আজ আমি খুব খুশি। বহুদিন পর পরিবারের সবাই আজ একসঙ্গে একজায়গায় জড়ো হয়েছি। সবাইকে দেখে আনন্দে, রোগেভোগা আমার শরীরটাও আজ বেশ ফুরফুরে হয়ে উঠেছে। ও, আমার পরিচয়টাই তো এখনও দিইনি। অবশ্য পরিচয় দেওয়ার মতো আমার কিইবা বিশেষত্ব আছে! এ সমাজের বেশিরভাগ মেয়ের মতোই আমিও রান্নাঘর, ঠাকুরঘর আর শোওয়ার ঘরের বাইরের পৃথিবীটাকে চিনেছি কখনও বাপ-ভাইয়ের চোখ দিয়ে, কখনও স্বামীর চোখে। এখন আমার ছোটমেয়ে সুমনাই আমার জীবনের খোলা জানলা। বাইরের দুনিয়াটা নতুন করে চিনি।
আমি কিরণ। এখন অবশ্য এই নামের সেরকম ব্যবহার হয় না। এই নামে ডাকার মতো লোক কমতে কমতে তলানিতে এসে ঠেকেছে।
সে যাক্, যে কথা বলছিলুম, আমার দুই মেয়ে। বড়ো জন অহনা, তার সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আমার বাড়ির লাগোয়া এক বহুতলের ফ্ল্যাটে থাকে। নিত্যনতুন শাড়ি, গয়না, ঘোরা-বেড়ানোর মধ্যেই ডুবে আছে সে। ওর সমস্ত বেহিসাবী চাহিদা আমার জামাই পূরণ করলেও ওকে আকছার অপমানজনক কথা শোনাতে ছাড়ে না। অহনা এসব গায়ে মাখে না। বলে, জীবন একটাই। তাকে খামোখা ন্যাতানো, ম্যাড়ম্যাড়ে করে লাভ নেই। ওর জীবনদর্শনের মূলকথা হলো ‘মস্তি’। নিজের আখের গোছানোর জন্য ও মানসম্মানের পরোয়া করে না। সময়ের অভাবে আমার খোঁজখবর না নিতে পারলেও বেড়াতে যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যে ওর ফ্ল্যাটের চাবি আমার কাছে রেখে যায়। আমার দায়িত্ব থাকে দাঁড়িয়ে থেকে ওর ঠিকে-কাজের লোক দিয়ে ওর ফ্ল্যাটের কাজ করিয়ে নেওয়া। এসব দেখে সুমনা রাগারাগি করে। আমি ওকে শান্ত করার চেষ্টা করি। এ কাজটুকু করে দিতে পারি বলেই তো মেয়েটাকে মাঝেমধ্যে দেখতে পাই! ও আনন্দে জীবন কাটাচ্ছে, ঈশ্বরের কাছে এর থেকে বেশিকিছু আমার চাওয়ার নেই।
অন্যদিকে ধীর-স্থির সুমনা কখনোই অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করে না। আত্মসম্মান বজায় রেখে মাথা উঁচু করে চলতে অভ্যস্ত। প্রাইভেট ফার্মে একটা ছোটখাটো চাকরি করে ও। বিবাহিত জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিতে না পেরে আমার কাছে ফিরে এসেছে। ওই আমার বল-ভরসা। ওর যেকোনো সিদ্ধান্তের ওপর আমার আস্থা আছে। ওরা ভালো থাকলেই আমি খুশি।
এখন এসব কথা থাক। কতদিন পর একসাথে সবাইমিলে সময় কাটাচ্ছি। জায়গাটা বেশ শান্ত। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে গঙ্গা। ঠাণ্ডা হাওয়ায় আমার দুচোখ জড়িয়ে আসছে। পুলক, আমার স্বামী; দূরে দাঁড়িয়ে ইশারায় আমাকে কাছে ডাকছে। আমি কাছে যেতেই বলল, “ওদিকে কি করছ? আমার সাথে থাক।”
আমি বললাম, “তুমি এখানে একা দাঁড়িয়ে কি করছ? ওদিকে সবাই রয়েছে। ওখানেই চলো।”
“কিরণ, এবার ছাড়তে শেখো। ওরা কি আদৌ তোমাকে চায়?” ওর ব্যথাজড়ানো স্বরে আমি চমকে উঠলাম তবুও বললাম, “মানে?” আমার পরিবারের সকলের দিকে তাকিয়ে বললাম, “দেখ, আজ সবাই এসেছে। ওই দেখ, অহনা কি বকবক করছে। সবাই ওর কথা শুনছে। আমিও যাই, দেখি মেয়েটা কি বলছে।”
পুলক গভীর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। বলে, “যাও, সময় পেরিয়ে যাচ্ছে।”
ওদের কাছাকাছি আসতেই অহনার গলা কানে এল, “বোন, মায়ের বিয়ের কামরাঙা নেকলেস টা আমি নেব।”
হঠাৎ কি বিকট তাপ আমাকে যেন ঘিরে ধরলো। তাপে আমি ঝলসে যাচ্ছি। আমি চিৎকার করছি। এ কি! আমার দিকে ওদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
কানে এল সুমনার গলা, “দিদিভাই, শুধু মায়ের নেকলেস কেন, গয়না যা কিছু আছে সবই তুই নিস। আমাকে এসবের থেকে মুক্তি দে।”
ওই তো পুলক, অসহ্য তাপে ঝলসে গিয়ে একটু আশ্রয়ের জন্য হাত বাড়াচ্ছি ওর দিকে; ও আমাকে ধরতে এগিয়ে আসছে না। দূরে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। বড্ডো অসহায় লাগছে নিজেকে। এরা সবাই আমার আপনজন? আমি দেখতে পাচ্ছি প্রচণ্ড তাপে আমার শরীরটা গলে যাচ্ছে। তবুও আমি তো আমিই!
ছাইয়ের গাদা থেকে সুমনা আমাকে ঠিক খুঁজে নিয়েছে। ওর হাতে ধরা মাটির সরার মধ্যে আমি দিব্যি ঢুকে গেছি। মেয়েটার হাতের ছোঁয়ায় আমার শরীরের সব তাপ জুড়িয়ে গেছে। এখন শীত শীত করছে। প্রবল কাঁপুনি আসছে। গঙ্গার জলে সারাটা ভাসিয়ে দিল ও। একি! আমি একা! আমার খুব ভয় করছে, ঠাণ্ডায় ঠকঠক্ করে কাঁপছি আমি। সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ওই তো পুলক, জল ভেঙে এগিয়ে আসছে। আমাকে জড়িয়ে ধরলো ও। আহ্ কি শান্তি। বহুদিন পর মনে হচ্ছে আমি ফিরে পেয়েছি আমার ঠিক-বেঠিকের নির্ভরতার আশ্রয়। পালকের মত হালকা লাগছে নিজেকে। এবার আমার সমস্ত শীত কেটে যাবে। ঢেউয়ে ঢেউয়ে আমরা ভেসে যাব অনন্ত পারাবারের পথে।
অসাধারণ বললেও এই গল্পের সঠিক মূল্যায়ন হয় না!অনেক দিন মনে থাকবে এই গল্প।
অসাধারণ বললেও এই গল্পের সঠিক মূল্যায়ন হয় না!অনেক দিন মনে থাকবে এই গল্প।
অসাধারণ লাগল!এই গল্পের সঠিক মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার নেই। অনেক দিন মনে থাকবে এই গল্প।