Logo
এই মুহূর্তে ::
কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবিতার আয়ুষ্কাল — নজরুলের বিদ্রোহী : রফিকুর রশীদ বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হেলালগীতি : ড.মুন্সি আবু সাইফ সোনাম ওয়াংচুক — গান্ধিবাদী অনশনের ঐতিহ্য : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নুসরাত সুলতানা-র ছোটগল্প ‘ইনকিউবেটর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্পেন — রবীন্দ্রনাথ কখনও এখানে খেতে আসেননি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জাতি সংঘের চিঠি : নির্বাচন কমিশন ও ভারত সরকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি ডালিয়া — ডায়েট ফ্রেন্ডলি রেসিপি : রিঙ্কি সামন্ত ছানি অপারেশন কোথায় ও কখন করা উচিত : ডা. তনুশ্রী চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অপারেশন লোটাসের ইতিবৃত্ত : দিলীপ মজুমদার ওড়িশার পঞ্চদশ শতকের মহাকবি সরলা দাসের কোটিপূজাই আজ খুঁটিপূজা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ঢেউ-এর দোলায় তসলিমা নাসরিন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৪৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

[পাঠকের জন্য অনুবাদকের সতর্কীকরণ — এর আগে থেকেই কিন্তু শুরু হয়েছে মূল টেক্সট অনুবাদের থেকে অনেক বেশি যোগ হচ্ছে সেই পাঠের বিস্তৃত টিকা — অনুবাদক]

৪৬. ১৭২২ থেকে ১৭৫৫ পর্যন্ত সমস্ত আর্থিক কাজকর্ম চলার সময়ে ‘তুমার’ বা প্রমিত রাজস্ব নির্ধারণের (তুমার — ‘তুমার বা প্রমিত রাজস্ব-নির্ধারণ’ হল, আকবরের রাজস্বমন্ত্রী টোডরমলের জরিপের ভিত্তিতে তৈরি মুঘল শাসনের মূল রাজস্ব-তালিকা, যে তালিকা পরবর্তী সব রাজস্ব বন্দোবস্তের ভিত্তি হিসেবে কাজ করত) হার প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। চাষাবাদ এলাকা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে যদি কখনও রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভূত হতো, তবে রাজস্ব/খাজনা সেই অনুপাতে তা বৃদ্ধি করা হত। কাসিম আলীর শাসনকালের সমাপ্তিলগ্নে বাংলার রাজস্ব-ব্যবস্থা সম্পর্কে মি. গ্রান্টের বিবরণ —

বাংলার রাজস্ব বন্দোবস্ত, ১৭৬৩ (সারসংক্ষেপ)

বাবদ                                                                                 টাকা (Rs.)

তুমার বা প্রমিত রাজস্ব-নির্ধারণ                                                       ১,৪১,১৬,১১৬

আলিবর্দি খানের মৃত্যু (১৭৫৬) পর্যন্ত আবওয়াব (আটটি খাতে),

এবং কাসিম আলি-র শার্ফ সিক্কা                                                      ৪২,২৩,৪৬৭

কাসিম-এর কেফায়েত (তিনটি খাতে), এবং

জাফর খানের আবওয়াব-ই-সুবাহদারি (আংশিক)                                      ৪৫,২৩,৫৬৩

মীর কাসিমের তাওফির (ঢাকার জাগির-ই-নওয়ারা-সহ বৃদ্ধি)                         ৩১,৬২,৩৫৮

মোট রাজস্ব (যোগফল)                                                  ১,১৯,০৯,৩৮৮

বিয়োগ : নির্ধারিত সুবিধা ও খরচ                                                     ৪,০১,২৭৬

১৭৬৩ সালে বাংলার নিট রাজস্ব                                                      ২,৫৬,২৪,২২৩ [টিকা-১]

টিকা-১

এই তালিকা ১৭৬৩-এর  মীর কাসিমের (কাসিম আলি খান) আমলের বাংলার রাজস্ব আদায়ের চূড়ান্ত হিসাব দেখায়। এই তালিকা জেমস গ্র্যান্ট তাঁর মিনিট বা বিশ্লেষণে ব্যবহার করেছিলেন এবং জন শোর তাঁর মিনিটে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছিলেন। অনুবাদকের ব্যাখ্যা —

১. তুমার (প্রমিত রাজস্ব) : মুঘল আমলে বাংলার মূল রাজস্ব-নির্ধারণ; তৈরি হয়েছিল টোডরমলের জরিপের ভিত্তিতে (১৫৮২)।

২. আবওয়াব (অতিরিক্ত খাজনা) : আলিবর্দি খানের মৃত্যু (১৭৫৬) পর্যন্ত আরোপিত বিভিন্ন খাজনা, এবং কাসিম আলি-র শার্ফ সিক্কা (মুদ্রা বিনিময় কর — যাকে নবাবি আমলে প্রচলিত অর্থে বাটা বলা হত)।

৩. কেফায়েত আর তাওফির : মীর কাসিম আরোপিত বিভিন্ন কর ও জাগির-সংক্রান্ত আয় বৃদ্ধি।

৪. মোট রাজস্ব (১,১৯,০৯,৩৮৮ টাকা) : আবওয়াব, কেফায়েত ও তাওফির যোগ করে পাওয়া মোট রাজস্ব।

৫. নির্ধারিত সুবিধা আর খরচ (৪,০১,২৭৬ টাকা) : প্রশাসনিক বা অন্য ব্যয় বাবদ কাটা।

৬. নিট রাজস্ব (২,৫৬,২৪,২২৩ টাকা) : চূড়ান্ত রাজস্বের পরিমাণ, যা ফিফথ রিপোর্টের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এই তালিকা সূত্রে একটা বিষয় পরিষ্কার, ১৭৬৩-এ বাংলার রাজস্ব ১৫৮২-র তুলনায় অর্থাৎ প্রায় ১৮০ বছর পর প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছিল—যা মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে আরোপিত বিপুল অতিরিক্ত করের ফল।

৪৭. কাসিম আলী বা অন্য নাজিম যে আদৌ এই পরিমাণ অর্থ আদায় করতে পেরেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি; তাছাড়া দু’এক বছর পর পর এই পরিমান অর্থ আদায় সম্ভব হলেও, একে স্থায়ী আর নিয়মিত আদায়যোগ্য রাজস্ব হিসেবে নির্ধারণ করার যৌক্তিকতা প্রমাণিত হয় না। অত্যাচার এবং জবরদস্তি আদায়ের নজির গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, বিশেষ করে যারা এমন আচরণের অনুকরণ করতে চান না; আর দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের পদ্ধতি ফলপ্রসূও হতে পারে না। ১৭২২ থেকে ১৭৬৩ সাল—এই একচল্লিশ বছরের মধ্যে রাজস্বের পরিমাণ যেভাবে দ্রুত বৃদ্ধি করা হয়েছিল এবং যে প্রক্রিয়ায় তা কার্যকর করা হয়েছিল, তা-ই এই পদক্ষেপের যৌক্তিকতা বা যথার্থতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো যুক্তি হিসেবে দাঁড়ায়। এর বিপরীতে অন্য কোনো যুক্তি বা খণ্ডনকর্ম কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যদি এমন প্রমাণ পাওয়া যায় যে দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি এই বাড়তি কর আরোপের পক্ষে ছিল (অর্থাৎ, এই পরিমাণ অর্থের সমতুল্য প্রকৃত ও ন্যায্য আয়ের উৎস ছিল) অথবা নির্ভরযোগ্য নথিপত্রে প্রমাণিত হয় যে, এভাবে বর্ধিত রাজস্বের পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে পরপর বেশ কয়েক বছর ধরে আদায় করা হয়। যেখানে কেবল যুক্তিতর্ক দিয়ে কাউকে আশ্বস্ত করা সম্ভব হয়নি, সেখানে এ ধরনের বাস্তব তথ্য বা প্রমাণ হয়তো গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারত। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১১৬৮ বঙ্গাব্দের (যা ১৭৬১-র এপ্রিল থেকে ১৭৬২-র মাঝের সময়ের সমতুল্য) শেষে বকেয়া রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৭৯,৭৪,০৬৫ টাকা।

৪৮. এখানে কাসিম আলীর কার্যকলাপ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া দরকার; এবং এ উদ্দেশ্যে আমি দিনাজপুরের উদাহরণ বেছে নেব, কারণ বর্তমান নির্ধারিত রাজস্বের চেয়ে অনেক বেশি রাজস্ব আদায়ের সক্ষমতা যে ওই জমিদারির আছে—তার প্রমাণ হিসেবে সম্প্রতি এই উদাহরণটাই তুলে ধরা হয়েছে।

৪৯. পরিশিষ্টে দিনাজপুর অঞ্চলের বাংলা ১১৬৯ সনের (যা ১৭৬২ সালের এপ্রিলে শুরু হয়েছিল) রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় এবং বকেয়া সংক্রান্ত দুটি হিসাব রয়েছে। প্রথমটিতে সরকারের সাথে ইজারাদারের (ফার্মার) শর্তাবলি উল্লেখ করা হয়েছে; দ্বিতীয়টিতে রয়েছে সেই শর্তাবলি পূরণের লক্ষ্যে তিনি ওই জেলায় যে বন্দোবস্ত করেছিলেন তার বিবরণ। [টিকা-২]

৫০. ‘তুক্কুদ্দার’ বা ইজারাদার ছিলেন রামনাথ বাড়ৈ; তিনি আগের বছর দিনাজপুরের ‘হস্তাবুদ’ বা আয়ের উৎস ও সম্পদের হিসাব যাচাইয়ের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কাসিম আলী তাঁরই দেখানো সম্পদের হিসাবকে কাজে লাগিয়ে তাঁকে ওই জেলার রাজস্ব আদায়ের চুক্তিতে আবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করেন; এবং তিনি সেই চ্যালেঞ্জ বা পরীক্ষাটি গ্রহণ করেন। তাঁর অস্বীকৃতি জানানোর অর্থ হতো এটা স্বীকার করে নেওয়া যে, তাঁর করা হিসাবটি ছিল গণ্ডগোলের। [টিকা-৩]

৫১. এই বন্দোবস্তের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল মূল রাজস্ব ও করের একটি সমন্বিত ও বর্ধিত অঙ্কের ওপর; এর সাথে সেই বছর আরও কিছু অতিরিক্ত কর ও দাবি যুক্ত করা হয়েছিল। প্রথমত, ‘নজরানা-মহাল’ (nuzzeranahal)—যা পূর্ববর্তী ‘নজরানা-মুকরারি’ (nuzzerana mokurrary) করের চেয়ে ভিন্ন ছিল। যদি এর কোনো বাস্তব বা সম্ভাব্য আয়ের উৎসের সাথে সম্পর্ক থাকে, তবে এর অর্থ হতে পারে অধীনস্থ প্রজাদের সাথে চুক্তি সম্পাদনের সময় প্রাপ্ত উপঢৌকন। দ্বিতীয়ত, ‘সারফ’ (Serf) বা টাকার বাট্টা (discount), যার হার ছিল প্রতি ১০০ টাকায় ৯ টাকা ৬ আনা। তৃতীয়ত, ‘কাচা’ (Cutcha) বা ‘গুইরে বেকেনি’ (guire bekenny)—যার অর্থ হলো প্রজাদের ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দেওয়া জমির একাংশ (এক বিঘা জমির এক-দশমাংশ) পুনরায় বাজেয়াপ্ত বা প্রত্যাহার করে নেওয়া। এ ছাড়াও, রাজস্বের আনুষঙ্গিক বা অনিয়মিত উৎস থেকে সম্ভাব্য আয় ২১,৩৩৭ টাকা হিসেবে দেখানো হয়েছিল; এবং অতিরিক্ত ৪৮,৪৫০ টাকা সংগ্রহের উৎস হিসেবে জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রির বিষয়টিও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

৫২ আবওয়াব ও অন্যান্য করের পুনরালোচনা (সারসংক্ষেপ)

ক্রম      করের নাম        পরিমাণ (টাকা)

১.        নজরানা-হাল (আসলের ওপর ১০/২৪ অংশ বা ৫.৫ মাসের শতকরা হারে কর)                ২,৯৭,৮৫৯

২.       শার্ফ বা বাট্টা (প্রতি রুপিতে ১১.৫ আনা হারে মুদ্রা বিনিময় কর)                               ২,৫৩,৬৮০

৩.       কুচ্ছা বলান্নি (রায়তদের দখলকৃত জমির ১/১০ অংশ পুনরুদ্ধার)                               ১,০০,০০০

মোট                                                                            ৬,৫১,৫৩৯

৪.       আনুমানিক আদায় (হাসবুল-ওসুলি মারোচা)                                                    ২১,৩৩৭

৫.       জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রি (বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়)                                            ৪৮,৫৪০

মোট                                                                            ৬৯,৮৭৭

সর্বমোট (সকল প্রকার রুপি)                                                                   ৭,২১,৪১৬

[ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট – ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের ৫২ নম্বর পৃষ্ঠা তালিকা দিনাজপুরের রাজস্ব বিবরণীর সংক্ষিপ্ত পুনরালোচনা। মূলত ১৭৬২-৬৩-র (১১৬৯ বঙ্গাব্দ) দিনাজপুর জেলায় আরোপিত আবওয়াব (অতিরিক্ত কর)-এর সারসংক্ষেপ — এটাই ফিফথ রিপোর্টের গ্র্যান্ট-শোর বিতর্কের ভিত্তি। করগুলোর ব্যাখ্যা —

১. নজরানা-হাল (২,৯৭,৮৫৯ টাকা) : এটি মূল রাজস্বের (আসল) ওপর ১০/২৪ অংশ বা ৫.৫ মাসের শতকরা হারে ধার্য করা কর। এটি মূলত জমিদার বা কর্মকর্তাদের উপহার/কর হিসেবে আরোপিত হতো।

২. শার্ফ বা বাট্টা (২,৫৩,৬৮০ টাকা) : পুরাতন ও নতুন মুদ্রার বিনিময়ে কৃষকদের ওপর চাপানো অতিরিক্ত কর (প্রতি রুপিতে ১১.৫ আনা হারে)। এটি মূলত কৃষকদের আর্থিক লেনদেনের ওপর আরোপিত হতো।

৩. কুচ্ছা বলান্নি (১,০০,০০০ টাকা) : রায়তদের দখলকৃত জমির ১/১০ অংশ পুনরুদ্ধার – এটি জমিদারি দখল বাড়ানোর কৌশল; এর মাধ্যমে কোম্পানি পরোক্ষভাবে জমিদারি বাড়াতে চাইছিল।

৪. আনুমানিক আদায় (২১,৩৩৭ টাকা) : বিভিন্ন উৎস থেকে আনুমানিক আদায় (যেমন হাসবুল-ওসুলি মারোচা)।

৫. জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রি (৪৮,৫৪০ টাকা) : জমিদারদের থেকে বাজেয়াপ্ত বা বিক্রি হওয়া সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয়। ঐতিহাসিক তাৎপর্য: এই ৭,২১,৪১৬ টাকা ছিল দিনাজপুরের মূল রাজস্বের (২৫,২৯,৪৬৩ টাকা) ওপর চাপানো অতিরিক্ত কর, যা কৃষকদের জন্য ছিল প্রায় ২৮.৫% অতিরিক্ত বোঝা; জেমস গ্র্যান্ট এই করগুলোকেই প্রমাণ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন যে বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব — কারণ মূল রাজস্বের তুলনায় এই করগুলো ছিল ‘অতিরিক্ত’ এবং ‘ঐতিহাসিক’; অন্যদিকে, জন শোর এই করগুলোকেই কৃষক-শোষণের প্রমাণ হিসেবে দেখান এবং সতর্ক করেন যে এই ধরনের কর আরোপ কৃষকদের জীবন-জীবিকা ধ্বংস করবে — যা ১৭৭০-এর মন্বন্তরে প্রমাণিত হয়েছে। এই তালিকা ফিফথ রিপোর্টের সেই ঐতিহাসিক দলিলগুলোর একটি, যা ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির নির্মমতা ও কৃষক-শোষণের কাঠামো উন্মোচন করে। — অনুবাদক]

৫৩. অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের খরচ পূর্বের ৪,৮৭,২৪১ রুপি থেকে কমিয়ে ২,৯৩,৬৮৪ রুপিতে নামিয়ে আনা হয়েছিল। হিসাবের বিভিন্ন যোগ-বিয়োগের বিস্তারিত বিবরণে না গিয়ে আমি সেই নিট অর্থের পরিমাণ উল্লেখ করছি যা পূর্ববর্তী ইজারাদার চলতি বছরের রাজস্ব হিসেবে পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—সমস্ত কর্তন বা ছাড় বাদ দিয়ে যার পরিমাণ ছিল ২৬,৪৪,৭৩৩ সিক্কা রুপি (St R); এর সাথে যুক্ত করা হয়েছিল আগের বছরের বকেয়া অর্থের একটি অংশ (যা আদায়যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিল) এবং চুন সরবরাহের বাবদ বকেয়া পাওনা, যার ফলে তাঁর মোট প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৭,০৬,০১৯ সিক্কা রুপি।

টিকা-২

৪৮, ৪৯ পয়েন্টে উল্লিখিত পরিশিষ্ট

দিনাজপুরের রাজস্ব বন্দোবস্ত, আদায় ও উদ্বৃত্তের বিবরণী, ১১৬৯ বঙ্গাব্দ (১৭৬২-৬৩ খ্রিস্টাব্দ)

চুক্তিবদ্ধ খাজনা-ঠিকাদার রামনাথ বুদ্ধির স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী

১. মূল রাজস্ব (মাহাল ও সায়ের)

খাত                                           টাকা               আনা               পয়সা

মাহাল (ভূমি রাজস্ব) :

পূর্ববর্তী কর-সহ খাজনা     ২৫,২৯,৪৬৩      ২                  ১                  ০

সায়ের(শুল্ক ও পরিবর্তনশীল কর) :

শুল্ক ও অন্যান্য

পরিবর্তনশীল খাত           ১,২৭,৪৬৮        ৮                  ১৪                 ০

২. নতুন কর/আবওয়াব

খাত                                           টাকা               আনা               পয়সা

নজরানা-হাল (আসলের ওপর ১০/২৪ অংশ

বা ৫.৫ মাসের

শতকরা হারে কর)                   ২,৯৭,৮৫৯        ০                  ৫                  ১

হাসবুল-ওসুলি মারোচা

(আনুমানিক আদায়)         ২১,৩৩৭           ৫                  ১৪                 ০

জমিদারদের সম্পত্তি বিক্রি

(বিক্রি থেকে প্রাপ্ত আয়)    ৪৮,৫৪০           ৭                  ৬                  ৩

৩. মোট রাজস্ব (সকল খাতের সমষ্টি)

বিবরণ                                                             টাকা               আনা               পয়সা

সকল প্রকার আদায়ের মোট জুমা               ৩০,২৪,৭০৮      ৮                  ৪                  ০

বিয়োগ: সিক্কা রুপিতে রূপান্তরে স্বল্পতা         ৪,৬৭,৫০২        ১৩                ১৪                 ০

অবশিষ্ট (সিক্কা রুপি)                           ২৫,৫৭,২০৫      ১০                 ১০                 ০

৪. অতিরিক্ত কর

খাত                                                               টাকা               আনা               পয়সা

শার্ফ বা বাট্টা

(প্রতি রুপিতে ১১.৫ আনা হারে ছাড়)           ২৫,৩৬৮                    ০                  ৫                  ০

কুচ্ছা বলান্নি (রায়তদের দখলকৃত জমির

১/১০ অংশ পুনরুদ্ধার)                        ১,০০,০০০         ০                  ০                  ০

৫. সমন্বিত জুমা

বিবরণ                                                             টাকা               আনা               পয়সা

সমন্বিত জুমা (সিক্কা রুপি)                     ২৯,১০,৮৮৫      ১০                 ১৫                ০

৬. আদায়-ব্যয় (সেরিঞ্জামি)

খাত                                                               টাকা               আনা               পয়সা

স্বাভাবিক ভাতা                                 ৪,৮৭,২৪১        ৫                  ৫                  ০

পুনরুদ্ধৃত (অননুমোদিত)                       ১,৯৩,৫৫৬        ৫                  ৯                  ০

সকল প্রকার বাদ-বাকি                        ২,৯৩,৬৮৪        ১৫                ১৬                ০

বিয়োগ: স্বল্পতা                                 ২৫,৫৩২           ১৫                ১৬                ০

আদায়-ব্যয়ের জন্য অনুমোদিত                 ২,৬৬,১৫২        ০                  ০                  ০

৭. নিট জুমা (সিক্কা রুপিতে)

খাত     মোট টাকা         শার্ফ/বাট্টা         নিট জুমা

মাহাল   ১৭,৯৫,৮০৮      ৪        ১০       ০        ২,১১,৮০১         ৫        ১৮      ০        ২০,০৭,৬১০

সায়ার   ১,২৭,৪৬৮        ৮        ১৪       ০        ১১,৯৫০ ৩        ৭        ০        ১,৩৯,৪১৮

নজরানা  ২,৯৭,৮৫৯        ৫        ১        ০        ২৭,৯২৪ ৪        ১০       ০        ৩,২৫,৭৮৩

হাসবুল-ওসুলি     ২১,৩৭৭ ৫        ১৪       ০        ২,০০৪   ২        ১০       ০        ২৩,৩৮১

জমিদারি সম্পত্তি বিক্রি      ৪৮,৫৪০ ৭        ৬        ৩        –         –         –         –         ৪৮,৫৪০

কুচ্ছা বলান্নি       ১,০০,০০০         ০        ০        ০        –         –         –         –         ১,০০,০০০

সর্বমোট  ২৩,৯১,০৫৩      ১০       ১০       ০        ২,৫৩,৬৮০        ০        ৫        ০        ২৬,৪৪,৭৩৩      ১০       ১৫      ০

দিনাজপুরের রাজস্ব বিবরণী (দ্বিতীয় অংশ) – ১১৬৮ ও ১১৬৯ বঙ্গাব্দ

বিবরণ             টাকা     আনা     পয়সা

১১৬৮ বঙ্গাব্দের জন্য চুয়ান (খাদ্য/জোগানের বরাদ্দ)     ৭,৬৯৮            ৮        ১০       ০

১১৬৯ বঙ্গাব্দের হিসাবে                                  ৩০,৪০০           ০        ০        ০

মোট                                            ৩৮,০৯৮               ৮      ১০     ০

১১৬৯ বঙ্গাব্দের নিট জুমা

(সকল খরচ বাদে, সিক্কা রুপিতে)                       ২৬,৮২,৮৩২      ৩        ৫        ০

১১৬৯ বঙ্গাব্দের উদ্বৃত্ত, এই

বছরের জুমায় অন্তর্ভুক্ত                                  ২৩,১৮৭           ১২       ১৪       ০

১১৬৯ বঙ্গাব্দের নিট জুমা (সকল খরচ বাদে,

সিক্কা রুপিতে)                                           ২৭,০৬,০১৯       ১৫      ১৯       ০

আদায় :                       

সকল প্রকার রুপিতে মোট আদায়                       ২১,২০,৩৮০       ১৫      ১৬      ০

বিয়োগ: স্বল্পতা (কম ওজন)                              ১,৮৮,১৮৫        ০        ০        ০

সিক্কা রুপিতে আদায়                                     ১৯,৩২,১৯৫       ১৫      ১৬      ০

বকেয়া/উদ্বৃত্ত                                            ৭,৭৩,৮২৪        ০        ৩        ০

অনুবাদকের লেখা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট — এই নথিটি ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশটা ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির জটিলতা ও কৃষক-শোষণের কাঠামো খুলে ধরে। ১৭৬২-৬৩-র দিনাজপুরের এই রাজস্ব বিবরণী দেখায় কীভাবে ব্রিটিশ আমলে প্রচলিত মুঘল রাজস্ব কাঠামোর ওপর নতুন কর (আবওয়াব) চাপিয়ে কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা বাড়ানো হয়েছিল। নথির মূল বৈশিষ্ট্য : —

১. মূল রাজস্ব ও নতুন করের সমন্বয় : দিনাজপুরের মূল রাজস্ব (মাহাল ও সায়র) ছিল ২৬,৫৬,৯৩১ টাকা; কিন্তু নতুন কর (নজরানা-হাল, হাসবুল-ওসুলি, জমিদারি সম্পত্তি বিক্রি) যোগ করে তা দাঁড়ায় ৩০,২৪,৭০৮ টাকায় — যা প্রায় ১৪% বেশি।

২. শার্ফ/বাট্টা : পুরাতন ও নতুন মুদ্রার বিনিময়ে কৃষকদের ওপর চাপানো অতিরিক্ত কর (প্রতি রুপিতে ১১.৫ আনা হারে)।

৩. কুচ্ছা বলান্নি : রায়তদের দখলকৃত জমির ১/১০ অংশ পুনরুদ্ধার — এটি ছিল জমিদারি দখল বাড়ানোর একটি কৌশল।

৪. আদায়-ব্যয় (সেরিঞ্জামি) : প্রশাসনিক খরচ বাবদ ২,৬৬,১৫২ টাকা কর্তন — যা দেখায় যে রাজস্বের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ব্যয়ে চলে যেত।

৫. নিট রাজস্ব: ২৬,৪৪,৭৩৩ টাকা নিট রাজস্ব আদায় — যা প্রমাণ করে যে কৃষকদের ওপর চাপানো অতিরিক্ত কর সত্ত্বেও কোম্পানি তাদের রাজস্ব নিশ্চিত করছিল। গুরুত্ব: এই নথিটি ফিফথ রিপোর্টের গ্র্যান্ট ও শোরের বিতর্কের ভিত্তি — গ্র্যান্ট এই ধরনের তথ্য ব্যবহার করে যুক্তি দেন যে বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব, অন্যদিকে শোর এই করগুলোকেই কৃষক-শোষণের প্রমাণ হিসেবে দেখান।

দিনাজপুরের রাজস্ব বিবরণী (দ্বিতীয় অংশ) — ১১৬৮ ও ১১৬৯ বঙ্গাব্দ – ওপরের টিকা ২-এর উল্লিখিত তালিকার দ্বিতীয় অংশে ১১৬৮ ও ১১৬৯ বঙ্গাব্দের রাজস্ব আদায় ও খরচের তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হয়েছে : চুয়ান (খাদ্য/জোগানের বরাদ্দ) : ১১৬৮ বঙ্গাব্দে ৭,৬৯৮ টাকা এবং ১১৬৯ বঙ্গাব্দে ৩০,৪০০ টাকা — যা দু’বছরের মধ্যে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি, সম্ভবত সামরিক বা প্রশাসনিক খরচ বৃদ্ধির ইঙ্গিত। নিট জুমা: ১১৬৯ বঙ্গাব্দের নিট জুমা ছিল ২৬,৮২,৮৩২ টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের উদ্বৃত্ত (২৩,১৮৭ টাকা) যোগ করে দাঁড়ায় ২৭,০৬,০১৯ টাকায়। আদায় ও বকেয়া: মোট আদায় (১৯,৩২,১৯৫ টাকা) এবং নিট জুমার (২৭,০৬,০১৯ টাকা) মধ্যে বিশাল ব্যবধান — ৭,৭৩,৮২৪ টাকা বকেয়া বা আদায় হয়নি। এই বিপুল বকেয়া প্রমাণ করে যে কৃষকরা নির্ধারিত রাজস্ব দিতে পারছিল না, এবং কোম্পানি তাদের ওপর অত্যাচার বাড়াচ্ছিল।

ঐতিহাসিক তাৎপর্য :

১. রাজস্ব বৃদ্ধি ও কৃষক-শোষণ : ১৫৮২ সালের টোডরমলের জরিপের তুলনায় ১৭৬৩ সালের দিনাজপুরের রাজস্ব প্রায় আড়াই গুণ বেড়েছিল। এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল আবওয়াব (অতিরিক্ত কর) — যেমন নজরানা-হাল, কুচ্ছা বলান্নি, শার্ফ/বাট্টা — যা কৃষকদের ওপর চরম অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছিল।

২. গ্র্যান্ট আর শোরের বিতর্কের ভিত্তি : জেমস গ্র্যান্ট এই ধরনের রাজস্ব তথ্য ব্যবহার করে বলেছিলেন বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব (আন্ডার-অ্যাসেসড হয়ে আছে)। অন্যদিকে, জন শোর এই করগুলোকেই কৃষক-শোষণের প্রমাণ হিসেবে দেখান এবং সতর্ক করেন যে রাজস্ব বাড়ালে বিপর্যয় হবে (তার বক্তব্য ১৭৭০-এর মন্বন্তরে প্রমাণিত হয়েছিল)। ৩. ফিফথ রিপোর্টের প্রাসঙ্গিকতা : ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে এই ধরনের নথি সংরক্ষণ করা হয়েছিল যাতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা কোম্পানির রাজস্ব নীতির প্রকৃত চিত্র বুঝতে পারেন। কিন্তু এই নথিগুলোই প্রমাণ করে যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩) কৃষকদের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।

৪. বকেয়া রাজস্বের তাৎপর্য : ৭,৭৩,৮২৪ টাকা বকেয়া থাকার অর্থ হলো কৃষকরা রাজস্ব দিতে অসমর্থ ছিল। কোম্পানি এই বকেয়া আদায়ের জন্য জমিদারদের ওপর চাপ বাড়ায়, আর জমিদাররা তা কৃষকদের ওপর চাপিয়ে দেয় — যা বাংলার কৃষি সমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডে এই নথির স্থান: এই নথি ফিফথ রিপোর্টের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর পৃষ্ঠায় ছিল, যা সম্পাদক ফার্মিঙ্গার তার ‘হিস্টোরিক্যাল ইন্ট্রোডাকশন’-এ উল্লেখ করেছেন। ফার্মিঙ্গার এই নথি তুলে ধরে এর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন যে এই তালিকা প্রমাণ কীভাবে ব্রিটিশ রাজস্ব নীতি ধীরে ধীরে কৃষক-শোষণের একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হয়; এই দিনাজপুরের রাজস্ব বিবরণী তাই শুধু একটি আর্থিক হিসাব নয় — এটি উপনিবেশিক শাসনের সেই নির্মম প্রক্রিয়ার দলিল, যা হকার, চাষি ও কারিগরদের কাছ থেকে তাদের উৎপাদিত সম্পদ লুণ্ঠন করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।

৫০ পয়েন্টের টিকা ৩

Ramnaut Baddie (রামনাথ বুদ্ধি। বুদ্ধি বা বাড়ৈ) নামে এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যিনি দিনাজপুরের রাজস্বের “তুকুদ্দার” ঠিকাদার/ইজারাদার ছিলেন। আমরা এই চরিত্রর ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট বুঝতে চেষ্টা করি। ফিফথ রিপোর্টে বলা হয়েছে স্থানীয় রাজস্ব ঠিকাদার বা ইজারাদার রামনাথ বাড়ৈ ১৭৬২-৬৩-তে (১১৬৯ বঙ্গাব্দ) দিনাজপুরের রাজস্ব সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। এই রিপোর্টের দিনাজপুরের রাজস্ব বিবরণীতে তাঁর নাম “contracting Farmer” বা চুক্তিবদ্ধ খাজনা-ঠিকাদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর কাজ —

১. হস্তবুদ (Hustabood) পরীক্ষা করা : রামনাথ বাড়ৈ আগের বছর দিনাজপুরের হস্তবুদ বা সম্পদের হিসাব পরীক্ষা করেছিলেন। হস্তবুদ ছিল জমির উৎপাদন, খাজনা ও সম্ভাব্য রাজস্বের বিস্তারিত জরিপ ও মূল্যায়ন।

২. রাজস্ব চুক্তি গ্রহণ করা : মীর কাসিম তাঁর জমা দেওয়া সম্পদের অনুমানের সুযোগ নিয়ে তাকে দিনাজপুরের রাজস্বের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করেন। বাড়ৈ এই চুক্তি সম্পাদন করতে বাধ্য হন কারণ অস্বীকার করলে তাঁর নিজের হিসাবের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। অর্থাৎ, তিনি তাঁর নিজের হিসাবের “ফাঁস” হওয়ার ভয়ে এই চুক্তি করতে বাধু হয়েছিলেন। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট — মীর কাসিমের কৌশল: মীর কাসিম এমন এক কূটকৌশল অবলম্বন করেছিলেন, যেখানে ঠিকাদারকে তাঁর নিজের হিসাবের ভিত্তিতে রাজস্বের দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এটি ছিল রাজস্ব বৃদ্ধির একটি চতুর পদ্ধতি; ঠিকাদারি প্রথা: ব্রিটিশ আমলে রাজস্ব আদায়ের এই ‘ঠিকাদারি প্রথা’ (farming system) অত্যন্ত প্রচলিত ছিল। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রায়শই কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাতো, কারণ ঠিকাদাররা নিজেদের লাভের জন্য রাজস্ব আদায় কঠোর করতেন।

রামনাথ বাড়ৈ-এর মানসিক দ্বন্দ্ব —

১. তাঁর আগের কাজ : তিনি দিনাজপুরের হস্তবুদ বা সম্পদের হিসাব তৈরি করেন। এই হিসাব ছিল জমির উৎপাদনশীলতা, খাজনা ও সম্ভাব্য রাজস্বের একটি মূল্যায়ন।

২. মীর কাসিমের চাপ : মীর কাসিম সেই হিসাবকে ভিত্তি করে তাঁকে রাজস্ব চুক্তি ঠিকা নিতে বাধ্য করেন। অস্বীকার করলে বোঝা যেত যে তাঁর পূর্ববর্তী হিসাব ভুল ছিল—যা তাঁর পেশাদার সুনাম নষ্ট করত।

৩. চুক্তি গ্রহণ : এই কারণেই তিনি চুক্তি গ্রহণ করেছিলেন, যদিও তিনি হয়তো জানতেন যে সেই হস্তবুদ কৃষকদের পক্ষে আদায় করা সম্ভব নয়।

ফিফথ রিপোর্টের ভাষ্য — ফিফথ রিপোর্টে উল্লিখিত শোরের মিনিটের ৫০ নম্বর প্যারায় এই ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে। ফার্মিঙ্গার এই উদাহরণটি দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন: কীভাবে মুঘল ও ব্রিটিশ আমলারা কৃষক-শোষণের জন্য স্থানীয় ঠিকাদারদের ব্যবহার করত; কীভাবে ‘হস্তবুদ’-এর মতো পরিসংখ্যানগত যুক্তিকে রাজস্ব বৃদ্ধির অস্ত্রে পরিণত করা হত

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন