“নাম তার কমলা,
দেখেছি তার খাতার উপরে লেখা।
সে চলেছিল ট্রামে, তার ভাইকে নিয়ে কলেজের রাস্তায়।
আমি ছিলেম পিছনের বেঞ্চিতে।
মুখের এক পাশের নিটোল রেখাটি দেখা যায়,
আর ঘাড়ের উপর কোমল চুলগুলি খোঁপার নীচে।
কোলে তার ছিল বই আর খাতা।
যেখানে আমার নামবার সেখানে নামা হল না।”
(ক্যামেলিয়া, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
ভালোবাসার আবেশে অজান্তেই প্রেমিকের নির্ধারিত স্টপেজ পেরিয়ে যায়। ট্রামের ধীর গতি, ট্রীং-ট্রীং ঘণ্টি, খোলা জানলার বসন্ত বাতাস প্রেমে অনুঘটকের কাজ করে। যাত্রীদের ভিড়ের মধ্যেও তৈরি হয় এক ব্যক্তিগত জগৎ ।

বাংলা সাহিত্যে ট্রাম শুধু পরিবহণ নয়;
প্রেমে, অপ্রেমে, কাজে, অকাজে, বিপ্লবে বিদ্রোহে
সে ঢুকে পড়েছে কোলকাতার মানুষের অন্তর্জীবনে।
পরনে হাতা গোটানো বুশশার্ট আর ধুতি, মুখে পান, বাঙালি বাবু ট্রামে চড়ে চলেছেন সওদাগরি অফিসে হাজিরা দিতে। এ ছবি খুব পুরনো নয়।
শুধু শহরের গতি বদলেছে,

ট্রামের জানলার বাইরে কলকাতা একটু একটু করে অন্যরকম হয়ে গেছে। পুরো কলকাতাই যখন এক খোলা বাজারে বদলে গেল,
তখন ট্রামকেও ছেড়ে দিতে হয়েছে তার ধীর, নিশ্চিন্ত জায়গা।
সময়ের তাড়াহুড়ো, বিজ্ঞাপনের আলো আর দ্রুতগতির শহরের কাছে
সে যেন ক্রমে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠল।
তবু আজও কোলকাতার বুকে বাজে রেললাইনের ধাতব স্মৃতি। এখনো ধর্মতলা-শ্যামবাজার (রুট-৫) এবং ধর্মতলা-গড়িয়াহাট (রুট-২৫) রুটে বিকেলের পড়ন্ত আলোয় ‘জিয়া নস্টাল’ মাত্র দুটি ট্রাম চলতে দেখা যায়।

এশিয়ায় প্রথম কোলকাতার বুকে ঘোড়ারা যে ট্রাম টেনেছিল ১৮৭৩ সালে, তাদের যত্নআত্তির খরচ ট্রাম কোম্পানি চালাতে পারেনি। সময়ের সঙ্গে, প্রয়োজনের তাগিদে তাই ট্রামও পা বাড়ায় বিবর্তনের পথে।
ঘোড়ার ক্লান্ত খুরের শব্দ পেরিয়ে আসে স্টিম ইঞ্জিন, তারপর শহরের তারজালে ভর করে হাজির হয় ইলেকট্রিক টিকিওলা ট্রাম।
ক্ষিতীন্দ্রনাথ নাথ ঠাকুর “কলিকাতায় চলাফেরা সেকালে আর একালে” তে লিখলেন, —
ঘোড়ার ট্রামে আরাম : ঘোড়ার ট্রামে যাহা কিছু আরাম ছিল তাহা গ্রীষ্মকালের প্রভাতে হাইকোর্ট হইতে পার্কস্ট্রিটের মোড়ে যাইবার গাড়িতে। গাড়িগুলির চারিদিক খোলা ছিল দার্জিলিং যাইবার রেলগাড়ির মতো। গাড়ি ধীরে ধীরে চলিত। ঘোড়া একঘেয়ে ছন্দে চলিয়াছেই — যাইতে যাইতে দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ক কত তত্ত্ব যে মাথার মধ্যে খেলিত, তাহার ইয়ত্তা নেই।

কলের ট্রাম : ধর্মতলার মোড় হইতে ট্রাম চলিত ধোঁওয়া কলের সাহায্যে। তাহার পূর্বে শহরের মধ্যে এমন ধোঁওয়া ছাড়া গাড়ি আগে দেখি নাই। উহা দেখিয়া আমাদের বড় মজা লাগিত।
ইলেকট্রিক ট্রাম : ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক ট্রাম আমাদের দেশে বেশ একটা নূতন ভাব আনিয়াছে।ট্রামে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর আসন পৃথক পৃথক গাড়িতে নির্দিষ্ট হওয়াতে খুব বড়লোকের ও ধনীলোকদিগেরও চড়িতে কোনো বাধা রহিল না। সম্ভ্রম রক্ষার কি আশ্চর্য সামাজিক বিধান!
সম্ভ্রম রক্ষার বিধান ছিল ট্রাম কর্মচারীদের পোশাকেও। ১৯০৫ সাল পর্যন্ত জমাদার থেকে সিনিয়র ইন্সপেক্টর সকলেই পরতেন তকমা লাগানো ঊর্দি। বুকের উপর পিতলের নম্বর, কাঁধে ব্যাজ, টুপিতে কোম্পানির চিহ্ন — সব মিলিয়ে স্পষ্ট ছিল ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা। গাঁয়ের খোলস ছেড়ে কোলকাতা তখন নগরায়নের পথে দ্রুত ধাবমান; ট্রাম সেই পরিবর্তনেরই চলমান প্রতীক।

oppo_2
ট্রামের ভিতরেও ছিল এক নিজস্ব যান্ত্রিক শৃঙ্খলা। কন্ডাক্টরের কাঁধে ঝোলানো চামড়ার ব্যাগের পাশে থাকত মুদ্রা বিনিময়ের ছোট ধাতব যন্ত্র। এক, দুই কিংবা চার আনার খোপ আলাদা আলাদা। আঙুলের হালকা চাপে টুং করে বেরিয়ে আসত খুচরো পয়সা। সেই শব্দ যেন ট্রামের ঘণ্টার সঙ্গে মিশে কলকাতার দৈনন্দিন সুর হয়ে উঠেছিল।
আর ছিল টিকিট পাঞ্চিং মেশিন। কাগজের সরু টিকিটে কন্ডাক্টর একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ফুটো করে দিতেন। কোথা থেকে কোথায় যাত্রা, কোন শ্রেণি, কত ভাড়া, সবই যেন সেই ছোট্ট ছিদ্রের ভিতরে বাঁধা থাকত। পাঞ্চিং মেশিনের “খটাস” শব্দে বোঝা যেত টিকিট কাটা হয়েছে। অফিসযাত্রী বাবু, কলেজপড়ুয়া ছাত্র, বাজারফেরা মানুষ — সকলের হাতেই জমত রঙিন পাঞ্চ করা টিকিট। অনেকেই আবার বইয়ের পাতার মধ্যে রেখে দিতেন সেটি স্মৃতি হিসেবে।

কোলকাতার প্রতিবাদে, প্রতিরোধেও ট্রাম সাক্ষী থেকেছে বারবার। ১৯৫৩ সালের ঐতিহাসিক ট্রামভাড়া বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন তো কোলকাতার রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মাইলফলক। এক পয়সা ভাড়া বাড়ানোর প্রতিবাদে ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। শহরের দেওয়ালে লেখা হচ্ছিল স্লোগান, “এক পয়সা বাড়িলে, আগুন জ্বলিবে।”
ট্রামের জন্যে সেই জ্বলে ওঠা আগুনের আঁচ নিভে গেছে কবেই! ট্রাম এখন বার্ধক্যের জীর্ণতা আর স্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন।
কোনো বিশেষ দিনে ট্রামের টাইম মেশিনে চড়ে ছুঁয়ে আসা যায় বদলে যাওয়া পুরনো কোলকাতাকে। অলস দুপুরে স্মরণিকা ট্রাম মিউজিয়ামে মেলে বিস্মৃত ইতিহাস। এককালের শ্যামবাজার ট্রামডিপোর জমজমাট অফিস আজ নিঃশব্দ। সারিসারি বৃদ্ধ ট্রামেরা দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধাবাসে।

“শেষ ট্রাম মুছে গেছে, শেষ শব্দ, কলকাতা এখন জীবনের জগতের প্রকৃতির অন্তিম নিশীথ। চারিদিকে ঘর বাড়ি পোড়ো-সাঁকো সমাধির ভিড়”
জীবনানন্দ কি জানতেন তাঁর অন্তিম উচ্চারণ, বিষণ্ণ নগরচেতনা একদিন ট্রামের সঙ্গেই বিলীন হয়ে যাবে!
ছবি : লেখক