মনসা মঙ্গল কাব্য
প্রাচীন ভারতে নাগ পূজক নানান সম্প্রদায়ের বসবাস ছিল। ভারতের অনেক স্থান নাম তাই নাগ সম্পর্কিত। তাদের দেব দেবীরাই অষ্ট নাগ। বৃহৎ বঙ্গ সমাজের নিম্ন স্তরে জনপ্রিয় নাগদেবী ছিলেন মনসা। এখানে মাঠে ঘাটে বনজঙ্গলে সর্পকূলের অবাধ বিচরণ। পদে পদে মৃত্যু ভয়।তাই সর্প দংশনভীতি, প্রজনন ও ঐশ্বর্য লাভের উদ্দেশ্যে তার পূজা করা হত।আদিতে কোন মূর্তি ছিল না। ঘটেই পূজা হত তার। এখনও তার প্রচলন আছে। ঘট গর্ভ বা সৃষ্টির প্রতীক, উর্বরতার রূপক। এক সময়ে নাগ পূজার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে ভারতের দিকে দিকে। টলে উঠল উচ্চকোটির দেবতা মহাদেবের উচ্চ আসন। বাংলার আর এক শাক্ত দেবী চণ্ডীও ছিলেন উচ্চাসনে। কিন্তু মনসা’র মান ছিল না। তিনি অচ্ছুত অভাজনের দেবী। এই নিয়ে ক্ষোভ অভিমান ছিল নিম্ন বর্গের মনে। কিন্তু কোন প্রতিকার হয়নি। ব্যঙ্গ বিদ্রুপে দীর্ঘকাল অবদমিত ছিল দাবি। তারপর ত্রয়োদশ শতকে তূর্কি অভিযানে ভূলুণ্ঠিত হল বাংলার ব্রাহ্মণ্য মান। রাজন্য পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে ব্রাহ্মণরা এবার মাটিতে পদার্পণ করলেন। অচ্ছুত দেব দেবতাকে কোলে তুলে নিলেন। মনসা পেলেন দেবীর উচ্চাসন। মনসামঙ্গলে শিব ও চণ্ডী হলেন মনসার জন্মদাতা জনক জননী। এ জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল তাকে। মনসামঙ্গলে চিত্রিত হয়েছে সেই আর্য অনার্য সংঘাত চিত্র।

পুরাণে কথিত আছে,কোন এক সময়ে সাপ সরীসৃপের উপদ্রবে পৃথিবীর মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তখন সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মার আদেশে মহামুনি কাশ্যপ নিজের মন থেকে এক কন্যার জন্ম দিলেন।মন থেকে জন্ম,তাই নাম হল মনসা।সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা তাকে সরীসৃপের দেবী করে দিলেন। এরপর মনসা শিবকে প্রসন্ন করেন। শিব তাকে পাঠালেন নারায়ণের কাছে। মনসার প্রতি প্রসন্ন হয়ে নারায়ণ তাকে সিদ্ধির বরমন্ত্র দিলেন। দেবী হিসেবে স্বর্গের স্বীকৃতি ও মর্ত্যে পূজার অধিকার পেলেন মনসা।
মনসামঙ্গল কাব্যে মনসা শিবের কন্যা। পদ্ম বনে তার জন্ম। তাই নাম হল পদ্মা। শিব তাকে ঘরে নিয়ে এলেন। ঘরনী চণ্ডী তা সহ্য করবেন কেন! বিমাতার লাঞ্ছনা গঞ্জনায় জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠল মনসার। অত্যাচারে একটি চক্ষু হারিয়ে হলেন ‘কানি’। মায়ে ঝি’এ নিত্য ঝগড়া। একদিন চণ্ডী রেগে লাথি মারলেন মনসাকে। কন্যার রোষ বহ্নিতে বেহুঁশ হলেন বিমাতা। এই গৃহবিবাদ থেকে বাঁচতে মহেশ মেয়েকে ফেলে এলেন সিজ বৃক্ষ তলায়। তখন তার নেত্রজলে জন্ম হল সখী নেত্রা’র। যিনি নেতা ধোপানি হয়ে বেহুলা-লখিন্দরকে স্বর্গের পথ দেখান। এই মানহীনা মনসা একবার রক্ষা করলেন স্রষ্টা পিতার জীবন। সমুদ্র মন্থনের গরল গলাধঃকরণ করে মহাদেব তখন বিবশ। বিষের দেবী সেই বিষ হরণ করে হলেন বিষহরা।

সংসারও সুখের ছিল না দেবীর। স্বামী জরৎকারুর ছিল বিয়ে না করার পণ। কিন্তু একবার পথের মাঝে দেখলেন স্বর্গত পিতৃপুরুষরা গাছে হেঁট মুণ্ডু হয়ে ঝুলছেন। তাদের উদ্ধার করতে বাধ্য হয়েই বিবাহ করলেন মনসাকে কিন্তু শর্ত দিলেন অবাধ্য হলে তাকে ত্যাগ করবেন। একদিন মনসা সকালে যথা সময়ে স্বামীকে ডেকে দিতে ভুলে গেলেন। সেদিন জপ তপ পূজা হল না জরৎকারুর। রাগে গৃহ ত্যাগ করলেন তিনি। দেবতাদের অনুরোধে পরে ফিরে এলেন গৃহে। জন্ম হল পুত্র আস্তিকের। যিনি পরলোকগত পিতৃ পুরুষদের উদ্ধার ও জন্মেজয়ের যজ্ঞ থেকে সর্প কূলকে রক্ষা করেন। মনসামঙ্গলে কাহিনী অবশ্য অন্য। দেবীর সংসারে চক্রান্ত করে অশান্তি বাধান বিমাতা। ফুলশয্যার রাত্রে তিনি মনসাকে সর্পালঙ্কার সজ্জিতা হতে বলে বাসরঘরে গোপনে ব্যাঙ ছেড়ে রাখলেন। রাত্রে সাপেরা ব্যাঙ দেখে মহানন্দে মনসার অঙ্গ ছেড়ে ছুটল ব্যাঙ শিকারে। ভীত আতঙ্কিত জরৎকারু বাসরঘর ছেড়ে বিবাগী হলেন। এক সময়ে আবার ফিরে আসেন সংসারে।

দেবী মনসার বড়ই অভিমান তার মান লক্ষী-সরস্বতীর সমান নয়। উচ্চকোটি সমাজে তার পূজা নেই। নারীকে দেবতা বলে উচ্চকোটি সমাজ। তারা পুরুষ দেবতা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর ভক্ত। তার নাম কেউ মুখে নেয় না। অথচ তার অগণ্য ভক্ত। তারাই সমাজের চালিকা শক্তি। ক্ষোভে দুঃখে মনসার মনে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে। ছলে বলে কৌশলে যেমন করেই হোক এই উঁচু মাথা নিচু করতে হবে। বাংলার সওদাগররা তখন সমাজের শিরোমনি। দেশ বিদেশের বাণিজ্যে ভরা ভাণ্ডার। রাজাও হাত পাতেন তাদের কাছে। এই বনিক কূলপতি চন্দ্রধরের (চাঁদ) পূজা চাইলেন মনসা। সে মাথা নিচু করলেই বাকি বর্ণ হিন্দু সমাজ সহজেই মেনে নেবে তাকে। কিন্তু চাঁদ তো অন্য ধাতুতে গড়া। ব্যাঙ্গ বিদ্রুপ করে মনসাকে বললেন,
“যে হাতে পূজি মুঁই শিব শূলপাণি
তাতে না পূজিব মুই চ্যাঙমুঁড়ি কানি।”
কিন্ত দেবী মনসাও ছাড়ার পাত্রী নন। প্রবল পৌরুষের প্রতীক চন্দ্র ধরের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হলেন। এক সময় সর্বশান্ত চাঁদ পুত্রবধূ বেহুলার অনুরোধে বাধ্য হলেন নত হতে। বাম হাতে পূজা দিলেন দেবীর। এভাবেই নিজ অধিকার আদায় করলেন দেবী মনসা। আর্য অহঙ্কার নত হল অনার্য মাতৃতান্ত্রিক সমাজের কাছে।

পদ্মা কি জৈন দেবী পদ্মাবতী?
দুর্গাগ্রামের পদ্মা পূজার নিয়ম নীতি মনসার সাথে মেলে না। তবে কি তিনি জৈন নাগ দেবী পদ্মাবতী! এই দেবীর পূজা হয় দশমী তথা দশহরার দিন। এখানে ঝাঁপান নেই অর্থাৎ সাপ খেলিয়ে মনসা মঙ্গলের গান গাওয়া হয় না।জৈন অহিংসা মতেই এই এলাকায় সাপ ধরা ও মারা নিষিদ্ধ। কিছু দিন আগেও এলাকার মানুষ সাপ ধরে কলসী বা মাটির পাত্রে ভরে পদ্মাতলায় ছেড়ে যেত।এখন পূজা তলার আশপাশে বসতি গড়ে ওঠায় সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। এই গ্রামে এজন্যই সাপ ধরা,সাপের খেলাও নিষিদ্ধ ছিল তাই এক সময় বেদে জাতির প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল এলাকায়।এখানে মনসার প্রিয় সিঁজ বৃক্ষ নেই,পূজা হয় পাথরে। পূজার দিন অরন্ধন পালন করেন কিছু সম্প্রদায়। এই সব নানান প্রমাণে কাটোয়ার লোক সংস্কৃতি গবেষক স্বপন ঠাকুরের ধারনা ইনি জৈন সর্প দেবী পদ্মাবতী।
পদ্মাবতী হলেন ২৩ তম জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের শাসন দেবী (রক্ষাকারী দেবী), তার শাসন দেব হলেন পার্শ্বযক্ষ। তাপস কামাথ যখন গাছের গুঁড়িতে অগ্নিসংযোগ করে হত্যা করার চেষ্টা করেন, তখন পার্শ্বনাথ আরো দুই নাগ নাগিনীকে রক্ষা করেন। এরা মৃত্যুর পর ইন্দ্র ও পদ্মাবতী হয়েছিলেন। জৈন শাস্ত্র অনুযায়ী পার্শ্বনাথকে যখন মেঘমালী উত্যক্ত করেন, তখন পদ্মাবতী ও তার স্বামী ধরণেন্দ্র তাকে রক্ষা করেন। পদ্মাবতী পদ্ম ফুলের উপর বসে থাকেন, তার মাথার উপর থাকে একটি সাপের ফণা। প্রায়শই তার মূর্তির মুকুটে পার্শ্বনাথের একটি ছোট চিত্র খোদিত থাকে।(উইকিপিডিয়া)

বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে জৈন ধর্ম বিস্তারের অনেক প্রমাণ আজো আছে। বাঁকুড়া পুরুলিয়া জেলায় এখনও অনেক জৈন মন্দির মূর্তি বর্তমান। তারা হিন্দুর দেব দেবী রূপে পূজা পাচ্ছেন। বর্ধমানের মঙ্গলকোট ব্লকের বাবলাডাঙ্গা শঙ্করপুরে জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের মূর্তি এখন ল্যাংটেশ্বর শিব। পাশের কুন্দা গ্রামেও জৈন তীর্থঙ্করের মূর্তি আছে। কাছেই দাঁইহাটের বেড়া অঞ্চলে উদ্ধার হয়েছে জৈনদের পিতলের নৈপজ্জি। তাতে একটি জৈন মন্দির প্রতিষ্ঠার (১৩৯৭ খ্রীষ্টাব্দ)কথা লেখা আছে। স্থানীয় করজগ্রামেও আছে ল্যাংটেশ্বর তলা। অর্থাত এখানেও একদা জৈন ধর্ম ছিল। তাই দুর্গাগ্রামে জৈন দেবীর পূজাও অবিশ্বাস্য নয়।
পদ্মা কি বৌদ্ধদেবী জাঙ্গুলী?
দুর্গাগ্রামের দেবী পদ্মার ধ্যান মন্ত্রে রয়েছে জাঙ্গুলীর উল্লেখ।

“৺ও দেবীং কাঞ্চনাং সন্নিভ্যাম কৃতশেখরাং ফেনময়ী চার্ব্বেতং রাগেন্দ্র বন্দোং পুত্রিকাং বিষহরি তেজসে জাঙ্গুলীং বাং শ্রীং পদ্মাদেবী নমঃস্তুতে।”
জাঙ্গুলী বৌদ্ধ মহাযান তন্ত্রের সুপরিচিত দেবী।তবে কি এই দেবী বৌদ্ধদের! সেটাও অসম্ভব নয়। কারণ এক সময়ে এই বাংলা ভেসেছিল বৌদ্ধ ধর্ম প্লাবনে। বিশেষত বাংলার পাল বংশের দীর্ঘ শাসনকালে এখানে হিন্দু ব্রাহ্মণ্য ধর্ম প্রথমে প্রায় লোপ পেয়েছিল। তার পর শূর, বর্মন, সেন বংশের শাসনে আবার আবার প্রবল হল। বৌদ্ধদের একাংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল। অন্যরা চৈতন্যদেব ও নিত্যানন্দের প্রভাবে ফিরে এল সনাতন ধর্মে। তাদের তন্ত্র মন্ত্র দেব দেবী অনেক কিছুই হিন্দুর হল। কিছুদিন আগেই আমাদের গ্রামের কাছেই বেড়াগ্রামে (দাঁইহাট) একটি পুষ্করণী খননে উদ্ধার হয়েছে বৌদ্ধদেবী মারিচীর মূর্তি। অদূরে মঙ্গলকোটের মশারু,পলশনা ও আশপাশ গ্রামে পূজিতা সর্পদেবী ঝাঁকলাই তো বৌদ্ধ নাগ দেবী জাঙ্গুলীর নামান্তর। বৌদ্ধ প্রভাবের চিহ্ন দুর্গাগ্রামেও আছে। তাই দেবী পদ্মাও কোন এক সময়ে বৌদ্ধ প্রভাবিত ছিলেন সন্দেহ নেই! সেজন্যই এখনও জঙ্গলেই তার বাস! ডঃ নীহাররঞ্জন রায়ের মতে জাঙ্গুলী দেবী ছিলেন শবর কুমারী,জঙ্গল বাসিনী। এই দেবী বীণা বাজান ও মনসার মতই সর্প বিষ ঝেড়ে দিতে পারেন। মনে রাখা দরকার যে, বৈদিক দেবী সরস্বতীরও এই গুণ ছিল। যাইহোক বৌদ্ধ যুগে দীর্ঘ সময় দেবী পদ্মা জাঙ্গুলী রূপেই ছিলেন এখানে।

আশ্চর্য সমন্বয় ও সহাবস্থান
বাংলার লোক ধর্ম সময়ের নানান স্রোতে অবগাহন করেছে বারবার। এখানে পালা পার্বণ ধর্ম তাই এত বিচিত্র। যে এসেছে সেই রেখে গেছে তার চারন চিহ্ন। এখনো দেবী পদ্মার বাৎসরিক পূজার দিনে পূজা তলায় তিন চারটি স্থানে পৃথক পূজার আয়োজন হয়। সেগুলো আমরা ভিন্ন গোষ্ঠীর পূজা বলে জানি। কিন্তু মত এক হলে তেমন হবার কথা নয়! বিস্মৃত ইতিহাসের স্মৃতি চিহ্ন এখানেই খুঁজে নিতে হয়। হিন্দু বৌদ্ধ জৈন যে মত যখন ছিল প্রবল, দেবী তখন তাদের হয়েছেন। অন্যরা সরে গেছে দূরে। এখানে একাধিক পূজার কারণ সেটাই। বাংলার গোয়ালা বা গোপ সম্প্রদায় ব্রাহ্মণ্য আচার ধর্মের প্রভাব বিস্তার সত্বেও দীর্ঘ দিন বৌদ্ধ ধর্ম প্রভাবিত ছিল। সেই সূত্রে তাদের পূজা,পূজারী ছিল আলাদা। তাই তাদের পদ্মাপুজা এখনও আলাদা। অনার্য অন্ত্যজ সম্প্রদায় কোন দিন আর্য ধর্ম মানেনি। তাদের পূজার স্থান আলাদা। তারা শূকর হাঁস বলি দেন। অর্থাত জৈন বৌদ্ধ অনার্যের অতীত চিহ্ন হারিয়ে যায় নি এখনও। অনেক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও এখানে পূজা পাঠান,পুষ্প নিয়ে যান। এক সময়ে তারাও হিন্দু সমাজের অংশ ছিলেন। তাই কি তাদের অন্তরে সেই বিস্মৃত অতীতের টান! তাই নানা মত, পথ, ও বিশ্বাসের সেতুবন্ধন ও সমন্বয়ের প্রতীক আমাদের পদ্মাপুজা।
আমাদের গর্ব
ঠাকুর শ্রী শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন ‘যতো মত ততো পথ’। এই বহুত্বের বিশ্বাস আমাদের অনেক রূপান্তরের অর্জন। অনেক সাধনার ধন। আমাদের অন্তর আজ বিকশিত পদ্ম। আর নানা মত নানা পথের লালনক্ষেত্র আমাদের পদ্মাতলা। এ শুধু ধর্মক্ষেত্র নয় এক ঐতিহাসিক ক্ষেত্র। আমাদের বাস সেই সাধনক্ষেত্রে! ভাবলে বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।
সমাপ্ত