Logo
এই মুহূর্তে ::
কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবিতার আয়ুষ্কাল — নজরুলের বিদ্রোহী : রফিকুর রশীদ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নুসরাত সুলতানা-র ছোটগল্প ‘ইনকিউবেটর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার

দিলীপ মজুমদার / ৪৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

দিল্লির যন্তর মন্তরে যখন ককরোচ জনতা দলের আহ্বানে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান-বিক্ষোভ চলছে, তখনই আন্দোলনে নামলেন কৃযকরা। প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা থেকে আসা বেশ কয়েকটি কনভয়কে সীমান্তবর্তী এলাকায় আটকে দেওয়া হয়। তবু কিছু বিক্ষোভকারী পৌঁছে যান কিষাণ ঘাটে। গত ২১ জুলাই। ভারতের কৃষকদের সাম্প্রতিক আন্দোলন আলোচনা করার আগে একবার দেশের কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।

স্বাধীনতা-পূর্ব কৃষক আন্দোলন

নীল বিদ্রোহ বোধহয় এদেশের প্রথম সংগঠিত, প্রভাবশালী কৃষক আন্দোলন। ১৮৫৯ সালের আন্দোলন এটি। চাষের জমিতে নীল বুনতে বাধ্য করা হত কৃষকদের। সামান্য টাকা বা দাদন দিয়ে কৃষকদের সারা জীবন ঋণের জালে আবদ্ধ করে রাখা হত। নীলকররা অকথ্য অত্যাচার করতেন। ১৮৫৯ সালে নদিয়া জেলায় কৃষকরা প্রথম চাষের জমিতে নীল বুনতে অস্বীকার করে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন দিগম্বর বিশ্বাস ও বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস। নদিয়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলা দেশে। হরিশ মুখার্জির ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ ও দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’ নাটক সে আন্দোলনকে পুষ্ট করে। ১৮৬০ সালে নীল কমিশন গঠিত হয় এবং নীল চাষের অবসান হয়।

ব্রিটিশ সরকারের রায়তোয়ারি ব্যবস্থায় জমির উচ্চ হার ও রাজস্ব বৃদ্ধি, মারোয়ারি ও গুজরাটি মহাজনদের চড়া সুদের হার ও জালিয়াতি হিসেব, আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর তুলার বাজার হ্রাস-প্রভৃতি কারণে দাক্ষিণাত্যে কৃষকরা বিদ্রোহ করে। তারা দলবদ্ধভাবে মহাজনদের বাড়ি, দোকানে হামলা করে, ঋণের আইনি দলিলপত্র ও বন্ধকী কাগজপত্র পুড়িয়ে দেয়। সরকার বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী নামায়। কৃষকদের সুরক্ষার জন্য ১৮৭৯ সালে ‘ডেকান এগ্রিকালচারিস্ট রিলিফ অ্যাক্ট’ পাস করে।

১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সাঁওতালরা তাদের জমি–জমার অধিকার হারাতে শুরু করে। সেই সঙ্গে ছিল দিকুদের অত্যাচার। দিকু হল অসাধু মহাজন ও ব্যবসায়ী। তারা চড়া সুদে ঋণ দিত এবং সেই ঋণ আদায়ে নির্মম পন্থা অবলম্বন করত। দিকুদের সঙ্গে ছিল পুলিশের অত্যাচার। তাই ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন সাঁওতালরা একত্রিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দেয়। ব্রিটিশ বাহিনী কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন করে। ১৫ থেকে ২০ হাজার সাঁওতাল নিহত হয়। পরে সাঁওতালদের সুরক্ষার জন্য ‘সাঁওতাল পরগণা’ গঠিত হয়।

বিহারের চম্পারণ জেলার কৃষকরা নীলকরদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিল। সেখানে প্রচলিত ছিল তিনকাঠিয়া প্রথা। ব্রিটিশ নীলকররা কৃষকদের মোট জমির প্রতি বিঘার তিন কাঠা জমিতে নীল বুনতে বাধ্য করত কৃষকদের। সেই সঙ্গে ছিল নানা অবৈধ কর ও চড়া খাজনা। এই অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য স্থানীয় কৃষক নেতা রাজকুমার শুক্ল গান্ধীজিকে চম্পারণে আসতে অনুরোধ করেন। ১৯১৭ সালের এপ্রিল মাসে গান্ধীজি চম্পারণে আসেন এবং অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। এর ফলে ব্রিটিশ সরকার তিনকাঠিয়া প্রথা বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং ক্ষতিপুরণ দেয় ও ফিরিয়ে দেয় কৃষকদের ন্যায্য অধিকার।

১৯১৮ সালে গুজরাটের খেদা অঞ্চলে খরা ও পোকামাকড়ের আক্রমণে ফসল নষ্ট হয়, প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় এবং অঞ্চলটি দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এই দুর্যোগের মধ্যেও রাজস্ব আদায়ের কড়াকড়ি করে। ভূমি রাজস্ব আইন অনুযায়ী ফলন স্বাভাবিকের একের চার অংশ কম হলে মওকুফ পাওয়ার কথা থাকলেও ব্রিটিশ সরকার তা গ্রাহ্য করেনি। তখন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও গান্ধীজির নেতৃত্বে অহিংস লড়াই শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার নতি স্বীকার করে।

ব্রিটিশদের নতুন ভূমি আইন ও খাজনা ব্যবস্থার জন্য কেরালার মালাবার অঞ্চলের মোপলা কৃষকরা সর্বস্বান্ত ও ভূমিহীন হয়ে পড়ে। তার সঙ্গে ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু জমিদারদের সীমাহীন শোষণ ও অতিরিক্ত কর আদায়। তাই ১৯২১ সালের ২০ আগস্ট আলি মুসালিয়ার, ভারিয়ানকুন্নাথ কুঞ্জহাম্মদ হাজির নেতৃত্বে কেরালার তিরুরাঙ্গাদি অঞ্চলে বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে। ব্রিটিশ সরকার সামরিক আইন জারি করে, স্পেশাল মালাবার ফোর্স গঠন করে হাজার হাজার মোপলা কৃষককে হত্যা করে।

ব্রিটিশ সরকার ১৯২৮ সালে গুজরাটের বারদৌলিতে কৃষকদের জমির খাজনা ২২% থেকে ৩২% বাড়িয়ে দেয়। আর্থিক সংকট ও ফসলের প্রভূত ক্ষতি হলেও কর কমানোর আবেদন গ্রাহ্য করেনি। কৃষকদের জমি বাজেয়াপ্তও করেছিল ব্রিটিশ সরকার। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বে এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে ব্রিটিশ সরকার। করের হার কমিয়ে ৬.০৩% করে এবং বাজেয়াপ্ত জমি ফিরিয়ে দেয়।

বাংলায় জমির ভাগচাষী বা বর্গাদাররা সারাদিন পরিশ্রম করে ফসল ফলালেও মালিক বা জোতদারেরা অর্ধেক বা তার বেশি ফসল জোর করে দখল করে নিত। ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগ চাষিকে দেওয়ার সুপারিশ ফ্লাউড কমিশন করলেও মালিকরা তা মেনে নেয়নি। তাই ইলা মিত্র, মণিকৃষ্ণ সেন, হাজি মোহাম্মদ দানেশের নেতৃত্বে দিনাজপুর, রংপুর, জলপাইগুড়ি, সুন্দরবনের কাকদ্বীপে শুরু হয় তেভাগা আন্দোলন। কৃষকরা ফসল কেটে জোতদারের ঘরে না দিয়ে নিজেদের গোলায় তোলে।

হায়দ্রাবাদের নিজামের সামন্ত্রতান্ত্রিক শাসন ও শোষণ, অবৈধভাবে জমি দখল, অতিরিক্ত কর আদায়, জোরপূর্বক শ্রম বা ভেত্তি প্রথার বিরুদ্ধে তেলেঙ্গানায় কৃষকরা বিদ্রোহ করে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে। এই বিদ্রোহ চলেছিল ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত। ১৯৪৬ সালে জমিদারদের গুণ্ডার হাতে আন্দোলনকর্মী দোদ্দি কোমারাইয়ার শহিদ হওয়ার পরে আন্দোলন সশস্ত্র আন্দোলনের রূপ নেয়। প্রতিরোধের জন্য কৃষকরা গড়ে তোলে গেরিলা স্কোয়াড। তেলেঙ্গানার প্রায় ৩ হাজার গ্রামে জমিদার ও নিজামের বাহিনী হটিয়ে দিয়ে সমান্তরাল সরকার (গ্রাম রাজ্যম) প্রতিষ্ঠা করে।

স্বাধীনতা পরবর্তী কৃষক আন্দোলন

ভাকরা নাঙাল বাঁধ প্রকল্পের খরচ তোলার জন্য পাঞ্জাব সরকার কৃষকদের উপর অতিরিকত কর চাপায়। এর নাম ছিল ‘বেটারমেন্ট লেভি’ বা ‘উন্নতি শুল্ক’। সেচ খালের সুবিধা পাওয়ার আগেই এই চড়া কর আরোপ করায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি চাষির মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অল ইণ্ডিয়া কিষাণ সভার নেতৃত্বে পাঞ্জাবের একাধিক জেলার কৃষকরা একত্রিত হয়ে অহিংস পন্থায় প্রতিবাদ জানায়। কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ লড়াইএর ফলে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাঞ্জাব সরকার।

কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতালের নেতৃত্বে ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলার নকশালবাড়িতে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের মূলে ছিল দরিদ্র কৃষক ও আদিবাসীদের অধিকার ও জোতদারদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ভূমি বণ্টনের অসাম্য, কৃষকদের অর্থনৈতিক সংকট, গ্রামীণ সমাজে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ তৈরি করেছিল নকশাল আন্দোলনের পটভূমি। ভূমি সংস্কারের বাস্তবায়ন ব্যর্থ হওয়ায় এবং মহাজনী প্রথা, দমন-পীড়ন ও শোষণের অভিজ্ঞতা তীব্র হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে সংগঠিত প্রতিরোধের মানসিকতা জেগে ওঠে। কলকাতার বহু মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী নকশালবাড়ির আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়। আন্দোলনটি ছড়িয়ে পড়ে বিহার, ছত্তিশগড়, অন্ধ্রপ্রদেশে। এই আন্দোলন নতুন একটি কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম দেয়।

সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা ( SKM)

আমরা এবার আলোচনা করব ভারতের সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের কথা। তার আগে বলে নেওয়া দরকার সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার কথা। এই সংস্থাটি পরিচালনা করে সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন। সংস্থাটির জন্ম ২০২০ সালের নভেম্বরে। চার শতাধিক কৃষক সংগঠন নিয়ে এই মোর্চা গঠিত। এতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ ও অন্যান্য রাজ্যের কৃষক ইউনিয়ন অন্তর্ভুক্ত। অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে আছে ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি সহযোগী, ক্রান্তিকারি কিষাণ ইউনিয়ন, অখিল ভারতীয় কিষাণ সভা, জামহুরি কিষাণ সভা, কুল হিন্দ কিষাণ ফেডারেশন প্রভৃতি।

সংযুক্ত কিষাণ সভার সাত সদস্যের কমিটিতে আছেন : জগজিৎ সিং ডাল্লেওয়াল, ড. দর্শন পাল, অতুলকুমার অঞ্জন, হান্নান মোল্লা, বলবীর সিং রাজেওয়াল, অশোক ধাওয়াল, যোগেন্দ্র যাদব, গুরনাম সিং চাদুনি, শিবকুমার কাক্কা।

২০২০-২১-এর কৃষক আন্দোলন

এই কৃষক আন্দোন শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ২৬ নভেম্বর। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটি বৃহত্তম, দীর্ঘতম এবং শক্তিশালী কৃষক আন্দোলন। কর্পোরেটপন্থী তিনটি কৃষি আইন বাতিল করার মূল দাবি নিয়ে এই আন্দোলন। ২০২০ সালের জুন মাসে অধ্যাদেশ জারি হওয়ার আগে কোন কৃষক সংগঠনের সঙ্গে পরামর্শ করেনি সরকার, কোন রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করা হয় নি। তিনটি কৃষি আইন এইরকম :

ক] এপিএমসি ভেঙে দেওয়া, কৃষি পণ্যের সম্পূর্ণ বাণিজ্য দেশীয় ও বিদেশি কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়া। আইনটির চূড়ান্ত লক্ষ্য হল এমএসপি এবং খাদ্যশস্যের সরকারি সংগ্রহ সম্পূর্ণরূপে বাতিল করা। ফলে সমগ্র গণবণ্টন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

খ] সারাদেশে চুক্তিভিত্তিক চাষকে উৎসাহিত ও প্রসারিত করা। এর ফলে শক্তিশালী কর্পোরেট সংস্থাগুলি কৃষকদের লুঠ করতে পারবে। কোন বিরোধের ক্ষেত্রে কৃষকের আদালতে যাওয়ার বিধান নেই।

গ] সরকার সাতটি সবচেয়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (চাল, ডাল, গম, রান্নার তেল, পেঁয়াজ, আলু) মজুদের উপর থেকে সমস্ত বিধি-নিষেধ তুলে নিয়েছে। ফলে কর্পোরেট সংস্থা ও বড় ব্যবসায়ীরা এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যগুলি মজুত ও কালোবাজারি করার অবাধ সুযোগ পাবে, এগুলির দাম বাড়বে।

এছাড়াও কৃষকদের অন্য দাবি ছিল :

ক] ড. এম এস স্বামীনাথনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় কৃষক কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করার জন্য একটি আইন প্রণয়ন করা এবং উৎপাদনের সামগ্রিক খরচের দেড় গুণ হারে কৃষি পণ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করা।

খ] বিদ্যুৎ সংশোধনী বিল ২০২০ প্রত্যাহার করা।

ড. অশোক ধাওয়াল এই দীর্ঘতম আন্দোলনের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন :

১] এর নেতৃত্বে রয়েছে দেশের ৫০০-র বেশি কৃষক সংগঠন, যারা সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার মঞ্চের তলায় একজোট হয়েছে। কৃষক সমাজের সর্বস্তরের মানুষ আছে এর মধ্যে।

২] এটি বিজেপি রাজ্য সরকারগুলির পক্ষ থেকে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান, লাঠিচার্জের মতো প্রচণ্ড দমন-পীড়ন মোকাবিলা করেছে। ২৬ শে জানুয়ারি সরকার প্রযোজিত সহিংসতার পর কৃষকদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার, তাদের বিরুদ্ধে এফ আই আর, জলবায়ু কর্মীদের গ্রেপ্তার, নিউজক্লিকের মতো স্বাধীন সংবাদ পোর্টালে ইডির অভিযানের মতো সমস্ত প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠেছে।

৩] এটি বিজেপি-আর এস এসের ক্রমাগত অপবাদের শিকার হয়েছে, এবং বলা হয়েছে যে এই সংস্থা — খালিস্তানি, মাওবাদী, এমনকি পাকিস্তান, চিনের দ্বারা উস্কানিপ্রাপ্ত।

৪] লক্ষ লক্ষ কৃষক ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে দিল্লি অবরোধ করে রাখলেও আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। ২৫০ জনের বেশি কৃষক শহিদ হয়েছেন। ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসে কেন্দ্রীব সরকার, তার পুলিশ এবং তাদের এজেন্টদ্বারা সংঘটিত সহিংসতাকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিহত করেছে কৃষকরা।

৫] আন্দোলনটি ছিল বিশুদ্ধভাবে ধর্মনিরপেক্ষ।

৬] ৮ ডিসেম্বরের ভারত বন্ধের অভূতপূর্ব সাফল্যের পরে শ্রমিক শ্রেণি ও সমাজের অন্যান্য সকল স্তরের ব্যাপক সমর্থনে এই আন্দোলন এক গণ সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

৭] এই আন্দোলন বিজেপি-আর এস এসের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার ও আম্বানি-আদানির প্রতীক ভারতীয় ও বিদেশি কর্পোরেট লবির ভেতরকার দুর্নীতিগ্রস্ত আঁতাতকে সরাসরি চিহ্নিত করে তার উপর আঘাত হেনেছে।

লখিমপুর খেরির হত্যাকাণ্ড

২০২১ সালের ৯ অক্টোবর কৃষক সংগঠনগুলি লখিমপুর খেরির হত্যাকাণ্ডকে একটি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ বলে আখ্যায়িত করেছিল যা গত ১০ মাস ধরে চলমান কৃষক আন্দোলনকে ভেঙে দেওয়ার একটি সুচতুর পরিকল্পনা।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অজয় মিশ্র ও তাঁর ছেলে আশীষ মিশ্র কৃষকদের কটূক্তি করতেন। বলতেন ‘খালিস্তানীরা কৃষকদের নামে কাজ করছে’। বলতেন, ‘এই আন্দোলনে বাবর খালসা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাত আছে’। ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা আয়োজিত কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে এবং ২৫ সেপ্টেম্বর পালিয়ায় ক্রান্তিকারী কিষাণ ইউনিয়ন ও ভারতীয় কিষাণ ইউনিয়নের প্রতিবাদ সভায় অজয় মিশ্রদের কালো পতাকা দেখানো হয়।

এর জবাবে বিজেপির এক সভায় অজয় মিশ্র উদ্ধতভাবে ঘোষণা করেন, ‘এই ধরনের লোকেদের আমি শুধু একটা কথাই বলতে চাই : ভদ্রভাবে আচরণ করুন, নইলে ২ মিনিটের মধ্যে আপনাদের শায়েস্তা করব। আমি শুধু একজন মন্ত্রী নই। যারা আমাকে চেনেন তারা এও জানেন যে আমি চ্যালেঞ্জ থেকে পালিয়ে যাই না। আপনাদের লখিমপুর ছাড়তে হবে।’

এই ভাষণের জেরে ৩ অক্টোবর টিকুনিয়া গ্রামে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেই সমাবেশে আশীষ মিশ্র এস ইউ ভি গাড়ি দিয়ে ৪ জন কৃষক ও স্থানীয় সাংবাদিক রমন কাশ্যপকে চাপা দেন।

সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন — দ্বিতীয় পর্ব

পাঞ্জাব ও হরিয়ানার বেশ কয়েকটি কৃষক সংগঠন ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে দিল্লির কিষাণ ঘাটে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। সমাবেশের কারণ সরকার প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা। তাঁদের মতে এই চুক্তি কৃষক, কৃষি ও ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য গুরুতর হুমকি। সংযুক্ত কিষাণ মোর্চা এই মর্মে রাষ্ট্রপতিকে একটি চিঠি লিখেছেন। সেই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে কর্পোরেট চাপে এবং পর্যাপ্ত জনমত যাচাই ছাড়াই চুক্তিগুলি সম্পাদনের চেষ্টা করা হচ্ছিল।

২০২৬ সালের ২০ জুলাই পাঞ্জাব ও অন্যান্য রাজ্য থেকে কৃষকদের গাড়িবহর দিল্লির দিকে যাত্রা শুরু করে। অনেককে বিভিন্ন সীমান্ত চৌকিতে থামিয়ে দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও কিছু আন্দোলনকারী কিষাণ ঘাটে পৌঁছান। দিল্লিতে প্রবেশের সুযোগ না পেয়ে কৃষকরা শম্ভু সীমান্তে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন