৭৮ ১০ ১ ৩
যোগ: পৃথকভাবে সংগৃহীত খাত ৫,৬৪,৫৭৫ ১৫ ৫ ২
১১৭১ সালের মোট বন্দোবস্ত ১,৮২,৬২,২৫৪ ৯ ৭ ১
যোগ: শার্ফ সিক্কা (মুদ্রা বাট্টা) ৪,৫৩,৪৮৮ ১ ৬ ১
দিনাজপুরে বৃদ্ধি ৪,১৯,২৯৩ ১৪ ২ ১
মোট ৮,৭২,৭৮১ ১৫ ৮ ২
বিয়োগ: বিভিন্ন জেলায় কর ছাড় ১,৯১,৩৫,০৩৬ ৮ ১৫ ৩
মোট বন্দোবস্ত (মুশকুরাত-সহ) ৩১,০৬,০২৪ ১০ ১৫ ০
বছরের আদায় ১,৪৪,৪৯,৯১১ ১১ ৭ ৩
বছর শেষে আদায় ২,০৭,৯৬৪ ১৩ ১৯ ০
অসংগৃহীত উদ্বৃত্ত ১,৪৭,০৪,৮৭৬ ৯ ৬ ৩
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
এই তিনটি সারণী ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল, যা বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার ক্রমবিকাশ ও সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এগুলো ব্রিটিশ-পূর্ব ও ব্রিটিশ-আমলান্তরকালীন রাজস্ব নীতির পরিবর্তন, কৃষক-শোষণের কাঠামো এবং ফিফথ রিপোর্টের গ্র্যান্ট-শোর বিতর্কের ঐতিহাসিক ভিত্তি উন্মোচন করে।
সারণী ৫-এর তাৎপর্য (মীর কাসিমের আমল)
মীর কাসিমের (কাসিম আলি খান) সময়ে রাজস্ব বন্দোবস্ত ছিল ২,৪১,১৮,৯১২ টাকা — যা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কিন্তু আদায় হয়েছিল মাত্র ১,৮৯,৭০,৯৯৪ টাকা, এবং উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১,৭৬,৬২,৭১৩ টাকায়। এই বিপুল উদ্বৃত্ত প্রমাণ করে যে – মীর কাসিম রাজস্ব বৃদ্ধির কঠোর নীতি গ্রহণ করলেও কৃষকরা তা দিতে অসমর্থ ছিল; এই উদ্বৃত্তই পরবর্তী বছরগুলিতে রাজস্ব সংকট ও কৃষক-বিদ্রোহের বীজ বপন করে; মীর কাসিমের এই নীতি ছিল কোম্পানির চাপের ফল, যা তিনি নিজের সামরিক শক্তি গঠন ও কোম্পানি-নির্ভরতা কমানোর জন্য গ্রহণ করেছিলেন।
সারণী ৬-এর তাৎপর্য (নন্দকুমারের আমল)
নন্দকুমারের প্রশাসনে (১৭৬৩-৬৫) রাজস্ব বন্দোবস্ত কমে ১,৭৭,০৪,৭৬৬ টাকায় নেমে আসে, কিন্তু আদায়ের পরিমাণ ছিল ৭৪,১৩,৩৬০ টাকা, এবং উদ্বৃত্ত ছিল ১,০০,৮৬,৩৫৮ টাকা। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ — আবওয়াবের বিস্তারিত তালিকা: এই সারণীতে আবওয়াবের (অতিরিক্ত কর) বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে — চৌত (মারাঠা কর), ফিলখানা (হাতির খরচ), ফৌজদারি আবওয়াব, নজরানা ইত্যাদি। এই করগুলো কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়েছিল এবং রাজস্বের মূল কাঠামোকে বিকৃত করেছিল। খালসা ও জাগিরের বিভাজন: খালসা জমি (সরকারি রাজস্ব জমি) ও জাগির (বণ্টিত জমি) — এই বিভাজন মুঘল আমলের রাজস্ব কাঠামোর ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে, যা ব্রিটিশ আমলেও অব্যাহত ছিল। রাজস্ব হ্রাস: ১১৭১ বঙ্গাব্দে রাজস্ব বন্দোবস্ত কিছুটা হ্রাস পায়, যা সম্ভবত কৃষক-বিদ্রোহ বা অর্থনৈতিক সংকটের ফলে ঘটে। ১৭৬৪-৬৫ সালে আদায় আরও কমে ৭৬,০২,৪৪২ টাকায় নেমে আসে, এবং উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৯৫,২২,১৪৪ টাকায় — যা প্রমাণ করে যে রাজস্ব নীতি ক্রমাগত ব্যর্থ হচ্ছিল।
সারণী ৭-এর তাৎপর্য (মুহম্মদ রেজা খানের দেওয়ানি প্রশাসন)
১৭৬৫ সালে ব্রিটিশরা দেওয়ানি লাভের পর মুহম্মদ রেজা খান প্রথম দেওয়ানি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান। এই সারণীতে ১৭৬৫-৬৬ সালের রাজস্ব বিবরণী দেওয়া হয়েছে — রাজস্ব বন্দোবস্ত: পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় রাজস্ব বন্দোবস্ত কিছুটা কমে ১,৯১,৩৫,০৩৬ টাকায় দাঁড়ায় (কর ছাড়ের পর)। শার্ফ সিক্কা ও দিনাজপুরে বৃদ্ধি: মুদ্রা বাট্টা (শার্ফ সিক্কা) ও দিনাজপুরে রাজস্ব বৃদ্ধি — এই দুটি খাত যোগ করে মোট বন্দোবস্ত দাঁড়ায় ১,৯১,৩৫,০৩৬ টাকায়। আদায় বৃদ্ধি: এই বছরে আদায় হয় ১,৪৪,৪৯,৯১১ টাকা — যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। উদ্বৃত্ত কমে দাঁড়ায় ১,৪৭,০৪,৮৭৬ টাকায় (যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় কম)।
ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির সূচনা : মুহম্মদ রেজা খানের প্রশাসনে ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় — যেখানে কর ছাড়, মুদ্রা বাট্টা, এবং জেলা-ভিত্তিক রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় আরও পদ্ধতিগত করা হয়। এই পদ্ধতিই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের (১৭৯৩) ভিত্তি তৈরি করে।
সামগ্রিক ঐতিহাসিক তাৎপর্য — এই তিনটি সারণী মিলিয়ে বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থার তিনটি স্তর চিহ্নিত করা যায়: মীর কাসিমের আমল (১৭৬২-৬৩) : উচ্চ রাজস্ব বন্দোবস্ত, কিন্তু আদায় কম — যা কোম্পানির চাপ ও কৃষক-শোষণের চরম পর্যায় নির্দেশ করে। নন্দকুমারের আমল (১৭৬৩-৬৫) : আবওয়াবের বিস্তার, রাজস্ব হ্রাস, এবং ক্রমাগত উদ্বৃত্ত — যা রাজস্ব নীতির ব্যর্থতা ও কৃষক-বিদ্রোহের পূর্বাভাস দেয়। মুহম্মদ রেজা খানের আমল (১৭৬৫-৬৬) : ব্রিটিশ দেওয়ানি প্রশাসনের সূচনা, কর ছাড় ও মুদ্রা বাট্টার মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের উন্নতি — যা পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তি তৈরি করে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ