৫৩. ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান : রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী
ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান কে গেয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে সবাই একসঙ্গে বলে উঠবে, কেন, তরুণ ক্ষুদিরাম বসু। ‘হাসি হাসি পরব ফাঁসি/দেখবে ভারতবাসী’ — কার গান? কেন, অকুতোভয় তরুণ বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রকাশিত, অপ্রকাশিত দলিল সন্ধান করলে পাওয়া যাবে বহু ক্ষুদিরামের নাম। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অন্য কোন প্রদেশের এত তরুণের আত্মবলিদান দেখতে পাই না আমরা।
আর এক সাতাশ বছরের যুবকের ছবি দেখি।
১৯২৭ সালের ১৭ ডিসেম্বর। সেদিন সেই যুবকের ফাঁসি হবে। সকালে জেলখানায় ব্যায়াম করছিলেন তিনি। জেলারসাহেব তো অবাক। একটু বাদে যে ছেলেটা বিদায় নেবে পৃথিবী থেকে, সে করছে ব্যায়াম? জেলার তাই অবাক হয়ে কারণটা জানতে চাইলেন। যুবক বললেন :
‘জেলারসাহেব, আমি একজন হিন্দু। আমি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করি। আমি আমার পরবর্তী জন্মে একটি সুস্থ শরীর নিয়ে জন্মাতে চাই, যাতে আমি আমার অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করতে পারি। আজ আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় দিন, কীভাবে আমি দৈনন্দিন কাজ থেকে বিদায় নিতে পারি? আমি মরছি না, বরং আমি আবারও এক স্বাধীন ভারতে পুনর্জন্ম নেব।’
যুবকটির নাম রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী (১৯০১-১৯২৭)।
কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলায় (বা, কাকোরি ট্রেন ডাকাতি মামলা) ফাঁসি হয়েছিল তাঁর। নবগঠিত হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন (HRA; পরে যার নাম হয় হিন্দুস্থান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন বা HSRA) এই ট্রেন ডাকাতির পরিকল্পনা করেন। জড়িত ছিলেন রামপ্রসাদ বিসমিল খান, আশফাকুল্লা খান, চন্দ্রশেখর আজাদ, রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, শচীন্দ্র বক্সী, কেশব চক্রবর্তী, মুরারিলাল খান্না (গুপ্ত), বানওয়ারি লাল, মুকুন্দীলাল গুপ্ত, মন্মথনাথ গুপ্ত। ১৯২৫ সালের ৯ আগস্ট বিপ্লবীরা সাহারানপুর থেকে লখনউগামী ৮নম্বর ডাউন ট্রেন কাকোরির (কাকোরি উত্তরপ্রদেশের লখনউ জেলার একটি রেলস্টেশন) কাছে থামিয়ে গার্ড কেবিন থেকে ৮ হাজার টাকা লুঠ করেন। রাজেন্দ্রনাথ কাকোরি স্টেশনে শিকল টেনে থামিয়েছিলেন ট্রেন। তাঁর নির্দেশে তাঁর সহকর্মীরা লুঠ করেন টাকার ব্যাগ। ১৯২৬ সালের ২১ মে কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলার বিচার শুরু হয়। মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় রামপ্রসাদ বিসমিল খান, আশফাকুল্লা খান, ঠাকুর রোহন সিং এবং রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ীকে। মন্নমথনাথ গুপ্তকে ১৪ বছরের, রামকৃষ্ণ খত্রী-মুকুন্দিলাল–রাজকুমার সিং-গোবিন্দচরণ কর-যোগেশচন্দ্র চ্যাটার্জীকে ১০ বছরের, সুরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য-বিষ্ণুচরণ ডাবলিশকে ৭ বছরের, প্রেমকৃষ্ণ শর্মা-ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে ৫ বছরের এবং কেশব চক্রবর্তীকে ৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রাজেন্দ্রনাথের জন্ম বাংলাদেশের পাবনা জেলার মোহনপুর গ্রামে। ক্ষিতিমোহন তাঁর বাবা, আর বসন্তকুমারী তাঁর মা। দেশপ্রেমিক পরিবার। অনুশীলন সমিতির সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে তাঁর বাবা গ্রেপ্তার হন। মাত্র ৯ বছর বয়েসে রাজেন্দ্রনাথ চলে যান কাশীতে, তাঁর মামাবাড়িতে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়ার সময়ে আলাপ হয় বিপ্লবী শচীন্দ্রনাথ সান্যালের (১৮৯৩-১৯৪২) সঙ্গে। শচীন্দ্রনাথের জন্ম বেনারসে। তিনি হিন্দুস্থান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। শচীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গবাণী’র সম্পাদক নিযুক্ত করেন রাজেন্দ্রনাথকে। শুধু তাই নয়, অনুশীলন সমিতির বারাণসী শাখার সমন্বয়কারী ও অস্ত্রবিভাগের দায়িত্বও তাঁকে দেওয়া হয়।
রাজেন্দ্রনাথ আর একটা চমৎকার কাজ শুরু করেছিলেন। কাশীতে যে সব বিপ্লবীরা কাজ করছিলেন, তিনি তাঁদের হাতের লেখা চিঠিগুলি সংগ্রহ করতেন। সেসব চিঠি আছে কিনা, থাকলে কোথায় আছে, আমরা তার খোঁজ পাইনি।
কিন্তু শুধু বিপ্লবীদের ভাবনা সংগ্রহ করলেই হবে না। শিখতে হবে বোমা তৈরির কৌশল। না হলে ইংরেজের সঙ্গে লড়বেন কি করে?
রাজেন্দ্রনাথ চলে এলেন বঙ্গদেশের দক্ষিণেশ্বরে। দক্ষিণেশ্বরের বাচস্পতি পাড়ায় বিপ্লবীদের একটি গুপ্ত ঘাঁটি ছিল। ১৯২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুলিশ হানা দেয়। সেখান থেকে বোমা-কার্তুজ উদ্ধার করে। গ্রেপ্তার করা হয় রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী, অনন্তহরি মিত্র,প্রমোদ চৌধুরী, জীবনলাল চ্যাটার্জিকে। দক্ষিণেশ্বরের এই মামলার পরে পুলিশ তৎপর হয় এবং কাকোরি ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়। রাজেন্দ্রনাথ কাকোরি মামলায় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন।
ফাঁসির আগে গোণ্ডা জেল থেকে একটা চিঠি লিখেছিলেন রাজেন্দ্রনাথ। সেই চিঠির একটি লাইন :
‘প্রভাতের আলোর মতোই মৃত্যু অনিবার্য। তবে কেন মানুষ মৃত্যুকে ভয় করবে, বা তার জন্য শোক করবে!’