Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সংগ্রাম, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার জীবনকাব্য — সত্যজিৎ নাথের উপন্যাস “শেষের বেলা” : যশোবন্ত রায় যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবিতার আয়ুষ্কাল — নজরুলের বিদ্রোহী : রফিকুর রশীদ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নুসরাত সুলতানা-র ছোটগল্প ‘ইনকিউবেটর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ২৬ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

৬০. এখানে আলোচিত হিসাবের ভিত্তিতে যদি জেলার সামগ্রিক রাজস্ব-ক্ষমতার হিসেব তৈরি করতে হয়, তবে আমি রামনাথ বাড়ৈর আদায়করা ২০,১০,৩৩৫ টাকার হিসাবটিকেই ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করব — অবশ্য তাঁর কঠোর কর্মপদ্ধতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেই অঙ্কে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। যদি দাবিকরা অর্থের পরিমাণ এই অঙ্কের চেয়ে কিছুটা কম হতো, তবে রায়তদের কোনো রকম দুর্দশা ছাড়াই বা ভবিষ্যতের রাজস্বের উৎস ক্ষতিগ্রস্ত না করেই তা আদায় করা সম্ভব হতো; অথচ তাঁর আচরণের কারণেই এই উভয় নেতিবাচক পরিণতি ঘটেছিল। তবে এই হিসাবে আদায়-সংক্রান্ত খরচ বা জমিদারের প্রাপ্য অংশের কোনো সংস্থান রাখা হয়নি — অথচ কোনো না কোনোভাবে তাঁকে সেই অংশ দিতেই হতো। ফলে, সম্পদের প্রাক্কলিত পরিমাণ আনুপাতিক হারে কমে যাওয়ার কথা; অবশ্য যদি না তাঁকে জীবিকা নির্বাহের জন্য পর্যাপ্ত জমি বরাদ্দ করা হয়ে থাকে — যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

৬১. আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মিস্টার গ্রান্ট সুবাদারি কর বা আদায়ে যে তালিকা বিস্তারিতভাবে দিয়েছেন, তাতে ‘নজরানা-মহল’-এর কোনো উল্লেখ নেই। ৩ নম্বর হিসাবটি প্রমাণ করে যে, এটি ‘নাজেরানা মুকারারি’ (nazzerana mokurrery) থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল; উল্লেখ্য, এই বন্দোবস্তের ঠিক আগের আগের বছরেই সেই নাজেরানা মুকারারির পরিমাণ ১,৫৪,২০৮ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

৬২. ১৭৬২ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হওয়া বাংলা ১১৬৯ সনের জন্য দিনাজপুরের বন্দোবস্ত বা রাজস্ব-নির্ধারণ সংক্রান্ত ওপরের বিবরণটিকে কাসিম আলীর সামগ্রিক কর্মপদ্ধতির একটি নমুনা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। রংপুরের ক্ষেত্রে, ৩,৫৭,৯৮৬ টাকার বকেয়া পাওনা থাকা সত্ত্বেও, তাঁর নিযুক্ত আমিল আব্দুল আলী খান সেখানকার রাজস্বের পরিমাণ ১১,২৯,৩২৪ টাকা নির্ধারণ করেছিলেন। ওই জেলায় রাজস্ব আদায়ের সময় যে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়েছিল, তা সেখানকার অন্যতম প্রধান অঞ্চল ‘কারজিহাল’-এর রায়তদের বিদ্রোহ করতে বাধ্য করেছিল; এবং সেই বছর আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৬,৬৮,৬৯২ টাকা। (রংপুরের কালেক্টরের চিঠি, ১৬ই জানুয়ারি ১৭৮৭।) [টিকা ১]

টিকা ১

ফিফথ রিপোর্টের ৬২ নম্বর প্যারাগ্রাফে মীর কাসিমের (কাসিম আলী) রাজস্ব নীতির নিদারুণ উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। বাংলার নবাব ব্রিটিশদের চাপে দিনাজপুরের বন্দোবস্তের পর রংপুরে আরও কঠোর রাজস্ব নীতি প্রয়োগ করেন। এই প্যারাগ্রাফে উল্লিখিত আমিল আব্দুল আলী খান এবং রংপুরের বিদ্রোহ– এই দুই উপাদান উপনিবেশিক রাজস্ব কাঠামোর নির্মমতা ও কৃষক-প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরেছে। আব্দুল আলী খান ছিলেন কঠোর রাজস্ব আদায়ের প্রতীক — মীর কাসিমের ‘আমিল’ বা রাজস্ব-ঠিকাদার। ‘আমিল’ শব্দ ফার্সি, আরবি ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কর্মকর্তা’ বা ‘প্রতিনিধি’। উপনিবেশের প্রথমকালে এমনকি মুঘল আমলেও ‘আমিল’রা নির্দিষ্ট অঞ্চলের রাজস্ব সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন। আব্দুল আলী খান ছিলেন এই শ্রেণিরই একজন প্রতিনিধি।

রংপুরের রাজস্ব নীতি – তিনি রংপুরে রাজস্ব নির্ধারণ করেন ১১,২৯,৩২৪ টাকা; অথচ আগের বছর থেকে এই অঞ্চলে ৩,৫৭,৯৮৬ টাকা বকেয়া ছিল; অর্থাৎ, তিনি কেবল আগের বকেয়াই আদায় করতে পারেননি, বরং নতুন করের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এই অতিরিক্ত করের বোঝা কৃষকদের পক্ষে বহন করা অসম্ভব ছিল। সরকার থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপ সরাসরি কার্জিহালের বিদ্রোহের পটভূমি তৈরি করে। কার্জিহাল ছিল ব্রিটিশ আমলের প্রথম যুগের কৃষক-প্রতিরোধের প্রথম ঝলক। ফিফথ রিপোর্টের ‘কার্জিহাল’ বা কুর্জিহাল – আজকের বর্তমান কুড়িগ্রাম ও রংপুরের আশপাশের অঞ্চল – ছিল রংপুর জেলার অন্যতম প্রধান অংশ। অতিরিক্ত রাজস্বের চাপে এই অঞ্চলের রায়তরা বিদ্রোহ করতে বাধ্য হন।

বিদ্রোহের কারন —

১. অতিরিক্ত খাজনা : কৃষকদের ওপর চাপানো বিপুল রাজস্ব।

২. বকেয়া আদায়ের কঠোর পদক্ষেপ : আব্দুল আলী খান কঠোর শারীরিক শাস্তি ও জমি দখল করে রাজস্ব আদায়ের চেষ্টা করেন।

৩. অর্থনৈতিক অস্থিরতা : ক্রমাগত রাজস্বের বোঝায় কৃষকেরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তাদের জমি হারাতে থাকলে কৃষকেরা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ ঘোষণা করে; ঐ বছর রংপুর থেকে মাত্র ৬,৬৮,৬৯২ টাকা রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয় — যা নির্ধারিত রাজস্বের অর্ধেকেরও কম। এই বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে কৃষক-শোষণের একটি সীমা ছিল, এবং তা অতিক্রম করলে কৃষকেরা প্রতিরোধ গড়ে তুলত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট — মীর কাসিমের রাজস্ব নীতি — ১৭৬০-৬৩-তে মীর কাসিম বাংলার নবাব ছিলেন। তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাকে ক্ষমতায় বসালেও তার রাজস্ব নীতি ছিল অত্যন্ত কঠোর। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল — কোম্পানির কাছে বিপুল রাজস্ব জমা দেওয়া; তার নিজস্ব সামরিক বাহিনী গঠন করা; কোম্পানির প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করা। তিনি হাস্তবুদ (ভূমি জরিপ) ও আবওয়াব (অতিরিক্ত কর) বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। দিনাজপুর ও রংপুরের এই দুটি ঘটনা তাঁর সেই নীতিরই প্রতিফলন। তবে রংপুরের বিদ্রোহ প্রমাণ করে যে এই নীতি কৃষকদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করছিল এবং তারা নীরব ভুক্তভোগী ছিল না।

৪. ফিফথ রিপোর্টের ভাষ্য — ফিফথ রিপোর্টের ৬২ নম্বর প্যারাগ্রাফে ফার্মিঙ্গার এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন যাতে বোঝানো যায়: কীভাবে মীর কাসিমের রাজস্ব নীতি বাংলার কৃষক-সমাজকে ধ্বংস করেছিল; কীভাবে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের ফলে কৃষক-বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়েছিল; এবং কীভাবে এই বিদ্রোহ সত্ত্বেও কোম্পানি ও নবাব তাদের রাজস্ব নীতি পরিবর্তন করেনি। ফার্মিঙ্গারের মতে, এই ঘটনাটি ‘কাসিম আলীর সামগ্রিক কার্যকলাপের একটি নমুনা’ — যা প্রমাণ করে যে শাসকরা কৃষক-শোষণের কোনো সীমা মানতেন না। আব্দুল আলী খান ও রংপুরের বিদ্রোহের এই ঘটনা আমাদের উপনিবেশিক রাজস্ব কাঠামোর দুটি মুখ দেখায় — একদিকে কঠোর রাজস্ব আদায়ের নৃশংসতা, অন্যদিকে কৃষক-প্রতিরোধের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা। এই বিদ্রোহ কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা ছিল না; এটি বাংলার কৃষক-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি অংশ, যা পরবর্তীতে সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ, চুয়ার বিদ্রোহ, রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩) — এই ধারাবাহিকতার সূচনা করে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে যে কোনো শোষণ-কাঠামোর শেষ সীমা থাকে, এবং তা অতিক্রম করলে প্রতিরোধ অনিবার্য হয়ে ওঠে — আর সেই প্রতিরোধের নেতৃত্বে থাকেন হকার, চাষি ও কারিগররা, যাদের শ্রমে গড়ে ওঠে বাংলার মত স্বর্ণালী ভূখণ্ড।

বিদ্রোহের বাখানে যাওয়ার আগে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উল্লেখ করা দরকার। ইতিহাস মীরজাফরের মতই মীর কাশিমের প্রতিও সমানভাবে নির্দয় – সে মীর কাশিমের রাজস্বনীতির পক্ষে দাঁড়ায় নি। কিন্তু এই মীর কাশিমই বিশ্বের প্রথম শাসক রাজ্যে সমস্ত ট্যাক্স উঠিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ওপরে ব্রিটিশেরা বিপুল কর আদায়ের দাবি চাপিয়ে দেয় তাকে সিংহাসনে বসাবার শর্ত হিশেবে। শ্বশুর মীর জাফরের — যাকে রজতকান্ত রায় পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ বইতে দুর্দান্ত এনেকডোট উল্লেখ করে বলছেন ক্লাইভের গাধা – তুলনায় মীর কাশিম স্ট্রিক্ট শাসক ছিলেন — বিশেষ করে ব্রিটিশদের সঙ্গে ডিলের ক্ষেত্রে। তাই বিদ্রোহ যদিও ঘটেছিল মীর কাশিম ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের প্রায় দেড় দশকেরও পরে, তাঁর ওপরে এই চাপানো অত্যাচারী নবাবের অভিযোগ কিছুটা নস্যাৎ করতে দুটো কথা বলা দরকার।

মীর কাসিম: কৃষক-শোষক না প্রতিরোধের প্রতীক — মীর কাসিমের রাজস্বনীতি ছিল কঠোর, কিন্তু এই কঠোরতার কারণ ছিল কোম্পানির দেওয়া চরম চাপ। মীর কাসিমকে ১৭৬০-য় ক্লাইভের অনুগামী ভ্যান্সিটার্টের ক্ষমতায় বসানোর শর্ত ছিল বাংলার রাজস্বের একটি বড় অংশ তাদের সিন্দুকে প্রবেশ করুক যাতে তারা বাণিজ্য আর সামরিক খরচ মেটাতে পারে। মীর কাসিম বুঝেছিলেন কোম্পানির এই দাবি মেনে নিলে বাংলার অর্থনীতি ধ্বংস হবে। তিনি কোম্পানিকে খুশি করার বদলে নিজের শক্তি বাড়ানোর পথ বেছে নেন। ফিফথ রিপোর্টের ৬২ নম্বর প্যারাগ্রাফে ফার্মিঙ্গার যে মীর কাসিমের রাজস্ব নীতির সমালোচনা করেছেন, তার পুরো প্রেক্ষাপট কিন্তু এড়িয়ে গেছেন। ফার্মিঙ্গার দেখিয়েছেন কীভাবে মীর কাসিমের রাজস্ব নীতি কৃষকদের ধ্বংস করেছিল, কিন্তু তিনি বলেননি যে এই রাজস্ব নীতি মূলত কোম্পানির চাপের ফল ছিল।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : কোম্পানি বনাম মীর কাসিম – মীর কাসিম ব্রিটিশদের সঙ্গে খুব কড়া ব্যবহার করতেন। শ্বশুর মীর ছিলেন জাফরকে ‘ক্লাইভের গাধা’ — তিনি কোম্পানির পায়ে মাথা নত করেন, উপহার ও ক্ষতিপূরণ দিলেও নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেননি। অন্যদিকে, মীর কাসিম চেয়েছিলেন বাংলাকে কোম্পানির প্রভাব থেকে মুক্ত করতে। তিনি কোম্পানির কর্মচারীদের বাণিজ্যের বিশেষ সুবিধা বাতিল করেন, যা কোম্পানির স্বার্থে আঘাত করেছিল।

কোম্পানির চাপ : মীর কাসিমকে কোম্পানি বিপুল অর্থের দাবি জানায়। কোম্পানি চেয়েছিল রাজস্বের একটি বড় অংশ তাদের কাছে চলে যাক। মীর কাসিম বুঝতে পেরেছিলেন যে কোম্পানির এই দাবি মেনে নিলে বাংলার অর্থনীতি ধ্বংস হবে। তাই তিনি কোম্পানিকে খুশি করার বদলে নিজের শক্তি বাড়ানোর পথ বেছে নেন। তিনি তার রাজস্ব নীতি কঠোর করেন যাতে কোম্পানির দাবি মেটানো যায় এবং একইসঙ্গে নিজের সামরিক বাহিনী গঠন করা যায়। কিন্তু এই কঠোরতা কৃষকদের ওপর চরম শোষণ চাপিয়ে দেয়।

কৃষক-শোষণ নাকি প্রতিরোধের মূল্য — মীর কাসিমের রাজস্ব নীতি অবশ্যই কৃষকদের ওপর কঠোর ছিল। দিনাজপুর ও রংপুরের উদাহরণে আমরা দেখেছি কীভাবে আবওয়াব ও হাস্তবুদের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো হয়েছিল এবং কীভাবে কৃষকেরা বিদ্রোহ করেছিল। কিন্তু প্রশ্ন হলো — কেন তিনি এত কঠোর রাজস্ব নীতি গ্রহণ করেছিলেন? মীর কাসিম বুঝতে পেরেছিলেন যে কোম্পানি বাংলার অর্থনীতি ও রাজনীতিকে ধ্বংস করছে। তিনি চেয়েছিলেন বাংলাকে কোম্পানির প্রভাব থেকে মুক্ত করতে। তার রাজস্ব নীতি ছিল এই মুক্তির সংগ্রামের একটি অংশ। তিনি কৃষকদের ওপর চাপ দিয়েছিলেন যাতে কোম্পানির দাবি মেটানো যায় এবং নিজের সামরিক শক্তি গঠন করা যায়। কিন্তু এই চাপ কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনে। তিনি কোম্পানির চাপে রাজস্ব বাড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন, কিন্তু সেই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পড়েছিল কৃষকদের ওপর। এই দ্বন্দ্বেরই ফল ছিল রংপুরের বিদ্রোহ — যা কেবল মীর কাসিমের নীতির বিরুদ্ধেই ছিল না, বরং কোম্পানি-শোষণের বিরুদ্ধেও ছিল।

ফিফথ রিপোর্টের সীমাবদ্ধতা — ফিফথ রিপোর্ট মূলত ব্রিটিশ দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা, যেখানে মীর কাসিমকে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ ও ‘অত্যাচারী’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ফার্মিঙ্গার তাঁর সম্পাদনায় এই দৃষ্টিভঙ্গিকেই আরও সুসংহত করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা আরও জটিল। মীর কাসিম ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা শাসক, যিনি বাংলাকে কোম্পানির শোষণ থেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তার রাজস্ব নীতি কঠোর ছিল, কিন্তু তা ছিল কোম্পানির চাপের ফল, তার ব্যক্তিগত লোভের নয়। রংপুরের বিদ্রোহ যেমন কৃষক-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছিল, তেমনি মীর কাসিমের সংগ্রাম ছিল কোম্পানি-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধেরই আরেকটি রূপ।

এই সময় অর্থাৎ ১৭৬০ থেকে ১৭৬৪ পর্যন্ত বাংলায় কোম্পানি প্রধান ছিলেন হেনরি ভ্যান্সিটার্ট। ক্লাইভের বিশ্বস্ত বন্ধু মীর জাফরকে সরিয়ে মীর কাশিমকে বাংলার নিজামতের ক্ষমতায় বসান। ভ্যান্সিটার্ট এবং তার সমর্থক কোম্পানি আমলাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগের আঙুল ওঠে। হেনরি ভ্যান্সিটার্ট চার বছরের কোম্পানি শাসনকে ডিফেন্ড করতে আ ন্যারেটিভ অব ট্রানজাকশনস ইন বেঙ্গল লেখেন; এই বইতে যেহেতু তিনি নিজের গায়ে লাগা দুর্নীতির কাদা মুছতে চেয়েছেন, তাই তিনি সরকারের সঙ্গে চিঠিচাপাটি এবং সরকারি দস্তাবেজ নির্ভর করে দুর্নীতি, অনাচারের অভিযোগ খণ্ডন করেছেন। এই দুই মানুষের সময় বিশদে জানতে উল্লিখিত ব্রিটিশ পক্ষীয় প্রাথমিক বয়ানটা পড়ুন — এই বইতে মীর কাশিমের সনবগে তার আলাপচারিতার প্রভূত উল্লেখ রয়েছে।

ফিরি বিদ্রোহ বাখানে – কেন বিদ্রোহ?

শোষণের চরম পর্যায় — বিদ্রোহের মূল কারণ ছিল রাজস্ব-ঠিকাদার রাজা দেবী সিংহ ও তার কর্মচারীদের অত্যাচার। ১৭৮২ সালের ডিসেম্বরে, দেবী সিংহের গোমস্তা বা প্রতিনিধিরা কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করতে শুরু করে। এই করগুলোর মধ্যে ছিল ‘ডেরিনউল্লা’ (Dereenvillah) নামক একটি অবৈধ কর, ‘নারায়নী’ মুদ্রার বাট্টা, এবং অন্য ধরনের অত্যাচার। কৃষকদের আবেদনে বলা হয়েছিল: “আমরা গরু-বাছুর, স্ত্রীদের গয়না, এমনকি নিজেদের সন্তান পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছি। এখন শুধু আমাদের জীবন বাকি।”

বিদ্রোহের আগেই কলকাতার কর্মকর্তা চার্লস গ্র্যান্ট দেবী সিংহের অত্যাচারের বিস্তারিত বিবরণ পাঠান — তাঁতিদের থেকে ১২ মাসের বদলে ১৭-১৮ মাসের খাজনা আদায় করা হচ্ছিল এবং গ্রামে গ্রামে গোল গোল অর্থাৎ চক্রাকারে কর বসিয়ে তা আদায় করা হত। তার একটা চিঠির উদ্ধৃতি — “একটি দরজা খোলা হলে, পাঁচ-ছয়জন ক্ষুধার্ত ও নির্যাতিত মানুষের লাশ বেরিয়ে আসে, যারা নড়াচড়া করতে অক্ষম। তাদের পা বাঁধা, কথাও বলতে পারছিল না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ১০-১২ দিন বন্দী ছিল, দিনে মাত্র দু’বার খাবার দেওয়া হত, আর সকাল-সন্ধ্যা তাদের পেটানো হত।”

কারা বিদ্রোহী? — কৃষক-সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ — ১৭৮৩ সালের ১৮ জানুয়ারি (মাঘ মাসের ৭ তারিখ) বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহীদের মূল অংশ ছিল রংপুরের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক। এই কৃষকরা ছিল মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের, যারা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ফিফথ রিপোর্টের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের বছর রংপুরের রাজস্ব চুক্তি নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ ছিল, এবং এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময়ে তারা বিদ্রোহ করে। কৃষকদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন দিনাজপুরের কৃষকরাও।

কারা নেতৃত্ব দিয়েছিল? — ‘নবাব’ দীর্জিনারায়ণের উত্থান — বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা তেপাহ নামক স্থানে সমবেত হয়ে দীর্জিনারায়ণ (Dirjinarain)-কে তাদের রাজা বা ‘নবাব’ নির্বাচন করে। তিনিই বিদ্রোহের মুখ্য নেতা ছিলেন। দীর্জিনারায়ণ ছিলেন দুরলভনারায়ণের পুত্র, যিনি আগে মীর কাসিমের সময়ে একটি বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দীর্জিনারায়ণ ‘নবাব’ উপাধি ধারণ করে বিদ্রোহীদের নেতৃত্ব দেন।

কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল? — জনতার প্রতিরোধ — নেতৃত্ব পেয়ে বিদ্রোহীরা দ্রুত সংগঠিত হয় :

১. প্রতীকী রাজধানী ও শাসনব্যবস্থা: তারা দক্ষিণ ডোমলা (Dumla)-এ তাদের সদর দফতর স্থাপন করে এবং ‘নবাব’ দীর্জিনারায়ণের নামে ডাক বা প্রজ্ঞাপন জারি করতে থাকে।

২. সরকারি স্থাপনা আক্রমণ: তারা ডাকাল্লিগঞ্জের ফাঁসির মঞ্চ ভেঙে ফেলে এবং রাজস্বের দায়ে আটক বন্দীদের মুক্ত করে দেয়।

৩. গোমস্তা হত্যা: দেবী সিংহের প্রতিনিধি গৌরমোহনকে বন্দী করে হত্যা করা হয়।

৪. প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড: বিদ্রোহীরা রাজস্ব আদায় বন্ধ করে দেয় এবং নিজেদের অভিযানের খরচ চালানোর জন্য জোর করে কর আদায় করতে থাকে।

৫. আত্মসমর্পণের শর্ত: বিদ্রোহীরা প্রথমে শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিল। তারা দুই বছরের ডেরিনভিল্লা কর মওকুফ ও দুই মাসের জন্য রাজস্ব আদায় বন্ধ রাখার শর্তে দেশে ফিরে যেতে রাজি হয়েছিল।

সরকারি দমন-পীড়ন — রংপুরের কালেক্টর রিচার্ড গুডল্যাড প্রথমে আলোচনার চেষ্টা করেন, কিন্তু বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে তিনি কঠোর শাস্তির পথ বেছে নেন। মেজর রবার্টসনের সেনাবাহিনী এবং মির্জা মুহম্মদ তকির নেতৃত্বে সংগঠিত বাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এই অভিযানে বহু কৃষক নিহত হয়, তাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং প্রধান বিদ্রোহী গ্রামগুলোর প্রধানদের ফাঁসি দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব — ফিফথ রিপোর্টে এই বিদ্রোহের উল্লেখের কারণ এটি দেখায় যে কোম্পানি-শাসিত বাংলায় কৃষক-শোষণ কতটা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল এবং শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকদের প্রতিরোধ কতটা দৃঢ় ছিল। ফার্মিঙ্গারের মতে, মীর কাসিমের রাজস্ব নীতির এই পরিণতি বাংলার কৃষক-সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। উপনিবেশের পতন হোক।

রংপুর বিদ্রোহের বিশদ আলোচনার জন্য দেখুন – জ্ঞানগঞ্জ ২২ পুথি জাগো বাহে কোনঠে সবায়, রংপুর ধিং।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন