এই জগতে রক্ষাকর্তা ও পালনকর্তা বিষ্ণু বাস করেন বৈকুণ্ঠধামে। এই বৈকুণ্ঠধামের দ্বারপাল ছিলেন জয় আর বিজয়। কিন্তু চতুষ্কুমারের (সনক, সনন্দন, সনাতন ও সনৎকুমার) অভিশাপে এই জয় আর বিজয়ের জন্ম হলো অসুরকুলে হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু নামে। পূর্বজন্মে তারা বিষ্ণুর দ্বারপাল হয়ে নিযুক্ত থাকলেও অসুর জীবনে এরা বিষ্ণুবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন। হিরণ্যাক্ষ বিষ্ণুর বরাহ অবতারের হাতে নিহত হলে হিরণ্যকশিপুর বিষ্ণু বিদ্বেষ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়।
এই চতুষ্কুমার ছিলেন ব্রহ্মার চার মানসপুত্র। তাই ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য নিজেকে শক্তিশালী করবার প্রয়োজনে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার আরাধনা শুরু করেন। হিরণ্যকশিপু বনে গিয়ে একটানা শত শত বছর ধরে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে ব্রহ্মার উদ্দেশ্যে এমন এক দুষ্কর তপস্যা করেছিলেন, যার ফলে তার মাথা থেকে ধোঁয়া বের হতে থাকে এবং সমগ্র ব্রহ্মাণ্ড উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তার এই কঠোর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ব্রহ্মা আবির্ভূত হন এবং তাকে অমরত্বের কাছাকাছি এক দুর্লভ বর প্রদান করেন। হিরণ্যকশিপু এমনভাবে বর চেয়েছিলেন, যাতে কোনো মানুষ বা পশুর হাতে, কোনো অস্ত্রের সাহায্যে, দিনে বা রাতে, কিংবা ঘরের ভেতরে বা বাইরে তার মৃত্যু না হয়। ব্রহ্মা তাকে বরদান করে অন্তর্ধান হলেন।
ওদিকে হিরণ্যকশিপু যখন তপস্যার জন্য বনে গেছিলেন, তখন তার স্ত্রী কয়াধু ছিলেন সন্তানসম্ভাবা। দেবগন কয়াধুর কাছে দেবর্ষি নারদকে প্রেরণ করলেন তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে। সময়মত এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন কয়াধু সন্তানের জন্মের পর যখন হিরণ্যকশিপু ফিরে এলেন না, সেই সুযোগে সন্তানকে বিষ্ণুভক্ত করে তুললেন নারদ। সর্বদা বীনা বাজিয়ে তিনি বিষ্ণুর নাম উচ্চারণ করেন। আর সেই নারায়ন নারায়ন ধ্বনি বাস্তবে বড়ই মধুর। নারদের শেখানো ভক্তিতে মজলেন হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহ্লাদ। তিনি বিষ্ণুর পরম ভক্ত হয়ে উঠলেন।
এদিকে, বর লাভ করার পর হিরণ্যকশিপু নিজেকে অজেয় মনে করতে শুরু করেন। তিনি নিজেকেই ঈশ্বরের সমকক্ষ দাবি করেন এবং বিষ্ণুর পূজা বন্ধ করে কেবল নিজের আরাধনা করার জন্য পুরো রাজ্যে হুকুম জারি করেন। ক্রমে তিনি প্রবল অত্যাচারী হয়ে উঠলেন তার ক্ষমতাও ছিল তুলনাহীন।
স্কন্দপুরানে আছে একবার অসুররাজ রাবণ হিরণ্যকশিপুর-এর কানের দুল দুটি হাতে নিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দুল দুটি দুই বাহু দিয়ে চেষ্টা করেও তুলতে পারেননি। হিরণ্যকশিপুর দেহ হিরণ্য বা স্বর্ণ দিয়ে মোড়া ছিল। এই কবজের জন্যই তাকে বধ করা ছিল কঠিন। পুরান বলে মহাপরাক্রমশালী এই অসুররাজ সাত কোটি বছর রাজত্ব করেছিলেন।

হিরণ্যকশিপুর যখন রাজ্যে বিষ্ণুর আরাধনা নিষিদ্ধ করলেন তখন তিনি জানতে পারলেন তার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান প্রহ্লাদ বিষ্ণুর পরম ভক্ত। তিনি প্রহ্লাদকে নিষেধ করলেন, তারপর তিরস্কার করলেন। কিন্তু এতে কোন ফল না হলে, তিনি তার সন্তানকে হত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।
হিরণ্যকশিপু প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য বিষ পান করান, বিষধর সাপের সামনে, উন্মত্ত হাতির পায়ের নিচে, উঁচু পাহাড় থেকে নিচে ফেলে দেন। এমনকি প্রহ্লাদকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মারতে তাঁকে পিসি হোলিকার কোলে বসিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সর্বব্যাপী ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় প্রহ্লাদ প্রতিটি আক্রমণ থেকে অক্ষত ও নিরাপদে ফিরে আসেন।
কোনো উপায়েই যখন প্রহ্লাদের কোনো ক্ষতি করা গেল না, তখন ক্ষিপ্ত পিতা তাঁকে প্রাসাদের স্তম্ভে বেঁধে তরবারি দিয়ে আঘাত করার জন্য উদ্যত হন। তিনি উল্লাসে চিৎকার করে বলেন, ‘তুমি সর্বদা যে হরিনাম করো তবে ডাকো তোমার হরি কে। তোমার হরি কোথায়?’
প্রহ্লাদ একমনে হরিকে স্মরণ করতে শুরু করেন। কিছুক্ষণের মধ্যে এক অপার্থিব ধ্বনি শোনা গেল। ভয়ংকর কম্পনের মধ্যে দিয়ে ভগবান বিষ্ণু স্তম্ভ বিদীর্ণ করে অর্ধ-মানুষ ও অর্ধ-সিংহ রূপ ধারণ করে নৃসিংহ অবতার রূপে আবির্ভূত হন। হিরণ্যকশিপুর দেওয়া সব শর্ত পূরণ করে, বরের ফাঁকফোকর নিখুঁতভাবে কাজে লাগিয়ে গোধূলি লগ্নে, সভাকক্ষের চৌকাঠে, নিজের নখের সাহায্যে সেই অসুররাজকে বধ করেন এবং ভক্ত প্রহ্লাদকে রক্ষা করেন। বিষ্ণুর এই অবতারই নৃসিংহদেব নামে জগতে প্রসিদ্ধ হন। ভগবান নৃসিংহ প্রমাণ করেন যে, পরমেশ্বর যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারেন এবং ভক্তের বিশ্বাস ও আস্থাকে রক্ষা করার জন্য সর্বদা উপস্থিত থাকেন।
নৃসিংহ চতুর্দশী (বা নৃসিংহ জয়ন্তী) হলো হিন্দু দেবতা ভগবান বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার ‘নৃসিংহ দেব’-এর আবির্ভাব উপলক্ষে উপবাস ও আরাধনার পবিত্র দিন। বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে এই পবিত্র উৎসব পালিত হয়।
পূজার সময়সূচি : সন্ধ্যায় পূজার শ্রেষ্ঠ সময় : বিকাল ৪:১৭ থেকে সন্ধ্যা ৬:৫৬ পর্যন্ত। মধ্যাহ্ন সংকল্পের সময় : সকাল ১১:০৪ থেকে দুপুর ১:৪৪ পর্যন্ত।এই ব্রত ও উপবাসের মাধ্যমে ভক্তরা তাদের আধ্যাত্মিক পথের সকল প্রকার বিপদ ও বিঘ্ন থেকে সুরক্ষা লাভ করেন।
ব্রত পালনের মূল নিয়মাবলী :
উপবাস : সারাদিন অন্ন বা শস্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হয়। যারা পুরোপুরি নির্জলা (জল ছাড়া) থাকতে অক্ষম, তারা সারাদিন দুধ ও ফলমূল বা একাদশীর মতো ‘অনুকল্প’ (আলু, বাদাম ইত্যাদি) প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন।
ভগবান নৃসিংহ গোধূলি লগ্নে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে সন্ধ্যায় বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। এ সময় পঞ্চামৃত দিয়ে ভগবানের অভিষেক করা হয় এবং নতুন বস্ত্র ও অলঙ্কার নিবেদন করা হয়। পূজায় তাজা ফল, মিষ্টি, এবং তুলসী পাতা আবশ্যক। বিশেষ করে ‘পনকম’ (ঠান্ডা জল, আখের গুড় বা মিছরি, লেবুর রস, আদা ও গোলমরিচের মিশ্রণ) নিবেদন করা হয়।
সারাদিন ও সন্ধ্যায় ‘হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র’ জপ করতে পারেন এবং নৃসিংহদেবের স্তব বা স্তুতি (যেমন- নরসিংহ কবচ) পাঠ করা অত্যন্ত শুভ।পূজার সময় ‘নমস্তে নরসিংহায়…’ মন্ত্র উচ্চারণ করা হয় এবং তুলসী পাতা নিবেদন করা হয়।

কর্ণাটকের হোয়সালেশ্বর মন্দিরে ভগবান বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের এটি একটি অনবদ্য ও জীবন্ত ভাস্কর্য । ভাস্কর্যে নৃসিংহ দেবকে ১২টি হাতে উগ্র রূপে দেখানো হয়েছে।
পারন (উপবাস ভঙ্গ): চতুর্দশী তিথি শেষ হওয়ার পর এবং পরের দিন সকালে পূজা সম্পন্ন করে উপবাস ভঙ্গ করতে হয়।এই দিনে ভগবানের লীলাকথা (যেমন প্রহ্লাদ ও হিরণ্যকশিপুর কাহিনী) পাঠ ও শ্রবণ করা আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য বিশেষ ফলদায়ক।
নরসিংহ দেব হলেন ভক্তের রক্ষক এবং অশুভ বিনাশকারী। এই দিন নিষ্ঠাভরে পুজো করলে জীবনের যেকোনো আকস্মিক বাধা ও অমঙ্গল কেটে যায়।এই পুণ্য তিথিতে ভগবান নৃসিংহের সাথে দেবী লক্ষ্মীরও পুজো করা হয়, যা সংসারে সুখ, সমৃদ্ধি ও আর্থিক স্থায়িত্ব নিয়ে আসে।বিশেষ করে শনি বা মঙ্গলের অশুভ প্রভাব কাটাতে এবং মানসিক জোর বৃদ্ধিতে নৃসিংহ দেবের আরাধনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়।
নরসিংহ জয়ন্তী আমাদের শেখায় ধর্মের পথে চললে ঈশ্বর সবসময় তার ভক্তের পাশে থাকেন।অধর্ম, হিংসা এবং অত্যাচার চিরকাল টিকে থাকতে পারে না।অপরের ক্ষতি না করে শান্তি ও ন্যায়ের পথে জীবনযাপন করা উচিত।
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ।।